আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

বৌদ্ধরা কি মূর্তিপূজারী?

লিখব না, লিখব না করেও লিখতে বসলাম। কারণ বিষয়টা কয়েকদিন ধরে মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিষয়টা হচ্ছে আমরা বৌদ্ধরা বুদ্ধমূর্তিকে বন্দনা করি কেন? পূজা করি কেন? আরেকটা কথা হচ্ছে, অনেকেই এখানে “বুদ্ধমূর্তি” শব্দের ব্যবহারে আপত্তি তোলেন। তার বদলে তারা বুদ্ধবিম্ব বা বুদ্ধের প্রতিবিম্ব বা বুদ্ধের প্রতিমা ইত্যাদি শব্দ ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

আচ্ছা, বুদ্ধের মূর্তিকে মূর্তি বলব না তো কী বলব? সেটাকে নিয়ে আপত্তি তোলার কী আছে? আমি যদ্দূর জানি, এই আপত্তি হচ্ছে মূলত মুসলিমদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে। মুসলিমরা মূর্তিপূজার বিরোধী। তাই তারা নাক সিঁটকে বলে যে, বৌদ্ধরাও মূর্তিপূজা করে। মূলত এই মূর্তিপূজার অভিযোগ থেকে মুক্তি পেতেই সরলমনা বৌদ্ধরা বুদ্ধমূর্তি না বলে অন্যকিছু বলতে চায়, ব্যবহার করতে চায়।

আমি তার একটা সমাধান দিতে পারি। মুসলিম কেউ যদি বলে, আপনি বুদ্ধমূর্তিকে পূজা করেন কেন? আপনি তো মূর্তিপূজারী! তাহলে তার উত্তরে আপনার পাল্টা প্রশ্ন করা উচিত, আচ্ছা, আপনারা তো সবসময় মক্কার দিকে মুখ করে নামাজ পড়েন। আপনারা মক্কাকে কেন উপাসনা করেন? যেকোনো মুসলিমই তার উত্তরে প্রতিবাদের সুরে বলবেন, আমরা মক্কার দিকে মুখ করে নামাজ পড়ি বটে, কিন্তু আমাদের প্রার্থনা, উপাসনা সবই হচ্ছে এক আল্লাহের প্রতি। তখন আপনি বলতে পারেন, আমরা বৌদ্ধরাও ঠিক এভাবেই উপাসনা করি। আমরা যদিও বুদ্ধমূর্তির সামনে উপাসনা করি, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমাদের প্রার্থনা, উপাসনা সবই হচ্ছে বুদ্ধের প্রতি।

শুধু মুসলিমরা নয়, আধুনিক যুগের তথাকথিত শিক্ষিত বৌদ্ধরাও এই প্রশ্নটা করে থাকে। যেন তারা বুদ্ধমূর্তিকে বন্দনা পূজা করতে হয় বলে যার পর নাই লজ্জিত। আমি বলি, সেটা হয় তাদের বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে না জানার কারণে। বৌদ্ধধর্মে পথ চলা শুরু হয় আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ ধরে। তাতে প্রথমেই আপনার ভুল দৃষ্টিভঙ্গিকে ঠিক করে নিতে হয়। সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হয়। সঠিক বিশ্বাস গড়ে তুলতে হয়। সেটা কীরকম? আপনার বিশ্বাস করতে হয় কর্মফল এবং জন্মান্তরবাদকে। এই দুটোই হচ্ছে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি। এই দুটোই হচ্ছে বৌদ্ধধর্মের মূল ভিত্তি। আপনার এই ভিত্তি নড়বড়ে হলে বুঝতে হবে আপনার বৌদ্ধ হওয়াটাও নড়বড়ে হয়ে গেছে। এই ভিত্তি সুদৃঢ় হলে তখন দান, শীল, ভাবনা, সেবাপূজার ফল আছে বলে বিশ্বাস আসে।

এখন আপনি কর্মফল ও জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস না করেও দান করতে পারেন, সৎ জীবন যাপন করতে পারেন, ধ্যান করতে পারেন। অনেকেই সেরকম আছেন। কিন্তু বুদ্ধ বলেন, তারা সংসারে বার বার জন্ম হওয়া থেকে মুক্ত হবেন না। আর যারা কর্মফলে বিশ্বাস করেন, জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস করেন, তারা সংসারে বার বার জন্মানোর দুঃখময় চক্র থেকে মুক্তির পথে এগিয়ে যাবেন। এটাই হচ্ছে আমাদের মতো বৌদ্ধদের জন্য বুদ্ধের আশ্বাসবাণী। এই বিশ্বাসেই আমরা বৌদ্ধধর্মকে মনেপ্রাণে ধারণের চেষ্টা করি। এই বিশ্বাসেই আমরা বুদ্ধকে পূজা করি।

বলা ভালো, অন্যদের কথা জানি না, কিন্তু বন্দনার সময়ে আমার কখনোই মনে হয় নি আমি একটা মূর্তিকে বন্দনা করছি। আমি বুদ্ধের সামনে, বুদ্ধকেই বন্দনা করছি বলে আমার মনে আসে সবসময়। তাই একজন বৌদ্ধ হিসেবে আমি অন্তত বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, আমি মূর্তিপূজা করি না, আমি বুদ্ধকে পূজা করি।

যে ধর্মে যেভাবে উপাসনা করার নিয়ম সেভাবেই উপাসনা করাটা স্বাভাবিক। তাই নিজ নিজ ধর্মীয় নিয়ম অনুসারে কেউ মূর্তি বানিয়ে পূজা করে, অথবা কেউ কোনো একটা নির্দিষ্ট দিকে উপাসনা করে। তাতে যদি কেউ কটাক্ষ করে কিছু বলে, তাহলে বুঝতে হবে সেটা তার ধর্মীয় গোঁড়ামি ও অহংকারের প্রকাশ মাত্র। আমি সেধরনের লোকজনকে এড়িয়ে চলাটাই পছন্দ করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *