আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

বৌদ্ধ হলে আপনি ত্রিরত্ন বাদে অন্য কাউকে বন্দনা করতে পারবেন না

কথাটা চমকে দেয়ার মতোই। জ্বি হ্যাঁ। আপনি যদি খাঁটি বৌদ্ধ হন তাহলে আপনি হবেন কেবল ত্রিরত্নের উপাসক বা উপাসিকা। আপনার উপাস্য হবে কেবল ত্রিরত্ন। আপনি কেবল বুদ্ধ, ধর্ম ও সঙ্ঘকে উপাসনা করবেন, বন্দনা করবেন। কিন্তু যখন আপনি ত্রিরত্ন বাদে কোনো দেবতা বা সৃষ্টিকর্তাকে বন্দনা করেন, তাহলে তখন আপনার ত্রিশরণ ভঙ্গ হয়। কারণ তখন আর আপনি ত্রিরত্নের উপাসক নন, সেই দেবতা বা সৃষ্টিকর্তার উপাসক হয়ে গেছেন।

গৃহীরা কাদেরকে বন্দনা করতে পারে?

————————-

আমি আগের একটা পোস্টে লিখেছিলাম গৃহীরা যেকাউকে বন্দনা করতে পারে। লেখাটা একটু ভুল হয়ে গেছে। ভয়ভৈরব সুত্রের অর্থকথা বলছে, গৃহীরা কেবল তিন প্রকার ব্যক্তিকে বন্দনা করতে পারে। তারা কারা?

জ্ঞাতিকে – জ্ঞাতি মনে করে বন্দনা করলে ত্রিশরণ ভঙ্গ হয় না। তাই কোনো উপাসক বা উপাসিকার আত্মীয়স্বজন যদি ভিন্নধর্মী হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে ভিন্নধর্মীয় গুরুজনকে অথবা ভিন্নধর্মীয় সন্ন্যাসী বা ধর্মীয় গুরুকে সে জ্ঞাতি হিসেবে বন্দনা করতে পারে। তাতে সেই উপাসক বা উপাসিকার ত্রিশরণ ভঙ্গ হয় না।

শিক্ষাগুরুকে– শিক্ষককে বন্দনা করলেও শরণ গ্রহণ হয় না। শিক্ষাগুরু হিসেবে আপনি যদি ভিন্নধর্মী শিক্ষককেও বন্দনা করেন তাতেও ত্রিশরণ গ্রহণ ভঙ্গ হয় না।

বিপদজনক ব্যক্তিকে – “বন্দনা না করলে ক্ষতি করতে পারে” এই ভয়ে বন্দনা করলেও ত্রিশরণ ভঙ্গ হয় না। তাই ধরা যাক অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে রাখা হলো এক উপাসককে। বন্দনা কর আমাদের দেবতাকে, আমাদের সৃষ্টিকর্তাকে। তখন বাধ্য হয়ে বন্দনা করলে তাতে কিন্তু ত্রিশরণ ভঙ্গ হয় না। অথবা ধরা যাক, আপনি বিধর্মী একটা পরিবেশে আছেন যেখানে তাদের দেবদেবীকে বন্দনা করার জন্য আপনাকে চাপ দেয়া হচ্ছে। তখন ভয়ে হলেও আপনাকে বন্দনা করতে হচ্ছে। আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, তাতে আপনার ত্রিশরণ ভঙ্গ হবে না। তবে আমি মনে করি আপনার সেরকম পরিবেশ থেকে দূরে সরে আসার চেষ্টা করা উচিত।

কাকে বন্দনা করলে ত্রিশরণ ভঙ্গ হয়?

—-———————

গৃহীরা যদি বুদ্ধ, ভিক্ষুসঙ্ঘ, আত্মীয়স্বজন ও শিক্ষক ব্যতীত অন্য কাউকে পূজনীয় মনে করে বন্দনা করে, তাহলে ত্রিশরণ ভঙ্গ হয়। কেন ভঙ্গ হয়? কারণ আপনি তখন আত্মীয় মনে করে নয়, শিক্ষক মনে করে নয়, ভয়েও নয়, বরং পূজনীয় মনে করে বন্দনা করছেন। পূজনীয় মনে করে বন্দনা করলে তখন তার শরণ বা আশ্রয় নেয়া হয়ে যায়।

তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে অর্থকথা বলছে, সেট্ঠৰসেনেৰ হি সরণং গয্হতি, সেট্ঠৰসেন ভিজ্জতি। অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ হিসেবে মনে করলে তবেই শরণ গ্রহণ হয়। শ্রেষ্ঠ হিসেবে শরণ ভঙ্গ হয়। আমি বলি, শ্রেষ্ঠ কয়জন হয়? একজনই হয়। আপনি ত্রিরত্নকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে নিয়ে ত্রিশরণ গ্রহণ করেছিলেন। অথচ এখন শ্রেষ্ঠ মনে করে কোনো এক দেবতাকে বা সৃষ্টিকর্তাকে বন্দনা করছেন। অর্থাৎ আপনি ত্রিরত্নকে শ্রেষ্ঠত্বের আসন থেকে নামিয়ে দিলেন। তার জায়গায় আরেকজনকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসালেন। তাহলে আপনার আর ত্রিশরণ থাকল কই? আপনার উপাসকত্বই তো তখন সেখানে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

তাই বৌদ্ধ মাত্রেই কোনো দেবদেবী বা সৃষ্টিকর্তাকে বন্দনা করা উচিত নয়। করলে তার ত্রিশরণ ভঙ্গ হয়। সে তখন আর ত্রিরত্নের উপাসক থাকে না, সেই দেবদেবীরই উপাসক হয়ে যায়, সেই সৃষ্টিকর্তার উপাসক হয়ে যায়।

রেফারেন্স:১. ভয়ভৈরব সুত্রের অর্থকথা => সরণগমনকথা (মধ্যম নিকায়, মূলপর্যায় বর্গ)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *