আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

মরণের পরে কী হয়?

প্রশ্নটা আসলে খুব সহজ। মরণের পরে কী হয়? কিন্তু তার উত্তর দেয়া বলতে গেলে অসম্ভব। কারণ সেটা হাতে কলমে জানার জন্য আপনার অবশ্যই আগে মরতে হবে। মরে তারপর আপনি বুঝবেন আপনার কী হচ্ছে না হচ্ছে। কিন্তু কয়জন আছে যারা মরার পরে আবার ফিরে এসে বলেছে আমার অমুক হয়েছে, সমুক হয়েছে?

ডাক্তাররা হয়তো সেব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন। বিশেষ করে যারা জরুরী বিভাগে গুরুতর আশংকাজনক রোগীদের নিয়ে কাজ করেন, এমনকি শ্বাসপ্রশ্বাস ৩০ মিনিট ধরে বন্ধ, মস্তিষ্ক অসাড়, যেটাকে ডাক্তারি ভাষায় বলা হয় ব্রেইন ডেড, অথবা ক্লিনিক্যালি ডেড, সেরকম মানুষকেও ফিরিয়ে আনা যায় মৃত্যুর ওপার থেকে। অন্তত স্যাম পার্নিয়া নামের একজন ডাক্তার সেরকমই বলেন।

স্যাম পার্নিয়া হচ্ছেন নিউইয়র্কের স্টোনি ব্রুক ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের ডাক্তার। তিনি মূলত সদ্য মৃত মানুষদেরকে আবার জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করেন। পানিতে ডুবেছে, দুর্ঘটনায় মারা গেছে এমন সদ্য মৃতদেরকে তিনি আবার জীবন ফিরিয়ে দিতে পারেন। সাধারণত যাদের হৃদপিণ্ড অচল হয়ে যায় কয়েক মিনিটের জন্য তাদেরকে সিপিআর CPR দিয়ে হৃদপিণ্ডকে আবার সচল করা যায়। কিন্তু সিপিআর পদ্ধতি আধুনিক হয়েছে। আর তার সাথে সাথে আরো বেড়েছে জীবন ও মৃত্যুর মধ্যেকার সীমারেখা। ফলে আরো অনেক লোকজনকে বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে। এভাবে যারা ফিরে এসেছে মরণের ওপার থেকে, তাদের মধ্যে কয়েকজন বলেছে তাদের অভিজ্ঞতার কথা, যা মাঝে মাঝে অসম্ভব বলেই মনে হয়। তারা দাবি করেছে যে তারা নাকি অনেক কিছু দেখেছে এবং শুনেছে, অথচ তাদের হৃদপিণ্ড স্তব্ধ, মস্তিষ্ক অসাড়। অর্থাৎ ডাক্তারি ভাষায় তারা তখন মৃত।

বিষয়টা অলৌকিক মনে হতে পারে, কিন্তু স্যাম পার্নিয়া একটা বই লিখেছেন, Erasing Death: The Science That Is Rewriting the Boundaries Between Life and Death. বইটা আমার খুব ভালো লেগেছে। ঝরঝরে ভাষায় ডাক্তার বলে গেছেন কীভাবে চল্লিশ মিনিট সিপিআর করে একজন লোককে সুস্থ স্বাভাবিক করে তুলেছে একদল ডাক্তার। আরো অনেক কাহিনী আছে সেখানে। তার একটা সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল Wired.com ওয়েবসাইটে। সেটার কিছু অংশ আমার কিছু একনিষ্ঠ পাঠকদের জন্য তুলে ধরলাম এখানে:

Wired.com: বইটাতে আপনি বলেছেন মৃত্যু একটা নির্দিষ্ট ক্ষণে হয় না, তা একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। তার মানে কী?

Parnia: মৃত্যু হচ্ছে যখন আপনার হৃদপিণ্ড থেমে যায়, আপনার ব্রেইন থেমে যায়। কার্ডিয়াক এ্যারেস্টের মুহুর্ত আসে। পঞ্চাশ বছর আগেও, সিপিআর আবিষ্কৃত হওয়ার আগে, এই পর্যায়ে পৌঁছলে আপনাকে আর ফেরানো যেত না। তাতে ধারণা হয়েছে যে, মৃত্যু হলে ফেরানোর কোনো রাস্তা নেই।

কিন্তু আমি যদি এই মুহুর্তে মারা যাই, আমার শরীরের ভেতরে কোষগুলো কিন্তু তখনো মরে নি। কোষগুলো মারা যায় অক্সিজেনের অভাবে, আর তাই তাদের মারা যেতেও কিছুটা সময় লাগে। সেটা তৎক্ষণাৎ হয় না। আমরা জানি যে, যখন আপনি মৃত হয়ে যান, যখন আপনাকে ডাক্তাররা মৃত ঘোষণা করে, তখনো একটা সম্ভাবনা থাকে দৈহিক ও মেডিকেলের দৃষ্টিকোণ থেকে যে, মৃত্যুকে হয়তো ফেরানো যাবে।

তবে এটা ঠিক, যদি কেউ মারা যায় এবং যথেষ্ট দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে থাকে, তার কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন এমন একটা সময় আসে যখন আর তাকে কোনো অবস্থাতেই ফেরানো যায় না। কিন্তু সেই সময়টা ঠিক কখন তা কেউ বলতে পারে না। এটা দশ মিনিট নাও হতে পারে, বরং এক ঘন্টারও বেশি হতে পারে। তাই মৃত্যু হচ্ছে একটা প্রক্রিয়া।

Wired.com: লোকজনকে কীভাবে মৃত্যু থেকে ফিরিয়ে আনা যায়?

Parnia: মৃত্যু হচ্ছে মূলত স্ট্রোকের মত। আর সেটা বিশেষ করে ব্রেইনের বেলায় সত্যি। স্ট্রোক হচ্ছে একটি প্রক্রিয়া যেখানে ব্রেইনে রক্তপ্রবাহ প্রবেশ থেমে যায়। সেটা হৃদপিণ্ড বন্ধ হওয়ার কারণে, নতুবা যেকোনো কারণে রক্তপ্রবাহ থেমে গেলে হয়। আর তখন আমরা তাকে মৃত বলে থাকি।

কিন্তু রক্তপ্রবাহ বন্ধ হলেও ব্রেইনের কোষগুলো আট ঘন্টা পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। ডাক্তাররা যদি কোষগুলোতে চলতে থাকা প্রক্রিয়াগুলোকে কাজে লাগাতে পারেন, আর কোষগুলোর মৃত্যুর গতিকে ধীর করে দিতে পারেন, তখন আমরা লোকটাকে চিকিৎসা করার আরো কিছুটা সময় পাব, আর দেখতে পারব কী কারণে লোকটা মারা গেছে। সেটার চিকিৎসা করে, হৃদপিণ্ডকে আবার চালু করে দিয়ে তাকে আবার আমরা জাগিয়ে তুলতে পারব। একদিক দিয়ে বলতে গেলে, যেসব কারণগুলোর চিকিৎসা আছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে মৃত্যুকে হয়তো ফেরানো যায়।

উদাহরণস্বরূপ এখন কেউ যদি হার্ট এ্যাটাকে মারা যায়, আর যদি সেই বিগড়ে যাওয়া হৃদপিণ্ডকে আমরা সারিয়ে তুলতে পারি, তাহলে এর মাঝে আমরা মস্তিষ্ককে রক্ষা করতে পারি, সেটার কোষগুলো যাতে স্থায়ীভাবে মারা না যায় সেটার ব্যবস্থা করতে পারি, এবং এরপরে হৃদপিণ্ডকে পুনরায় চালু করতে পারি। তবে যদি কেউ ক্যান্সারে মারা যায়, আর সেই ক্যান্সার যদি হয় চিকিৎসার অতীত, তাহলে অবশ্য তা ব্যর্থ হবে।

Wired: যারা কয়েকদিন বা কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক বছর হলো মারা গেছে এমন লোকজনকেও কি আপনি ফিরিয়ে আনতে পারেন বলছেন?

Parnia: না। এটা ক্রায়োজেনিক্স বা হিমায়িতকরণ নয়। আপনি যখন মারা যান, আপনার বেশির ভাগ কোষের মৃত্যু ঘটে এপোপটসিস নামক একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যেটা কোষগুলোতে আগে থেকেই প্রোগ্রাম করে দেয়া থাকে। যদি আপনার শরীর ঠাণ্ডা হয়, তখন এই প্রক্রিয়ায় যে রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলো হয় সেগুলো ধীরগতিতে হয়। এভাবে শরীরকে ঠাণ্ডা করলে তা দেহের কোষগুলোর মৃত্যুর হারকে ধীর করে দেয়। এটা হচ্ছে শরীরকে ঠাণ্ডা করা, একদম হিমায়িত করে রেখে দেয়া নয়। হিমায়িত করে রাখলে তা কোষগুলোকে আরো ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

ওআয়ার্ড: আপনি তো মৃত্যু পরবর্তী অভিজ্ঞতাগুলো নিয়েও স্টাডি করেছেন।

স্যাম পার্নিয়া: হ্যাঁ। যারা কার্ডিয়াক এ্যারেস্ট থেকে বেঁচে ফিরেছে, তাদের মধ্যে ১০% রিপোর্ট করেছে যে তারা অসাধারণ দৃশ্য দেখেছে। তাদের এই অভিজ্ঞতাটা হয় যখন হৃদপিণ্ড থেমে যায় এবং ব্রেইনে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ব্রেইনে কোনো রক্তপ্রবাহ প্রবেশ করে না, ফলে দশ সেকেণ্ডের মধ্যে ব্রেইন অসাড় হয়ে যায়, সেটার সকল কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যায়। ডাক্তারেরা তখন সিপিআর শুরু করে, যদিও তখনো যথেষ্ট পরিমাণ রক্ত যায় না ব্রেইনের মধ্যে। ইইজি গ্রাফ, যেটা ব্রেইনের কর্মকাণ্ডকে পরিমাপ করে, সেটা দেখায় একটা সরলরেখা মাত্র। অর্থাৎ ব্রেইন তখনো অসাড়। ডাক্তারি ভাষায় সে তখন হচ্ছে মৃত।

কেবল আমার গবেষণা নয়, আরো অন্য চারজনের গবেষণাও আছে, যা একটা জিনিসই দেখায়: মস্তিষ্ক মৃত হলেও লোকজন তখনকার ঘটনা স্মরণ করতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এধরনের যে ঘটনাগুলোর রিপোর্ট আমাদের আছে, সেগুলো মিলিয়ে দেখলে বুঝা যায় এটা নিয়ে আরো বিস্তারিতভাবে গবেষণার প্রয়োজন আছে।

Wired: আপনার বইয়ের একটা ঘটনা হচ্ছে জো তিরালোসি নামক এক ইতালিয়ানকে নিয়ে। সে নাকি ৪০ মিনিট হৃদপিণ্ড বন্ধ থাকার পরও বেঁচে ফিরেছে। আপনি কি তার ব্যাপারে কিছু বলবেন?

Parnia: সে যখন হাসপাতালে ভর্তি হয়, তখন আমি তার দায়িত্বে ছিলাম না। কিন্তু যে ডাক্তাররা তার দায়িত্বে ছিল আমি তাদেরকে ভালো করে চিনি। আমরা জরুরি বিভাগে কিছু কাজ করেছিলাম, যাতে তারা জানে যে লোকজনকে ঠাণ্ডা করাটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তিরালোসি যখন ভর্তি করা হয়েছিল, তারা তাকে ঠাণ্ডা করেছিল, যা তার মস্তিষ্কের কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া থেকে রক্ষা করেছিল। তারা তার হৃদপিণ্ডের নালিগুলোতে ব্লক খুঁজে পেয়েছিল। সেগুলো তো এখন চিকিৎসা করা যায়। সিপিআর করে, তাকে ঠাণ্ডা করে, ডাক্তাররা তার চিকিৎসা করতে পেরেছিল, এবং মস্তিষ্ক যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তা নিশ্চিত করতে পেরেছিল।

তিরালোসি জেগে উঠার পরে নার্সদেরকে বলেছিল যে তার একটা গভীর অভিজ্ঞতা হয়েছে, এবং সে সেটা নিয়ে কথা বলতে চায়। এভাবেই আমাদের দেখা হয়েছিল। সে আমাকে বলেছিল যে সে কীরকম অসাধারণ শান্তি অনুভব করেছিল। সে একটা সত্তার দেখা পেয়েছিল, যে ছিল মমতা ও করুণায় ভরা।

অনেকেই তার মতো অভিজ্ঞতা লাভ করেছে। লোকজন যা দেখে তা সাধারণত তাদের বিশ্বাসের পটভূমির সাপেক্ষে সেটার একটা অর্থ করে নেয়। যেমন সেরকম দেখলে একজন হিন্দু বলবে সে কোনো হিন্দু দেবতার দেখা পেয়েছে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তায় অবিশ্বাসী হলে সে কোনো হিন্দু দেবতাকে বলবে না, বা কোনো খ্রিস্টান ঈশ্বরের কথা বলবে না। যদিও একই সত্তা। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির লোকজন একই জিনিসকে দেখে, কিন্তু সেই একই জিনিসের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ তারা ধরে নেয় তাদের বিশ্বাসের ভিত্তিতে।

Wired: এই যে লোকজন সবাই একই জিনিস দেখছে, তা থেকে আমরা কী শিখতে পারি?

Parnia: অন্তত এটা আমাদের বলে যে, মানুষেরা যখন মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যায় তখন তাদের সেরকম একটা অসাধারণ অভিজ্ঞতা হয়। এটা সার্বজনীন। এটা এমনকি তিন বছরের বাচ্চাও বলেছে সেরকম উদাহরণও আছে। আর এটা আমাদেরকে বলে যে, আমাদের মৃত্যুকে ভয় পাওয়া উচিত নয়।

Wired: কিন্তু আমরা কীভাবে নিশ্চিত জানতে পারি যে এই যে লোকজনের মৃত্যু-পরবর্তী অভিজ্ঞতাগুলো হচ্ছে, সেগুলো তারা হয়তো মনে করছে মাত্র, কিন্তু সেগুলো বাস্তবে আদৌ ঘটছে কিনা সন্দেহ। হতে পারে যে, তারা হয়তো মৃত্যুর ঠিক আগমুহুর্তের চিন্তাগুলোকেই ভুলবশত সেরকম অভিজ্ঞতা বলে স্মরণ করছে।

Parnia: এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বটে। এই যে স্মৃতিগুলো হয়, সেটা কি কোনো মানুষ যখন একদম সরলরেখা হয়, এবং মস্তিষ্কে কোনো কার্যক্রম থাকে না সেই সময়ে, যেমনটা বিজ্ঞান বলছে? নাকি যখন তারা জেগে ওঠার চেষ্টা করছে, কিন্তু তখনো অজ্ঞান হয়ে আছে সেই সময়ে?

এসব অভিজ্ঞতাগুলো মস্তিষ্কের থেমে যাওয়ার আগে হচ্ছে অথবা জেগে ওঠার পরে হচ্ছে বলে যেরকম মনে করা হয়, সেই ধারণার বিপরীতে একটা বিষয় আছে। আর তা হচ্ছে অনেকেই একদম নির্দিষ্ট কিছু বিষয় বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছে, যেগুলো তাদের কার্ডিয়াক এ্যারেস্টের সময় ঘটেছিল। তখন লোকজন কে কী বলেছিল, কীরকম পোশাক পরেছিল, ১০ মিনিট বা ২০ মিনিট পরে কী হয়েছিল তারা সেগুলোর বর্ণনা দিয়েছে। সেটা তো মস্তিষ্কের কর্মকাণ্ডের সাথে মেলে না।

এটাও হতে পারে যে, কেউ কেউ খুব ভালো মানের সিপিআরের সুবিধা পেয়েছে, যার কারণে তাদের ঠিকই মস্তিষ্কের কার্যক্রম ছিল, যদিও বাস্তবে সেরকম হওয়ার কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই। অথবা এটাও হতে পারে যে, মানুষের মন, আত্মা তখনো কাজ করে গেছে।

Wired: তাদের এই দেখা ও শোনার অভিজ্ঞতাগুলো কি মস্তিষ্কের কোনো ধরনের সুক্ষ্ম কার্যক্রম হতে পারে না [যেটা বিজ্ঞানীরা এখনো ধরতে পারেন নি?]?

Parnia: আপনি যখন মারা যান, তখন আপনার মস্তিষ্কে কোনো রক্ত প্রবাহিত হয় না। রক্ত প্রবাহ একটা নির্দিষ্ট লেভেল থেকে নিচে নামলে তখন সেখানে আর বৈদ্যুতিক কার্যক্রম চলতে পারে না। যখন আপনার সবকিছু অকেজো হয়ে গেছে তখন আপনার মস্তিষ্কের কোনো লুকোনো অংশ কোনোভাবে কাজ করে চলেছে তা ভাবতেও তো প্রচুর কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়।

এসব পর্যবেক্ষণ থেকে মস্তিষ্ক ও মন কীভাবে পরস্পরের সাথে কাজ করে সেব্যাপারে আমাদের যে প্রচলিত ধারণা, সেটা নিয়ে প্রশ্ন জাগে। প্রচলিত ধারণা হচ্ছে যে, মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক প্রক্রিয়াগুলোই মন সৃষ্টি করে। সেটা বোধহয় আর সঠিক নয়, কারণ আমরা এখন দেখাতে পারি যে, মৃত্যুর পরে সেই বৈদ্যুতিক প্রক্রিয়াগুলো আর চলে না, অথচ লোকজন তারপরেও তখন বিভিন্ন কিছু দেখে এবং শোনে।

মস্তিষ্কে একটা কিছু হয়তো থাকতে পারে, যেটা আসলে মন সৃষ্টির জন্য দায়ী, অথচ আমরা সেটা এখনো আবিষ্কার করতে পারি নি। অথবা এটাও হতে পারে যে, মন হচ্ছে মস্তিষ্ক থেকে আলাদা কোনো একটা অস্তিত্ব।

Wired: এ তো মনে হচ্ছে মনের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে অলৌকিকতার দিকে চলে যাওয়া।

Parnia: আমরা বিষয়গুলোকে বিজ্ঞানের হাতিয়ার দিয়ে যতদূর সম্ভব ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি। কিন্তু যেসব বিজ্ঞানী খোলা মনের এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখেন, তারা স্বীকার করেন যে, আমাদেরও একটা সীমাবদ্ধতা আছে। একটা কিছু আছে যা আমাদের বর্তমান বিজ্ঞান দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না, তার মানে এই নয় যে বিষয়টা অলৌকিক বা ভুল। যখন মানুষ ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিজম আবিষ্কার করেছে, অনেক বিজ্ঞানী সেটা নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করেছে।

বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, আত্মা হচ্ছে ব্রেইনের কোষগুলোতে চলা প্রক্রিয়া মাত্র। কিন্তু ব্রেইনের কোষগুলো কীভাবে মানুষের মাঝে চিন্তার জন্ম দেয় তা নিয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা করা হয় নি। আপনি যদি মস্তিষ্কের কোনো কোষকে মাইক্রোস্কোপের নিচে রেখে দেখেন, আর আমি যদি তখন আপনাকে বলি যে, “এই ব্রেইন কোষটা মনে করছে যে আমি ক্ষুধার্ত” সেটা অসম্ভব।

এটা হতে পারে যে, ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিজম, মানুষের আত্মা এবং মন হচ্ছে খুব সুক্ষ্ম ধরনের শক্তি যেগুলো মস্তিষ্কের সাথে সুক্ষ্মভাবে যোগাযোগ করে থাকে, যেগুলো আসলে মস্তিষ্ক দ্বারা উৎপন্ন হয় না। যদিও এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।

Wired: কিন্তু চিন্তা ও অনুভূতি কীভাবে হয় সেগুলো নিয়ে যে এত ব্রেইন স্ক্যান করা হলো, সেগুলোর কী হয়েছে? অথবা বিজ্ঞানীদের সেই পরীক্ষাগুলো, যেখানে তারা ব্রেইনের ক্রিয়াকলাপ দেখে বলে দিতে পারেন যে লোকজন কী দেখছে, অথবা কী স্বপ্ন দেখছে।

Parnia: আমাদের যে সমস্ত তথ্যউপাত্ত আছে, তাতে দেখা যায় যে, নির্দিষ্ট কিছু মানসিক প্রক্রিয়ার সাথে ব্রেইনের কিছু নির্দিষ্ট অংশের সংশ্লিষ্টতা আছে। কিন্তু সেখানেও সেই ডিম না মুরগির প্রশ্ন চলে আসে। সেখানে ব্রেইনের কোষগুলোর ক্রিয়াকলাপই কি মন উৎপন্ন করে? নাকি মন সেই ব্রেইনের কোষগুলোর কর্মকাণ্ডকে উৎপন্ন করে?

কারো কারো মতে, ব্রেইনের কোষগুলো চিন্তার জন্ম দেয়। ধরা যাক একটা বিষণ্ণ ছবি দেখে মন খারাপ হলো। আর একটা সুখী সুখী ভাবের ছবি দেখে মন সুখী হলো। কিন্তু সেটা তো সংশ্লিষ্টতা মাত্র, সেটা কার্যকারণ নয়। আপনি যদি সেই থিওরিটা গ্রহণ করেন, তাহলে লোকজন যে শুনছে বা দেখছে বলে রিপোর্ট করছে তাদের ব্রেইনের কার্যক্রম থেমে যাওয়ার পরেও, সেরকম কোনো কিছু থাকত না। এতে প্রমাণ হয় যে, মানুষের যদি মন বলে কোনো কিছু থাকে, তাহলে খুব সম্ভবত আমাদের এই থিওরিগুলো এখনো পরিপূর্ণ নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *