আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

মাতালদের মদ খাওয়ার অজুহাত

মায়ানমার হচ্ছে বৌদ্ধ দেশ। ছোটবেলা থেকেই তারা বৌদ্ধধর্মীয় শিক্ষায় বড় হয়েছে। তাই বড় হয়ে আকাম কুকাম করলেও তারা ধর্মের দোহাই দেয়। যেমন ধরা যাক এখানকার মদখোরদের কথা। তাদেরকে মদ খেতে মানা করা হলেও তারা বলবে, মদ খেলে কী হয়? কোশল রাজার মন্ত্রী ছিল সন্ততি। সাতদিন ধরে মদ খেয়ে মাতাল হয়েও সে অর্হৎ হয়েছে, নির্বাণ পেয়েছে। তাই যে খাবে না মদ, সে খুঁজে পাবে না নির্বাণের পথ!

কিন্তু আপনারা হয়তো অনেকেই জানেন না সন্ততি মন্ত্রীর কথা। সন্ততি ছিল কোশলরাজা প্রসেনজিতের মন্ত্রী। সে একদিন প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্রোহকে শান্ত করে ফিরেছিল। তখন রাজা খুশি হয়ে তাকে সাতদিন রাজত্ব দিয়ে একজন নাচে গানে দক্ষ মেয়েকে দিলেন। সে সাতদিন ধরে মদে মাতাল হয়ে থাকল। সপ্তম দিনে সর্ব অলঙ্কারে সেজেগুজে হাতির পিঠে চড়ে গোসলের ঘাটে গেল। যাওয়ার সময়ে নগরীর গেটে দেখল বুদ্ধ পিণ্ডচারণের জন্য নগরীতে প্রবেশ করছেন। দেখে সেই হাতির পিঠ থেকেই মাথা নত করে বন্দনা করে চলে গেল। বুদ্ধ মৃদু হাসলেন। আনন্দ ভান্তে জিজ্ঞেস করলেন, “ভান্তে, হাসির কারণ কী?” বুদ্ধ তখন হাসির কারণ বলতে গিয়ে বললেন- “আনন্দ, সন্ততি মহামন্ত্রীকে দেখ। সে আজ এভাবেই সেজেগুজে আমার কাছে এসে চারপদের গাথা শেষে অর্হত্ব লাভ করবে।”

বুদ্ধের সেই কথা লোকজন শুনল। সেখানে ভিন্নধর্মী লোকজন চিন্তা করল- “শ্রমণ গৌতমের কাণ্ড দেখ। মুখে যা আসে তাই বলে। এই সন্ততি তো এখনই মদে মাতাল হয়ে আছে। সে নাকি আবার এই অবস্থাতেই তার কাছে ধর্মকথা শুনে পরিনির্বাপিত হবে। আজ তাকে মিথ্যা বলার কারণে ধরব।” শ্রদ্ধাবান লোকজন চিন্তা করল- “আহা, বুদ্ধগণের কী মহান ক্ষমতা! আজ বুদ্ধের লীলা এবং সন্ততি মহামন্ত্রীর লীলা দেখতে পাব।”

সন্ততি মহামন্ত্রীও সারাদিন পানিতে খেলা করে উদ্যানে গিয়ে পানভোজনের প্রাঙ্গণে গিয়ে বসল। সেই মেয়েটিও রঙ্গমঞ্চের মাঝে গিয়ে নাচগান দেখাতে শুরু করল। কিন্তু শারীরিক কসরৎ দেখানোর জন্য সপ্তাহকাল ধরে অল্প আহারের কারণে সেদিন নাচগান দেখানোর সময়ে তলপেটে প্রচণ্ড ব্যথা উৎপন্ন হয়ে হার্ট এ্যাটাক হলো। সে তৎক্ষণাৎ মুখ চোখ হা করে মারা গেল। সন্ততি মহামন্ত্রী প্রবল শোকে অভিভূত হয়ে গেল। সপ্তাহকাল ধরে খাওয়া মদের নেশা তপ্ত কড়াইয়ে পানির ফোঁটার মতো উবে গেল। সে ভাবল, “আমার এই শোক অন্য কেউ নেভাতে পারবে না, তথাগত ছাড়া।”

তাই সে সেনাদল সহকারে সন্ধ্যাবেলায় শাস্তার কাছে গিয়ে বলল- “ভান্তে, আমার এরকম শোক উৎপন্ন হয়েছে। আমার সেই শোক আপনিই নেভাতে পারবেন বলে এসেছি। আমার আশ্রয়স্থল হোন।” তখন শাস্তা “শোক নেভাতে সমর্থের কাছেই তুমি এসেছ। এই মেয়ের এভাবে মারা যাওয়ার সময়ে তোমার কাঁদতে কাঁদতে ঝরে পড়া অশ্রুজলের পরিমাণ চারি মহাসাগরের পানির থেকেও বেশি”। এই বলে এই গাথা বললেন-

যা অতীতের সেটাকে শুকিয়ে ফেল, ভবিষ্যতের সেগুলোতে রেখো না কোনো টান।মাঝে কোনোকিছুকে গ্রহণ না করলে শান্ত হয়ে বিচরণ করবে।

সকল সৃষ্টিতে যার মায়া নেইনা থাকলেও অনুশোচনা করে না, জগতে তার পতন হয় না।

যার এটা আমার বলে কোনোকিছু নেই, অপরের বলেও কোনোকিছু নেই,মমত্বকে সে খুঁজে বেড়ায় না, আমার নেই বলে অনুশোচনা করে না।

(সু॰ নি॰ ৯৫৫, ১১০৫; চূল়নি॰ জতুকণ্ণিমাণৰপুচ্ছানিদ্দেস ৬৮)।

গাথা শেষে সন্ততি মহামন্ত্রী অর্হত্ব লাভ করে নিজের আয়ু ফুরিয়ে আসছে দেখে বুদ্ধকে বলল- “ভান্তে, আমার পরিনির্বাণের অনুমোদন করুন।” বুদ্ধ তখন মিথ্যা বলার কারণে ধরবে বলে সমবেত হওয়া ভিন্নধর্মী লোকজন যাতে সুযোগ না পায়, এবং শ্রদ্ধাবান লোকজনের যাতে সন্ততির অতীত পুণ্যকর্ম শুনে নিজেদেরও সাদরে পুণ্য করার মন হয় সেটা বিবেচনা করে বললেন, “তাহলে তোমার কৃতকর্ম আমাকে বল। বললেও মাটিতে দাঁড়িয়ে নয়, সাত তালগাছ উঁচু আকাশে উঠে গিয়ে বল।”

সে “ঠিক আছে, ভান্তে” বলে বুদ্ধকে বন্দনা করে এক তালগাছ সমান আকাশে উঠে আবার বুদ্ধকে বন্দনা করে উঠে গেল। এভাবে ক্রমান্বয়ে সাত তালগাছ সমান আকাশে উঠে পদ্মাসনে বসে “ভান্তে, আমার পূর্বকর্মের কথা শুনুন” বলে বলল-

এখন থেকে একানব্বই কল্প আগে বিপস্সী সম্যকসম্বুদ্ধের সময়ে আমি বন্ধুমতী নগরে এক পরিবারে জন্ম নিয়ে ভেবেছিলাম- “অন্যকে কাটা, মারা, অকরণীয় এসব কর্ম করে কী হবে।” তখন ভেবে দেখতে দেখতে ধর্মঘোষকের কাজ দেখলাম। সেই থেকে সেই কর্ম করতে করতে লোকজনকে উদ্বুদ্ধ করে “পুণ্য করুন। উপোসথদিনগুলোতে উপোসথ গ্রহণ করুন। দান দিন, ধর্মকথা শুনুন। বুদ্ধ রত্ন ইত্যাদির মতো অন্য কিছু নেই। ত্রিরত্নকে সেবাপূজা করুন” বলে ঘোষণা করতে করতে বিচরণ করতাম।

আমার সেই ঘোষণার শব্দ শুনে বুদ্ধের পিতা বন্ধুমতী মহারাজা আমাকে ডেকে “বাপু, কী করতে করতে বিচরণ করছ?” জিজ্ঞেস করলেন।

“হে দেব, ত্রিরত্নের গুণ প্রকাশ করে লোকজনকে পুণ্যকর্মে নিয়োজিত করতে করতে বিচরণ করছি”।

“কীসে বসে বিচরণ করছ?”

“হে দেব, পায়ে হেঁটে হেঁটে।”

“বাপু, তোমার এভাবে বিচরণ করাটা যথাযোগ্য নয়। এই ফুলের মালা পরিধান করে, ঘোড়ার পিঠে বসে বিচরণ কর”

বলে আমাকে মুক্তার মালার মতো ফুলের মালা দিয়ে দাঁতের মতো সাদা ঘোড়া দিলেন।

তখন আমি রাজার দেয়া উপহার নিয়ে সেভাবেই ঘোষণা করতে লাগলাম। পরে আবার রাজা ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “বাপু, কী করতে করতে বিচরণ করছ?”

“এরকম, হে দেব।”

“বাপু, ঘোড়াও তোমার যথাযোগ্য নয়, এখানে বসে বিচরণ কর” বলে চারটি সৈন্ধব ঘোড়া যুক্ত রথ দিলেন।

তৃতীয়বারেও রাজা আমার শব্দ শুনে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “বাপু, কী করতে করতে বিচরণ করছ?”

“এরকম, হে দেব।”

“বাপু, রথও তোমার যথাযোগ্য নয়” বলে বিপুল ধনসম্পদ ও মহাপ্রসাধনী দিয়ে একটা হাতি দিলেন।

সেই আমি সর্ব অলঙ্কারে সজ্জিত হয়ে হাতির পিঠে বসে আশি হাজার বছর ধর্মঘোষক হিসেবে কাজ করেছি। ফলে আমার এতকাল দেহ থেকে চন্দনগন্ধ প্রবাহিত হয়, মুখ থেকে শাপলার গন্ধ প্রবাহিত হয়। এই আমার কৃতকর্ম।

এভাবে সে নিজের পূর্বকর্মকে বর্ণনা করে আকাশে বসেই তেজোধাতুতে প্রবেশ করে পরিনির্বাপিত হল। শরীরে অগ্নিশিখা উঠে মাংস-রক্ত পুড়ে গেল, জুঁই ফুলের মতো ধাতু অবশিষ্ট থাকল। শাস্তা শুদ্ধবস্ত্র বিছিয়ে দিলেন। ধাতুগুলো সেখানে পড়ে গেল। সেগুলো পাত্রে রেখে চারি মহাপথের মিলনস্থলে স্তুপ করালেন। “লোকজন বন্দনা করে পুণ্যের ভাগী হবে।”

ভিক্ষুরা ধর্মসভায় বলাবলি করল, “বন্ধু, সন্ততি মহামন্ত্রী গাথা শেষে অর্হত্ব লাভ করে অলঙ্কারে সজ্জিত অবস্থাতেই আকাশে বসে পরিনির্বাপিত হয়েছে। তাকে কি ‘শ্রমণ’ বলা উচিত? নাকি ‘ব্রাহ্মণ’ বলা উচিত?” শাস্তা এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে ভিক্ষুগণ, বসে বসে এখন কী কথা হচ্ছিল?’ “এই কথা” বলাতে “হে ভিক্ষুগণ, আমার পুত্রকে ‘শ্রমণ’ও বলা যায়, ‘ব্রাহ্মণ’ও বলা যায়।” এই বলে ধর্মদেশনা হিসেবে এই গাথা বললেন-

অলঙ্কৃত হলেও যদি সৌম্য হয়ে বিচরণ করে,শান্ত দান্ত নিয়ত ব্রহ্মচারী।সকল জীবের প্রতি দণ্ড পরিহার করে,সে-ই হচ্ছে ব্রাহ্মণ, সে-ই হচ্ছে শ্রমণ, সে-ই হচ্ছে ভিক্ষু।

সেখানে অলঙ্কৃত মানে হচ্ছে পোশাক ও সাজসজ্জা দ্বারা সজ্জিত। তার অর্থ হচ্ছে- পোশাক ও অলঙ্কার ইত্যাদিতে অলঙ্কৃত হয়েও যদি কোনো ব্যক্তি দৈহিক ইত্যাদি দিক দিয়ে সৌম্য হয়ে বিচরণ করে, লালসা ইত্যাদির উপশমে শান্ত, ইন্দ্রিয় দমনের দ্বারা দান্ত, চারি মার্গের নিশ্চয়তায় নিয়ত, শ্রেষ্ঠ আচরণের দ্বারা ব্রহ্মচারী, দৈহিক আঘাত ইত্যাদি পরিহারের দ্বারা সকল জীবের প্রতি দণ্ড পরিহার করে, তাকে এমন পাপ বিধোত হওয়ার কারণে ব্রাহ্মণও বলা যায়, পাপ প্রশমনের কারণে শ্রমণও বলা যায়, কলুষতাগুলোর ভগ্ন হওয়ার কারণে ভিক্ষুও বলা যায়।

দেশনা শেষে বহুজন স্রোতাপত্তি ইত্যাদি ফল লাভ করেছিল।

(ধর্মপদ অর্থকথা => ১০. দণ্ডৰগ্গো => ৯. সন্ততিমহামত্তৰত্থু)

☝️

এটা বার বার পড়ুন। ধর্মকথা যত পড়বেন তত পুণ্য হবে।

✌️

ধর্মকথা বেশি বেশি শেয়ার করুন। অন্যকেও পুণ্যের ভাগী করুন। ধর্মদান সকল দানকে জয় করে।

☝️
✌️

আর যে বিষয়গুলি আপনার পছন্দ হয়েছে সেব্যাপারে কমেন্ট করুন। তাতে ধর্মালোচনা হবে। ফলে যারা পাঠক ও যারা শ্রোতা সবারই আরো পুণ্য বাড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *