আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

বার্মাদেশে ধর্মীয় পরিমণ্ডলেও বহু পরিবর্তন

বর্তমানে বার্মাদেশে ধর্মীয় পরিমণ্ডলেও বহু পরিবর্তন হচ্ছে। ইয়াঙ্গুনে এই ৩০/৪০ বছর আগেও ভিক্ষুরা প্রকাশ্যে টাকাপয়সা ব্যবহার করতেন না। কিন্তু এখন যেকোনো অনুষ্ঠানে গেলে দায়কেরা খাম একটা ধরিয়ে দেয়। সেটা এতটা ডালভাত হয়ে গেছে যে কোনো ভিক্ষু খাম না ধরলে রীতিমত অবাক হয়ে যায় তারা। হয়তো ভাবে, এমন ভিক্ষুও তাহলে আছে এই দুনিয়ায়।

এখন বার্মাতে ভিক্ষুদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষা করার জোয়ার এসেছে। আমি তাদের সাথে বার্মিজে কথা বললেও তারা উত্তর দেয় ইংরেজিতে। মহা সমস্যা।

মুন প্রদেশের এক খুব প্রাচীন বিহার আছে, যেটা এককালে পরিয়ত্তি বা ধর্মশিক্ষার জন্য খুব বিখ্যাত ছিল। কিন্তু এখন দায়কেরা অভিযোগ করে বলছে, ভিক্ষুরা ধর্মশিক্ষা করে ইংরেজি শেখার জন্য বিদেশে যায়, আর ফিরে আসে না। এখন সেখানে সর্বসাকুল্যে ২০জনের মতো ভিক্ষুশ্রামণ আছে। ভিক্ষুশ্রামণের অভাবে একটা বিল্ডিং তো পুরোটাই নষ্ট হয়ে গেছে।

গতবার বাগানে যাওয়ার পথে আমার কথা হয়েছিল শান স্টেট থেকে আসা এক ভিক্ষুর সাথে। তার নাকি প্রচুর টাকা দরকার, কারণ সে অনেক কিছু করতে চায়। সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ করতে চায়। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম কত টাকা দরকার তার? সে বলেছিল কোটি কোটি টাকা! আমি চমকে গিয়েছিলাম।

শ্রদ্ধেয় সুমনালংকার ভান্তের কথা মনে পড়ছে। তাকে হয়তো অনেকেই চিনবেন বেড়া ভান্তে নামে। তখন আমি গৃহী ছিলাম। গৃহীকালে অত ভিক্ষুদের নিয়ে মাথাব্যথা থাকে না। ভিক্ষু মাত্রেই গৃহীর নমস্য। তাই আমিও তার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। গিয়ে বললাম ভান্তে আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি। তিনি বললেন পারলে একটা টাকার গাছ এনে দাও। যাতে ইচ্ছেমত টাকা পাওয়া যায়। আমি অবশ্য এত মাইণ্ড করি নি তখন। কারণ ভান্তের অনেকগুলো প্রজেক্ট। কত কাজ। সেগুলোতে টাকা লাগবে তো। সেটা তখন আমার গৃহীকালীন দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। আমার মনে হয় গৃহীরা সবাই ভিক্ষুদের ব্যাপারে খুব উদার। তবে এখন অবশ্য ভিক্ষু হয়ে আমার সেই দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে গেছে।

এখন আমার দৃষ্টিভঙ্গি কীরকম হয়েছে? সেটা আপনারা এই বার্মিজ লেখাটা পড়লে জানতে পারবেন। কিন্তু সবাই হয়তো বার্মিজ পড়তে পারেন না। তাই আমার সতীর্থ হাতে গোণা দুয়েকজন ভিক্ষুর জন্য এটা আংশিক অনুবাদ করে দিলাম।

————-বার্মিজ পোস্টের আংশিক অনুবাদ——————–

বুদ্ধশাসনে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে পরিয়ত্তি বা ধর্মশিক্ষা এবং পটিপত্তি বা শীলসমাধির অনুশীলন।

বুদ্ধশাসনের দায়িত্বভার গ্রহণকারী ভিক্ষুশ্রামণেরা ধর্মশিক্ষা ও শীলসমাধির অনুশীলন না করে লৌকিক কাজে সময় কাটিয়ে দিলে তা বুদ্ধশাসনের ক্ষতির কারণ হয়।

ধর্ম শিক্ষা দিতে পারলেও সে ধর্মশিক্ষা দেয় না।

ধ্যান শিক্ষা দিতে পারলেও সে ধ্যান শিক্ষা দেয় না।

ধর্মীয় বই লিখতে পারলেও সে ধর্মীয় বই লেখে না।

বরং ইংরেজি শিক্ষা, কম্পিউটার শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ, হাসপাতাল, পথঘাট, ব্রীজ নির্মাণ ইত্যাদি কাজে সময় কাটিয়ে দেয়।

তা বুদ্ধশাসনের দারুণ ক্ষতির কারণ হয়।

ভিক্ষুর কাজ ভিক্ষু না করলে কে এসে তার কাজ করে দেবে?

ভিক্ষুর কাজ কেবল ভিক্ষুই করতে পারে।

ধর্মশিক্ষক ভিক্ষু হতে গেলে সেটা তো টাকা দিয়ে কেনার জিনিস নয়। কমপক্ষে দশ বছর ধর্মশিক্ষা করে তবেই ধর্মশিক্ষক ভিক্ষু হওয়া যায়।

দায়কের কাজ ভিক্ষু না করলেও সেগুলো করার মানুষ আছে।

রাস্তা নির্মাণের কাজ ভিক্ষু না করলেও তা করার মানুষ আছে।

কিন্তু ধর্মশিক্ষা দেয়ার কাজ যদি ভিক্ষু না করে, তাহলে সেটা করার মত মানুষ তো নেই।

সামাজিক উন্নয়নকাজ সে না করলেও সেগুলো করার মানুষ আছে।

কিন্তু ধ্যানশিক্ষা দেয়ার কাজ যদি ভিক্ষু না করে, তাহলে সেটা করার মত মানুষ তো নেই।

ধর্মপদে বুদ্ধ বলেছেন:অত্তদত্থং পরত্থেন বহুনাপি ন হাপযে। (১৬৬)

অর্থাৎ নিজের শীল, সমাধি প্রজ্ঞার উন্নতির পথকে পরের বহু কল্যাণের বিনিময়েও নষ্ট করো না।

তাই পরের কল্যাণের তরে বুদ্ধশাসনের হানি করা উচিত নয়।-

ছবিতে যে ভিক্ষুদেরকে দেখছেন তারা সবাই বিনয় মেনে চলা ভিক্ষু। এবং আমার মনে হয় সবাই বিদেশি ভিক্ষু। কারণ বেশিরভাগ আমার চেনাপরিচিত।

এদের মধ্যে ডান থেকে দ্বিতীয়জন হলেন শ্রীলঙ্কান ভিক্ষু। নামটা ভুলে গেছি। কিন্তু অভিধর্মে তার অসাধারণ জ্ঞান। প্রচলিত বইপুস্তকে যে প্রশ্নের উত্তর আমি খুঁজে পাইনি সেগুলোই তিনি সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন। এমন প্রজ্ঞাসম্পন্ন আর কাউকে চোখে পড়ে নি আমার।

ডান থেকে চতুর্থজন হলেন শ্রদ্ধেয় দেবানন্দ ভিক্ষু। তিনিও শ্রীলঙ্কান ভিক্ষু। প্রাণ কী? প্রাণি কাকে বলে এসব খুব গভীর অভিধর্মের তাত্ত্বিক বিষয়গুলো নিয়ে তার সাথে আমার কথা হত ঘন্টার পর ঘন্টা।

এই দুজন শ্রদ্ধেয় ভান্তেকে আমি খুব মিস করি। কারণ তারা এত গভীরভাবে বিনয়শীল মেনে চলেন তা আমাকে খুব অনুপ্রাণিত করে। আর ধর্মের ব্যাপারে তাদের এত গভীর জ্ঞান, আমার প্রশ্নের উত্তরগুলো যেগুলো বইয়ের বাইরে, সেগুলো কেবল তারাই উত্তর দিতে পারতেন। তারা ফিরে গেছেন শ্রীলঙ্কায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *