আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

একটা জাতি কীভাবে উন্নতি করতে পারে

একটা জাতি কীভাবে উন্নতি করতে পারে? একতাবদ্ধ হলেই তা সম্ভব। একটা সংগঠন কীভাবে উন্নতি করতে পারে? সবাই মিলে একযোগে কাজ করলেই তা সম্ভব। একটা পরিবার কীভাবে উন্নতি করতে পারে? গুরুজনদেরকে মান্যগণ্য করলেই তা সম্ভব। তার প্রমাণ কী? তার প্রমাণ হচ্ছে লিচ্ছবি জাতি। তারা বুদ্ধের সাতটি উপদেশ অনুসারে চলে এত পরাক্রমশালী হয়ে উঠেছিল যে মগধের রাজা অজাতশত্রু পর্যন্ত তাদেরকে আক্রমণ করতে দুবার চিন্তা করেছেন।

সেই উপদেশগুলোর মধ্যে আমি এখানে তিনটা উপদেশ উল্লেখ করব:

১) নিত্য সম্মিলিত হওয়া

————————

বুদ্ধ একসময় আনন্দকে বলেছিলেন – হে আনন্দ, লিচ্ছবিরা যতদিন নিত্য সম্মিলিত হবে, ঘন ঘন সম্মিলিত হবে, ততদিন তাদের উন্নতিই আশা করা যায়, অবনতি নয়।

লিচ্ছবিরা কীরকম নিত্য সম্মিলিত হত? কীরকম ঘন ঘন সম্মিলিত হত? অর্থকথামতে নিত্য সম্মিলিত হওয়া মানে হচ্ছে দিনে তিনবারও সম্মিলিত হত, মাঝে মাঝেও সম্মিলিত হত। ঘন ঘন সম্মিলিত হওয়া মানে হচ্ছে “গতকালও সম্মিলিত হয়েছি, তার আগের দিনও সম্মিলিত হয়েছি, আজ আবার কীজন্য সম্মিলিত হচ্ছি” এমন মনোভাব না এনে সম্মিলিত হওয়া।

এখানে প্রশ্ন আসতে পারে, সম্মিলিত হওয়া মানে কি সকল লিচ্ছবি লোকজন সম্মিলিত হত? দিনে এতবার মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকলে তাহলে তারা কাজ কখন করত? অর্থকথা থেকে বুঝা যায় এখানে লিচ্ছবির সাধারণ লোকজনকে নয়, বরং রাজাদেরকে বুঝানো হয়েছে। লিচ্ছবি রাজ্য অনেকজন রাজা দ্বারা শাসিত ছিল। অনেকটা মন্ত্রীপরিষদ শাসিত সরকারের মত। সংসদে যেমন অধিবেশন বসে, সেখানে তাদেরও সেরকম অধিবেশন বসত। কিন্তু তাদের নিত্য অধিবেশন হত, ঘনঘন অধিবেশন হত।

রাজাগণ নিত্য এভাবে অধিবেশনে সম্মিলিত না হলে বিভিন্ন দিক থেকে আসা খবরাখবর পাওয়া যায় না। খবর না পেলে “অমুক গ্রাম বা গঞ্জ দুর্যোগ কবলিত, অমুক স্থান চোর ডাকাতে ভরা” ইত্যাদি জানা যায় না। দুর্বৃত্তরাও প্রশাসন দুর্বল জেনে গ্রামে গঞ্জে হানা দিয়ে লোকালয়কে ধ্বংস করে থাকে। এভাবে রাজাদেরই অবনতি ঘটে।

রাজাগণ নিত্য এভাবে অধিবেশনে সম্মিলিত হলে সেসব খবরাখবর পাওয়া যায়। তখন সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে শত্রুদেরকে দমন করা যায়। দুর্বৃত্তরাও “রাজাগণ সতর্ক হয়ে আছেন। আমরা এখন দলবল বেঁধে ঘুরতে পারব না” বলে দল ভেঙে পালিয়ে যায়। এভাবে রাজাদের উন্নতি হয়।

২) সামগ্রিকভাবে সম্মিলিত হওয়া

———————————-

বুদ্ধ এরপর আনন্দকে বলেছিলেন – হে আনন্দ, লিচ্ছবিরা যতদিন সামগ্রিকভাবে সম্মিলিত হবে, সামগ্রিকভাবে উঠে যাবে, সামগ্রিকভাবে করণীয় কাজগুলো করবে ততদিন তাদের উন্নতিই আশা করা যায়, অবনতি নয়।

লিচ্ছবিরা কীভাবে সামগ্রিকভাবে সম্মিলিত হত? কীভাবে সামগ্রিকভাবে উঠে যেত? কীভাবে সামগ্রিকভাবে করণীয় কাজগুলো করত? অর্থকথামতে, সম্মিলিত হওয়ার ঢোল পেটানোর আওয়াজ শুনলে – “আজ আমার কাজ আছে, মঙ্গল অনুষ্ঠান আছে” বলে এড়িয়ে গেলে সেটা সামগ্রিকভাবে সম্মিলন হয় না। ঢোলের শব্দ শুনেই খেতে খেতে, সাজগোজ করতে করতে, কাপড়চোপড় পরতে পরতে অর্ধভুক্ত অবস্থায় অথবা অর্ধেক সাজগোজ করা অবস্থায় অথবা কাপড়চোপড় পরতে পরতে যে যে অবস্থায় থাক না কেন সেখান থেকেই গিয়ে সম্মিলিত হলে সেটা হয় সামগ্রিকভাবে সম্মিলন।

সম্মিলিত হয়ে চিন্তাভাবনা করে, আলাপ আলোচনা করে করণীয় নির্ধারণ করে একত্রে না উঠলে সেটা সামগ্রিকভাবে উঠা হয় না। একত্রে উঠলে তবেই সামগ্রিকভাবে উঠা হয়।

অধিকন্তু “অমুক স্থানে গ্রাম অথবা গঞ্জ উপদ্রুত, ডাকাতে আক্রান্ত” শুনে “কে গিয়ে এই শত্রুদেরকে দমাবে?” বললে “আমি প্রথম, আমি প্রথম” বলে গেলেও সামগ্রিকভাবে উঠা হয়। একজনের কাজকর্ম ভালোমতো না চললে বাকি রাজারা সন্তান ও ভাইদেরকে পাঠিয়ে সেই কাজকর্মে সহায়তা করে থাকে, অথবা একজনের মঙ্গল অনুষ্ঠানে অথবা রোগশোকে অথবা সেরকম কোনো সুখদুঃখ দেখা দিলে সবাই সেখানে সহায়তার জন্য এগিয়ে যায়। এভাবেই লিচ্ছবিরা সম্মিলিতভাবে করণীয় কাজ করে থাকে।

৩) বয়োজ্যেষ্ঠদেরকে সম্মান করা

———————————

বুদ্ধ এরপর আনন্দকে বলেছিলেন – হে আনন্দ, লিচ্ছবিরা যতদিন তাদের মধ্যে যারা বয়োবৃদ্ধ, তাদেরকে সমাদর করবে, সমীহ করবে, মানবে, পূজা করবে, তাদের কথা ধরা উচিত বলে মনে করবে ততদিন তাদের উন্নতিই আশা করা যায়, অবনতি নয়।

এখানে কীভাবে লিচ্ছবিরা বয়োবৃদ্ধদেরকে সমাদর করত? অর্থকথামতে, তারা নাকি দিনে দুই তিনবার তাদেরকে সেবাশুশ্রুষা করতে গিয়ে তাদের কথা শোনা উচিত বলে মনে করত। যারা এভাবে বয়োবৃদ্ধ রাজাদেরকে সমাদর ইত্যাদি করে না, উপদেশের জন্য তাদেরকে সেবাশুশ্রুষা করতে যায় না, তখন বৃদ্ধ রাজারা তাদেরকে ভুলে যায়, উপদেশ দেয় না। ফলে খামখেয়ালি হয়ে চলার কারণে তারা রাজত্ব থেকে বিচ্যুত হয়। যারা কিন্তু বয়োবৃদ্ধদেরকে সমাদর করে, দিনে দুতিনবার সেবাশুশ্রুষা করতে যায়, তাদেরকে বৃদ্ধ রাজারা “এটা করা উচিত, এটা করা উচিত নয়” ইত্যাদি বলে প্রাচীন রীতিনীতিকে শিক্ষা দিয়ে থাকে। যুদ্ধ আসলেও এভাবে যুদ্ধে প্রবেশ করতে হবে, এভাবে যুদ্ধ থেকে বের হয়ে আসতে হবে এভাবে উপায় দেখিয়ে থাকে। তারা সেভাবে উপদেশ লাভ করে সেঅনুসারে চলে রাজবংশকে টিকিয়ে রাখতে পারে।

চাকমাদের কথা

এখানে আমি চাকমাদের ব্যাপারে বলি। চাকমারা নিজেদেরকে একটা জাতি হিসেবে দাবি করে। কিন্তু সেই জাতির নীতিনির্ধারক কারা? যেমন লিচ্ছবি জাতির নীতিনির্ধারক ছিল সেই রাজারা। সেই রাজারা নিত্য মিটিংয়ে বসে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা করে সেগুলোর সমাধানের পথ নির্ধারণ করত।

কিন্তু চাকমাদের নীতিনির্ধারক কারা? আমাদের বিভিন্ন জাতিগত সমস্যা সমাধানে কারা কাজ করে? হেডম্যান, কার্বারি এরা? নাকি আমাদের রাজাবাবু? নাকি আমাদের সন্তুবাবু? প্রসিতবাবু? অথবা সংস্কারের কোনো নেতা? তারা কি নিত্য সম্মিলিত হয়? মিটিং করে? জাতির বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা করে? সেগুলো সমাধানের পথ নির্ধারণ করে? মনে তো হয় না। এই যে মেয়েরা বেজাতি বিয়ে করছে, সে বিষয়ে তারা কিছু করেছে? মনে তো হয় না। এই যে সেলিব্রেটিরা মুসলিম হয়ে যাচ্ছে সেব্যাপারে তারা কিছু করেছে? মনে তো হয় না। এ যেন একটা জাতিকে মেধাশূন্য করে দেয়া। এগুলো একেকটা জাতিগত সমস্যা। নীতিনির্ধারকেরা যদি একত্রে বসে আমাদেরই জাতিগত সমস্যাগুলো নিয়ে কিছু না করে, তাহলে আমরা তাদের কাছ থেকে জাতির জন্য ভালো কিছু আশা করতে পারি? তাহলে এধরনের নেতাদের রেখে কী লাভ?

আমার মনে হয়, এব্যাপারে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করার সময় এসেছে। সময় হয়েছে একটা চাকমা জাতীয় দল গঠন করার। চাকমারা যেহেতু ভারত, বাংলাদেশ ও বার্মায় ছড়িয়ে আছে, তাই সেখানে থাকা চাকমাদের মধ্যে এভাবে এলাকাভিত্তিক জনপ্রতিনিধি বাছাই করতে হবে। সেই জনপ্রতিনিধিরা লিচ্ছবি রাজাদের মতো নিত্য মিটিং করবে। একসাথে মিটিংয়ে বসবে, একসাথে মিটিং থেকে উঠবে। মিটিংয়ের সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে সবাই মিলে কাজ করবে। নিজের কাজের কথা, ব্যক্তিস্বার্থের কথা চিন্তা না করে জাতীয় স্বার্থকেই প্রাধান্য দেবে। আমরা কি সেরকম নতুন করে শুরু করতে পারি না?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *