আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

বিনয় ও গারবতা কাকে বলে?

আজ আমাদের আচারিয় পূজা হয়ে গেল। শিক্ষকেরা বেশিরভাগই ভিক্ষু। কিছু গৃহী শিক্ষক শিক্ষিকাও আছেন। সবাইকে উপহার দেয়া হলো। একজন ভান্তে অনুষ্ঠানে যান নি। তাকে আমি তার রুমে গিয়ে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে উপহার পৌঁছে দিলাম । তারপর জিজ্ঞেস করলাম, সেয়াদ, অনুষ্ঠানে গেলেন না কেন?

সেয়াদ বললেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা অনেক সিনিয়র ভিক্ষু। তাদের কেউ কেউ আঠার বর্ষা, উনিশ বর্ষা, বিশ বর্ষা বা তারও বেশি হয়েছেন। অথচ তারা ডিপ্লোমা পড়ছেন। বিএ পড়ছেন। তাদের সামনে তো আর আমি শিক্ষকদের উচ্চ আসনে বসতে পারি না। ভিক্ষু হিসেবে সেটা ঠিক নয়। তাই যাই নি।

সেয়াদের এই যে নম্রতা, বিনয়ী মনোভাব, এটা আমাকে খুব মুগ্ধ করল। গারবতা তো একেই বলে।

বুদ্ধ মহাকাশ্যপ ভান্তেকে প্রথম দেখাতেই বলেছিলেন, হে কাশ্যপ, তীব্র লজ্জা ও ভয় রাখতে শিখ নবীন, মধ্যম ও প্রবীণ ভিক্ষুদের প্রতি। সেটা কীজন্য বলেছিলেন? কাশ্যপ ছিলেন জাতে ব্রাহ্মণ। খুব সেই জাতের অহংকার যেন তিনি লালন না করেন তার জন্যই তিনি সেরকম বলেছিলেন।

আমরা ভিক্ষুরা জাতের অহংকার করতে পারি না। জ্ঞানের অহংকার করতে পারি না। শিক্ষক হয়েছি বলে বড়দের সামনে উচ্চ আসনে বসতে পারি না। এটা হচ্ছে সিনিয়রদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান দেখানো। এটাই হচ্ছে গারবতা।

তারা যদি ভুলও বলেন আমরা সেখানে তর্ক করতে পারি না। মতপার্থক্য থাকতেই পারে। সবারই নিজস্ব পছন্দ অপছন্দ আছে। আমাদের সবগুলো কথা অন্য কারোর ভালো না লাগাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার জন্য যদি আমরা ফেসবুকে ইচ্ছেমত গালাগালি করি, তাহলে সেটা আমাদেরই সংকীর্ণ মনের পরিচয় দেয়। অর্থাৎ আমরা অপরকে সম্মান করতে শিখি নি। অপরের মতকে সম্মান করতে শিখি নি। আমরা শুধু মনে করেছি যে আমরাই সঠিক। বাকি সবাই ভুল।

এধরনের আত্মকেন্দ্রিক অহংকারী মনোভাব আমাদেরই হীনমনের পরিচয় দেয়। আমরা মনটাকে উদার করব। মতপার্থক্যকে মেনে নিতে শিখব। অন্যদেরকে মানুষ হিসেবে, ব্যক্তি হিসেবে সম্মান দিতে শিখব। ধর্ম আমাদেরকে এভাবেই বিনয়ী হওয়ার শিক্ষা দেয়। এজন্যই তো বুদ্ধ এই ধর্মকে বলতেন ধর্মবিনয় নামে।

এমন বিনয়ী ধর্মের ধ্বজাধারী হয়েও আমরা যদি নম্র ভদ্র না হই, বিনয়ী না হই, এই বেসিক জিনিসগুলোও যদি আমরা না শিখি, জানোয়ারের মত কথার আঘাতে ছিন্নভিন্ন করে দিই অপরকে, তাহলে কোথায় গেল শীল শিক্ষা? কোথায় গেল ধ্যান শিক্ষা? কোথায় গেল মার্গফলের শিক্ষা? অথচ ভিক্ষু হয়েছি তো এগুলোর জন্যই। আমরা তো তখন পথভ্রষ্ট ভিক্ষু।

পথহারা ভিক্ষু অন্যকে কী পথ দেখাবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *