আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

চতুর্থ ধ্যানে চব্বিশ ঘন্টা

সুভূতি ভিক্ষু, পাঅক ভাবনাকেন্দ্র, মায়ানমার

(সুভূতি ভান্তে হচ্ছেন একজন আমেরিকান ভিক্ষু। তিনি মায়ানমারে পাঅক ভাবনাকেন্দ্রে থাকেন। তিনি সেখানকার একজন ভিক্ষুর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন, যিনি ২৪ ঘন্টারও বেশি সময় ধরে চতুর্থ ধ্যানে ছিলেন। সুভূতি ভান্তের মনে হয়েছিল এরকম সাক্ষাৎকার প্রকাশ করলে তা জেনে অন্যরাও অনুপ্রেরণা পাবে। সাক্ষাৎকারটি অনেক লম্বা। আমি শুধু তার প্রথম অংশ এখানে তুলে ধরলাম:)

সুভূতি ভান্তে: ভান্তে, আপনার তো বেশ বয়স হয়েছে। আর আমার জানামতে, আপনি আগে তেমন ধ্যানে সফল হন নি। তো আপনি এর আগে কী করেছিলেন? আপনি কি পরিয়ত্তি শিক্ষা করেছিলেন? আপনি কি অন্য কোনো ধরনের ধ্যান চেষ্টা করেছিলেন? আপনি কি পালি জানেন? একটু বিস্তারিত বলবেন কি?

সিনিয়র ভান্তে: আমি বুদ্ধশাসনের জন্য অনেক কাজ করেছি। আর যখন ভিক্ষু হিসেবে সিনিয়র হয়ে গেলাম তখন আমাদের কাঁধে অনেক দায়িত্ব চাপল। বিহার নির্মাণ … ইত্যাদি। বেশির ভাগ সময় তাতেই চলে গিয়েছিল। কিন্তু আমরা ধ্যান করার চেষ্টা করেছিলাম। আমরা বহু সেয়াদের কাছে গিয়েছি। বহু পদ্ধতি দেখেছি … মহাসি, গোয়েঙ্কা … আরো অন্য বহু পদ্ধতি … কিন্তু সেগুলো এধরনের সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

সুভূতি ভান্তে: নিমিত্ত পায় এমন কোনো ধ্যানপদ্ধতি করেছিলেন?

সিনিয়র ভান্তে: না। না। তবে সচেতনতা ও ইন্দ্রিয় সংযমের প্রাথমিক পদ্ধতি কিছু করেছিলাম। বিশেষ করে তারা যেটাকে বলে বিদর্শন … গোয়েঙ্কা … মহাসিতেও … কিন্তু সেগুলো কোনোটাই এটার মত সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। আমাদের তখন অনেক কিছু করতে হত … বিহারের নানা দায়িত্ব … যেগুলো শেষ হওয়ার নয় … তারপরে আবার ছোট বাচ্চাদের দেখতে হত … বিহারে এধরনের কাজ সবসময় থাকে … যখন মনে হবে তোমার কাজ শেষ তখনই আরেকটা শুরু হয় … এরপর আরেকটা এসে হাজির হয় … যেমন কেউ এসে হয়তো বলল, “ভান্তে, আমি একটি কুটির বানাতে চাই!” [হাসি]

সুভূতি ভান্তে: এখানে আসার আপনার কোনো পরিকল্পনা ছিল না?

সিনিয়র ভান্তে: না। একদম ছিল না। আমার পরিকল্পনা ছিল আমি অন্যান্য বিদর্শন পদ্ধতিগুলো চেষ্টা করে দেখব। কারণ আমি ৬ মাস ছিলাম বাগো শহরে, সেখান থেকে মহাসির পণ্ডিতারাম বিহারে। তারপর পাঅক ভাবনাকেন্দ্রে সেয়াদজি এবং সেয়াদ উ চন্দিমার সাথে দেখা করতে আসলাম। তিনি আমার কপ্পিয়কারককে ফরম ফিলাপ করতে দিলেন। একমাস পরে আমরা ইমেইল পেলাম। কপ্পিয়কারক সাথে সাথে টিকেট কেটে ফেলল রাতের বাসে। আমরা পরদিন সকালে পৌঁছে গেলাম এখানে।

সুভূতি ভান্তে: এখানে এসে নিমিত্ত পেতে আপনার কতদিন লেগেছিল? আপনি কীভাবে ধ্যানে পাঁচ প্রকারে দক্ষতাকে আয়ত্ব করেছিলেন? একেকটি ধাপে কত সময় লেগেছিল? অর্থাৎ প্রথমে শ্বাসপ্রশ্বাস থেকে নিমিত্ত পেতে কত সময় লেগেছিল? এরপরে সেই নিমিত্ত থেকে উজ্জ্বল নিমিত্ত পেতে কত সময় লেগেছিল? একটু বিস্তারিত বলবেন কি?

সিনিয়র ভান্তে: প্রথমে খুব কষ্ট হয়েছিল। পাঁচ মাস লেগেছিল শুধু মন বসাতে। আর তেমন ধ্যানও করা হতো না। দিনে দুবার হয়তো ধ্যানে বসতাম। একবারে ২ থেকে ৩ ঘন্টা। এরকমই হতো।

সুভূতি ভান্তে: এক বসায় দুই তিন ঘণ্টা! খারাপ তো নয়।

সিনিয়র ভান্তে: হ্যাঁ, মাঝে মাঝে বোরিং লাগত। আর ফোনে মেসেজ আসত … খারাপ কিছু নয়, কিছু যোগাযোগ রেখেছিলাম আর কী… তারপর হঠাৎ করে কী হলো কে জানে, লোকজন সব কড়া করে ধ্যান শুরু করে দিল। তারা সারা রাত ধ্যান করে ইন্টারভিউ দিতে যেত। কেউ কেউ তো ৮ ঘন্টা, ১০ ঘন্টা ধ্যানে থাকত! প্রথমে আমি খুব চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু নিমিত্ত আর পেলাম না। অথচ কত বই যে পড়েছি …

সুভূতি ভান্তে: পাঁচ মাসেও কোনো নিমিত্ত পান নি?

সিনিয়র ভান্তে: ঠিক তাই। আমি সেয়ালে দীপঙ্করার [Sayalay Dipankara] সব বই পড়েছি। আজান ব্রহ্মবংশের বইগুলোও পড়েছি। তবে পুরো বই কখনোই পড়া হয় নি। শুধু শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ে ধ্যানের অংশটুকু পড়েছি। আর দুজন গৃহী যোগীর লেখা বই একটা আছে “Practicing the jhānas”। খুব ভালো বই। একদম পাঅক সেয়াদের মতো। আমি সেই বইটাকে খুব গুরুত্ব দিয়েছিলাম।

সুভূতি ভান্তে: Shaila Catherine এর বইটা?

সিনিয়র ভান্তে: হ্যাঁ হ্যাঁ। তার বইটা খুবই ভালো বই। আমি এখনো সেটা অনুসরণ করি। কারণ সেয়াদজি তার ভূমিকায় লিখেছিলেন যে পশ্চিমা যোগীদের মধ্যে অন্যতম সেরা হচ্ছে সে। তাই আমি সেটা অনুসরণ করি।তো … আমি সেগুলো পড়ছিলাম … আর ধ্যান করছিলাম। তখন এক বন্ধু বলল, “ভান্তে, আমার মনে হয় আপনি নিমিত্ত পেয়েছেন”। সেয়াদও বললেন, “আমার মনে হয় তুমি নিমিত্ত পেয়েছ। নয় কি?”

সুভূতি ভান্তে: কিন্তু আপনি কখনো নিমিত্ত পেয়েছেন বলে রিপোর্ট করেন নি?

সিনিয়র ভান্তে: না। কখনোই না। আমি তো ভেবেছি বুড়ো হওয়া পর্যন্ত আমার ধ্যান করে যেতে হবে। আপনি তো জানেন কত ভিক্ষু এখানে বহু বছর ধরে ধ্যান করছে। কয়েকজন সিনিয়র ভিক্ষু আছেন, খুব ভালো ভালো সেয়াদ আছেন যারা বহু বছর ধরে ধ্যান করেছেন।তাই আমি তখনো ঠিক নিশ্চিত ছিলাম না সেটা নিমিত্ত কিনা।

আমি ভাবছিলাম বাইরের আলো। অথবা ভেতরের আলো। তখন আরেক ভান্তে বলল, “ভান্তে, বাইরের আলো বেশিক্ষণ থাকে না। কিন্তু ভেতরের আলো হলে সেটা স্থির থাকে”।কিন্তু তবুও আমার মন সেটা মানতে প্রস্তুত ছিল না। মনের মাঝে সন্দেহ ছিল। তারপর আমি করলাম কী। আমি প্রচেষ্টা বাড়িয়ে দিলাম। প্রতিদিন চার ঘন্টা বসতে লাগলাম ধ্যানে। আর যেহেতু এই বইয়ে আছে যে তারা নাকি মাত্র দুমাস ধরে চর্চা করেছিল, আর কেবল এক ঘন্টার বিরতি দিত … সেটাও খাওয়ার সময়টুকু … আর তারপরে তারা আবার ধ্যানে বসত। তাই তাদের খুব দ্রুত অগ্রগতি হয়েছিল। তাই আমিও সেটা অনুসরণ করলাম। আমি অনুমতি নিয়ে নিজের কুটিরে গেলাম এবং এই বসার মাদুরটা নিলাম, এরপর পায়চারি করলাম এবং ধ্যানে বসলাম, বার বার। প্রথমে আলোটা খুব ঝাপসা ছিল। তাই আমার মাঝে সন্দেহ দেখা দিল। আমি পর্দাগুলো চীবর দিয়ে ঢেকে দিলাম যাতে অন্ধকার হয়। তখন আলো স্থির হয়েছে বলে মনে হলো। এরপর শুরু হলো ব্যথা, হাঁটুগুলো …

সুভূতি ভান্তে: আপনি কি শ্বাসপ্রশ্বাসের স্থানে গোলাকার বৃত্ত দেখেছিলেন, অথবা সেরকম কিছু?

সিনিয়র ভান্তে: যখন আমি চোখ বন্ধ করতাম তখন সেটা বেশ ঝাপসা দেখাত …

সুভূতি ভান্তে: সেটা কি পুরো পর্দা জুড়ে থাকত? …

সিনিয়র ভান্তে: না না। কেবল সামনে … অনেকটা মুখের উপর, কিন্তু খুব ঝাপসা। এটা অনেকটা গুড় পোড়ালে পাত্রে যেরকম আঠালো মিঠার মণ্ড লেগে থাকে সেরকম। সেরকমই আমি প্রথম দেখেছিলাম। আসলে আমি ঠিক বুঝাতে পারব না। সেটা খুব ঘোলাটে ছিল। আর সেটা কোনো লাইটের মতো ছিল না। অথবা টর্চলাইটের মতোও ছিল না। সেরকম কোনো কিছু ছিল না। কিন্তু যখন আমি চোখ বন্ধ করতাম, সেটি আবির্ভূত হত। রাতে যখন আমি বুদ্ধবন্দনা করতাম তখন আমি তার ছাপ দেখতে পেতাম মেঝেতে। আমি সেয়াদকে ব্যাপারটা বললাম … এবং কুমার সেয়াদ বললেন “ঠিক আছে”। এরপর তিনি আমাকে দীর্ঘক্ষণ ধরে থাকতে বললেন … নিমিত্ত নিয়ে থাকতে বললেন। তিনি আমাকে উৎসাহ দিলেন এবং বললেন “চিন্তা করো না” …

সুভূতি ভান্তে: প্রথম থেকেই আপনি যদি একদম যথাযথ হবে বলে আশা করেন তাহলে অগ্রগতি হবে না … আপনার প্রথমে নিজেকে বিশ্বাস করতে হবে … তবেই এগোতে পারবেন।

সিনিয়র ভান্তে: একদম সত্যি কথা। বিশ্বাস হচ্ছে মূল চাবিকাঠি। আমার নিমিত্ত ছিল। কিন্তু আমি বিশ্বাসই করতে পারি নি, যতক্ষণ না অন্যরা আমাকে দেখিয়ে দিয়েছে।

সুভূতি ভান্তে: এটা আপনার আগে পড়া কোনো বইয়ের সাথে মেলে নি। তাই সেদিক দিয়ে বলতে গেলে আগেভাগে পড়াটাও হচ্ছে বিপদজনক।

সিনিয়র ভান্তে: একদিক দিয়ে বলতে গেলে সেটা ঠিক। কিন্তু মূলত আমিই তো ভুল বুঝেছিলাম …

সুভূতি ভান্তে: বিশুদ্ধিমার্গ বলে যে, আপনার সেটা নিয়ে আলোচনা করা উচিত নয় … কারণ আপনি যদি বলেন আমার নিমিত্ত হচ্ছে এরকম, এবং অন্যজন বলে, না, আমার নিমিত্ত তো এরকম। তখন আপনারা একে অপরের নিমিত্তকে আকাঙ্খা করবেন, কারণ যেটা নেই সেটাই আপনি আকাঙ্খা করেন …

সিনিয়র ভান্তে: হ্যাঁ হ্যাঁ।

সুভূতি ভান্তে: তো আপনার নিমিত্তের উন্নতি হতে থাকল?

সিনিয়র ভান্তে: হ্যাঁ। ধ্যান আরো গভীর হলো। এরপরে তারা আমাকে ভবাঙ্গ চেক করে দেখতে বলল [হৃদপিণ্ডের স্থানে]।

সুভূতি ভান্তে: তখন কি আপনার অন্যকোনো চিন্তা আসত মনে, নাকি আসত না?

সিনিয়র ভান্তে: আসত তো। কিন্তু সেয়ালে দীপঙ্করা এটা নিয়ে তার বইয়ে সুন্দরভাবে বলেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, “আমি তোমাদেরকে নিরাশ করতে চাই না। তাই আমি তোমাদেরকে বলতে চাই না। অথচ আমি সেটা না বলেও পারছি না। তোমরা এসে আমাকে বলো যে এই অনাহুত চিন্তাগুলো তোমরা চাও না, তবুও সেগুলো তোমাদের মনে আসে। আমি বলি, সেগুলো অনাহুত হয়ে আসে না। সেগুলো আসে, কারণ সেগুলো হচ্ছে তোমাদেরই আকাঙ্খা।”

সেটা যেন আমার গালে চড় মারার মতো লাগল। তারপরে যখন আমি বসতাম তখন বাইরের কোনো একটা শব্দ হয়তো আমাকে ডিস্টার্ব করত … তখন আমি চাইতাম সেটা নিরব হোক। সেটা ছিল আমার আকাঙ্খা। তারপর আমি চাইতাম যেন দীর্ঘক্ষণ ধরে বসে থাকতে পারি … সেটাও ছিল আমার আকাঙ্খা … আহ! মনটা এত জটিল। কত আকাঙ্খা এলো, গেলো। কত সুন্দর সুন্দর চিন্তা আসল … যেমন, আহা, তোমার এখানে দান দেয়া উচিত, তোমার এখন গিয়ে কোনো সিনিয়র ভিক্ষুকে সেবা করা উচিত। তখন আমি বলতাম, কী হয়েছে? সেগুলোও আকাঙ্খা মাত্র। তারপর হঠাৎ করে সবকিছু শান্ত হতে শুরু করল … এরপর আরেক সমস্যা দেখা দিল। মনে হলো আমি এক দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে আছি এবং দেখতে পাচ্ছি যে চিন্তাগুলো হামাগুড়ি দিয়ে দেয়াল বেয়ে ভেতরে ঢুকছে। আমি সেয়াদকে সেটা জানালাম। সেয়াদ বললেন, এটা আলস্যতন্দ্রা হতে পারে।

এরপর আমি আবার বইগুলোতে চোখ বুলিয়ে নিলাম। সেগুলো তখন খুব সাহায্য করেছিল। কারণ আমি তখনো সেই স্তর পার হতে পারি নি। সেই চারটি বই যে কতবার পড়েছি। তারপর দেখলাম সেখানে লেখা আছে, আপনার একদম গোড়া থেকে শুরু করা উচিত। তাই আমি বললাম ঠিক আছে। আর তাই আমি ধ্যানের এত অগ্রগতি সব বাদ দিলাম। আবার নতুন করে গণনা শুরু করলাম। [সলজ্জ হাসি]

আমার একটা জপমালা ছিল, সেটা দিয়েই শুরু করলাম। আজান ব্রহ্মের একটা দেশনা আমি খুব শুনতাম। সেখানে তিনি বলছিলেন তোমার কোনোকিছু করতে হবে না। তিন ঘন্টা বসতেই হবে এমন নয়, কোনো আলস্য তন্দ্রা নয়, কিছু নয়, কিছু নয়। কেবল বসে থাকো। তাতেই হবে। সেটা তোমাকে রিলাক্স করবে।

তারপর আমি প্রথমে গণনা শুরু করলাম। এটা বেশ বিরক্তিকর ছিল। বেশ হতাশ বোধ করছিলাম। তারপর আমার মনে পড়ল পণ্ডিতারামে পেটের উঠানামার কথা বলা হতো। তারা বলত তুমি যদি তাতে এক সেকেণ্ড মনোযোগ রাখতে পার, সেরকম ৩৬০০ বার করলে ৩৬০০ সেকেণ্ড, অর্থাৎ এক ঘন্টা।

তাই আমি পুঁতিগুলো গুণতে শুরু করলাম। শ্বাস নিলাম, ফেললাম, এক … শ্বাস নিলাম, ফেললাম, দুই … এভাবে আট পর্যন্ত। তখন একটা পুঁতি গুণলাম। কিন্তু মাঝখানে কোনো চিন্তা আসলে সেখানেই থামতাম। আবার নতুন করে গণনা শুরু করতাম। এভাবে ধীরে ধীরে অতিরিক্ত চিন্তাগুলো গুণতে পারা যেত। এভাবে তিন ঘন্টা ধরে শুধু ১, ২, ৩, ৪, ৫… এভাবে শুধু গুণতে থাকা।

এরপরে ধ্যান শক্তিশালী হয়ে উঠল। জপমালা আর দরকার হলো না। এরপর আমি এমনিতেই শ্বাসপ্রশ্বাসে মন দিতে পারতাম। তখন আলো আরো উজ্জ্বল হতে শুরু করল। তখন সেয়াদ আবার ভবাঙ্গ চেক করে দেখতে বললেন। সেটাও তিন ঘন্টার বসায় মাত্র একবার দেখতে বলতেন। এরপর এক ঘন্টায় একবার করে দেখতে বলতেন। এরপর ধ্যানাঙ্গগুলো দেখতে বললেন। তুমি সেখানে ধ্যানাঙ্গগুলোকে তখন এমনিতেই ধরতে পারবে।

এই জিনিসগুলো কখনো পারব বলে ভাবি নি। এর আগে কত পদ্ধতি চেষ্টা করেছি। কত গুরু আমাদেরকে বলেছেন, তোমাদের এখন এটা হয়েছে, এটা পেয়েছ। কিন্তু সেগুলো বুদ্ধের শিক্ষার সাথে মিলিয়ে দেখলে আকাশ পাতাল ব্যবধান।

কিন্তু যখন তুমি ভালো একটা জায়গা পাবে যেখানে ভালো শিক্ষক রয়েছেন, ভালো বন্ধু রয়েছে, সঠিক পরিবেশ আছে, সমস্ত হেতুগুলো এসে মিলেছে, তখন যেন তা হয় বুদ্ধের সেই উপমার মতো। তুমি যখন একটা আগুন জ্বালাতে চাও, তুমি কাঠ জোগাড় কর, তারপর ঘষতে থাক। ধীরে ধীরে এটা উষ্ণ হবে। কিন্তু বন্ধ করলে সেগুলো আবার ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। যখন সমস্ত হেতুগুলো মিলে যাবে তখন আগুনের শিখা বের হবে। তখন তোমার সেখানে তুলা অথবা একটা কিছু দিতে হবে, সেই আগুনটাকে জ্বালিয়ে রাখার জন্য।

এই পদ্ধতি হচ্ছে সেটার মতো, যেখানে শুরু হয় শ্বাসপ্রশ্বাস দিয়ে। সেই শ্বাসপ্রশ্বাস থেকে আসে নিমিত্ত। সেখানে তুমি ডুবে যাও। সেখান থেকে আসে প্রথম ধ্যান, দ্বিতীয় ধ্যান, তৃতীয় এবং চতুর্থ ধ্যান। এরপর তোমার আছে কসিন ধ্যানগুলো।

সুভূতি ভান্তে: নিমিত্তে ডুবে যাওয়াটা একটু ব্যাখ্যা করুন।

সিনিয়র ভান্তে: হ্যাঁ, এটা আসলে সহজ একটা জিনিস। তবে সবার তো আলাদা আলাদা অভিজ্ঞতা হয়। আমার যা হয়েছে তা হচ্ছে আমি যখন শ্বাসপ্রশ্বাসে মন দিলাম তখন শ্বাসপ্রশ্বাস ধীরে ধীরে পানির মতো হয়ে উঠল … কী করে বলি … যেন মাটিতে শুষে মিশে যাচ্ছিল … যেন শ্বাসপ্রশ্বাস মিলিয়ে গিয়ে আলো চলে আসল। এরপর শ্বাসপ্রশ্বাসের জায়গায় আলো চলে আসল। এভাবে সেগুলো যেন এক হয়ে মিশে থাকে। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল আলো এসে শ্বাসপ্রশ্বাসের স্থান দখল করেছে এবং শ্বাসপ্রশ্বাস কেবল সেখানে মিশে গেছে।

সুভূতি ভান্তে: তার মানে সেখানে কোনো শ্বাসপ্রশ্বাস ছিল না?

সিনিয়র ভান্তে: হ্যাঁ। কিন্তু খুব মনোযোগ দিলে তখনো অনুভব হয় অবশ্য।

সুভূতি ভান্তে: তো এই নিমিত্ত তাহলে সবসময় আসত … নিমিত্তকে সবসময় অনুভব করতেন?

সিনিয়র ভান্তে: হ্যাঁ। তুমি সেটা তোমার সামনেই দেখতে পাবে। তোমার কিছু করতে হবে না। যখন এটি আসে তখন এটি খুব শান্তির … কীভাবে বলি … এটি তোমাকে যেন ঘিরে ধরে … যেন কোনো সুন্দর বাতাস এসে তোমার মুখে পরশ বুলায়। এটা খুব কোমল হয়ে আসে, সবদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

আমরা তো শ্বাসপ্রশ্বাসকে দেখছি … আনাপানাকে দেখছি। তাই আমাদের মনোযোগ থাকে সবসময় মুখের সামনে। যেন আমরা কোনো মনিটরকে দেখছি। ঠিক কিনা? যেন মনে হয় এটি তোমার মুখের সামনে আসছে এবং সবকিছু ঢেকে ফেলছে। কিন্তু এটি ক্রমে ক্রমে আরো উজ্জ্বল হতে থাকে। … মূলত এর জন্য অনেক চেষ্টা করতে হয়েছে। সেটা একদিনে হয় নি।

সুভূতি ভান্তে: এরপর আপনি সেটাকে ক্রমাগতভাবে ধরে রেখেছিলেন কোনো চিন্তা ছাড়া? নাকি তখনো চিন্তাগুলো আসত … অথবা শব্দ? আপনি শব্দ শুনতেন কিন্তু সেগুলো নিয়ে কোনো চিন্তা করতেন না?

সিনিয়র ভান্তে: ধ্যানের মধ্যে?

সুভূতি ভান্তে: হ্যাঁ, নিমিত্ত পাওয়ার ধাপে এবং পরবর্তীতে ধ্যানের স্তরগুলোতে?

সিনিয়র ভান্তে: নিমিত্তের ধাপে তো চিন্তাগুলো বেশ দুর্বল ছিল … সেগুলো দুর্বল মানে হচ্ছে তোমার মনে হবে সেগুলো ফেলে দেয়া জিনিসের মতো গুরুত্বহীন … তুমি পুনরায় আবার শ্বাসপ্রশ্বাসে ফিরে আসবে।

সুভূতি ভান্তে: তখন কি আপনি নিমিত্তের মধ্যে, বা নিমিত্তের মধ্যে ডুবে গেছেন?

সিনিয়র ভান্তে: যখন তুমি ভেতরে যাও, তখন তুমি একদম ভিন্ন অনুভব করবে। তুমি কিছু করতে পারবে না। অনেকটা সুইমিং পুলে ডুবে যাওয়ার মতো। কিন্তু যখন তুমি সেখান থেকে পাড়ে উঠে আস তখন ভিন্ন। তখন তুমি যেদিকে খুশি ঝাঁপ দিতে পার। এখানেও তুমি যখন পাড়ে দাঁড়িয়ে, তখন তুমি শব্দ শুনবে। হয়তো দেহের অনুভূতিও বোধ হবে।

সুভূতি ভান্তে: যখন আপনি পাড়ে থাকেন?

সিনিয়র ভান্তে: হ্যাঁ, যখন পাড়ে থাকি। আর যখন তুমি অধিষ্ঠান ইত্যাদি পাঁচ প্রকার দক্ষতার ধাপগুলোতে যাও, সেখানে তো চোখের পাতা খুলতে চাইলেও খোলা যায় না … সেগুলো যেন লেগে আছে এরকম। প্রথম প্রথম যখন তুমি এই প্রথম ধ্যান, দ্বিতীয় ধ্যান এসবে ঢুকবে তখন খুব কড়া মনে হবে, গভীর মনে হবে। কিন্তু পরে আস্তে আস্তে এটা স্বাভাবিক হয়ে আসে।

কিন্তু প্রথম প্রথম মনে হয় যেন তুমি একটা হাত পাও নাড়াতে পারবে না। কি জটিল অবস্থা! একদম বইয়ের কথার মতো। অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। তারা যা বলেছে সত্যি বলেছে। তুমি কিন্তু তোমার নিমিত্ত বা ধ্যানের ক্ষতি না করেই দেখতে পারবে কী হচ্ছে। কিন্তু বইয়ের কথাগুলো এত সত্যি! [হাসি]

সুভূতি ভান্তে: তাহলে নিমিত্তের মানটা প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ধ্যানে বদলে যায়?

সিনিয়র ভান্তে: নিশ্চয়ই বদলে যায়। অবশ্যই বদলে যায়। প্রথমটাতে তোমার মনে হবে অসাধারণ, নয় কি? কারণ আমরা তার পরে কিছুই জানি না। তাই অসাধারণ। এরপর আলো আসে, এটি শক্তিশালী হতে শুরু করে, আর তুমি তাতে ডুবে যাও।

কিন্তু এরপরে তুমি যখন দ্বিতীয় ধ্যানে যাও … তোমার মনে হবে যেন তুমি বাইরে ঘাসের উপরে শুয়েছ। বাচ্চা থাকতে তুমি যেরকম ঘাসের উপরে খেলা করতে না? সেরকম। তারপর তোমার সারা গা চুলকাতে লাগল। তখন তুমি ভেতরে এসে শুয়ে পড়লে মাদুরের উপরে। তা তুলনামূলকভাবে অনেক আরামের, নয় কি? তোমার সেখানে কোনো চুলকানি নেই, কোনো মশা কামড়াচ্ছে না। এটাও হচ্ছে সেরকম। বিতর্ক বিচারও হচ্ছে সেরকম।

তারপর তুমি সেগুলো নিয়ে বিরক্ত হয়ে ওঠ। কারণ সেগুলোর জন্যই মনে এতকিছু অনুভব হয়। তুমি সত্যিই সেগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাও। এটা যেন অনেকটা তুমি একটা কুড়াল নিলে, আর এক কোপ দিলে। দেখলে যে এর অর্ধেক চিরে পড়ে গেল একপাশে। বাকি অর্ধেক রয়ে গেল। প্রীতি, সুখ, একাগ্রতা … সেগুলো রয়ে যায় …

সুভূতি ভান্তে: নিমিত্ত তখন কি আরো ….

সিনিয়র ভান্তে: সেটা আরো উজ্জ্বল, আরো শক্তিশালী … আরো শক্তিশালী হয়। এটা যেন পৃষ্ঠা উল্টানোর মতো। এটা যেন আধুনিক কালের ফোনের মতো, অথবা কোনো টাচস্ক্রিনের মতো। তুমি হাত বুলালেই নতুন একটা পেজ খুলবে। অথবা কোনো বইয়ের পাতা উল্টানোর মতো।

যেন একটা নতুন অধ্যায় শুরু হয়। আর তখন তুমি সেটা অনুভব করবে। প্রীতি এবং বাকিগুলো। সেটা তোমাকে এত শক্তি দেবে। যখন তুমি সেখান থেকে বের হয়ে আসবে তুমি তা তোমার দেহে অনুভব করবে। এত শক্তি সেখানে। যেন প্রীতি দ্বারা নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করে, সতেজ করে তোলে। এমনকি যখন তুমি বেরিয়ে এসে হাঁটবে, এটা ওটা করবে, দেখবে তোমার দেহ যেন নিজেই চলছে।

এরপর তুমি যখন তৃতীয় ধ্যানে যাবে … সেটা অনেক বেশি কোমল … সুখ। সেখানে তোমার সত্যিই প্রীতিকে নিরস মনে হবে। কারণ যখন পরের অধ্যায় খুলে যাবে তখন তুমি প্রীতির নিরসতাকে এত অনুভব করবে … সুখ হচ্ছে এত আরামের। এটাই আমাদেরকে এতদূর পথ নিয়ে এসেছে। এসব ধ্যানের মধ্য দিয়ে এনেছে।

যখন তুমি চতুর্থ ধ্যানে যাবে, যেখানে তুমি সুখকেও পরিত্যাগ করবে, তখন আলো এত উজ্জ্বল হয় … এই আলো … নিমিত্ত এত উজ্জ্বল হয়। সুখও চলে যায়, কিন্তু আরেকটা আসে … উপেক্ষা। কিন্তু তুমি যেটা অনুভব করবে সেটা সুখের থেকে ভিন্ন। তুমি অনুভব করবে যে তুমি এখন নির্ভার বা হালকা হয়ে গেছ, কারণ এই তো খুব মজা করলে, তাই না? যেন স্বান্তনা দিচ্ছে এমন। কিন্তু এটাও খুবই আরামদায়ক অনুভূতি। এই উপেক্ষা।

আগেরটা তো খুব সুখের ছিল। কিন্তু এখন সেটা আর নেই। যেন তুমি সেটাকে ঝেড়ে ফেলেছ, তবে এটাও খুব ভালো। খুব শক্তিশালী। দৈনন্দিন জীবনে, এমনকি তুমি যদি খারাপ কিছুও শোন, তুমি তাতে উপেক্ষা অনুভব করবে। তুমি আর আগের মতো প্রতিক্রিয়া দেখাবে না। তুমি ভাববে … এরকমই হয়। তুমি অনুভব করবে যে এটা কাজ করছে। সত্যি। ধরো তোমার খুব খারাপ কিছু হয়েছে … কোনো খবর শুনেছ অথবা কোনোকিছু অথবা কেউ একজন আসল এবং কিছু একটা বলল… আগে তো তুমি প্রতিক্রিয়া দেখাতে … নয় কি?

সুভূতি ভান্তে: আপনি যখন মেডিটেশন হলরুমে গ্রুপ ভাবনা করতেন, তখন কোনো শব্দ শুনতেন না?

সিনিয়র ভান্তে: আমি শুনতাম তো। মানে যখন আমি ধ্যান থেকে বেরিয়ে আসলে আর কী। ধ্যানের মধ্যে থাকলে তো শুনতাম না।

সুভূতি ভান্তে: কিছুই শুনতেন না? এই যে দরজা খুলছে, কথা বলছে, মশারি খুলছে, এটা ওটা শব্দ হচ্ছে?

সিনিয়র ভান্তে: না। তবে আমরা যখন উচ্চ থেকে উচ্চতর ধ্যানে যাই, তখন শুনলেও সেটা কোনো ব্যাপার হয় না। কারণ চারপাশে অনেক নির্মাণকাজ চলছে, নয় কি? এই যে চাকার আওয়াজ, ট্রাক্টরগুলো আসছে যাচ্ছে খুব বড় আওয়াজ করে … তাতে কোনো সমস্যা হয় না।

সুভূতি ভান্তে: ঠিক ঠিক। কিন্তু অন্য সময়ে আপনি কিছুই শোনেন না?

সিনিয়র ভান্তে: যখন তুমি সত্যিই ধ্যানের মধ্যে থাক, তখন তুমি কিছুই শুনবে না।

সুভূতি ভান্তে: আর শ্বাসপ্রশ্বাস … ধ্যানের সময়ে?

সিনিয়র ভান্তে: না। কোনো শ্বাসপ্রশ্বাস থাকে না। তুমি যদি সত্যিই সেদিকে মন দাও তখন এটি আবার শুরু হয়। সত্যি নয় কি? চিত্ত হচ্ছে এরকম। কারণ এটা ভিন্ন। কামাবচর চিত্ত। ঠিক কিনা? মহগ্গত চিত্ত। এরপরে নীবরণগুলো আসার কোনো উপায় নেই। আমার মনে হয় তুমি যদি বিশাল কোনো উল্টোপাল্টা কাজ না কর, তাহলে সেগুলো আসতে পারবে না।

সুভূতি ভান্তে: তাহলে আপনি ২৪ ঘন্টা বসে ছিলেন, নাকি তারো বেশি?

সিনিয়র ভান্তে: ও, অনেক বেশি …

সুভূতি ভান্তে: ও আচ্ছা। আসলে ঠিক কতক্ষণ? কতদিন ছিলেন?

সিনিয়র ভান্তে: [হাসি] সেটা ব্যক্তিগত ব্যাপার … এটা বাইরে বলার জন্য।

সুভূতি ভান্তে: তাহলে …এহেম … তাহলে টয়লেটে যাওয়া হয় নি এর মাঝে?

সিনিয়র ভান্তে: না না। কোনো প্রয়োজন নেই … সত্যি! কারণ তুমি যখন নিমিত্তের মধ্যে থাক …

সুভূতি ভান্তে: টয়লেটে যান নি? সে তো সুপারম্যানের কাজ!

সিনিয়র ভান্তে: না না না। … অন্য অনেকেই আছে তো এরকম। আর অনেকেই আছে যারা এরপর টয়লেটে গেছে।

সুভূতি ভান্তে: কিন্তু আপনি পাগুলো নড়াচড়া করেছেন তো?

সিনিয়র ভান্তে: মাঝেমধ্যে যখন খুব ….

সুভূতি ভান্তে: ২৪ ঘন্টার মধ্যে কয়বার আপনি পা নড়াচড়া করেছেন?

সিনিয়র ভান্তে: আমার তো মনে নেই। কয়েকবার হবে।

সুভূতি ভান্তে: আপনি কি দেয়ালে হেলান দিয়ে ছিলেন? নাকি এখন যেভাবে বসে আছেন সেভাবেই বসে ছিলেন? এই বসার ব্যাপারটা নিয়ে একটু জানতে চাচ্ছি … বসার ভঙ্গি। আপনি এমন উঁচু ত্রিকোণাকার কুশনের উপরে বসেছিলেন। আপনি কি তখন বসে দেয়ালে হেলান দিয়েছিলেন? নাকি রুমের মাঝখানে ছিলেন?

সিনিয়র ভান্তে: আমার ছোট একটা কাঠের ফ্রেম আছে। ছোট টেবিলের মতো। সেটা কীভাবে বলি … পিঠ ঠেস দেয়ার জন্য। হ্যাঁ। দেহটা সাধারণত এমনিতেই খাড়া থাকে।একারণেই বুদ্ধ বলেছেন … এমনকি নিমিত্তের জন্যও … আমি সত্যিই বুঝেছিলাম আমার পিঠ একটু বাঁকা। আমার পিঠে একটু সমস্যা আছে। আমার একটা বড় দুর্ঘটনা হয়েছে। একারণেই আমি পূর্বসতর্কতা নিয়েছিলাম। কিন্তু ঝুঁকলে অথবা যদি তোমার মাথা নিচে নেমে যায় … নিমিত্ত অথবা অবস্থান … একারণেই আমি নিশ্চিত বুদ্ধ বলেছেন দেহকে সোজা রাখতে হবে … বুদ্ধ এত সঠিক ছিলেন … যখন এটা হয়েছে কেবল তখন আমি এটা বুঝতে পেরেছি।

সুভূতি ভান্তে: কিন্তু আপনার কি পূর্ণ পদ্মাসনে বসার প্রয়োজন হয়েছিল?

সিনিয়র ভান্তে: না।

সুভূতি ভান্তে: আপনি কি পূর্ণ পদ্মাসনে বসার চেষ্টা করেছিলেন?

সিনিয়র ভান্তে: আমি পারি না। দুর্ঘটনার পরে আমি পিঠে ও হাঁটুতে আঘাত পেয়েছিলাম। তার আগে আমি সামান্য পারতাম, কিন্তু এরকম না। এরপর থেকে শুধু এই ভঙ্গিমায় বসি। [বার্মিজ বসার ভঙ্গিমা, না জানলে গুগলে সার্চ দিন Burmese Posture]

সুভূতি ভান্তে: তাহলে তিন ঘন্টা সাধারণত সহজ … ছয় ঘন্টাও সেরকম হতে পারে।

সিনিয়র ভান্তে: হ্যাঁ। তারও বেশি পারা যায়। তারও বেশি পারা যায়। তুমি কেবল অসাড়তা অনুভব করবে, কোনো ব্যথা নয়। সত্যি। কোনো ব্যথা নেই … যেন …

সুভূতি ভান্তে: অর্থাৎ আপনি কিছু অসাড়তা অনুভব করেন পায়ে, কিন্তু সেটা আপনি অগ্রাহ্য করতে পারেন।

সিনিয়র ভান্তে: দীর্ঘসময় পরে কেবল সেরকম হয়। হতে পারে রক্ত চলাচল অথবা সেরকম কিছুর কারণে। তখন তুমি অসাড়তা অনুভব করবে। কিন্তু তোমার মন চাইবে সেদিকে মন দিতে। তবে তুমি সেটাও এড়িয়ে যেতে পারবে। হ্যাঁ। সেটা কোনো ব্যথা নয়। এত সময় পরেও নয়।

সুভূতি ভান্তে: এরপর আপনি যখন দেহের ৩২টি অংশ দেখেন, আপনি কি ইচ্ছে করলেই দেখতে পারেন? নাকি আপনার বই দেখতে হয়? নাকি আপনি আলো ব্যবহার করতে পারেন? সেটা কি আপনার সারা দেহ স্ক্যান করার মতো করেন, নাকি আপনি এমনিতেই জানতে পারেন কোথায় কোন অংশে দেখতে হবে?

সিনিয়র ভান্তে: প্রথমে আমার খুব সন্দেহ হয়েছিল। সন্দেহ মানে হচ্ছে আমি যা দেখলাম তা কি সত্যি?

সুভূতি ভান্তে: উভয় পদ্ধতি মিশিয়ে? অর্থাৎ বই ও আলো ব্যবহার করে?

সিনিয়র ভান্তে: কিন্তু মাঝে মাঝে তুমি দেখতে পাবে। যেমন আমার একবার খুব ব্যথা হচ্ছিল, আর আমার কেবল মনে হচ্ছিল আমার হাতে কিছু একটা গড়বড় হয়ে গেছে। কিছু একটা জটিলভাবে পেঁচিয়ে গেছে। এরপর দেখা গেল সেটা ছিল মাংসপেশি। হাড়ের এই অংশের মাংসপেশি। তুমি দেখবে যে এটা আসছে, আর তখন আমি সেটাকে এভাবে স্পর্শ করলাম। ব্যথাটা একদম সেখানে। এটা যেন মনে হলো স্বপ্নের মতো … একদম স্বপ্ন … ঐ যে হঠাৎ করে দরজা খুলে যায় এবং একটা কিছু দেখা যায় এবং বন্ধ হয়ে যায় … সেরকম … তখন আমি সেখানে কিছু মলম দিলাম। আর সেটা পাল্টে গেল।

সুভূতি ভান্তে: আহা! আপনি নিজেই নিজের চিকিৎসা করলেন তাহলে।

সিনিয়র ভান্তে: না না। তুমি নিশ্চয়ই ভাববে না যে হাড়ে কিছু একটা হয়েছে। কারণ ব্যথা তো করছিল সারা হাত। আমার খুঁজতে হয়েছিল।

সুভূতি ভান্তে: আপনি দেখতে পেয়েছিলেন তার মূল কারণকে?সিনিয়র ভান্তে: হ্যাঁ। হ্যাঁ। ওরা বলে যে, কিছু কিছু লোক আছে যারা খুব শক্তিশালী। যাদের খুব ভালো পারমী আছে। তারা একদম হুবহু স্থান এবং তার অভ্যন্তরের রং পর্যন্ত দেখতে পায়। বাইরের রংও দেখতে পায়। ভেতরে কোথায় কী আছে সব দেখতে পায়। সত্যি। কারণ এটা বাস্তব।তাই এই দুটো জিনিস আমি যখন খুঁজছি আর খুঁজছি কিন্তু সেগুলো আসছে না।এরপর … কারণ আমরা গোয়েঙ্কা এবং কত কী করেছি। তুমি অনুভূতিগুলো অনুভব করবে। আর আমরা বহু ধরনের ধ্যান করেছি। আরেক সেয়াদের কাছে আমরা ভেতরেরগুলো দেখেছিলাম। তাই যখন তুমি বলো মস্তিষ্ক অথবা কোনোকিছু, তখন তুমি অনুভব করবে যে অনুভূতিগুলো সেখানে যাচ্ছে, কিন্তু তাই বলে তুমি কিন্তু সেখানে মনোযোগ দিচ্ছ না, তুমি শুধু সামনে তাকিয়ে আছ। কিন্তু তুমি শুধু অনুভব করবে।পরে কী হলো [একটু ফিসফিসিয়ে, গোপন কথা বলার মতো করে] … যখন তুমি ডাইনিং হলে যাও অথবা সীমায় যাও, তুমি যেভাবে যাওয়ার কথা সেভাবে যাও, তুমি তো কোনোকিছু পরিকল্পনা করে যাও না, ঠিক কিনা … তুমি তো আর তোমার সিনিয়র সেয়াদকে একতাল মাংসের দলা হয়ে আসছে বলে দেখতে চাও না। ঠিক কিনা?

সুভূতি ভান্তে: কিন্তু আপনি দেখতে পান ?

সিনিয়র ভান্তে: সেরকমই … ঠিক কিনা? যখন আমি সীমায় যাই, যেন মনে হয় মাংসের দোকানে যাওয়ার মত … অনেক অনেক অনেক অনেক। খুব ভালো নয়, না? এমনকি ছোট একটা পাখিও, যদিও সেটা মিষ্টি সুরে ডাকছে। তখন দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেল।

সুভূতি ভান্তে: হ্যাঁ… ৩২টি অংশের সবকিছু …

সিনিয়র ভান্তে: হ্যাঁ হ্যাঁ … তারপর তুমি কেবল তোমার আলোর পরিধি বাড়িয়ে দেবে … আর তখন …

সুভূতি ভান্তে: সেটা কি আপনি সীমায় চোখ খুলেই দেখতেন, নাকি ধ্যানে চোখ বন্ধ অবস্থায়?

সিনিয়র ভান্তে: চোখ খুলে। হ্যাঁ, চোখ খুলেও। কারণ আমার কোনো ধারণা ছিল না। তুমি তো সেয়াদগণকে সেভাবে দেখতে চাও না, ঠিক কিনা?সেরকমই। আমি শুনেছি কিছু কিছু ভিক্ষু আছেন যারা চোখ খুলেও ধ্যানে প্রবেশ করতে পারেন, বেরিয়ে আসতে পারেন। ব্যাপারটা সেরকমই। …

সুভূতি ভান্তে: কারণ ধ্যান তো আসলে মনের কাজ। চোখ দিয়ে কোনো কাজ নেই। তাই আপনি সেরকম করতে পারেন?

সিনিয়র ভান্তে: আমি চেষ্টা করছি। কিন্তু সামান্য পেরেছি। পুরোপুরি পারি না। তুমিও পার তো। ঐ কী যে বলে, পিণ্ডচারণের আগে … দায়কের সামনে এসে … কারণ পঞ্চবশীতা আছে না … অধিষ্ঠানবশীতা হচ্ছে ধ্যানে ঢোকায় দক্ষতা। উঠে আসা হচ্ছে বের হতে দক্ষতা। এই জিনিসগুলো …

সুভূতি ভান্তে: যতক্ষণ ইচ্ছা ধ্যানে থাকা?সিনিয়র ভান্তে: হ্যাঁ। তোমার মনে আছে তো? … সেরকমই আর কি …তাই সমাপজ্জনবশীতা হচ্ছে যেকোনো সময়ে ধ্যানে ঢুকে যাওয়া. সেকেণ্ডের মধ্যেই … সেভাবেই আমাদের চর্চা করতে হয় … কেউ কেউ পারে তো। যেমন ধরা যাক ভান্তে আপনি গেলেন বাইরে …তারপর আমি অধিষ্ঠান করলাম … আমার মন খুব শক্তিশালী … তাই আমি বলতে পারি … “ভান্তে সুভূতি প্রথম সিঁড়িতে পা রাখতে আমার মনটা প্রথম ধ্যানে হোক, দ্বিতীয় ধ্যানে, তৃতীয় ধ্যানে। যখন সে এই কুটিরের প্রথম ধাপে, আমি ধ্যান থেকে বেরিয়ে আসব।” সেরকমই হয়।

সুভূতি ভান্তে: আপনি সরাসরি সময়টা বলতে পারেন? ধরুন দুই ঘন্টা। আর বরাবর দুই ঘন্টা হতেই আপনি বের হয়ে এলেন ধ্যান থেকে?

সিনিয়র ভান্তে: হ্যাঁ। সময় যত কম হয় তত সহজ হয়। সত্যি! কারণ তখন সেটা একদম নিখুঁত হয়। অনেকটা ঘুমানোর মত। আর মাঝে মাঝে আমাদের একটা সময়ের বোধ থাকে তো। তাই আমরা এলার্মের আগেই হঠাৎ জেগে উঠি। সেরকম।

সুভূতি ভান্তে: কয়েক সেকেণ্ড আগে বেরিয়ে আসেন? নাকি একই সময়ে বেরিয়ে আসেন?

সিনিয়র ভান্তে: সেরকমই। তারা বলে সাধারণত পাঁচ মিনিট আগে এবং পাঁচ মিনিটের পরে না হলে ভালো। অধিষ্ঠান ঠিক থাকে।

সুভূতি ভান্তে: কিন্তু আপনার তো তার চেয়েও নিখুঁত হয়েছে টাইমিং।

সিনিয়র ভান্তে: হ্যাঁ, হ্যাঁ। সময় অল্প হলে টাইমিং আরো নিখুঁত হয়। একদম বরাবর হয়। কিন্তু সময় যত লম্বা করবেন …

সুভূতি ভান্তে: তো এই ২৪ ঘন্টা চতুর্থ ধ্যানের পরে আপনার কেমন লেগেছে? আপনার কি ঘুমাতে হয়েছে? খেতে হয়েছে?

সিনিয়র ভান্তে: হ্যাঁ। বোধহয় শেষ এক বা দুঘন্টা তুমি অনুভব করবে যে শক্তি কমে যাচ্ছে … যখন তুমি বেরিয়ে আসবে তখনো তুমি সত্যিই ক্লান্ত হবে। তবে বসা থেকে উঠলেও তো তোমার ক্লান্তি লাগে … মিথ্যা তো আর বলতে পারি না, হাহা।কিন্তু তাই বলে এমন না যে তুমি ঘুমাও নি বা সেরকম কিছু। দেহের শক্তি কমে গেছে … আমার মনে হয় কারণ এর তো শক্তি খরচ করতে হয়, ঠিক কিনা? তার মানে এই নয় যে তোমার কোনো রোগ আছে। কোনো কারণে সারা রাত জাগলেও তো তোমার ক্লান্তি লাগে। এটা সেরকম কিছু নয়। সেরকম নয়।তুমি শুধু অনুভব অনুভব করবে … তোমার দেহ দুর্বল … কিন্তু তোমার মনটা ঝলমলে … যেন দ্যুতি ছড়াচ্ছে।

সুভূতি ভান্তে: আপনি এখন সাদা কসিন শেষ করেছেন?

সিনিয়র ভান্তে: না, এখনো করি নি।

সুভূতি ভান্তে: এখনো নয়? আপনি কি তাহলে সাদা কসিন পছন্দ করেন?

সিনিয়র ভান্তে: সাদা কসিন … আমার মনে হয়েছে আমি এখানে একটু বেশি সময় দিই। কারণ এই পথে তারা বলে যে, এটা একটা বিরাট অর্জন। তাই একটু বেশি সময় দিয়ে এটাকে একটা স্থায়ী দৃঢ় ভিত্তি করে নিই, ঠিক কিনা? এটাকে আরো শক্তিশালী করি। কিন্তু কঙ্কাল … এরপর আমরা কঙ্কাল ভাবনা করেছি। কঙ্কাল থেকেই সাদা আলো আসে।

সুভূতি ভান্তে: তাহলে আপনি এটাকে আনাপানের চেয়ে বেশি পছন্দ করেন?

সিনিয়র ভান্তে: আমি জানি না … কারণ আনাপানা মনে হয় … যেন একটা স্বপ্ন সত্যি হয়েছে, নয় কি? লোকজন কত বলাবলি করে। আর এখন এটা হঠাৎ করে পেয়ে গেলাম। ঠিক কিনা?

সুভূতি ভান্তে: তো আপনি কি আশা করেন ৭ দিন বা তারো বেশি থাকবেন?

সিনিয়র ভান্তে: না। দেখা যাক।

সুভূতি ভান্তে: সাদা কসিনের ৪র্থ ধ্যানের পরে আপনি তাহলে দুদিনের জন্য বসতে যাচ্ছেন আবার?

সিনিয়র ভান্তে: দেখা যাক।

সুভূতি ভান্তে: আর তারপর যখন আপনি পরের বর্ণ কসিন নিয়ে তিন দিন বসবেন … পরের বর্ণকসিন নিয়ে চারদিন … একদম ৭ দিন পর্যন্ত। সেরকম নাকি? সেরকম হলে তো বহুদিন লাগবে এই শমথ কোর্স শেষ করতে?

সিনিয়র ভান্তে: হ্যাঁ, সেরকমই লাগবে বটে। কারণ সেয়াদও বলেন, যত বেশি সময় ধরে বসতে পারা যায় তত ভালো।

সুভূতি ভান্তে: ওকে ভান্তে। অসংখ্য ধন্যবাদ। আমি মনে করি এটা অনেকের অনুপ্রেরণা যোগাবে। ৪৭ মিনিটের রেকর্ডিং। তাই সাধুবাদ ভান্তে।

সিনিয়র ভান্তে: হ্যাঁ ঠিক আছে। সবাইকে আমন্ত্রণ জানিও। আমার কিছু ছিল না। কীভাবে বলি। কেবল প্রচেষ্টা, শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস। সেয়াদ সত্যিই সাহায্য করেছেন এবং ছিল ভালো কল্যাণমিত্র।

এমনকি গৃহীরাও। তুমি তো দেখেছে তারা আসছে। দেখেছ, পাঁচ দিনের মধ্যেই প্রথম ধ্যান পাচ্ছে। তাই এই ধ্যান এবং এসব জিনিসগুলো এখনো জীবন্ত আছে …

তাই আমি এই ভান্তের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছি যাতে একজনও যদি তাতে অনুপ্রাণিত হয় আর তারা এখানে আসে এবং চর্চা করে এবং ধ্যান লাভ করে, সেটা আমাদের সবার জন্য পুণ্য হবে এবং বুদ্ধশাসনের জন্যও দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

সাধু সাধু সাধু

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *