আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

History repeats itself

বৃষ্টি হচ্ছে এখানে প্রচুর। আসুন এই ফাঁকে একটা জাতকের কাহিনী শোনাই। জাতকের নাম হচ্ছে উচ্ছঙ্গ জাতক। সেটা হচ্ছে এরকম –

একবার কোশলরাজ্যে তিন জন লোক এক বনের ধারে হালচাষ করছিল। এদিকে ডাকাতেরা সেই বনের মধ্যে লোকজনকে লুটপাট করে পালিয়ে গেল। লোকজন ডাকাতদেরকে খুঁজতে এসে না পেয়ে বনের ধারে সেই তিনজনকে দেখে বলল, তোমরা বনের মধ্যে লুটপাট করে এখন কৃষক সেজে আছ। তারা সেই তিনজনকে ধরে বেঁধে নিয়ে কোশলরাজার কাছে দিয়ে বলল, এরাই হচ্ছে সেই চোর।

তখন এক মহিলা “আমাকে আচ্ছাদন দিন, আমাকে আচ্ছাদন দিন” বলে কেঁদে কেঁদে বার বার রাজবাড়িতে আসতে লাগল। রাজা তা শুনে বললেন, যাও, একে কাপড় দাও। লোকজন তাকে কাপড় দিল। কিন্তু মহিলাটি বলল, আমি এই আচ্ছাদনের কথা বলছি না। স্বামী আচ্ছাদনের কথা বলছি। লোকজন গিয়ে রাজাকে বলল, সে নাকি এই আচ্ছাদনের কথা বলছে না, স্বামী আচ্ছাদনের কথা বলছে।

রাজা তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি নাকি স্বামী আচ্ছাদন চাচ্ছ?”

হ্যাঁ দেব। নারীর কাছে স্বামী হচ্ছে আচ্ছাদন। স্বামী না থাকলে হাজার স্বর্ণমুদ্রা মূল্যের বস্ত্র পরে থাকলেও সেই নারীকে নগ্ন বলা হয়ে থাকে।

রাজা তা শুনে সন্তুষ্ট হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এই তিনজন তোমার কে হয়?

একজন আমার স্বামী, একজন ভাই, একজন পুত্র।

আমি তোমার প্রতি খুশি হয়েছি। এই তিনজনের মধ্যে একজনকে দিচ্ছি। কাকে চাও?

সে বলল, হে দেব, আমি বেঁচে থাকলে আরেক স্বামী পাব। পুত্রও পাব। পিতামাতা মারা যাওয়ায় ভাই কিন্তু দুর্লভ হবে। তাই আমার ভাইকে দিন।

রাজা খুশি হয়ে তিনজনকেই মুক্তি দিলেন। এভাবে একজনের দ্বারা সেই তিনজন দুঃখ থেকে মুক্ত হলো। সেই ঘটনাটা ভিক্ষুসঙ্ঘের মধ্যে বেশ প্রচার হলো। তখন একদিন ভিক্ষুরা ধর্মসভায় মিলিত হয়ে বসে বসে সেই মহিলাটির গুণের কথা বলাবলি করতে লাগল, বন্ধু, এক নারীর দ্বারা তিনজন দুঃখ থেকে মুক্ত হয়েছে। বুদ্ধ এসে জিজ্ঞেস করলেন, ভিক্ষুগণ, এখন কী কথা বলাবলি করে বসে আছ? তখন তারা ব্যাপারটা জানাল। তিনি বললেন, হে ভিক্ষুগণ, এই মহিলাটি কেবল এখন সেই তিনজনকে মুক্ত করে নি, আগেও মুক্ত করেছিল। এই বলে তিনি অতীতের কথা বলতে লাগলেন-

অতীতে বারাণসীতে ব্রহ্মদত্ত রাজার রাজত্বকালে তিনজন বনের ধারে হালচাষ করত। এরপরের ঘটনা সবই হচ্ছে উপরের মতো। এরপরে রাজা জিজ্ঞেস করলেন, তিনজনের মধ্যে কাকে চাও?

মহিলাটি বলল, তিনজনকেই দিতে পারবেন না, দেব? না। দিতে পারব না।

দিতে না পারলে আমার ভাইকে দিন।

ছেলে বা স্বামীকে নাও। ভাইকে নিয়ে কী হবে?

তখন মহিলাটি বলল, এরা হচ্ছে সহজলভ্য, কিন্তু ভাই তো দুর্লভ।

এই বলে সে এই গাথা বলল-

৬৭. “কোলে আমার ছেলে, হে দেব, পথে যাচ্ছে স্বামী।[কিন্তু] সেই দেশ দেখছি না, যেখান থেকে সহোদর ভাইকে আনব।

এখানে “কোলে আমার ছেলে” মানে হচ্ছে, হে দেব, আমার ছেলে আমার কোলেই রয়েছে। অরণ্যে প্রবেশ করে কোলে শাকসবজি সংগ্রহ করে রাখলে তখন কোলে শাকসবজি সহজলভ্য বলা যায়। তেমনিভাবে নারীর কাছে সন্তানও এই কোলের শাকসবজির মতো সহজলভ্য। তাই বলা হয়েছে,”কোলে আমার ছেলে, হে দেব”।

“পথে যাচ্ছে স্বামী” মানে হচ্ছে নারী যদি পথে একাকী চলতে থাকে, সেখানেও তার জন্য স্বামী সহজলভ্য। যাকে দেখে তাকেই স্বামী করতে পারে। তাই বলা হয়েছে, “পথে যাচ্ছে স্বামী”।

“[কিন্তু] সেই দেশ দেখছি না, যেখান থেকে সহোদর ভাইকে আনব” মানে হচ্ছে যেহেতু আমার মাতাপিতা নেই, তাই এখন মাতৃগর্ভ নামক সেই দেশ আর দেখি না, যেখান থেকে আমি একই মায়ের পেটে জন্মানো সহোদর ভাইকে আনতে পারব। তাই আমার ভাইকে-ই ফিরিয়ে দিন।

রাজা “সে তো সত্য কথা বলছে” বলে খুশি হয়ে তিনজনকেই কারাগার থেকে এনে দিলেন। তারা তিনজন সেই মহিলাকে নিয়ে চলে গেল।

বুদ্ধও “হে ভিক্ষুগণ, কেবল এখন নয়, আগেও সে এই তিনজনকে দুঃখ থেকে মুক্ত করেছিল” বলে এই ধর্মদেশনা করে সংশ্লিষ্ট ঘটনার সাথে সেই জন্মের যোগসুত্র তুলে ধরলেন এভাবে,

“অতীতের চারজন বর্তমানের এই চারজন ছিল। রাজা আমিই ছিলাম।”

জাতকটি পড়ে আমার একটা কথা মনে পড়ে গেল, History repeats itself. ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। যে ঘটনাটি অতীত জন্মেও ঘটেছিল, সেটিই বর্তমান জন্মেও ঘটতে পারে। যেমন হয়েছিল এই পরিবারটির ক্ষেত্রে। কে জানে, আমাদের জীবনেও হয়তো এরকম কোনো না কোনো ঘটনা ঘটে গেছে!

*** পালি শিক্ষার্থীদের জন্য একটা টিপস- উচ্ছঙ্গ মানে হচ্ছে কোল, কোমর।

রেফারেন্স

————

জাতক-অট্ঠকথা-১ => ১. এককনিপাতো => [৬৭] ৭. উচ্ছঙ্গজাতকৰণ্ণনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *