আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

আচারিয় পূজা

আমাদের এখানে আচারিয় পূজা হবে। আচারিয় মানে হচ্ছে শিক্ষাগুরু। সোজা কথায়, শিক্ষাগুরুদেরকে সম্মাননা জানানো। অনেক কিছু উপহার দেয়া হবে শিক্ষকদেরকে। তাই প্রত্যেক ক্লাস থেকে টাকা তোলা হচ্ছে। বার্মিজ ভিক্ষুদের জন্য ৫০ হাজার চ্যাট ধরা হয়েছে। আমরা বিদেশি। তাই আমাদের জন্য সাত খুন মাপ। তবে না দিলে কেমন জানি লাগে। শিক্ষকদেরকে পূজা করাটাও তো পুণ্যকাজ।

আমি গেলাম আমাদের ক্লাসের সহপাঠী ড. তিনমা লুইনের কাছে। এই উপাসিকা নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে পিএইচডি করে আবার আমাদের সাথে ডিপ্লোমা বিএ এসব পড়ছে। ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা আছে তার, সেটা মানতেই হবে। তাকেই আপাতত আমার কপ্পিয়কারক বানিয়েছি। বললাম, আচারিয় পূজায় কিছু তো দেয়া দরকার। সে দুহাত জোড় করে বলল, ভান্তে, কত দেব? আমি বললাম, কত আছে? সে বলল, ৭০ হাজার আছে।

ভিক্ষু হিসেবে টাকা পয়সা নিয়ে কথা বলা খুব ঝামেলা। কথাবার্তায় একটু গড়বড় হলেই বিনয়ের জালে ফেঁসে যেতে হয়। আমি এগুলো নিয়ে যতটুকু সম্ভব সতর্ক থাকার চেষ্টা করি। আমি যদি বলি, ৫০ হাজার দিয়ে দাও। তাহলে সেটা অর্ডার দেয়ার মত হয়ে যাবে। ভিক্ষুরা বলতে পারে না, এত টাকা দাও, অমুককে দাও। অথচ বেশিরভাগ লোকজনই সেটা বোঝে না। তারা একটা পরিষ্কার জবাব চায়। কত দিতে হবে? কাকে দিতে হবে? মহা ঝামেলা।

তাই আমাকে একটু বুদ্ধি করে বলতে হল- সবাই তো ৫০ হাজার করে দিচ্ছে। সে বুঝল, ৫০ হাজার? আর ইউ সুওর? আমি হেসে বললাম, অবশ্যই, দেখলাম তো। ৫০ হাজার করে দিচ্ছে সবাই। সে হেসে বলল, ওকে, ভান্তে।

এই টাকাগুলো তার হাতে কীভাবে এল, তার একটা বিশাল কাহিনী আছে। আজকে বিকালে ক্লাস নেই। তাই এই ফাঁকে সেটাও একটু আয়েশ করে বলে নিই।

কঠিন চীবরের মাসে আমরা বাংলাদেশী চারজন ও ভিয়েতনামী এক ভিক্ষুকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল জাপান জাদীর সেয়াদের কাছে।

জাপান জাদী নাম হলো কেন তার কাহিনীও বেশ রহস্যময়। বছর দশেক আগের কথা। জাপানের এক লোক খুব নাকি প্রাচীন মূর্তি সংগ্রহ করত। একদিন সে স্বপ্ন দেখল তার সংগ্রহে থাকা এক বুদ্ধমূর্তি বলছে সেটাকে বার্মার এক বিহারে গিয়ে দিয়ে আসতে। পরপর কয়েকদিন ধরে একই স্বপ্ন দেখে সে জাপান থেকে বার্মায় পাড়ি দিল। অনেক দেখে শুনে অবশেষে এই জাপান জাদী সেয়াদের বিহারে সেই বুদ্ধমূর্তিগুলো দিয়ে দিল, সেটা ইয়াঙ্গুন শহরের বাইরে। সেটা নাকি এখন খুব সুন্দর বিহার হয়েছে। আমি কখনো যাই নি অবশ্য।

তো সেই জাপান জাদী সেয়াদের আহ্বানে আমরা পাঁচজন ভিক্ষু গেলাম। আমাদেরকে প্রথমে চাইনিজ রেস্টুরেন্টে নিয়ে খাওয়ানো হলো। চাইনিজদের মতো করে ছোট এক বাটি ভাত, আর নানা পদের তরকারি। সাথে দিয়েছে চপস্টিক। খাওয়া খুব কম খেতে পারলাম।

সেখান থেকে একটা এ্যাপার্টমেন্টে গেলাম। জায়গাটা শোয়েডাগন জাদীর কাছেই। সেখানেই জাপান জাদীর সেয়াদের সাথে পরিচয় হওয়া গেল। ছাদের উপরে বুদ্ধমূর্তি বসানো হয়েছে একটা। আমরা বন্দনা করে ছবি তুললাম। এক সুন্দর চেহারার তরুণকে আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হলো। সে নাকি বার্মিজ ফিল্মের নায়ক। দুঃখিত, নায়ক বাবাজির নামটা ভুলে গেছি।

সেয়াদ ছাদের উপরে সুইমিং পুল বানিয়েছেন। বলা ভালো, ভিক্ষুরা সাঁতার কাটতে পারে না। তাই যারা সাঁতার কাটবে তারা নিজ দায়িত্বে সাঁতরাবে।

ছাদ থেকে নামার পথে এবার দেখলাম লোকজন লাইন ধরে দাঁড়িয়েছে। খাম ধরিয়ে দেবে। চীবর ইত্যাদিও দেবে। কয়েকজন লোক কপ্পিয়কারক হিসেবে দাঁড়িয়ে গেল। তারা লোকজনের কাছ থেকে খাম সংগ্রহ করে নিল। এরপর চলে আসার সময়ে গাড়িতে উঠে জিনিসপত্রসহ সেগুলো ধরিয়ে দিল।

আমি পড়ে গেলাম বিপদে। গাড়ির ভেতরে আমাদের ইউনিভার্সিটিরই একজন বয়স্ক স্টাফ বসেছিল। তাকে বললাম খামগুলো নিয়ে নাও। সে বলল, এক্কেবারে নিয়ে নিলাম কিন্তু। আমি বললাম, কোনো সমস্যা নেই। যা আছে সব নিয়ে নাও।

আমি সেগুলোর খবরও রাখি নি আর। পরদিন সকালে খাওয়ার সময়ে সেই স্টাফ দেখা করতে আসল। এসে বলল, তার নাকি বদলি হয়ে যাচ্ছে। সেদিনই যেতে হবে। আমি বললাম, ও আচ্ছা। ভালো তো। বদলি হলে সেটা আমাকে বলতে হবে কেন। তার যে খুব ঘনিষ্ঠ আমি সেটা তো না।

আবার বিকালে আমাকে খুঁজতে আসল কয়েকজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। ছবি মিলিয়ে দেখল আমিই কিনা। এরপর খামটা দিয়ে বলল ভান্তে, ঐ স্টাফ বদলি হয়ে গেছে। আমি বললাম, হ্যাঁ, সকালে কথা হয়েছে তো। আবার বলল, এই টাকাটা দিতে বলেছে। এই কর্মকর্তা হচ্ছেন ঐ স্টাফের বস। সে তার বসকে দিয়ে আমাকে টাকা পাঠাবে তা আমার বিশ্বাস হলো না। কিন্তু আমি বললাম, আমি তো এগুলো নেব না।

আমি কখনোই বলি নি যে আমি টাকা ধরি না। পরে সে বুঝল। এবার সে জিজ্ঞেস করল, ভান্তে, আপনার কোনো কপ্পিয়কারক আছে? এটা তো নির্দোষ প্রশ্ন। তাই আমি বললাম, অবশ্যই আছে। আমাদের ক্লাসের একজন আছে। ড. তিনমা লুইন। সে চিনল না, কিন্তু তার সাথে যে দুয়েকজন স্টাফ ছিল, তারা চেনে। ব্যস, ঝামেলা মিটে গেল। এভাবে সেই টাকাটা আমার কপ্পিয়কারকের হাতে পৌঁছে গেল।

পরে জেনেছি, সেবারে আমাদের পাঁচজনের প্রত্যেককে দেয়া হয়েছিল বার্মিজ টাকায় ৬লাখেরও বেশি করে। কিন্তু আমার কপ্পিয়কারকের হাতে পৌঁছেছিল মাত্র ১ লাখের মতো। বাকিগুলো হাওয়া। ওরা কি একারণেই হুট করে সেই স্টাফকে বদলি করে দিল? আমি জানতে চাই নি। জানার ইচ্ছেও হয় নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *