আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

আমরা যেসব সুখদুঃখ অনুভব করি সবই কি অতীতের কর্মফল?

বিষয়টা নিয়ে আমি কয়েকদিন ধরে ভাবছি। ধরা যাক, ঝলমলে ইয়াঙ্গুন শহর। এই শহরেরই বড় রাস্তা ধরে হাঁটছে এক তরুণ । ওদিকে মিয়ানমার প্লাজার সামনে লেকের ধারে বসে হাওয়া খাচ্ছে এক মেয়ে। আর একজন বাড়ির বারান্দায় বসে পান খাচ্ছে। ওদিকে শোয়েডাগন জাদির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে প্রার্থনা করছে এক বৃদ্ধ।

আসুন এবার আমরা একটা thought experiment করে দেখি। অর্থাৎ মনে মনে পরীক্ষা করে দেখি। আইনস্টাইন এই thought experiment দিয়ে তার আপেক্ষিকতার তত্ত্বকে আবিষ্কার করেছিলেন। যার মাধ্যমে তিনি বুঝেছিলেন সুন্দরী মেয়ের পাশে বসে একঘন্টা কাটালেও মনে হয় সময়টা খুব দ্রুত চলে গেছে। আর গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদে এক মিনিট দাঁড়ালেই মনে হয় সময়টা এত দেরীতে যাচ্ছে কেন? এই হচ্ছে আপেক্ষিকতার তত্ত্ব। আসুন আমরাও সেভাবে মনে মনে পরীক্ষা করে দেখি। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামিয়ে দিই। দেখি তারা কে কী করে।

যে তরুণটা রাস্তা ধরে হাঁটছিল সে হঠাৎ করে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়তে দেখে হতভম্ব হয়ে গেল। এরপর সম্বিৎ ফিরে পেয়ে পড়িমড়ি করে দৌড় দিল কাছের যাত্রীছাউনির কাছে। যে মেয়েটা লেকের পাড়ে হাওয়া খাচ্ছিল সে হঠাৎ বৃষ্টি পড়তে দেখে ধুর ছাই বলে উঠে গেল। তার আজকের বিকেলটা বৃষ্টি এসে মাটি করে দিল। বাড়ির বারান্দায় বসে বসে পান চিবুচ্ছিল যে লোকটি, সে হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি দেখে ইয়াহু বলে এক লাফে উঠোনে গিয়ে ভিজতে শুরু করল। বৃষ্টিতে তার আনন্দ আর ধরে না! শোয়েডাগন জাদীর সামনে প্রার্থনারত বুড়োটা কিন্তু গায়ে বৃষ্টির ফোঁটা পড়তেই সচেতন হয়ে উঠল। সে মনোযোগ দিল তার দেহ কী অবস্থায় আছে, অনুভূতি কী হচ্ছে, মনে কী জাগছে, পছন্দ হচ্ছে নাকি অপছন্দ হচ্ছে নাকি উপেক্ষা জাগছে, দেহমনের পুঞ্জের উৎপত্তি ও বিলীন হয়ে যাওয়াকে অনিত্য, দুঃখ ও অনাত্ম হিসেবে দেখতে লাগল।

ঘটনা একটাই। কিন্তু চারজনের চার ধরনের প্রতিক্রিয়া হলো। কী হচ্ছে এখানে? আসুন আমরা আরেকটু গভীরে গিয়ে দেখে নিই তাদের দেহমনের প্রক্রিয়ায় আসলে কী হচ্ছে।

প্রথমে বলে নিই গায়ে বৃষ্টির ফোঁটা পড়লে কী হয় । অামাদের দেহ হচ্ছে একেকটা টাচস্ক্রীনের মতো। আমাদের হাতে পায়ে পিঠে, মাথায়, মুখে যেখানে যেখানে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে সেখানে ঠাণ্ডা অনুভূতি হচ্ছে। অভিধর্ম বলছে, সেই অনুভূতি একা উৎপন্ন হচ্ছে না। যে যে স্থানে সেই ঠাণ্ডার অনুভূতি পাচ্ছেন বুঝতে হবে যে দেহের সেই সেই স্থানে মনও উৎপন্ন হচ্ছে। সেটা এক বিশেষ ধরনের মন। অভিধর্মে সেটাকে বলা হয় কায়বিজ্ঞান। আমি সহজ ভাষায় বলি দেহভিত্তিক মন। দেহের স্বভাবই এরকম যে, জীবিত দেহের যেখানে যেখানে স্পর্শ হবে সেখানে এই দেহভিত্তিক মন উৎপন্ন হবে, সুখ অথবা দুঃখের অনুভূতি হবে। এভাবে বৃষ্টিতে ভিজে আপনি যে সুখকর বা দুঃখকর অনুভূতি অনুভব করছেন তা আপনার অতীতেরই কর্মের ফল হিসেবে বুঝতে হবে। তার উপর আপনার হাত নেই। সেটাকে আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।

এথেকে আপনি হয়তো বলতে পারেন, তাহলে কি আমরা যেসব সুখদুঃখ অনুভব করি সবই অতীতের কর্মফল? সেটা নয়। কারণ যেকোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা প্রতিনিয়ত প্রতিক্রিয়া দেখাই। সেটা হোক প্রকাশ্যে, হোক মনে মনে। সেই প্রতিক্রিয়া দেখানোর সময়েই কর্ম সৃষ্টি হয়ে থাকে। আর সেসব প্রতিক্রিয়া দেখানোর সময়েও আমরা সুখদুঃখ অনুভব করি। সেই সুখদুঃখগুলো কিন্তু অতীতের কর্মফল নয়। সেগুলো হচ্ছে কর্ম সৃষ্টির সময়ে সহজাত অনুভূতি মাত্র।

একটু বুঝিয়ে বলা যাক তাহলে। ধরা যাক হাতে এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়ল। হাতের সেস্থানে তখন দেহভিত্তিক মন উৎপন্ন হ য়ে বিলীন হয়ে গেল । সেই মনের সাথে সাথে যে সুখ অথবা দুঃখের অনুভূতি হলো সেটা হচ্ছে অতীত কর্মের ফল। কিন্তু সেই অনুভূতি ও থাকে মুহুর্ত মাত্র। সেই অনুভূতিও নিমেষেই উৎপন্ন হয়ে বিলীন হয়ে যায় । এরপরে উৎপন্ন হয় দুটো বা তিনটা নিষ্ক্রিয় মন। সেগুলো উৎপন্ন হয় হৃদপিণ্ডের মধ্যে। সেই নিষ্ক্রিয় মনগুলোর পরে এরপরে উৎপন্ন হয় সাতটি সক্রিয় মন। অভিধর্মের ভাষায় এই সক্রিয় মনগুলোকে বলা হয় জবন বা গতিশীল মন। এই মনগুলোর সাথে সহচর হিসেবে উৎপন্ন হয়ে থাকে চেতনা। এই চেতনাকেই বলা হয় কর্ম।

আপনি যদি হঠাৎ বৃষ্টিতে হতবিহ্বল হয়ে পড়েন অথবা কী করতে হবে বুঝে উঠতে পারেন না, সেই রাস্তায় হাঁটতে থাকা তরুণের মতো, তখন সেই চেতনাগুলো হয় মোহমূলক চেতনা। সেগুলো হয় পাপকর্ম।

আর যদি বৃষ্টি তে অসন্তুষ্ট হন , সেই লেকের পাড়ে বসে থাকা মেয়েটির মতো, তাহলে সেই চেতনাগুলো হবে বিদ্বেষ বা অসন্তোষমূলক চেতনা। সেগুলোও হয় পাপকর্ম।

আর যদি বৃষ্টিকে পছন্দ করেন, সেই ঘর থেকে বেরিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে আনন্দ করতে থাকা লোকটির মতো, তাহলে সেই চেতনাগুলো হবে লোভমূলক চেতনা। সেগুলোও হয় পাপকর্ম।

কিন্তু আপনি যদি বৃষ্টিটাকে “অনিত্য, দুঃখ, অনাত্ম” হিসেবে দেখেন, তাহলে সেই চেতনাগুলো হয় জ্ঞানযুক্ত চেতনা। এমন জ্ঞানযুক্ত চেতনাই হচ্ছে পুণ্যকর্ম।

এভাবে সামান্য এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়লেও সেটা আপনার অতীতেরই কর্মের ফল হিসেবে বুঝতে হবে। কিন্তু সেই এক ফোঁটা বৃষ্টির প্রতিক্রিয়া হিসেবে আপনি আবার সাতটি নতুন পাপ অথবা পুণ্যকর্ম সৃষ্টি করেছেন। অথচ দেহমনের প্রক্রিয়াটাএমন যে, পাপ পুণ্য কোনোটাই করব না বললেও হয় না। আপনার পাপ অথবা পুণ্য দুটোর একটা করতেই হবে। অর্হৎ না হওয়া পর্যন্ত এমন নতুন কর্ম সৃষ্টি করা থেকে কারো রেহাই নেই। সেই সাতটি নতুন কর্মের সাথে সাথে সহজাত যে সুখ, দুঃখ অথবা উপেক্ষার অনুভূতি হচ্ছে, সেগুলো কিন্তু তখন আর কর্মফলের কারণে নয়, সেগুলো তখন হয় কর্মের কারণে। অর্থাৎ কর্ম করার সময়ে প্রত্যক্ষ অনুভূতি।

তাই সুখদুঃখ আমরা যা অনুভব করি না কেন, সেগুলো পূর্বকৃত কর্মফলের কারণেও হয়, এবং বর্তমান ে যে কর্ম করছি সেই কর্মের কারণেও হয়।

একারণে আমাদের দেহ আছে যখন, তখন সেখানে প্রতিনিয়ত সুখদুঃখ অনুভব হবে, সেটাই স্বাভাবিক। চোখ দিয়ে ভালোমন্দ কত কী দেখব, কান দিয়ে ভালোমন্দ কত কী শুনব, মুখ দিয়ে ভালোমন্দ কত কী খাব। কিন্তু আমাদের তাতে কীরকম প্রতিক্রিয়া হচ্ছে তা আমাদের খেয়াল রাখা উচিত। সেই অভ্যাসবশত লোভ বা বিরক্তি জাগানো উচিত নয়। তাতে পাপ হয়, নতুন কর্মের সৃষ্টি হয়, সংসারচক্রে আরো বেশি বেশি ঘোরার টিকিট কাটা হয়ে যায়। মুর্খরাই সংসারচক্রে ঘুরতে উৎসাহিত বোধ করে। কিন্তু জ্ঞানীরা তাতে ক্লান্ত বোধ করে।

তাই সেরকম প্রতিক্রিয়া দেখানোর সময়ে বরং আমাদের সচেতন থাকা উচিত আমাদের দেহ কী অবস্থায় আছে, অনুভূতি কী হচ্ছে, মনে কী জাগছে, পছন্দ হচ্ছে নাকি অপছন্দ হচ্ছে নাকি উপেক্ষা জাগছে, অথবা বিষয়টাকে দেহমনের পুঞ্জ হিসেবে, অনিত্য দুঃখ অনাত্ম হিসেবে দেখার চেষ্টা করা উচিত।

যারা অভিজ্ঞ তারা সাধারণত প্রতিক্রিয়াকে পুণ্যের দিকে ফেরাতে মনোযোগ দেন শ্বাসপ্রশ্বাসে। আপনিও শ্বাসপ্রশ্বাসের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। শুয়ে, বসে, হাঁটতে হাঁটতে, কথা বলতে বলতে, টিভি দেখার সময়ে সচেতন হলেই অন্তত কয়েক সেকেণ্ডের জন্য হলেও নাকের ডগায় শ্বাসপ্রশ্বাসের উপরে মনোযোগ রাখার অভ্যাস করে তুলুন। অথবা তা না হলে মনে মনে বুদ্ধ, বুদ্ধ, অথবা অরহং অরহং এই গুণটা অর্থসহকারে আবৃত্তি করার অভ্যাস করে তুলুন। বুদ্ধ বলেছেন, অত্তদীপ ৰিহরথ। অত্তসরণা, অনঞ্ঞসরণা। অর্থাৎ নিজেকেই দ্বীপ হিসেবে গড়ে তুলুন। কীভাবে নিজেকে দ্বীপ হিসেবে গড়ে তুলতে হয়? আপনি যখন হাজারো কাজের মাঝেও শ্বাসপ্রশ্বাসে মন দেয়ার অভ্যাস গড়ে তুলছেন, অথবা বুদ্ধ অথবা অর্হৎ শব্দটি মনে মনে আবৃত্তির অভ্যাস গড়ে তুলছেন, তখন আপনি নিজের জন্য একটা দ্বীপ গড়ে তুলছেন। আপনি তখন নিজেই নিজের আশ্রয় হচ্ছেন।

এটাই হচ্ছে সতিপট্ঠান বা সচেতনতা প্রতিষ্ঠার পথ। এভাবেই আমাদের সবসময় সচেতনতা প্রতিষ্ঠার চর্চা করা উচিত। সচেতন হওয়ার চর্চা করা উচিত। সেটাই হচ্ছে বিশুদ্ধির পথ, সুখদুঃখকে অতিক্রমের পথ, জ্ঞান লাভের পথ, নির্বাণ সাক্ষাতের পথ। এই জ্ঞানে আমাদের সবারই অতিসত্ত্বর নির্বাণ সাক্ষাৎ হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *