আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

দুধ সুত্র

আমরা সবাই মায়ের দুধ খেয়ে বড় হয়েছি। এই দুধ নিয়ে একটা অসাধারণ সুত্র আছে। নাম হচ্ছে দুধ সুত্র (খীরসুত্তং, সং.নি.২.১২৭)। আমার খুবই পছন্দের সুত্র। তাই অনেকদিন ধরে অনুবাদ করব ভাবছিলাম। আজকে করে ফেললাম। মনোযোগ দিয়ে পড়ে দেখুন।

বুদ্ধ একসময় শ্রাবস্তীর জেতবনে অবস্থান করছিলেন। সেখানে তিনি ভিক্ষুদেরকে আহ্বান করে বললেন, হে ভিক্ষুগণ, এই সংসারচক্র হচ্ছে আদিবিহীন। অবিদ্যার আবরণে ঢাকা, তৃষ্ণার শৃঙ্খলে আবদ্ধ প্রাণিদের ছুুটে চলার, চলতে থাকার শুরু হয়েছে কবে, তা দেখা যায় না। হে ভিক্ষুগণ, তোমরা কোনটা বেশি বলে মনে কর? এই দীর্ঘ সময়ে ছুটে চলা, চলতে থাকার সময়ে পানকৃত মায়ের দুধ বেশি? নাকি চারটি মহাসাগরের পানি?”

ভিক্ষুরা বলেছিল, “ভান্তে, আমরা ভগবান কর্তৃক দেশিত ধর্মকে যেভাবে জানি, তাতে এই দীর্ঘ সময়ে ছুটে চলা, চলতে থাকার সময়ে পানকৃত মায়ের দুধই বেশি। চারটি মহাসাগরের পানি নয়।”

বুদ্ধ তিনবার সাধুবাদ দিয়ে বলেছিলেন, সাধু সাধু হে ভিক্ষুগণ, সাধু। তোমরা সত্যিই আমার এভাবে দেশিত ধর্মকে জেনেছ। হে ভিক্ষুগণ, এভাবে এই দীর্ঘ সময়ে ছুটে চলা, চলতে থাকার সময়ে পানকৃত মায়ের দুধই বেশি। চারটি মহাসাগরের পানি নয়। তার কারণ কী? হে ভিক্ষুগণ, তার কারণ হচ্ছে এই সংসার আদিবিহীন। অবিদ্যার আবরণে ঢাকা, তৃষ্ণার শৃঙ্খলে আবদ্ধ প্রাণিদের ছুুটে চলার, চলতে থাকার শুরু হয়েছে কবে, তা দেখা যায় না।

এরপর বুদ্ধ বলেছিলেন, এভাবে হে ভিক্ষুগণ, দীর্ঘকাল তোমরা দুঃখ ভোগ করেছ। তীব্র দুঃখ ভোগ করেছ। ক্ষয়ক্ষতি ভোগ করেছ। কবরস্থানকে বাড়িয়েছ। আর হে ভিক্ষুগণ, যা হয়েছে যথেষ্ট হয়েছে। এখন সকল সৃষ্টির প্রতি নিরানন্দিতই হওয়া উচিত। বিরাগীই হওয়া উচিত। বিমুক্তই হওয়া উচিত।

অর্থকথার ব্যাখ্যাটা আরো গভীর। সেখানে বলা হয়েছে, মায়ের দুধ সব প্রাণির কপালে জোটে না। কেঁচো, পিঁপড়া ইত্যাদি কীটপতঙ্গের মধ্যে আপনি আগে জন্মেছিলেন নিশ্চয়ই, কিন্তু তারা তো মায়ের দুধ খায় না। তাই সেসব জন্মে আপনার কপালে মায়ের দুধ জোটে নি তা বুঝতেই পারছেন। মাছ, কচ্ছপ ইত্যাদি জলজ প্রাণি, অথবা পাখির জন্মেও একই কথা। দুধ পান জোটে কেবল ছাগল, মোষ ইত্যাদি প্রাণিকুলে জন্ম হলে। আর থাকে মানুষের মধ্যে।

তবে এই সুত্রে ছাগল, মোষ ইত্যাদি জন্মে পানকৃত দুধকে বিবেচনা করা হয় নি। এমনকি মানুষ জন্মেও “দেবী, সুমনা, তিষ্যা” ইত্যাদি কত মায়ের সন্তান হিসেবে জন্মেছিলেন আপনি। সেই জন্মেও তাদের দুধ খেয়েছিলেন। সেগুলোও এখানে বিবেচনা করা হয় নি। অসংখ্য জন্মের মধ্যে কেবল যেসব জন্মে আপনার মায়ের নাম একই ছিল, সেসব জন্মে পানকৃত মায়ের দুধকেই এখানে বিবেচনা করা হয়েছে।

আচ্ছা, ধরা যাক এই জন্মে একজনের মায়ের নাম সুমনা। এর আগের জন্মে তার মায়ের নাম কী ছিল? পরবর্তী জন্মে তার মায়ের নাম কী হবে? তাদের নামও কী সুমনা হবে? সেরকম হবার সম্ভাবনা কতটুকু? আমার তো মনে হয় কোটি কোটি জন্মের মায়েদের মধ্যে দুজন মায়ের নাম একই হওয়ার সম্ভাবনা ১%ও হবে না। অথচ সেই অসম্ভব জন্মগুলোতেই একই নামের মায়েদের থেকে পানকৃত দুধ নাকি চারটি মহাসাগরের পানি থেকেও বেশি! বাকি ৯৯% জন্মের হিসাব কে জানে? এভাবে আমরা কত জন্ম ধরে ঘুরছি এই সংসারে? কত দুঃখ ভোগ করেছি? সেকারণেই বুদ্ধ বলেছেন, যা হয়েছে যথেষ্ট হয়েছে। এখন সবকিছুর প্রতি বিরাগী হওয়ার চর্চা করুন। বিমুক্তিকেই লক্ষ্য করুন। বুদ্ধের এটাই উপদেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *