আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

ভুল ধারণা – আনাপান ভাবনায় আলো হচ্ছে উপক্লেশ

আমাদের ক্লাস শেষ। পরীক্ষা শুরু হবে কিছুদিনের মধ্যে। হাতে কিছু সময় মিলেছে। এই ফাঁকে কয়েকটা বিষয় নিয়ে লিখব বলে ভাবছি। আজ লেখা যাক ধ্যানের সময় দেখা আলো নিয়ে।

শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ে ভাবনায় বসে অনেকেই আলো দেখে থাকেন। তখন আমাদের দেশের অনেক বিদর্শনাচার্য বলে দেন, আলো হচ্ছে উপক্লেশ। সেগুলোতে মন দিতে নেই। আরো অনেক কিছু বলে তাকে সেই আলো নিয়ে পড়ে থাকতে নিরুৎসাহিত করা হয়। তখন ভাবনাকারী আলো হারিয়ে আর পথের হদিশ পায় না। দিকভ্রান্ত হয়ে ঘুরতে থাকে অন্ধের মত। কী আফসোস।

যারা এরকম বুদ্ধশাসনে সুদুর্লভ প্রব্রজ্যা লাভ করেও বিশুদ্ধির সহজ সোজা পথকে যথাযথভাবে জানে না, ফলে বহু প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সফল হয় না, তাদেরকে উদ্দেশ্য করেই আচার্য বুদ্ধঘোষ তার বিখ্যাত বিশুদ্ধিমার্গ গ্রন্থটি লিখেছেন। তাই যারা এরকম অন্ধভাবে ঘুরছে, তাদের খুব মনোযোগ দিয়ে বিশুদ্ধিমার্গ বইটি পড়া উচিত। বার বার পড়া উচিত। শুধু পড়লে হবে না। সেব্যাপারে অভিজ্ঞজনের কাছ থেকে জিজ্ঞেস করে নেয়া উচিত। তবে যারা মনে করে তারা সবকিছু জেনে বসে আছে, তাদেরকে আমার বলার কিছু নেই।

সে যাই হোক, আলোর ব্যাপারে বলি। শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ে ভাবনায় মনোযোগ একটু গভীর হলে আলো দেখা দেয়। উদাহরণস্বরূপ আপনি শ্বাসপ্রশ্বাসের ভাবনা করছেন। যদি কয়েকদিন ধরে প্রতিদিন ৭/৮ ঘন্টা ভাবনা করেন, আর যদি একটানা কমপক্ষে পনের বিশ মিনিট শ্বাসপ্রশ্বাসে মনোযোগ রাখতে পারেন, তাহলে কয়েকদিনেই আলো দেখা দিতে পারে।

এই আলো দুই ধরনের হয়। ধ্যানের আলো। এবং আলো নিমিত্ত। ধ্যানের আলো সাধারণত সমস্ত দিক আলোকিত করে থাকে। যেন মনে হবে আপনার চারপাশের সবকিছু আলোয় আলোকিত। অথচ সেই আলো কোত্থেকে আসছে সেটাও দেখা যায় না। অর্থাৎ আলোটা একজায়গায় কেন্দ্রীভূত নয়। সেটা হচ্ছে ধ্যানের আলো।

অন্যদিকে আলো নিমিত্ত হচ্ছে একটা আলো, যেটা হীরের মত, মুক্তার মত, জ্বলজ্বল করবে ঠিক আপনার নাকের ডগায়। অথবা আপনি যেখানে মনোযোগ দেবেন সেখানে। আপনার মনোযোগ যত গভীর হবে, তত সেটা আরো উজ্জ্বল হবে, আরো ঝিকমিক করে আলো ছড়াবে। আপনার ভাবনাগুরু হয়তো বলবেন সেদিকে না তাকাতে। কিন্তু আপনার তো চোখ বন্ধ। তাই সেদিকে চোখ খুলে তাকানোর প্রশ্নই আসে না। কিন্তু তবুও চোখ বন্ধ করলেই আপনি যেদিকে তাকাবেন সেই আলোটাকে দেখবেন। সেটার একটা ছাপ সবসময় আপনি চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাবেন। সেটাই হচ্ছে আলো নিমিত্ত। সেটা উদগ্রহ নিমিত্ত হতে পারে, অথবা প্রতিভাগ নিমিত্ত হতে পারে। উদগ্রহ নিমিত্ত হচ্ছে প্রাথমিক স্তরের, তার আলো খুব একটা ছড়ায় না। প্রতিভাগ নিমিত্ত হচ্ছে গভীর স্তরের, তার আলো হয় অতি উজ্জ্বল, সেটা আপনার চারদিকে ছড়িয়ে আলোকিত করে থাকে।

আপনি যদি ধ্যানে বসে কোনোকিছু দেখতে চান তাহলে এই প্রতিভাগ নিমিত্তের আলোতে দেখতে হবে আপনার। ধরা যাক আপনি কোনো একটা জিনিসের ব্যাপারে জানতে চান। তাহলে আপনার ধ্যানে বসে এই প্রতিভাগ নিমিত্তকে আনতে হবে। সেটা আসলে আলোকিত হয়ে উঠবে চারদিক। তখন আপনি যে জিনিসটা জানতে চান সেটাকে মনে মনে স্মরণ করতে হবে। তবে সেটা এমন না যে টিভির রিমোটের মত বোতাম চাপলেই টিভির পর্দায় সবকিছু দেখতে পাবেন। তার জন্য কিছুক্ষণ সময় দিতে হবে। কিন্তু তারপরেও যা দেখতে পাবেন তা সবসময় বাস্তবের মতো হয় না। কারণ আমরা খালি চোখে যেরকম দেখি সেগুলো ধ্যানের আলোয় সেরকম দেখা যায় না। কাজেই অনেক ক্ষেত্রে হয়তো সেটা বুঝতে কষ্ট হবে আপনার।

যেমন আপনি খালি চোখে দেখছেন নাগরাজার আসনে থাকা বুদ্ধমূর্তিকে। কিন্তু ধ্যানের আলোয় হয়তো দেখলেন সেই নাগরাজা বিশাল আকারে, জীবন্ত নাগের মতো হয়ে আপনার সামনে হাজির হয়েছে। সেরকম দেখলে ভয় পাওয়া স্বাভাবিক। আমি অনেকবার জিজ্ঞেস করেছি, কেন এরকম হয়। কেন যথাযথভাবে দেখা যায় না? সেয়াদ সাধারণত উত্তর দিয়েছেন, সংজ্ঞার বিভিন্নতার কারণে সেগুলো সেরকম দেখা যায়। তাই একটা নাগরাজাকেই ধ্যানের আলোয় একজন দেখে একেকভাবে। তবে আমার মনে হয়েছে, এব্যাপারে আমাদের আরো গবেষণা করা উচিত, পরীক্ষা নিরীক্ষা করা উচিত।

কোত্থেকে কোথায় চলে যাচ্ছি। আলোর ব্যাপারে বলছিলাম। এভাবে এই আলো আসে শ্বাসপ্রশ্বাসের ভাবনায় মনোযোগ গভীর হলে, অথবা আলোর নিমিত্ত পেলে।

কিন্তু বিদর্শনাচার্যগণ যে আলোকে উপক্লেশ বলছেন সেটা কোন ধরনের আলো? সেটা হচ্ছে বিদর্শনের আলো। সেই আলো আসে কখন? সেটা আসে উদয় বিলয় জ্ঞানের স্তরে। সেই উদয় বিলয় জ্ঞান আসে কখন? মার্গ-অমার্গ জ্ঞানদর্শন বিশুদ্ধির ধাপে। সেই বিশুদ্ধির ধাপে পৌঁছানো যায় কখন? সেটাতে পৌঁছাতে হলে আপনার ক্রমান্বয়ে তার পূর্ববর্তী বিশুদ্ধির স্তরগুলো সম্পন্ন করতে হয়।

একটু ব্যাখ্যা করা যাক। বিদর্শনের অনেকগুলো ধাপ আছে। সেগুলোকে বলা হয় সপ্ত বিশুদ্ধি। মধ্যম নিকায়ের রথবিনীত সুত্রে বলা হয়েছে –

১) আপনার প্রথমে শীলবিশুদ্ধির পথ পাড়ি দিতে হবে। শীল যথাযথভাবে পালন করলে শীলবিশুদ্ধির পথ পাড়ি দেয়া হয়। সেই পথে এরপর আপনি পৌঁছবেন চিত্তবিশুদ্ধির গেটে।

২) চিত্তবিশুদ্ধির গেটে প্রবেশ করে আপনার চিত্তকে বিশুদ্ধ করতে হবে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে বলা যায়, আপনি যদি একমনে ধ্যান করেন, তাহলে ধ্যান শুরুর কয়েকদিনের মধ্যেই এরকম গভীর মনোযোগ লাভ করতে পারেন। আপনার মনোযোগ গভীর হলে তখন চিত্তবিশুদ্ধি পরিপূর্ণ হয়। তখন আপনি পৌঁছবেন দৃষ্টিবিশুদ্ধির ধাপে।

৩) দৃষ্টিবিশুদ্ধির ধাপে আপনার দেহমনকে ভাগ ভাগ করে দেখাটা শিখতে হবে, অনুশীলন করতে হবে। বিশুদ্ধিমার্গে সুন্দর করে তার নিয়মটা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ আপনি যদি শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ে ভাবনাকারী হন তাহলে আপনার প্রথমে এই আলো নিমিত্ত না পাওয়া পর্যন্ত ধ্যান করতে হবে। আলো নিমিত্ত পেলে সেটা নিয়ে ঘন্টাখানেক ধ্যান করার পরে তার ধ্যানাঙ্গগুলো দেখতে হবে। অর্থাৎ বিতর্ক বিচার ইত্যাদিকে দেখতে হবে। সেগুলো যদিও মনের অংশ এবং মনকে খালি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু মনে রাখবেন মন হচ্ছে চোখের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। মন সবকিছুকে দেখতে পারে। সবকিছু মনের বিষয়বস্তু হয়। তাই একটা মন আরেকটা মনকে দেখতে পারে। তাই ধ্যানাঙ্গগুলোও আপনি দেখতে পাবেন ধ্যান লাভ করলে। এরপর সেগুলোর সাথে উৎপন্ন হওয়া মনগুলোকে একটা একটা করে দেখে নিয়ে এরপর সেগুলোর উৎপত্তিস্থল হিসেবে হৃদয়রূপকে দেখতে হবে। এই হৃদয়রূপ কিন্তু হৃদপিণ্ড নয়, অথবা হৃদপিণ্ডে থাকা রক্ত নয়। বরং সেই রক্তের ভিত্তিতে উৎপন্ন হওয়া কর্মজাত অতি সুক্ষ্ম পদার্থ, যা খালি চোখে দেখা যায় না। সেই হৃদয়রূপে থাকা চারি ধাতু এবং অন্যান্য পদার্থকে বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে একটা একটা করে। এভাবে মন ও দেহকে ভাগ ভাগ করে দেখাটা শিখতে হয়।

কিন্তু আপনি যদি শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ে ভাবনা করেও আলো না পান, তাহলে কীভাবে মন ও দেহকে ভাগ ভাগ করে দেখবেন? তার জন্য বিশুদ্ধিমার্গে যেভাবে বলা হয়েছে সেভাবে প্রথমে চারিধাতু ভাবনা করতে হবে। চারিধাতু ভাবনার মাধ্যমে দেহকে চারিধাতু হিসেবে দেখতে হবে। এরপরে মনকেও দেখতে হবে। চারিধাতু ভাবনা কীভাবে করতে হয় তা বিস্তারিত জানার জন্য বিশুদ্ধিমার্গের দৃষ্টিবিশুদ্ধি অধ্যায়ে দেখুন। আর তা হাতেকলমে করতে চাইলে জানা ও দেখা বইটিতে পাঅক সেয়াদের শেখানো পদ্ধতিটা দেখুন।

এভাবে দেহ ও মনকে ভাগ ভাগ করে দেখলে সে তার নিজের দেহমনে আত্মার অস্তিত্বও খুঁজে পায় না। তখন তার দৃষ্টিবিশুদ্ধি পরিপূর্ণ হয়। সে পৌঁছে যায় সন্দেহ উত্তরণ বিশুদ্ধির ধাপে।

৪) সন্দেহ উত্তরণ বিশুদ্ধির ধাপে পৌঁছে ভাবনাকারী কারণসাপেক্ষ উৎপত্তিকে (প্রতীত্য সমুৎপাদ) অনুশীলন করে। সে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতে উৎপন্ন দেহমনের কারণকে যথাযথভাবে দেখে থাকে। তার যেসমস্ত সন্দেহ দেখা দিত, অর্থাৎ অতীতে আমি কি ছিলাম? সত্যিই কি আমার পুনর্জন্ম হয়েছে? ভবিষ্যতেও কি জন্মাব তার সমস্ত সন্দেহ দূরীভূত হয়। পাঅক ভাবনাকেন্দ্রে সাধারণত অতীতের এবং ভবিষ্যতের কমপক্ষে পাঁচ জন্মকে দেখে নিতে হয়। এরকম দেখতে পেলে বুঝতেই পারছেন, আপনার পুনর্জন্ম সম্পর্কে সন্দেহ তখন দৌড়ে পালাবে। তখন বুঝবেন যে, সবই হচ্ছে দেহমনের কারণসাপেক্ষ উৎপত্তি। সেখানে কোনো আত্মা নেই, কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই। এভাবে তখন আপনি এই ধাপ সম্পূর্ণ করে পৌঁছবেন মার্গ-অমার্গ জ্ঞানদর্শন বিশুদ্ধির ধাপে।

৫) মার্গ-অমার্গ জ্ঞানদর্শন বিশুদ্ধি মানে হচ্ছে কোনটা সঠিক পথ আর কোনটা সঠিক পথ নয় তা জানা ও দেখা। তার জন্য ভাবনাকারীর দেহকে আরো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। দেহ হচ্ছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণার সমষ্টি, যেগুলোকে বলা হয় কলাপ বা গুচ্ছ। কীসের গুচ্ছ? মৌলিক উপাদানের গুচ্ছ। একেকটি দেহকণা কমপক্ষে আটটি মৌলিক উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। সেগুলো সবসময় উৎপত্তি ও বিলীন হয়ে যাচ্ছে বিরামহীনভাবে। সেগুলোর বিভিন্ন প্রকার উৎপত্তিকে দেখতে হবে। বিভিন্ন প্রকার মন এবং সেগুলোর উৎপত্তিকেও দেখতে হবে। তার পদ্ধতিগুলো বিশুদ্ধিমার্গে বলা হয়েছে। আরো বিস্তারিত জানার জন্য “জানা ও দেখা” বইটা দেখুন।

বিদর্শনের এই ধাপটিই হচ্ছে উদয়বিলয় জ্ঞানের স্তর। এই স্তরে পৌঁছে নবীন বিদর্শন ভাবনাকারী তার দেহমনের উৎপত্তি ও বিলীন হওয়াকে দেখতে দেখতে তার মধ্যে দশ প্রকার লক্ষণ দেখা দেয়। তার মধ্যে একটা হচ্ছে আলো। সেটাই হচ্ছে বিদর্শনের উপক্লেশ।

চিন্তা করুন তো, বিদর্শনের কোন পর্যায়ে এসে এই আলো দেখা দেয়। এই আলো দেখা দেয় বিদর্শনের একদম শেষের দিকে, যখন ভাবনাকারী দেহ মনকে ভাগ ভাগ করে দেখতে শিখেছে, কলাপগুলোকে ভাগ ভাগ করে সেগুলোর উদয় বিলয়কে দেখতে পারছে।

তাই যারা এভাবে আলোর দেখা পেয়েছে তাদের আগে নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত সেটা তারা কীভাবে পেয়েছে। তখন তাদের ধ্যানের বিষয়বস্তু বা আলম্বন কী ছিল? তখন তারা কী নিয়ে ধ্যান করছিল? তখন কি তারা শ্বাসপ্রশ্বাসে মনোযোগ দিচ্ছিল? যদি তা হয় তাহলে সেটা তাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের আলো। সেটা উপক্লেশ নয়।

নাকি তারা দেহমনের বিশ্লেষণ সম্পন্ন করে, অতীত ভবিষ্যত জন্মগুলো দেখে নিয়ে, কলাপগুলোর উদয়বিলয়কে দেখার সময়ে সেই আলো দেখা দিয়েছিল? সেটা যদি হয় তাহলে নিশ্চিতই তা বিদর্শনের উপক্লেশ।

এভাবেই তাদের সেই আলোর কারণকে জেনে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। আন্দাজে আলো দেখলেই বিদর্শনের উপক্লেশ বলে চালিয়ে দেয়ার কোনো মানে হয় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *