আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

নতুন বছরে আশীর্বাদ নয়, শুভকামনা

করোনার বছর গেল। নতুন বছর এল। লোকজন দেখছি খুব উচ্ছ্বসিত। অনেকেই আশীর্বাদ চাচ্ছে, যেন এক আশীর্বাদে তাদের সব দুঃখ ধুয়ে মুছে যাবে। সব বিপদআপদ কেটে যাবে। কিন্তু সব ভিক্ষু কি সেরকম আশীর্বাদ দেয়ার ক্ষমতা রাখে? সাধারণত যাদের ভবিষ্যৎকে দেখার ক্ষমতা আছে তারাই আশীর্বাদ দিতে পারেন। কারণ তাদের আশীর্বাদ ভবিষ্যতে ফলবে কিনা তা তারা নিশ্চিত জানেন।

যেমন ধর্মপদ অর্থকথায় আয়ুবর্ধন কুমারের কাহিনী আছে। তাকে এক সন্ন্যাসী “দীর্ঘায়ু হও” বলে আশীর্বাদ দেয় নি। পরে বুদ্ধের কাছে গেলে বুদ্ধও আশীর্বাদ দেন নি। কারণ তারা ভবিষ্যৎজ্ঞানে দেখেছিলেন এই ছেলেটি সাতদিন পরে মরবে। কিন্তু টানা সাতদিন ধরে পরিত্রাণ সুত্র পাঠের মাধ্যমে ছেলেটির সেই বিপদ কেটে গিয়েছিল। পরে ছেলেটিকে বুদ্ধ “দীর্ঘায়ু হও” বলে আশীর্বাদ দিয়েছিলেন। কারণ তখন নাকি সে বাঁচবে ১২০ বছর! তাহলে কী বুঝা গেল? আশীর্বাদ হচ্ছে এক ধরনের ভবিষ্যৎবাণী মাত্র।

আবার বোধিরাজকুমারের কথা বিবেচনা করুন। সে শুনেছিল, বুদ্ধগণের কাছে প্রার্থনা করলে মনের আশা পূরণ হয়। তাই সে বুদ্ধকে নিমন্ত্রণ করে মনে মনে প্রার্থনা করেছিল যদি পুত্রসন্তান লাভ হয় তাহলে বুদ্ধ সেই কাপড়ের উপর দিয়ে হেঁটে যাবেন। নাহলে সেই কাপড়ের উপর দিয়ে যাবেন না। বুদ্ধ দেখলেন তার পুত্রসন্তানের কোনো আশা নেই। অতীত জন্মে সে এক দ্বীপে বসবাস করত। সেই দ্বীপে তারা স্বামী স্ত্রী দুজনে মিলে পাখির ছানাদের ধরে ধরে খেত। বর্তমানে তাদের স্বামী বা স্ত্রীর কোনো একজন যদি অন্য কেউ হত তাহলে সন্তান লাভের সম্ভাবনা থাকত। কিন্তু কর্মচক্রে তারা দুজনেই এই জন্মেও আবার স্বামী স্ত্রী হয়েছে। দুজনেরই সেই একই ধরনের পাপ হওয়ায় তাদের সন্তান লাভের আর কোনো সম্ভাবনা ছিল না। তবে আমার মনে হয় সে যদি আরো কয়েকটা বিয়ে করত তাহলে সন্তান লাভ করতে পারত। কিন্তু বুদ্ধ তো আর বলতে পারেন না, তুমি আরেকটা বিয়ে কর! তাই বেচারার কপালে আর সন্তান জোটে নি! কাহিনীটা আছে মধ্যম নিকায়ের বোধিরাজকুমার সুত্রে (ম.নি.৩২৪)।

আবার উগ্রসেন ভিক্ষুর কথা বলা যায়। সে অতীতে কশ্যপ বুদ্ধের আমলে তার স্ত্রীকে নিয়ে এক ভিক্ষুকে খাদ্য দান করে প্রার্থনা করেছিল, “ভান্তে, আপনার প্রাপ্ত ধর্মের ভাগীদার হতে পারি যেন।” সেই ভিক্ষুটি অর্হৎ ছিল। সে তাদের প্রার্থনা পূর্ণ হবে দেখে হেসেছিল। আপনারা ধরে নিতে পারেন সেই হাসিটাই হচ্ছে তাদের জন্য ভিক্ষুটির আশীর্বাদ। কিন্তু ভিক্ষুর হাসি দেখে মেয়েটি ভুল বুঝল। সে তার স্বামীকে বলল, আমাদের ভান্তে হাসছেন। কোনো নৃত্যশিল্পী হবেন বোধহয়। অর্হৎ ভিক্ষুকে এভাবে ভুল বুঝার ফল হয়েছিল মারাত্মক। ফলে তারা এই জন্মে হয়েছিল নর্তক ও নর্তকী। তাদের এই জন্মের কাহিনীটা আরো চাঞ্চল্যকর। প্রেমের টানে রাজা এডওয়ার্ডের রাজত্ব ত্যাগের মত কাহিনী। সেটা বিস্তারিত পড়তে পারেন ধর্মপদের তৃষ্ণা বর্গের উগ্গসেন ভিক্ষুর কাহিনীতে।

তাহলে কী বুঝা গেল? এভাবে ভবিষ্যতের জ্ঞান থাকলে তবেই আশীর্বাদ দেয়া যায়। তা নাহলে আশীর্বাদ দেয়া হয় যেন অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়ার মতন। তবে আমি গৃহী থাকাকালে হস্তরেখাবিদ ছিলাম। হস্তরেখাবিদ হিসেবে আমার কাজই ছিল ভবিষ্যৎবাণী করা। তাই আমি চোখ বুজে [আসলে ঠিক চোখ বুজে নয়, সারাদিন ধরে অনেক হিসাব নিকাশ করে] ভবিষ্যৎবাণী করে দিতাম। আমার ফি ছিল ৫০ ডলার একজন। এত দাম দিয়েও অনেকেই আমার সার্ভিস নিত। আমার গ্রাহকেরা ছড়িয়ে ছিল ইউরোপ, আমেরিকা, এমনকি পাকিস্তান থেকেও! আমি যখন বলতাম হবে, তখন সেটা প্রায়ই হয়ে যেত। তবে আমার ব্যর্থতাও ছিল অনেক। আমি বলেছি তোমার বিদেশে যাওয়ার চান্স নেই। কিন্তু তার অদম্য উৎসাহ তাকে ঠিকই বিদেশবাসী করেছে। আমি বলেছি তোমার চাকরি পাওয়ার আশা নেই। কিন্তু সে ঠিকই বিসিএস পেয়েছে। আমি বলেছি তোমার চেয়ারম্যান হওয়ার আশা নেই। কিন্তু সে ঠিকই পরে চেয়ারম্যান হয়েছে। এসব ক্ষেত্রেও আমার ব্যাখ্যা আছে অবশ্য। তবে এখন মনে হয়, লোকজনের কাছে যখন আশীর্বাদের এত চাহিদা, তখন ভিক্ষু হওয়ার বদলে হস্তরেখাবিদ হলেই ভালো হতো। আফসোস, ভিক্ষুদের জন্য এসব বিদ্যা নিষিদ্ধ। তা নাহলে অন্তত নিশ্চিন্তে আশীর্বাদ দেয়া যেত।

সে যাই হোক, লোকজন যেহেতু মঙ্গলকামী, তাই নতুন বছরে সবার জন্য শুভকামনা রইল। সবাই সুখী হোক, দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করুক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *