আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

মাংস খাওয়ার অভিযোগ এবং বুদ্ধের উত্তর

এই পোস্টে আছে —

=> বুদ্ধের মাংস খাওয়ার প্রমাণ

=> বুদ্ধ কেন মাংস খান তার উত্তর

((পোস্টটি খুব লম্বা। কেউ যদি পোস্ট পড়ে শেষ করতে পারেন তাহলে অগ্রিম সাধুবাদ।))

মাংস খাওয়া নিয়ে শুধু এখন নয়, বুদ্ধকেও বেশ অভিযোগের সম্মুখীন হতে হয়েছে। বিধর্মীরা অভিযোগ করেছে। ব্রাহ্মণেরা অভিযোগ করেছে। বিধর্মীদের অভিযোগ নিয়ে আমি পরে লিখব। এখানে ব্রাহ্মণদের অভিযোগকে বুদ্ধ কীভাবে মোকাবেলা করেছেন তা লিখছি। সেটা আছে সুত্তনিপাতের আমগন্ধ সুত্রে। সুত্রে কেবল গাথাগুলো আছে। মূল কাহিনীটা বিস্তারিত আছে অর্থকথায়। তাই আমি গাথাগুলো শেষে অর্থকথা থেকে পুরো কাহিনীটাই অনুবাদ করে দিয়েছি।

আমগন্ধ সুত্র

************

২৪২. যব, চিঙ্গূলকা, চীনা মুগডাল, পাতা, মূল, ফলধর্মত যা পাওয়া যায় তা-ই ঋষিগণ ভোজন করেন।কামনা বশত তারা মিথ্যা বলেন না।

২৪৩. সুকৃত ও সুসম্পন্ন এবং শ্রদ্ধাভরেঅপরজনের দেয়া যে উত্তম শালিভাত খাচ্ছেন,হে কশ্যপ, সেটাই আপনি আমগন্ধ খাচ্ছেন।

২৪৪. হে ব্রহ্মবন্ধু, আপনি বলেছিলেন,”আমগন্ধ আমার উপযুক্ত নয়”।অথচ খাচ্ছেন শালিভাতসুন্দরভাবে রান্না করা পাখির মাংস দিয়ে।হে কশ্যপ, আপনাকে তাই এব্যাপারে জিজ্ঞেস করছি,আপনার আমগন্ধটা কীরকম?

বুদ্ধের উত্তর ছিল এরকম‌-

২৪৫. প্রাণিদেরকে হত্যা, মারধর, কাটাকাটি ও বন্দী করে রাখা,চুরি, মিথ্যা বলা, মিথ্যা আশা দেয়া, ঠকবাজি,নিরর্থক বহু গ্রন্থ শিক্ষা করা,অন্যের স্বামী বা স্ত্রীদের কাছে বিচরণ,সেটাই হচ্ছে আমগন্ধ, মাংসভোজন নয়।

২৪৬. কামাচারে অসংযত জন,ভোজন রসে প্রলুদ্ধ, অশুচি ভাব মিশ্রিত,নাস্তিক, অসমান, শিক্ষা দেয়ার অযোগ্য,সেটাই হচ্ছে আমগন্ধ, মাংসভোজন নয়।

২৪৭. যারা রুক্ষ ও নিরস, কর্কশ সুরে কথা বলে,অপরের পিঠের মাংস খায়,বিশ্বাসঘাতক, নিষ্ঠুর, অহংকারী,দানশীল নয়, কাউকে কোনো কিছু দেয় না।সেটাই হচ্ছে আমগন্ধ, মাংসভোজন নয়।

২৪৮. ক্রোধ, মত্ততা, একগুঁয়েমি, উল্টোস্বভাব,ছলনাময়ী স্বভাব, ঈর্ষাকাতরতা,দাম্ভিক কথাবার্তা, অহংকারী হয়ে ওঠা,অসৎ লোকজনের সাথে মেলামেশা,সেটাই হচ্ছে আমগন্ধ, মাংসভোজন নয়।

২৪৯. যারা পাপী, ঋণখেলাপী ও উল্টো বদনাম করে বেড়ায়,অবিচার করেও এখানে ধর্মাবতার সাজে,নরাধম হয়ে এখানে কষ্ট দিয়ে থাকে,সেটাই হচ্ছে আমগন্ধ, মাংসভোজন নয়।

২৫০. যারা এখানে প্রাণিহত্যায় অসংযত জন,অন্যের ধন কেড়ে নিয়ে উল্টো হুমকি দেয়,দুঃশীল, পশুপাখি শিকার করে বেড়ায়,কর্কশ কথা বলে, সৎ উপদেশের অনাদর করে,সেটাই হচ্ছে আমগন্ধ, মাংসভোজন নয়।

২৫১. যারা এসবে প্রলুদ্ধ, বিরুদ্ধ, ধ্বংসকারী,এসবে নিত্য ব্যস্ত থেকেপরে অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়,অধোশির হয়ে নরকে পড়ে যায়।সেটাই হচ্ছে আমগন্ধ, মাংসভোজন নয়।

২৫২. মাছ মাংস বিরতি নয়, নগ্ন হয়ে থাকা নয়,ন্যাড়া মাথা নয়, জটাধারী ও ধুলোয় ধুসরিত হয়ে থাকা নয়,কর্কশ চিতাবাঘের চামড়া ধারণ নয়,অগ্নি পরিচর্যা নয়,অথবা জগতে অমরত্বের যে বহু তপস্যা,বেদমন্ত্র, আগুনে বলি দেওয়া, যজ্ঞ ও ঋতু সেবন,সংশয় অনুত্তীর্ণ মানুষকেসেগুলোর কোনোটাই বিশুদ্ধ করে না।

২৫৩. ছয় ইন্দ্রিয়ে সংযত ও জ্ঞাত হয়ে বিচরণকারী,ধর্মে প্রতিষ্ঠিত, ঋজু ও মৃদু ভাবে রত,সঙ্গ অতিক্রান্ত, সকল দুঃখ পরিত্যক্ত,সেই ধীর ব্যক্তি দেখা ও শোনা বিষয়ে লিপ্ত থাকেন না।

২৫৪. এভাবে কশ্যপ ভগবানবারবার এর অর্থ ব্যাখ্যা করে দিলেন,যাতে তা বুঝতে পারল বেদমন্ত্রে পারঙ্গম তিষ্য ব্রাহ্মণ। বিচিত্র গাথার মাধ্যমে মুনি প্রকাশ করলেন,যা আমগন্ধ নয়,যাতে তৃষ্ণা ও মিথ্যাদৃষ্টি নেই,যেটাকে অন্যদিকে ফেরানো অসম্ভব।

—আমগন্ধ সুত্রের অর্থকথা ও টীকার ব্যাখ্যাবলী—

এই সুত্রের উৎপত্তি কোত্থেকে? ভগবানের উৎপন্ন হওয়ার আগে আমগন্ধ নামের এক ব্রাহ্মণ পাঁচশ যুবককে সাথে করে তাপস হিসেবে প্রব্রজ্যা নিয়ে হিমালয়ে প্রবেশ করেছিল। তারা পর্বতের মাঝে আশ্রম বানিয়ে বনের ফলমূল খেয়ে সেখানে বসবাস করত। কখনো মাছমাংস খেত না। তখন টক লবণ ইত্যাদি না খাওয়ার ফলে তাদের জণ্ডিস রোগ হলো। তারা টক লবণ ইত্যাদি খাওয়ার জন্য লোকালয়ে এক প্রত্যন্ত গ্রামে আসল। সেখানে লোকজন তাদের প্রতি শ্রদ্ধান্বিত হয়ে তাদেরকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াল। খাওয়া সেরে তাদের জন্য খাট, চেয়ার, পাত্র, পাপোষ ইত্যাদি নিয়ে এসে বাসস্থান দেখিয়ে দিয়ে বলল, ‘ভান্তে, এখানে থাকুন। কোনো চিন্তা করবেন না।’ দ্বিতীয়দিনও এভাবে দান দিল। এভাবে তারা প্রত্যেক ঘর থেকে একেক দিন করে দান দিল। তাপসেরা চারমাস সেখানে অবস্থান করে লবণ, টক ইত্যাদি খেয়ে শরীর ঠিকঠাক করল। এরপরে তারা লোকজনকে বলল, “বন্ধুগণ, আমরা চলে যাব।”

তখন লোকজন তাদেরকে তেল, চাল ইত্যাদি দিল। তারা সেগুলো নিয়ে নিজেদের আশ্রমে ফিরে গেল। তারা এভাবে প্রত্যেক বছর সেই গ্রামে আসত। লোকজন তাদের আসার সময় হলে দানের জন্য চাল ইত্যাদি তুলে রেখে তাদের জন্য অপেক্ষা করত। তারা আসলে আগের মতো করেই সম্মান করত।

এরপর জগতে ভগবান উৎপন্ন হয়ে শ্রেষ্ঠ ধর্মচক্র প্রবর্তন করে, অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ ধর্মের প্রচার শুরু করে, ক্রমান্বয়ে শ্রাবস্তীতে গিয়ে অবস্থান করছিলেন। তিনি একসময় সেই তাপসদের মার্গফলের হেতু আছে দেখে শ্রাবস্তী থেকে বেরিয়ে বিচরণ করতে করতে ক্রমান্বয়ে একসময় সেই গ্রামে এসে উপস্থিত হলেন। লোকজন ভগবানকে দেখে মহাদান দিল। ভগবান তাদেরকে ধর্মদেশনা করলেন। সেই ধর্মদেশনায় কেউ কেউ স্রোতাপন্ন হলো, কেউ কেউ সকৃদাগামী হলো, কেউ কেউ অনাগামী হলো, কেউ কেউ প্রব্রজ্যা নিয়ে অর্হৎ হলো। এরপরে ভগবান শ্রাবস্তীতে ফিরে এলেন।

এরপরে তাপসেরা আবার সেই গ্রামে আগমন করল। এবারে লোকজন কিন্তু তাদেরকে দেখে আগের মতো আর শশব্যস্ত হয়ে উঠল না। তাপসেরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করল, “বন্ধুগণ, কী হয়েছে? লোকজন দেখছি আগের মতো নেই। গ্রামটা কি রাজদণ্ডে উৎপীড়িত? নাকি দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত? নাকি আমাদের চেয়েও শীল ইত্যাদি গুণে শ্রেষ্ঠতর কোনো প্রব্রজিত ব্যক্তি এই গ্রামে এসেছেন?”

তারা বলল, “ভান্তে, গ্রামটি কোনো রাজদণ্ডে উৎপীড়িত নয়, দুর্ভিক্ষেও আক্রান্ত নয়। তবে জগতে বুদ্ধ উৎপন্ন হয়েছেন। সেই ভগবান বহুজনের কল্যাণের জন্য ধর্মদেশনা করতে করতে এখানে এসেছিলেন।”

তা শুনে আমগন্ধ তাপস বলল, “‘বুদ্ধ’ বলছেন, গৃহপতিগণ?”

“হ্যাঁ ভান্তে, ‘বুদ্ধ’ বলছি।”

সে তা শুনে খুব খুশি হলো। আপনমনেই খুশির সুরে বলে উঠল, “বুদ্ধ শব্দটি শোনাটাও জগতে দুর্লভ।” এরপরে সে তাদেরকে জিজ্ঞেস করল, “সেই বুদ্ধ কি আমগন্ধ খান, নাকি খান না?”

“ভান্তে, এই আমগন্ধ কী?”

“গৃহপতিগণ, মাছমাংস হচ্ছে আমগন্ধ।”

“ভান্তে, সেই ভগবান মাছমাংস খান।”

তা শুনে তাপস বিষণ্ণ হয়ে বলল, “তাহলে তিনি নিশ্চয়ই বুদ্ধ নন।” তবে আবার সে চিন্তা করল, বুদ্ধগণের আবির্ভাব জগতে দুর্লভ। গিয়ে বরং বুদ্ধকে দেখে, জিজ্ঞেস করে ব্যাপারটা জেনে নেব। এই ভেবে সে ভগবান যেপথে গিয়েছিলেন সেই পথে লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে করতে বাছুরহারা গাভীর মতো করে তাড়াহুড়ো করে কোথাও একরাতের বেশি না থেকে শ্রাবস্তীতে এসে সোজা জেতবনে গিয়ে পৌঁছল নিজের পরিষদ সহকারে। ভগবান সেই সময়ে ধর্মদেশনার জন্য আসনে বসে ছিলেন। তাপসেরা ভগবানের কাছে গিয়ে অভিবাদন না জানিয়েই নিরবে একপাশে বসল। ভগবান তাদের সাথে “হে ঋষিগণ, ভালো আছেন তো?” ইত্যাদি সৌজন্যমূলক আলাপ করলেন। তারাও “ভালো আছি, মাননীয় গৌতম” ইত্যাদি জবাব দিল।

এরপর আমগন্ধ তাপস ভগবানকে জিজ্ঞেস করল, “মাননীয় গৌতম কি আমগন্ধ খান, নাকি খান না?”

“হে ব্রাহ্মণ, এই আমগন্ধ কী জিনিস?”

“মাননীয় গৌতম, মাছমাংস হচ্ছে আমগন্ধ।”

ভগবান তখন বললেন, “হে ব্রাহ্মণ, মাছমাংস আমগন্ধ নয়। বরং আমগন্ধ হচ্ছে সকল ক্লেশ, পাপ, অকুশল বিষয়গুলো।”

এই বলে তিনি আবার বললেন,“হে ব্রাহ্মণ, কেবল তুমিই যে এখন এই আমগন্ধের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে এমন নয়। অতীতেও তিষ্য নামের এক ব্রাহ্মণ কশ্যপ ভগবানকে এমনটা জিজ্ঞেস করেছিল।”

এই বলে ভগবান সেই অতীতের তিষ্য ব্রাহ্মণ ও কশ্যপ ভগবানের বলা গাথাগুলো তাপসকে শোনালেন যাতে তাপসের বোধোদয় হয়। এভাবে অতীতের কশ্যপ বুদ্ধের আমলের সেই গাথাগুলো দিয়েই বর্তমানে এই সুত্রের উৎপত্তি হয়েছে।

কশ্যপ বুদ্ধের আমলের কাহিনী

কশ্যপ বুদ্ধের আমলের কাহিনী

কশ্যপ বুদ্ধের আমলের কাহিনীটা হচ্ছে এরকম। কশ্যপ বোধিসত্ত্ব নাকি আট অসংখ্য কল্প এবং আরো এক লক্ষ কল্প ধরে পারমী পূরণ করে বারাণসীতে ব্রহ্মদত্ত ব্রাহ্মণের স্ত্রী ধনবতী ব্রাহ্মণীর গর্ভে প্রবেশ করেছিলেন। তার অগ্রশ্রাবক বা প্রধান শিষ্যও সেদিনে দেবলোক থেকে চ্যুত হয়ে দ্বিতীয় প্রধান পুরোহিতের স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নিয়েছিল। এভাবে তাদের একই দিনে গর্ভে প্রবেশ, একই দিনে গর্ভ থেকে বের হওয়া বা জন্মগ্রহণ এবং একই দিনে তাদের নামকরণ হলো। একজনের নাম হলো কশ্যপ, আরেকজনের নাম হলো তিষ্য। তারা সেই ছোটবেলায় ধুলাবালি দিয়ে খেলা করার সময় থেকেই একসাথে বড় হলো।

তিষ্যের পিতা একসময় তিষ্যকে আদেশ দিল এভাবে, বাপু, এই কশ্যপ গৃহত্যাগ করে প্রব্রজিত হয়ে বুদ্ধ হবে। তুমিও তার কাছে প্রব্রজিত হবে, যাতে এই ভবসংসার থেকে মুক্ত হতে পার। তা শুনে সে সাধু বলে সম্মতি দিয়ে বোধিসত্ত্বের কাছে গিয়ে বলল, বন্ধু, আমরা উভয়েই প্রব্রজ্যা নেব। বোধিসত্ত্ব সাধু বলে প্রতিশ্রুতি দিলেন। এরপর বড় না হতেই তিষ্য বোধিসত্ত্বকে বলল, “এসো বন্ধু, প্রব্রজ্যা নিই।” কিন্তু বোধিসত্ত্ব বের হলেন না। তখন তিষ্য ভাবল বোধিসত্ত্বের জ্ঞান এখনো পরিপক্ক হয় নি। তাই সে নিজেই ঘর থেকে বের হয়ে ঋষি প্রব্রজ্যা নিয়ে অরণ্যের কোনো এক পর্বতের পাদদেশে আশ্রম বানিয়ে বসবাস করতে লাগল।

পরে বোধিসত্ত্বও ঘরে বসেই আনাপান স্মৃতি ভাবনা করে চারি ধ্যান এবং অভিজ্ঞা বা বিশেষ জ্ঞান লাভ করে প্রাসাদে করে উড়ে গিয়ে বোধিমণ্ডপ বা বুদ্ধত্ব লাভের স্থানের কাছে গিয়ে হাজির হলেন। এরপর অধিষ্ঠান করলেন, এই প্রাসাদ আগের স্থানে ফিরে যাক। তার অধিষ্ঠানবলে সেটি আগের স্থানে ফিরে গেল।

বুদ্ধত্ব লাভ করতে গিয়ে বোধিসত্ত্বের অবশ্যই প্রব্রজিত হতে হয়। প্রব্রজিত না হয়ে নাকি বোধিমণ্ডপ বা বুদ্ধত্ব লাভের স্থানে যাওয়া যায় না। তাই কশ্যপ বোধিসত্ত্বও প্রব্রজিত হয়ে বোধিমণ্ডপে হাজির হয়ে সাত দিন সাধনা করে সম্যকসম্বোধি প্রাপ্ত হলেন।

তখন ঋষিপতনে বিশ হাজার প্রব্রজিত তাপস অবস্থান করত। কশ্যপ ভগবান তাদেরকে আহ্বান করে ধর্মচক্র প্রবর্তন করলেন, অর্থাৎ প্রথম ধর্ম দেশনা শুরু করলেন। সুত্র শেষে সবাই অর্হৎ হয়ে গেল। এরপর ভগবান বিশ হাজার ভিক্ষু সহকারে সেই ঋষিপতনেই অবস্থান করছিলেন। কাশীরাজ কিকী তাদেরকে চারি প্রত্যয় বা চারটি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে সেবা করতেন। এরপর একদিন বারাণসীতে বসবাসকারী এক লোক পর্বতে চন্দনসার খুঁজতে গিয়ে তিষ্য তাপসের আশ্রমে পৌঁছে তাকে অভিবাদন জানিয়ে একপাশে দাঁড়াল। তাপস তাকে দেখে জিজ্ঞেস করল, “কোত্থেকে আসছ?”

“বারাণসী থেকে, ভান্তে।”

“সেখানকার খবর কী?”

“সেখানে ভান্তে, কশ্যপ নামের সম্যকসম্বুদ্ধ উৎপন্ন হয়েছেন।”

তাপস তখন দুর্লভ কথা শুনে খুশি হয়ে জিজ্ঞেস করল, “তিনি কি আমগন্ধ খান, নাকি খান না?”

“ভান্তে, এই আমগন্ধ কী?”

“বন্ধু, মাছমাংস হচ্ছে আমগন্ধ।”

“ভান্তে, সেই ভগবান মাছমাংস খান।”

তা শুনে তাপস তখন একটু হতাশ হয়ে আবার ভাবল, “গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করব। যদি বলেন যে আমগন্ধ খান, তাহলে তাকে সেরকম খেতে নিষেধ করব এই বলে, ‘ভান্তে, আপনার জন্ম, বংশ ও গোত্রের সাথে সেটা মানানসই নয়।’ এভাবে তাকে মাংস খেতে নিষেধ করে তার কাছে প্রব্রজ্যা নিয়ে ভবসংসার থেকে মুক্ত হব।”

এই বলে হালকা বহনযোগ্য কিছু জিনিসপত্র নিয়ে সে বারাণসীর উদ্দেশ্যে রওনা দিল। কোথাও একরাতের বেশি না থেকে সোজা এসে বিকালে বারাণসীতে পৌঁছে ঋষিপতনে প্রবেশ করল। ভগবান সেই সময়ে ধর্মদেশনার জন্য আসনে বসে ছিলেন। তাপস তখন ভগবানের কাছে গিয়ে অভিবাদন না জানিয়েই নিরবে একপাশে দাঁড়াল। ভগবান তাকে দেখে সৌজন্যমূলক কিছু কথা জিজ্ঞেস করলেন। সেও “ভালো আছি, মাননীয় কশ্যপ” ইত্যাদি জবাব দিয়ে একপাশে বসে ভগবানকে জিজ্ঞেস করল,“মাননীয় কশ্যপ কি আমগন্ধ খান, নাকি খান না?”

“হে ব্রাহ্মণ, আমি আমগন্ধ খাই না।”

“সাধু সাধু মাননীয় কশ্যপ। মাংস খাওয়া মানে হচ্ছে অন্য প্রাণির মৃতদেহ খাওয়া। সেটা না খেয়ে আপনি উত্তম কাজই করেছেন। সেটা আপনার জন্ম, বংশ ও গোত্রের পক্ষে একদম মানানসই হয়েছে।”

তখন কশ্যপ ভগবান চিন্তা করলেন, “আমি তো ক্লেশগুলোকে উদ্দেশ্য করে বলেছি যে আমি আমগন্ধ খাই না। অথচ ব্রাহ্মণ মনে করেছে আমি মাছমাংসের কথা বলছি। আমি বরং আগামীকাল গ্রামে পিণ্ডচারণের বের না হয়ে কিকী রাজার বাড়ি থেকে পাঠানো ভিক্ষান্ন খাব। সেখানে আমগন্ধের ব্যাপারে কথা উঠবে। তখন ব্রাহ্মণকে ধর্মদেশনা দিয়ে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেয়া যাবে।”

এই ভেবে তিনি পরদিন খুব সকালে উঠে শারীরিক প্রয়োজনীয় কাজ সেরে গন্ধকুটিতে প্রবেশ করলেন। ভিক্ষুরা গন্ধকুটির দরজা বন্ধ দেখে বুঝতে পারল আজ ভগবান ভিক্ষুদের সাথে যাবেন না। তাই তারা গন্ধকুটিকে প্রদক্ষিণ করে পিণ্ডচারণে বের হল।

ভগবান গন্ধকুটি থেকে বের হয়ে সাজানো আসনে বসে রইলেন। তাপসও শাকসবজি রান্না করে খেয়েদেয়ে ভগবানের কাছে গিয়ে বসল। এদিকে কাশীরাজ কিকী ভিক্ষুদেরকে পিণ্ডচারণ করতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন ভগবান কোথায়। তারা বলে দিল যে ভগবান বিহারেই আছেন। তা শুনে তিনি নানা পদের ও নানা স্বাদের তরকারি এবং বিশেষ বিশেষ মাংস দিয়ে প্রস্তুত খাদ্যদ্রব্য ভগবানকে পাঠালেন। রাজার অমাত্যগণ সেগুলো বিহারে নিয়ে ভগবানকে জানিয়ে হাত ধোয়ার পানি দিল। এরপর পরিবেশন করতে গিয়ে প্রথমে বিশেষ বিশেষ মাংস দিয়ে প্রস্তুত যাগু দিল। তাপস তা দেখে ভাবতে লাগল, ভগবান সেটা “খাবেন নাকি খাবেন না”। ভগবান তাপসের সামনেই যাগু খাওয়ার সময়ে মাংসের টুকরো নিয়ে মুখে দিলেন। তাপস তা দেখে গরম হয়ে গেল। যাগু পান শেষ হলে এরপর মাংস দিয়ে প্রস্তুত নানা স্বাদের তরকারি পরিবেশন করা হলো। ভগবানকে সেটাও খেতে দেখে এবার তাপস খুব রেগে গিয়ে বলল, “মাছমাংস খাচ্ছে অথচ বলে ‘আমি মাছমাংস খাই না।’” ভগবান খাওয়া শেষ করে হাত পা ধুয়ে বসে রইলেন।

তখন তাপস তার কাছে গিয়ে বলল, “মাননীয় কশ্যপ, আপনি মিথ্যা বলেছেন। সেটা পণ্ডিতের কাজ নয়। মিথ্যা বলা হচ্ছে বুদ্ধগণের নিন্দনীয়। পর্বতের পাদদেশে যেসব ঋষি বনের ফলমূল খেয়ে জীবনযাপন করেন তারা পর্যন্ত মিথ্যা বলেন না।”

এই বলে সে ঋষিদের গুণের প্রশংসা করে এই গাথা বলল,

২৪২. যব, চিঙ্গূলকা, চীনা মুগডাল, পাতা, মূল, ফলধর্মত যা পাওয়া যায় তা-ই ঋষিগণ ভোজন করেন।কামনা বশত তারা মিথ্যা বলেন না।

এখানে যব হচ্ছে ধুনন করে অথবা শীষগুলো কেটে নেয়া যায় এমন ধান জাতীয় ঘাস। চিঙ্গূলকা হচ্ছে রক্তকরবী ফুলের মতো শীষ হয় এমন উদ্ভিদ। চীনা মুগডাল হচ্ছে বনে অথবা পর্বতের পাদদেশে প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন এমন ডাল। পাতা হচ্ছে যেকোনো সবুজ পাতা। মূল হচ্ছে যেকোনো শেকড় বা কন্দ। ফল হচ্ছে যেকোনো গাছ অথবা লতায় ধরে এমন ফল। পানিতে জন্মানো পানিফল, শাকালু বা কেশুর ইত্যাদি ফলও এর মধ্যে গণ্য।

কামনাবশত মিথ্যা বলেন না মানে হচ্ছে, এই যব ইত্যাদি নিয়ে খাওয়ার সময়েও ঋষিগণ সেই খাদ্যগুলোর প্রতি কোনো মায়া মমতা মনে ধারণ করেন না, অর্থাৎ এগুলো আমার, আমি এগুলোর মালিক – এরকম কোনো চিন্তা তাদের থাকে না। নিষ্পৃহ হয়ে তারা সেগুলো ভোজন করে থাকেন। আপনি যেভাবে সুস্বাদু জিনিসের লোভে আমগন্ধ খেয়েও বলেন, ‘ব্রাহ্মণ, আমি আমগন্ধ খাই না,’ সেই ঋষিগণ সেরকম মিথ্যা বলেন না। কোনো কিছুর লোভেও তারা মিথ্যা বলেন না। এভাবে তাপস সেই ঋষিগণের প্রশংসা করে ভগবানকে নিন্দা করেছিল।

২৪৩. সুকৃত ও সুসম্পন্ন এবং শ্রদ্ধাভরেঅপরজনের দেয়া যে উত্তম শালিভাত খাচ্ছেন,হে কশ্যপ, সেটাই আপনি আমগন্ধ খাচ্ছেন।

এই গাথায় সুকৃত মানে হচ্ছে খরগোশ অথবা তিতির পাখির মাংস ধুয়ে, কেটেকুটে রান্নার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে এমন। সুসম্পন্ন মানে হচ্ছে রান্না ও পরিবেশন ইত্যাদি কাজের মাধ্যমে সুন্দরভাবে সেই খাদ্য সুসম্পন্ন হয়েছে এমন। অপরের দেয়া মানে হচ্ছে মাতাপিতার দেয়া নয়, বরং ধর্মপুণ্যের আশায় লোকজন তাকে দানের যোগ্য পাত্র মনে করে সেই খাদ্য দান দিয়েছে এমন। উত্তম মানে হচ্ছে সুন্দরভাবে সাজিয়ে দেয়া হয়েছে এবং তা সুস্বাদু ও প্রাণশক্তিতে ভরপুর করতে পারে এমন বলদায়ক খাদ্য। শালিভাত হচ্ছে যথাসময়ে বাছাইকৃত শালিধানের চাল থেকে প্রস্তুতকৃত ভাত। কশ্যপ হচ্ছে সেই কশ্যপ ভগবানের গোত্রের নাম। ব্রাহ্মণেরা সাধারণত বুদ্ধকে এভাবেই গোত্রের নামে সম্বোধন করে কথাবার্তা বলে থাকে।

তার কথার সারাংশ হচ্ছে, এভাবে হে কশ্যপ, যে মাংস আপনি খাচ্ছেন, যে শালিভাত আপনি খাচ্ছেন সেটাই হচ্ছে আমগন্ধ খাওয়া।

২৪৪. হে ব্রহ্মবন্ধু, আপনি বলেছিলেন,“আমগন্ধ আমার উপযুক্ত নয়”।অথচ খাচ্ছেন শালিভাতসুন্দরভাবে রান্না করা পাখির মাংস দিয়ে।হে কশ্যপ, আপনাকে তাই এব্যাপারে জিজ্ঞেস করছি,আপনার আমগন্ধটা কীরকম?এর আগের গাথায় ব্রাহ্মণ ভগবানকে আহারের কারণে নিন্দা করেছিল। এবার তাকে মিথ্যাবাদী হিসেবেও প্রমাণের উদ্দেশ্যে সেই তাপস এই গাথা বলেছে। সে এখানে ভগবানকে ব্রহ্মবন্ধু হিসেবে সম্বোধন করেছে, কারণ কশ্যপ বুদ্ধও জন্মগতভাবে ব্রাহ্মণ ছিলেন। তাই তার জন্মটাই কেবল ব্রাহ্মণ, কিন্তু কাজে বা গুণে ব্রাহ্মণের কোনো কিছু নেই। এভাবে ব্যঙ্গ বা নিন্দা করে ব্রাহ্মণের যে গুণগুলো দরকার সেগুলো ভগবানের নেই হিসেবে দেখিয়ে নিন্দার উদ্দেশ্যে সে এই গাথাটি বলেছে।

আগের গাথাগুলো বলার সময়েই সে ভগবানকে আপাদমস্তক দেখে নিয়েছিল। তখন ভগবানের বত্রিশ প্রকার মহাপুরুষ লক্ষণ ও আশি প্রকার অনুব্যঞ্জন লক্ষণ বা বিবিধ ছোটখাট লক্ষণ এবং দেহ থেকে বিচ্ছুরিত আলো এক ব্যাম বা ছয় ফুট পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে ছড়িয়ে পড়তে দেখে সে ভাবল, এমন মহাপুরুষ লক্ষণ সমন্বিত দেহ যার, তার তো মিথ্যা বলার কথা নয়। এর চোখের দুই ভ্রুযুগলের মধ্যে যে সাদা ও তুলার মতো কোমল লোম রয়েছে সেটা তো তার জন্ম জন্মান্তরে সত্যকথা বলার ফলেই উৎপন্ন হয়েছে। লোমকূপগুলোর প্রত্যেকটিতে রয়েছে একেকটি করে লোম। এমন লক্ষণসম্পন্ন হয়ে সে কীভাবে মিথ্যা বলতে পারে? নিশ্চয়ই সে আমগন্ধ বলতে অন্যকিছুকে বুঝিয়েছে। সেটাকে উদ্দেশ্য করেই সে বলেছে যে সে নাকি আমগন্ধ খায় না। তাকে বরং এব্যাপারে জিজ্ঞেস করে দেখি। কিন্তু প্রচুর মান বা অহংকার থাকার কারণে ভগবানের সাথে আলাপকালে তাকে সে তার কশ্যপ গোত্রের নামে সম্বোধন করে বলেছে, “হে কশ্যপ, আপনাকে তাই এব্যাপারে জিজ্ঞেস করছি, আপনার আমগন্ধটা কীরকম?”

২৪৫. প্রাণিদেরকে হত্যা, মারধর, কাটাকাটি ও বন্দী করে রাখা,চুরি, মিথ্যা বলা, মিথ্যা আশা দেয়া, ঠকবাজি,নিরর্থক বহু গ্রন্থ শিক্ষা করা,অন্যের স্বামী বা স্ত্রীদের কাছে বিচরণ,সেটাই হচ্ছে আমগন্ধ, মাংসভোজন নয়।

তাপসের প্রশ্নের উত্তরে ভগবান আমগন্ধের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এই গাথায় বলেছেন কোনটা আমগন্ধ, আর কোনটা আমগন্ধ নয়। এখানে প্রাণিদেরকে মারধর করা মানে হচ্ছে প্রাণিদেরকে লাঠিসোঁটা ইত্যাদি দিয়ে মারধর করা বা পেটানো। কাটাকাটি মানে হচ্ছে প্রাণিদের হাত পা ইত্যাদি কেটে দেয়া। বন্দী করে রাখা মানে হচ্ছে দড়ি, শেকল ইত্যাদি দিয়ে বন্দী করে রাখা। মিথ্যা আশা দেয়া মানে হচ্ছে “দেব, করব” ইত্যাদি বলে আশা দিয়ে পরে নিরাশ করা। ঠকবাজি মানে হচ্ছে নকল সোনাদানা ইত্যাদিকে আসল সোনা বা আসল জিনিস বলে চালিয়ে দেয়া।

সেটাই হচ্ছে আমগন্ধ, মাংসভোজন নয় কথাটির মানে হচ্ছে, সেই প্রাণিহত্যা ইত্যাদি পাপকাজ করাটাই হচ্ছে আমগন্ধ, বিষগন্ধ, পচাগন্ধ। তার কারণ কী? কারণ হচ্ছে, সেগুলো সুখকর নয়, ক্লেশ বা মনের কলুষতাজনিত অশুচি সেসব কাজে মিশ্রিত থাকে, সৎ লোকেরা সেসব কাজকে ঘৃণা করে, সেগুলো পরম দুর্গন্ধের সৃষ্টি করে থাকে। যাদের মনে কলুষতা বেশি থাকে, তারা সেকারণে অত্যন্ত দুর্গন্ধযুক্ত হয়। নিষ্কলুষ ব্যক্তিদের মৃতদেহও দুর্গন্ধ হয় না। তাই সেই অকুশল কাজগুলো করাটাই হচ্ছে আমগন্ধ। তবে না দেখে, না শুনে, সন্দেহ না রেখে মাংস খাওয়াটা হচ্ছে নির্দোষ। তাই মাংস খাওয়াটা আমগন্ধ নয়।

এই গাথায় ভগবান ধর্মকে মুখ্য করে এক প্রকার আমগন্ধের কথা বলেছেন। কিন্তু সব লোকজনের আমগন্ধ এক ধরনের নয়। একটা আমগন্ধই যে সবার মধ্যে থাকবে এমন নয়। আবার একজনের মধ্যেই যে সব ধরনের আমগন্ধ থাকবে এমনও নয়। তাদের সেই বিশেষ বিশেষ আমগন্ধকে ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে এবারে তিনি ব্যক্তিকে মুখ্য করে পরবর্তী দুটো গাথা বলেছেন।

২৪৬. কামাচারে অসংযত জন,ভোজন রসে প্রলুদ্ধ, অশুচি ভাব মিশ্রিত,নাস্তিক, অসমান, শিক্ষা দেয়ার অযোগ্য,সেটাই হচ্ছে আমগন্ধ, মাংসভোজন নয়।

এখানে কামাচারে অসংযত জন মানে হচ্ছে যারা মা – মাসী ইত্যাদির কোনো সীমা বজায় না রেখেই তাদের সাথে কামলালসা চরিতার্থ করে থাকে এমন অসংযত হয়ে কামাচারে লিপ্ত সাধারণ জন। ভোজন রসে প্রলুদ্ধ মানে হচ্ছে যারা ভোজনরসিক, বিভিন্ন স্বাদের খাদ্যের লোভে আবদ্ধ, মূর্ছিত, সম্মোহিত হয়ে, স্বাদ আস্বাদনের মধ্যে বিপদ না দেখে, স্বাদ আস্বাদনের জ্ঞান না রেখে বিবিধ খাদ্যের স্বাদ আস্বাদন করে চলে। অশুচি ভাব মিশ্রিত মানে হচ্ছে সেই নানান স্বাদের খাদ্যের জন্য নানান প্রকার পাপমূলক পেশা নামক অশুচি ভাব মিশ্রিত হয়ে জীবন যাপনকারী। নাস্তিক মানে হচ্ছে দানের ফল নেই ইত্যাদি দশ প্রকার মিথ্যা ধারণা পোষণ করে এমন। অসমান মানে হচ্ছে বিপরীত কায়িক, বাচনিক ও মানসিক কর্ম করে চলে এমন। শিক্ষার অযোগ্য মানে হচ্ছে যাদেরকে শিক্ষা দেয়া কঠিন, জাগতিক লাভের জালে আবদ্ধ, নিজের মতামতকেই সবসময় সেরা বলে মনে করে, নিজের বিশ্বাস বা মতাদর্শকে সহজে ত্যাগ করতে পারে না। এভাবে এই গাথায় ব্যক্তিকে মুখ্য করে “অসংযত কামাচার, খাদ্যের লোভ, পাপপেশায় লিপ্ত থাকা, নাস্তিকতা, বিপরীত কাজ সম্পাদন ও শিক্ষা গ্রহণের অযোগ্যতা” এই ছয় প্রকার বিষয়কেই আমগন্ধ বলে বুঝতে হবে, মাংস খাওয়াটা নয়।

২৪৭. যারা রুক্ষ ও নিরস, কর্কশ সুরে কথা বলে,অপরের পিঠের মাংস খায়,বিশ্বাসঘাতক, নিষ্ঠুর, অহংকারী,দানশীল নয়, কাউকে কোনো কিছু দেয় না।সেটাই হচ্ছে আমগন্ধ, মাংসভোজন নয়।এই গাথায় রুক্ষ ও নিরস মানে হচ্ছে যারা আত্মনিপীড়ন মূলক সাধনা করে থাকে। অপরের পিঠের মাংস খায় মানে হচ্ছে সামনাসামনি হলে মিঠে সুরে কথা বলে কিন্তু অপরের কাছে নিন্দা করে বেড়ায় এমন। তারা নাকি সামনাসামনি হলে মুখের পানে তাকাতে পারে না, তাই অপরের কাছে নিন্দা করে বেড়ায়। বিশ্বাসঘাতক মানে হচ্ছে বন্ধুদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এমন। অর্থাৎ তাদেরকে স্বামী বা স্ত্রী, ধনসম্পদ, জীবন ইত্যাদির ব্যাপারে বিশ্বাস করলেও তারা সেই বিশ্বাসের সুযোগে বন্ধুদের ক্ষতি করে বসে থাকে।

নিষ্ঠুর মানে হচ্ছে করুণাহীন বা অপরের ক্ষতি কামনা করে থাকে এমন। অহংকারী মানে হচ্ছে যারা জাতির কারণে, বংশের কারণে, ভদ্রঘরের সন্তান হওয়ার কারণে, সুন্দর গায়ের রঙের কারণে, ধনসম্পদের কারণে, শাস্ত্র শিক্ষার কারণে, পেশার কারণে, শিল্পবিদ্যায় দক্ষতার কারণে, অন্যান্য বিদ্যা শিক্ষার কারণে, বহু কিছু জানার কারণে, বুদ্ধি বা উপস্থিত বুদ্ধির কারণে, অথবা অন্য যেকোনো কারণে নিজেকে বড় মনে করে অপরকে অবজ্ঞা করে, সেরকম অতিমানী বা অহংকারী (ৰিভ.৮৮০)।

দানশীল নয় মানে হচ্ছে দানশীল স্বভাবের নয়, দান করার মত মনমানসিকতা নেই, কোনোকিছু ভাগ করে ভোগ করে না। কাউকে কোনো কিছু দেয় না মানে হচ্ছে দানশীল নয় বলে কেউ কোনো কিছু চাইলেও তাকে থাকলেও দেয় না। অদিন্নপুব্বক ব্রাহ্মণের বাড়ির লোকজনের মতো তৃষ্ণাকাতর প্রেতকুলে যাওয়ার হেতু সঞ্চয় করে থাকে। এভাবে এই গাথায় “রুক্ষতা, কর্কশতা, পিঠের মাংস খাওয়ার স্বভাব, বিশ্বাসঘাতকতা, নিষ্ঠুরতা, অহংকার, অদানশীলতা, অদান” এই আট প্রকার বিষয়কে আমগন্ধ হিসেবে বুঝতে হবে, মাংসভোজন নয়।এভাবে ব্যক্তিকে মুখ্য করে উপরোক্ত দুটি গাথা বলে বুদ্ধ বুঝতে পারলেন তাপসের মনোভাবের কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। তা জেনে তিনি ধর্মকে মুখ্য করেই আবার নিচের একটি গাথা বললেন।

২৪৮. ক্রোধ, মত্ততা, একগুঁয়েমি, উল্টোস্বভাব,ছলনাময়ী স্বভাব, ঈর্ষাকাতরতা,দাম্ভিক কথাবার্তা, অহংকারী হয়ে ওঠা,অসৎ লোকজনের সাথে মেলামেশা,সেটাই হচ্ছে আমগন্ধ, মাংসভোজন নয়।

এই গাথায় ক্রোধ বলতে যা বুঝায় তা উরগসুত্র বা সাপ সুত্রে যেভাবে বলা হয়েছে সেভাবে বুঝে নিতে হবে। মত্ততা হচ্ছে জন্মের কারণে মত্ততা, বংশের কারণে মত্ততা, সুস্থতার কারণে মত্ততা ইত্যাদি। সেগুলো বিভঙ্গ.৮৩২ অনুচ্ছেদে যেভাবে বলা আছে সেভাবে বুঝে নিতে হবে। উল্টোস্বভাব মানে হচ্ছে ভালো কিছু বললে তার বিরোধিতা করা। ছলনাময়ী স্বভাব মানে হচ্ছে পাপকাজ করে তা গোপন করে নিজেকে ভালো হিসেবে দেখানো। ঈর্ষাকাতরতা মানে হচ্ছে অপরের লাভ সম্মান ইত্যাদিতে ঈর্ষাকাতর হওয়া। দাম্ভিক কথাবার্তা মানে হচ্ছে নিজেকে উৎকৃষ্ট হিসেবে দেখানো।

অহংকারী হয়ে ওঠা মানে হচ্ছে কেউ কেউ জাতি, বংশ, ভদ্রঘরের সন্তান হওয়া, সুন্দর গায়ের রং, ধনসম্পদ, শাস্ত্র শিক্ষা, পেশা, শিল্পবিদ্যায় দক্ষতা, অন্যান্য বিদ্যা শিক্ষা, বহু কিছু জানা, বুদ্ধি বা উপস্থিত বুদ্ধি, অথবা অন্য যেকোনো বিষয়ে প্রথমে নিজেকে অন্যের সমান বলে মনে করে, কিন্তু পরবর্তীতে নিজেকে সেরা মনে করে, অন্যকে হীন মনে করে (ৰিভ.৮৮০)। এভাবে তারা অহংকারী হয়ে ওঠে।

এই নয় প্রকার অকুশল বা পাপকাজই হচ্ছে আমগন্ধ, মাংস খাওয়া নয়।ভগবান এভাবে ধর্মকে মুখ্য করে নয় প্রকার আমগন্ধ দেখিয়ে আবার ব্যক্তিকে মুখ্য করে আমগন্ধের কথা বলতে গিয়ে নিচের আরো তিনটা গাথা বললেন।

২৪৯. যারা পাপী, ঋণখেলাপী ও উল্টো বদনাম করে বেড়ায়,অবিচার করেও এখানে ধর্মাবতার সাজে,নরাধম হয়ে এখানে কষ্ট দিয়ে থাকে,সেটাই হচ্ছে আমগন্ধ, মাংসভোজন নয়।

এখানে পাপী মানে হচ্ছে যারা পাপকাজ করে বেড়ায় বলে জগতে পাপী বলে কুখ্যাত। ঋণখেলাপী ও উল্টো বদনাম করে বেড়ায় মানে হচ্ছে বসল সুত্রে যেভাবে বলা হয়েছে সেভাবে ধার নিয়ে ফেরত দেয় না, বরং উল্টো বদনাম করে বেড়ায়। অবিচার করে মানে হচ্ছে মামলা মোকদ্দমার বিচারক হয়েও ঘুষ খেয়ে আসল মালিকের বদলে অন্যের পক্ষে রায় দেয়। এভাবে অন্যায় রায় দিয়েও ধর্মের অবতার সেজে বসে থাকে বলে সে হয় ধর্মাবতার। অথবা এখানে মানে হচ্ছে এই বুদ্ধশাসনে।

ধর্মাবতার সাজে মানে হচ্ছে দুঃশীল হয়েও শীলবান সাজে। তাদের চারি ইর্যাপথ অর্থাৎ চালচলন, উঠা বসা, থাকা খাওয়া ইত্যাদি সবই শীলবান, ধার্মিকের মতো বলে বলা হয়েছে ধর্মাবতার সাজে। নরাধম হয়ে এখানে কষ্ট দিয়ে থাকে মানে হচ্ছে এই জগতে যারা নরাধম হয়ে মাতাপিতার প্রতি খারাপ কাজ করে থাকে, বুদ্ধ, পচ্চেকবুদ্ধ ইত্যাদি নমস্য ব্যক্তিগণের প্রতি খারাপ কাজের মাধ্যমে কষ্ট দিয়ে থাকে।

এভাবে এই গাথায় পাপে লিপ্ত থাকা, ঋণখেলাপী হওয়া, উল্টো বদনাম করা, অবিচার করা, ধর্মাবতার সেজে থাকা, খারাপ কাজের মাধ্যমে কষ্ট দেয়া – এই ছয় প্রকার বিষয়কেই আমগন্ধ বলে বুঝতে হবে, মাংস খাওয়া নয়।

২৫০. যারা এখানে প্রাণিহত্যায় অসংযত জন,অন্যের ধন কেড়ে নিয়ে উল্টো হুমকি দেয়,দুঃশীল, পশুপাখি শিকার করে বেড়ায়,কর্কশ কথা বলে, সৎ উপদেশের অনাদর করে,সেটাই হচ্ছে আমগন্ধ, মাংসভোজন নয়।

যারা এখানে প্রাণিহত্যায় অসংযত জন মানে হচ্ছে যারা ইহলোকে ইচ্ছেমত প্রাণিহত্যা করে থাকে। তারা শত শত, কিংবা হাজার হাজার প্রাণি মেরে ফেলেও সামান্য দয়া পর্যন্ত করে না বলে প্রাণিহত্যায় অসংযত। অন্যের ধন কেড়ে নিয়ে উল্টো হুমকি দেয় মানে হচ্ছে অন্যের ধন, প্রাণ কেড়ে নেয়ার সময় “এমন করবেন না” এভাবে কাতর মিনতি বা নিষেধ করতে গেলে উল্টো হাত দিয়ে অথবা ঢিল বা লাঠি ইত্যাদি দিয়ে মারতে থাকে। অথবা অন্য লোকজনকে ধরে নিয়ে “আজ বিশজন, আজ ত্রিশজন” এভাবে ধরে ধরে মেরে ফেলা, বেঁধে রাখা ইত্যাদিভাবে নির্যাতন করা।

দুঃশীল মানে হচ্ছে নিঃশীল বা শীলহীন ও দুরাচার করে বেড়ায় এমন। পশুপাখি শিকার করে বেড়ায় মানে হচ্ছে যারা পশুপাখির প্রতি নিষ্ঠুর হয়, যাদের হাত থাকে সবসময় রক্তরঞ্জিত। এর মাধ্যমে মূলত মাছ শিকারী, হরিণ শিকারী, পাখি শিকারী ইত্যাদি লোকজনকেই বুঝানো হয়েছে। সৎ উপদেশের অনাদর করে মানে হচ্ছে “এখন আর এগুলো করব না, এরকম কাজ থেকে বিরত থাকব” এমন আদর করে উপদেশ গ্রহণ করে না। এভাবে “প্রাণিহত্যায অসংযত থাকা, অন্যকে নির্যাতন, শীলহীনতা, ব্যাধগিরি, কর্কশ কথাবার্তা, অনাদর” এই ছয়টি বিষয়ই হচ্ছে আমগন্ধ, মাংসভোজন নয়। এই বিষয়গুলো আগে বলা হলেও শ্রোতাদের আরো শোনার ইচ্ছায়, এবং মনে রাখার সুবিধার জন্য, আরো দৃঢ়ভাবে মনে থাকার জন্য, এখানে আবারো বলা হয়েছে।

একারণেই পরবর্তীতে বলা হয়েছে, “এভাবে এই এতটুকুই ভগবান বার বার সেই বেদজ্ঞ মন্ত্রে পারঙ্গম তাপসকে ব্যাখ্যা করে শুনিয়েছেন।”

২৫১. যারা এসবে প্রলুদ্ধ, বিরুদ্ধ, ধ্বংসকারী,এসবে নিত্য ব্যস্ত থেকেপরে অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়,অধোশির হয়ে নরকে পড়ে যায়।সেটাই হচ্ছে আমগন্ধ, মাংসভোজন নয়।

এখানে যারা এসবে প্রলুদ্ধ, বিরুদ্ধ, ধ্বংসকারী মানে হচ্ছে যারা এসকল প্রাণিদের প্রতি লোভে প্রলুদ্ধ হয়ে, বিদ্বেষে বিরুদ্ধচারী হয়ে, মোহে বিপদ না দেখে বার বার নিয়ম লঙ্ঘনকারী হয়ে প্রাণীদেরকে ধ্বংসকারী হয়। নিত্য ব্যস্ত থাকে মানে হচ্ছে অকুশল বা পাপকাজে নিত্য ব্যস্ত থাকে, কখনো বিচার-বিবেচনা পূর্বক তা থেকে বিরত হয় না। পরে মানে হচ্ছে ইহলোক থেকে পরলোকে গিয়ে। অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয় মানে হচ্ছে লোকান্তরিক নরকের অন্ধকার অথবা নীচকুল ইত্যাদির অন্ধকারে পড়ে যায়। অধোশির হয়ে নরকে পড়ে যায় মানে হচ্ছে মাথা নিচের দিকে করে অবীচি ইত্যাদি নরকে পড়ে যায়। এভাবে অন্ধকারে ও নরকে পড়ে যাওয়ার হেতু হিসেবে প্রাণিদের প্রতি তাদের যে প্রলুদ্ধতা, বিরুদ্ধতা ও অজ্ঞানতাবশত প্রাণিদের ধ্বংস সাধন, এই তিনটা বিষয় হচ্ছে সকল আমগন্ধের মূলে। এই তিনটা বিষয়ই হচ্ছে আমগন্ধ, মাংস খাওয়া নয়।এভাবে ভগবান পারমার্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমগন্ধকে ব্যাখ্যা করে সেটা যে দুর্গতির পথ তা দেখিয়ে দিলেন।

এরপর যে মাছমাংস খাওয়াকে তাপস আমগন্ধ বলে মনে করত, দুর্গতির পথ বলে মনে করত এবং সেগুলো না খেলে তবেই বিশুদ্ধ থাকা যায় বলে মনে করত, এবং সেরকম মনে করার কারণেই সে মাছ মাংস খেত না, তাপসের সেরকম মাছমাংস না খাওয়াটা যে তাকে সেভাবে বিশুদ্ধ রাখতে পারছে না সেটা দেখানোর জন্য এরপর ভগবান নিচের ছয় পদের গাথাটি বললেন।

২৫২. মাছ মাংস বিরতি নয়, নগ্ন হয়ে থাকা নয়,ন্যাড়া মাথা নয়, জটাধারী ও ধুলোয় ধুসরিত হয়ে থাকা নয়,কর্কশ চিতাবাঘের চামড়া ধারণ নয়,অগ্নি পরিচর্যা নয়,অথবা জগতে অমরত্বের যে বহু তপস্যা,বেদমন্ত্র,আগুনে বলি দেওয়া, যজ্ঞ ও ঋতু সেবন,সংশয় অনুত্তীর্ণ মানুষকেসেগুলোর কোনোটাই বিশুদ্ধ করে না।

এখানে মাছ মাংস বিরতি মানে হচ্ছে মাছ মাংস না খাওয়া। অমরত্বের বহু তপস্যা মানে হচ্ছে অমরত্বের লক্ষ্যে দেহকে কষ্ট দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ব্রত যেমন- উৎকুটিক ব্রত বা শুধু পায়ের গোড়ালির উপর ভর দিয়ে বসে থাকা ইত্যাদির মাধ্যমে দেহকে তপ্ত করা। যজ্ঞ মানে হচ্ছে অশ্বমেধ যজ্ঞ ইত্যাদি।

ঋতু সেবন মানে হচ্ছে গ্রীষ্মকালে রোদের জায়গায় থাকা, বর্ষাকালে বৃক্ষমূলে থাকা, শীতকালে পানিতে ডুবে থাকা। সংশয় অনুত্তীর্ণ মানুষকে সেগুলোর কোনোটাই বিশুদ্ধ করে না মানে হচ্ছে ক্লেশ বিশুদ্ধি বা ভব বিশুদ্ধির মাধ্যমে সেগুলো সংশয় অনুত্তীর্ণ মানুষকে বিশুদ্ধ করে না। সংশয় থাকলে কী করে বিশুদ্ধ হতে পারে কেউ? তুমিও সংশয় নিয়ে পড়ে আছ। মাছমাংস খাওয়ার কথা শুনেই বুদ্ধের প্রতি সংশয় উৎপন্ন করেছ। এভাবে এই উদ্দেশ্যেই ভগবানের এই উক্তি।

এভাবে মাছমাংস না খাওয়া ইত্যাদি বিষয় যে মানুষকে বিশুদ্ধ করতে পারে না সেটা দেখিয়ে এরপরে যে বিষয়গুলো মানুষকে বিশুদ্ধ করতে সক্ষম সেগুলো দেখানোর জন্য বুদ্ধ এরপর নিচের গাথাটি বললেন।

২৫৩. ছয় ইন্দ্রিয়ে সংযত ও জ্ঞাত হয়ে বিচরণকারী,ধর্মে প্রতিষ্ঠিত, ঋজু ও মৃদু ভাবে রত,সঙ্গ অতিক্রান্ত, সকল দুঃখ পরিত্যক্ত,সেই ধীর ব্যক্তি দেখা ও শোনা বিষয়ে লিপ্ত থাকেন না।

এখানে ছয় ইন্দ্রিয়ে সংযত কথাটির মাধ্যমে ইন্দ্রিয় সংবরণ শীলকে বুঝাচ্ছে। জ্ঞাত হয়ে বিচরণকারী মানে হচ্ছে জ্ঞাতপরিজ্ঞা দ্বারা ছয় ইন্দ্রিয়কে জেনে, সুস্পষ্টভাবে বুঝে নিয়ে বিচরণ করে, অবস্থান করে। এর মাধ্যমে বিশুদ্ধ শীলের নামরূপ প্রকাশ পেয়েছে। ধর্মে প্রতিষ্ঠিত মানে হচ্ছে আর্যমার্গের দ্বারা উপলদ্ধি করতে হয় যে চারি সত্যধর্মকে, সেই চারি সত্যধর্মে প্রতিষ্ঠিত। এর মাধ্যমে স্রোতাপত্তি ভূমিকে দেখানো হয়েছে। ঋজু ও মৃদু ভাবে রত কথাটির মাধ্যমে সকৃদাগামী ভূমিকে দেখানো হয়েছে।

দেহ বাঁকা করা ইত্যাদি এবং মনকে একগুঁয়ে ও কঠিন করে তোলে যে লোভ দ্বেষ, সেগুলোর পরিমাণ কমে আসার কারণে সকৃদাগামী ব্যক্তিরা সবসময় ঋজু ও মানসিকভাবে নমনীয় স্বভাবের হয়ে থাকে। সঙ্গ অতিক্রান্ত মানে হচ্ছে লোভ ও দ্বেষের সঙ্গ অতিক্রম করেছে এমন। এর মাধ্যমে অনাগামী ভূমিকে দেখানো হয়েছে।

সকল দুঃখ পরিত্যক্ত মানে হচ্ছে সংসার চক্রের সকল দুঃখের হেতু তার পরিত্যক্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে অর্হত্ব ভূমিকে দেখানো হয়েছে। সেই ধীর ব্যক্তি দেখা ও শোনা বিষয়ে লিপ্ত থাকেন না মানে হচ্ছে সে এভাবে ক্রমান্বয়ে অর্হত্ব লাভ করে ধিতি বা প্রজ্ঞাসম্পদের কারণে ধীর বা বিজ্ঞ হয়ে ওঠার ফলে দেখা ও শোনা বিষয়গুলোতে কোনো প্রকার ক্লেশ বা কলুষতা দ্বারা লিপ্ত থাকে না। কেবল দেখা ও শোনা বিষয়েই নয়, গন্ধ পাওয়া, স্বাদ পাওয়া, স্পর্শ পাওয়া এবং উপলদ্ধ বা জানা বিষয়ের কোনোটাতেও সে লিপ্ত থাকে না। সে নিশ্চিতভাবেই পরম বিশুদ্ধি প্রাপ্ত হয়ে থাকে।

এভাবে কশ্যপ ভগবান অর্হত্বের শিখরে গিয়ে দেশনা সমাপ্ত করলেন।

এরপরে নিম্নোক্ত দুটো গাথা সঙ্গীতিকারকগণ বলেছেন। সেগুলো হচ্ছে এরকম-

২৫৪. এভাবে কশ্যপ ভগবান বারবার এর অর্থ ব্যাখ্যা করে দিলেন,যাতে তা বুঝতে পারল বেদমন্ত্রে পারঙ্গম তিষ্য ব্রাহ্মণ।বিচিত্র গাথার মাধ্যমে মুনি প্রকাশ করলেন,যা আমগন্ধ নয়, যাতে তৃষ্ণা ও মিথ্যাদৃষ্টি নেই,যেটাকে অন্যদিকে ফেরানো অসম্ভব।

এখানে বারবার এর অর্থ ব্যাখ্যা করে দিলেন মানে হচ্ছে অনেকগুলো গাথার মাধ্যমে বিষয় ও ব্যক্তিকে মুখ্য করে দেশনার মাধ্যমে যতক্ষণ না তাপস বিষয়টাকে বুঝতে পারল ততক্ষণ পর্যন্ত বললেন, বিস্তারিতভাবে বলে দিলেন। আমগন্ধ নয় মানে হচ্ছে ক্লেশ বা কলুষতা নেই বলে তা আমগন্ধ নয়। অন্যদিকে ফেরানো অসম্ভব মানে হচ্ছে বুদ্ধশাসনের বাইরের যেকোনো মতবাদের দ্বারা “এটিই সেরা, এটিই শ্রেষ্ঠ” এভাবে এটাকে অন্যদিকে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব।

২৫৫. বুদ্ধের সুভাষিত গাথায়তিষ্য ব্রাহ্মণ শুনল যা আমগন্ধ নয়,বরং সকল দুঃখ দূরকারী।শুনে সে নীচমনা হয়েতথাগতকে বন্দনা করল,সেখানেই প্রব্রজ্যা প্রার্থনা করল।

এখানে সুভাষিত গাথায় মানে হচ্ছে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যাত ধর্মদেশনায়। যা আমগন্ধ নয় মানে হচ্ছে যা ক্লেশহীনতার পথ বা নিষ্কলুষ হওয়ার পথ। তথাগতকে বন্দনা করল মানে হচ্ছে তিষ্য ব্রাহ্মণ তথাগতের পায়ে পড়ে পঞ্চাঙ্গ বন্দনা করল। সেখানেই প্রব্রজ্যা প্রার্থনা করল মানে হচ্ছে কশ্যপ ভগবান সেই আসনে বসা অবস্থাতেই তিষ্য তাপস ভগবানের কাছে প্রব্রজ্যার প্রার্থনা জানাল। তখন ভগবান বললেন, “এসো ভিক্ষু।” সে তৎক্ষণাৎ অষ্টপরিষ্কার যুক্ত হয়ে আকাশে উড়ে এসে শতবর্ষ বয়স্ক স্থবিরের মতো ভগবানকে বন্দনা করল। এর অল্প কয়েকদিনের মধ্যে সে শ্রাবক পারমী ভেদ করে তিষ্য নামের অগ্রশ্রাবক হয়ে গেল।

দ্বিতীয়জন হল ভারদ্বাজ। এভাবে সেই কশ্যপ ভগবানের তিষ্য ও ভারদ্বাজ নামের শ্রাবকযুগল হয়েছিল।আমাদের ভগবান সেই তিষ্য ব্রাহ্মণ প্রথমে যে তিনটা গাথা বলেছে, কশ্যপ ভগবান কর্তৃক মাঝখানে যে নয়টা গাথা উক্ত হয়েছে, এবং [কশ্যপ ভগবানের আমলের] সঙ্গীতিকারকগণের সর্বশেষ যে দুটো গাথা, এই চৌদ্দটি গাথা একত্রে এনে পরিপূর্ণভাবে এই আমগন্ধ সুত্র হিসেবে উপস্থাপন করে তার মাধ্যমে আমগন্ধের বিষয়টি ব্যাখ্যা করলেন আচার্য ও সেই পাঁচশত তাপসকে।

তা শুনে সেই ব্রাহ্মণ সেখানেই নীচমনা হয়ে ভগবানের পায়ে বন্দনা করে তার সঙ্গীসাথীদের নিয়ে প্রব্রজ্যা প্রার্থনা করল। ভগবান বললেন, “এসো ভিক্ষুগণ।” তারা তাতেই এসোভিক্ষু ভাব প্রাপ্ত হয়ে আকাশে উড়ে এসে ভগবানকে বন্দনা করল। এরপর কয়েক দিনের মধ্যে সবাই অগ্রফল অর্হত্বে প্রতিষ্ঠিত হল।

—আমগন্ধ সুত্র ও তার অর্থকথা সমাপ্ত —-

Reference:

খুদ্দক নিকায় / ৫. সুত্তনিপাত / ২. চূলবর্গ / ২. আমগন্ধসুত্র

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *