আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

চুরি করে বিদেশে যাওয়া ভান্তেরা কি পারাজিকাগ্রস্ত?

প্রথমেই বলে নিই, বিষয়টি কিন্তু সরাসরি ত্রিপিটকে উল্লেখিত হয় নি। পিটকে শুধু উল্লেখিত হয়েছে শুল্ক আদায়কারী চেকপোস্টের কথা (পারা.১১৩)। সেরকম চেকপোস্ট থাকতে পারে পাহাড়ের চুড়ায়, নদীর ঘাটে, অথবা গ্রামের প্রবেশমুখে। বর্তমানে সেরকম চেকপোস্ট থাকে রাস্তায় টোল আদায়কারী বুথ হিসেবে, বর্ডারে ও বিমানবন্দরে কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনের চেকপোস্ট হিসেবে, বিভিন্ন দর্শনীয় জায়গার প্রবেশপথে। সেরকম চেকপোস্টের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময়ে ভিক্ষু যদি যথাযোগ্য শুল্ক বা কর না দিয়ে চলে যায় তাহলে সেই চেকপোস্ট থেকে দুই পা পেরোলেই তার পারাজিকা হয়।

সোজা কথায় যেসব জায়গায় সরকারকে বা সরকার অনুমোদিত এজেন্সিকে ট্যাক্স দিতে হয় সেসব জায়গায় যদি ভিক্ষু যথাযোগ্য ট্যাক্স না দিয়েই চলে যায় তাহলে দুই পা পেরোলেই পারাজিকা হয়।

এবার বর্ডার ক্রসের কথায় আসি। বর্ডার ক্রস করতে গিয়ে সাধারণত সীমান্তরক্ষী বাহিনীর চেকপোস্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, অথবা সীমান্তে অবস্থিত কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন অফিসের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সেই চেকপোস্ট অথবা কাস্টমস অফিসে যদি ভিক্ষু কোনো জিনিস যথাযোগ্য শুল্ক না দিয়ে লুকিয়ে নিয়ে যায় তাহলে দুই পা পেরোলেই তার পারাজিকা হয়।

কিন্তু চুরি করে বর্ডার ক্রস করলে তখন কী হবে? অর্থাৎ ভিক্ষুটি বর্ডার ক্রস করতে গিয়ে কোনো কাস্টমস অথবা ইমিগ্রেশনের চেকপোস্টের মধ্য দিয়ে গেল না। সেগুলোকে এড়িয়ে কোনো এক চোরাপথে বর্ডার ক্রস করল। তখন কী হবে?

পিটকে যদিও এব্যাপারে সরাসরি কোনোকিছু বলা নেই, কিন্তু অর্থকথা বলছে, চেকপোস্টের মধ্য দিয়ে না যাওয়ায় তার কোনো অপরাধ হয় নি। সেক্ষেত্রে সে ভিক্ষু হিসেবে পারাজিকা অপরাধ থেকে মুক্ত।

এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পারাজিকা অর্থকথায় বলা হয়েছে, ‘‘‘পরিহরন্তং রাজপুরিসা ৰিহেঠেন্তী’তি কেৰলং আদীনৰং দস্সেত্বা উপচারং ওক্কমিত্বা পরিহরতো দুক্কটং, অনোক্কমিত্বা পরিহরতো অনাপত্তী’’তি ৰুত্তং। ইদং পাল়িযা সমেতি (পারা.অ.১১৩)। অর্থাৎ “এসব জিনিস নিলে বর্ডারে ধরে হয়রানি করবে” এই ভেবে কেবল অসুবিধার কথা চিন্তা করে কাস্টমস অথবা ইমিগ্রেশনের চেকপোস্টের আশপাশ দিয়ে গেলে দুক্কট অপরাধ হয়। কিন্তু চেকপোস্টের আশেপাশে না এসে অর্থাৎ চেকপোস্ট থেকে দূরের কোনো পথে বর্ডার ক্রস করলে কোনো অপরাধ হয় না। তাই নিন্দুকেরা যাই বলুক, বিনয়মতে সেই ভিক্ষুর কোনো অপরাধ হয় নি।

সোজা কথায় বিনয়ের নিয়ম হচ্ছে, ভিক্ষু যদি চুরি করে বর্ডার ক্রস করে, যেখানে তাকে কোনো কাস্টমস বা ইমিগ্রেশনের মধ্য দিয়ে যেতে হয় না, তখন কোনো সমস্যা নেই। যত সমস্যা হয় চেকপোস্টের মধ্য দিয়ে গেলে। তখন ভিক্ষু যদি টাকাপয়সা, জিনিসপত্র ইত্যাদি লুকিয়ে নিয়ে যায়, সেই চেকপোস্ট থেকে দুইপা বেরোলেই তার পারাজিকা। এখানে চেকপোস্ট দিয়ে যাওয়াটাই হচ্ছে বিনয়মতে বিবেচ্য বিষয়।

চুরি করে নাগরিকত্বের কাগজপত্র বানানো

————————

এখানে আরেকটা প্রশ্ন থেকে যায়। ধরা যাক কোনো ভিক্ষু চুরি করে বর্ডার ক্রস করল। তাতে কোনো অপরাধ হল না তার। কিন্তু সে সেদেশে গিয়ে ভুয়া নামে নাগরিকত্বের কাগজপত্র বানাল। তখন কী হবে? ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে বটে। তবে একটু ভেবে দেখলেই বুঝা যায়, এখানে ব্যাপারটা চুরি নয়, বরং মিথ্যা বলার পর্যায়ে পড়ে। কারণ সেখানে তো তার কোনো শুল্ক দিতে হয় না, বরং মিথ্যা তথ্য দিচ্ছে মাত্র। সে তখন মিথ্যা বলছে প্রশাসনকে। সেক্ষেত্রে মিথ্যা বলে প্রতারণা করার কারণে তার পাচিত্তিয় অপরাধ হয় মাত্র।

এখন ধরা যাক সে মিথ্যা বলে ভুয়া কাগজপত্র বানাল। সে এতে পারাজিকা থেকে পার পেয়ে যাবে বটে, কিন্তু সমস্যা হবে সেদেশে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরতে গেলে। অথবা বিভিন্ন চেকপোস্টে যেখানে বিদেশীদের জন্য বেশি দাম রাখা হয় সেসব ক্ষেত্রে। সেই ভিক্ষুটি যদি বিদেশীদের জন্য প্রযোজ্য দাম এড়িয়ে দেশী হিসেবে কম দাম দিয়ে প্রবেশ করে, তখন যথাযোগ্য শুল্ক ফাঁকির কারণে সে পারাজিকাগ্রস্ত হতে পারে।

কাগজপত্র না বানিয়ে চুরি করে প্রবেশ করলেও সে যদি সেভাবে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে যায়, টিকেট কাউন্টারে ঘুরতে যায়, বিভিন্ন চেকপোস্টের মধ্য দিয়ে যায়, সেখানে যদি দেশী ও বিদেশীদের মধ্যে দামের হেরফের থাকে, সেক্ষেত্রেও দেশী সেজে শুল্ক ফাঁকি দেয়ার কারণে সেরকম পারাজিকা অপরাধে পড়ার সম্ভাবনা আছে।

পঞ্চ মাসক সমান কত

—————

আপনি খেয়াল করবেন এখানে যথাযোগ্য শুল্ক বলা হয়েছে। যথাযোগ্য শুল্কের পরিমাণ হচ্ছে বুদ্ধের আমলের পঞ্চমাসক বা ৫ মাসা বা ১ পাদ। অর্থকথামতে, তা হচ্ছে ১টি স্বর্ণকাহনের চার ভাগের ১ ভাগ। বিমতিবিনোদনী টীকা বলছে তা হচ্ছে ৫ মাসা ওজনের সোনার মূল্যমানের। বর্তমানে ৫ মাসা ওজনের সোনার দাম কত?

তার জন্য আমরা বৌদ্ধভিক্ষু বিধিতে ঠানিস্সারো ভান্তের সিদ্ধান্তকে অনুসরণ করতে পারি। তিনি বিমতি বিনোদনী টীকাকেই অনুসরণ করেছেন। তার মতে 1 masaka is equal to 4 rice grains’ weight of gold. এই বিষয়টা বিমতি বিনোদনী টীকায় আমি তন্নতন্ন করেও খুঁজে পাই নি। ১ মাসক কীভাবে ৪টি শস্যদানার ওজনের সমান হয়?

সে যাইহোক, এভাবে তিনি ৫ মাসার দাম বলতে ১ ট্রয় আউন্সের ২৪ ভাগের ১ ভাগ সোনার দামকে বুঝিয়েছেন। ১ ট্রয় আউন্স সোনার ওজন হচ্ছে ৩১.১ গ্রাম। সেটাকে ২৪ ভাগ করলে হয় ১.২৯৫ গ্রাম। বর্তমানে ১ গ্রাম সোনার দাম ৬০.৪৭ ডলার। সেই হিসেবে ৫ মাসা সোনার বর্তমান মূল্য দাঁড়ায় ১.২৯৫ x ৬০.৪৭ ডলার = ৭৮.৩১ ডলার = ৬৬৪৩ টাকা!

ঠানিস্সারো ভান্তের হিসাবটা আমার কাছে একটু গোলমেলে মনে হয়েছে। তাই আমি ব্যাপারটা নিয়ে একটু ভেবেছি।

বিমতি বিনোদনী টীকা অনুসারে, ৫ মাসা ওজনের সোনার মূল্যমানই হচ্ছে পারাজিকার স্ট্যান্ডার্ড।

তাই আমি ভাবলাম বুদ্ধের আমলে প্রাচীন ভারতে স্বর্ণকাহনের ওজন কত ছিল তা বের করলেই তো হয়। আমি বিভিন্ন ওয়েবসাইটে ঢুঁ মেরে দেখলাম প্রাচীন ভারতে ১ কাহন মুদ্রার স্ট্যান্ডার্ড ওজন ছিল ৩২ রতি বা ৩.৫২ গ্রাম। এবার আসুন হিসাব করে দেখি।

১ কাহন = ২০ মাসা।

তাহলে ২০ মাসার ওজন ৩.৫২ গ্রাম।

সুতরাং ১ মাসার ওজন ০.১৭৬ গ্রাম।

সুতরাং ৫ মাসার ওজন হবে ০.৮৮ গ্রাম।

বর্তমানে ১ গ্রাম সোনার দাম ৬০.৪৭ ডলার। [২১ মে, ২০২১]

সুতরাং ৫ মাসা সোনার দাম ০.৮৮ x ৬০.৪৭ ডলার = ৫৩.২১ ডলার = ৪৫১৩ টাকা।

এই হচ্ছে পঞ্চমাসক বা ৫ মাসা সোনার বর্তমান মূল্য।

কোনো ভিক্ষু কোনো চেকপোস্টে এই ৪৫১৩ টাকা পরিমাণ শুল্ক না দিয়ে গেলেই পারাজিকা!

সেটা দেশে হোক বা বিদেশে হোক।

হিসাবে অথবা লজিকে কোনো ভুল দেখলে দেখিয়ে দেয়ার অনুরোধ রইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *