আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

বৌদ্ধধর্মে নাস্তিকতা

আজ একটু নাস্তিকতা নিয়ে লেখা যাক। সাধারণত নাস্তিক হচ্ছে যারা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করে না। কিন্তু বৌদ্ধধর্মে নাস্তিকতার সংজ্ঞা ভিন্ন। এখানে নাস্তিকতা নির্ণয়ের মানদণ্ড হচ্ছে চারটি বিষয় – কর্মফল, স্বর্গনরক, ভুত দেবতা, পুনর্জন্ম। এই চারটি জিনিসকে বিশ্বাস না করলে বৌদ্ধমতে আপনি নাস্তিক।

আর আস্তিক হচ্ছে যারা এই চারটি জিনিসে বিশ্বাস করে। খাঁটি বৌদ্ধ মাত্রেই আস্তিক হতে বাধ্য। এখানে দেখতে পাচ্ছেন, দুটো মতবাদ পরস্পর বিপরীত। বুদ্ধ কী বলেন এব্যাপারে। আসুন একটা সুত্র দেখি। সেটা হচ্ছে অপণ্ণক সুত্র (ম.নি.২.৯৫)। সুত্রটা হচ্ছে এরকম-

বুদ্ধ একবার কোশল রাজ্যে বিচরণ করতে করতে সালা গ্রামে পৌঁছেছিলেন। বুদ্ধ এসেছেন শুনে গ্রামবাসীরা দল বেঁধে সেখানে দেখা করতে গেল। বুদ্ধ তখন তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, গৃহপতিগণ, আপনাদের পছন্দের কোনো ধর্মীয় গুরু আছেন কি?

না ভান্তে।

গৃহপতিগণ, সেরকম পছন্দের কোনো ধর্মীয় গুরু না থাকলে এই নির্দোষ ধর্মকে গ্রহণ করে চলা উচিত। এতে আপনাদের দীর্ঘকালের হিতসুখের কারণ হবে। কী সেই নির্দোষ ধর্ম?

কেউ কেউ আছেন যারা বলেন, – কর্মফল বলে কিছু নেই, স্বর্গ নরক নেই. ভুত দেবতা নেই, স্বর্গনরক স্বয়ং দেখেছে এমন কেউ নেই, পুনর্জন্ম বলে কিছু নেই, মরলেই এই জীবনের শেষ।

তাদের সেটা হয় মিথ্যা দৃষ্টিভঙ্গি, মিথ্যা চিন্তা, মিথ্যা কথা। সেটা হয় আর্যদের বিপরীত। সেটা হয় অসত্য ধর্মকে প্রকাশ। সেই অসত্য ধর্মকে প্রকাশের দ্বারা তারা নিজেকে উৎকৃষ্ট হিসেবে জাহির করে, অপরকে অবজ্ঞা করে।

বিজ্ঞ ব্যক্তি সেখানে বিচার করে দেখে – যদি পরকাল না থাকে, তাহলে তো তারা বেঁচে গেল। কিন্তু যদি থাকে, তাহলে মরণের পরে পরকালে নিশ্চিত তাদের স্থান হবে নরকে। আর ইহকালেও ভিক্ষুশ্রমণদের কাছে তারা দুঃশীল, মিথ্যাদৃষ্টিক ও নাস্তিক বলে নিন্দিত হবে। এভাবে নাস্তিক হলে একাংশ মাত্র নিশ্চিন্ত হওয়া যায়।

কিন্তু যারা বলে, কর্মফল আছে, স্বর্গনরক আছে, ভুত দেবতা আছে, স্বর্গনরক স্বয়ং দেখেছে এমন আছে, পুনর্জন্ম আছে, মরলেই এই জীবনের শেষ নয়। তাদের সেটা হয় তাদের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি, সঠিক চিন্তা, সঠিক কথা। সেটা আর্যদের বিপরীত হয় না। তাতে সত্যধর্মের প্রকাশ হয়। সেই সত্যধর্মকে প্রকাশের দ্বারা তারা নিজেকে উৎকৃষ্ট হিসেবে প্রকাশ করে না, অপরজনকেও অবজ্ঞা করে না।

বিজ্ঞব্যক্তি সেখানে বিচার করে দেখে – যদি পরকাল থাকে, তাহলে তারা মরণের পরে সুগতি স্বর্গে উৎপন্ন হবে। আর ইহকালেও ভিক্ষুশ্রমণদের কাছে তারা শীলবান, সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন ও আস্তিক বলে তো প্রশংসিত হবেই। এভাবে আস্তিক হলে উভয়কালেই নিশ্চিন্ত হওয়া যায়।

বিষয়টা আরেকটু সহজ করে বুঝিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে। ধরা যাক একজন নাস্তিক একটা গাড়ি কিনল। কিন্তু সে দুর্ঘটনা হবে বলে বিশ্বাস করে না। তাই গাড়ির আর ইন্স্যুরেন্স করল না।

কিন্তু তার আস্তিক বন্ধু গাড়ি কিনে ইন্স্যুরেন্স করল। প্রতি মাসে তার কিছু টাকা দিতে হলো বটে, কিন্তু সেগুলো তো সে মেয়াদ শেষে সুদে আসলে পেয়ে যাবে।

এখন কথা হচ্ছে, দুর্ঘটনা না হলে তো ভালো। নাস্তিক ব্যক্তি বেঁচে যাবে। কিন্তু যদি দুর্ঘটনা হয়েই যায় তখন তো সে শেষ, তার গাড়িও শেষ।

এদিকে তার আস্তিক বন্ধু ইন্স্যুরেন্স করে রেখেছিল, তাই দুর্ঘটনা না হলেও সে তার টাকা সুদেআসলে পেয়ে যাবে। আর যদি দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি সেটা পুষিয়ে দেবে। তাই ইন্স্যুরেন্স করে রাখা হচ্ছে বুদ্ধিমানের কাজ।

বুঝলেন তো? কর্মফল, স্বর্গনরক, ভুত দেবতা ও পুনর্জন্মে বিশ্বাস হচ্ছে ইন্স্যুরেন্স করে রাখার মত। মরণের পরে যদি পরকাল থাকে তাহলে এই ইন্স্যুরেন্স আপনাকে দুঃখকষ্ট থেকে বাঁচিয়ে দেবে। আর যদি পরকাল নাও থাকে, তবুও অন্তত এই জীবনটা তো সাধুজনের প্রশংসিত একটা জীবন হবে।

তাই উভয়কালের জন্য ইন্স্যুরেন্স করে রাখা হচ্ছে পণ্ডিতের কাজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *