আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

অসুরেরা কেন অপায়ের অন্তর্ভুক্ত হলো?

এই প্রশ্নটা আমাকে অনেকদিন আগে জিজ্ঞেস করেছিল একজন। এর মাঝে দুয়েকবার তাগাদা দিয়ে মেসেজও দিয়েছে। আমি ভাবলাম, আজ লিখতেই হবে এটা। তাই চোখ বুজে নেমে পড়লাম লেখার কাজে। এর উত্তর জানতে হলে প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে অপায় কাকে বলে।

দীর্ঘনিকায়ের মহানিদান সুত্রের অর্থকথায় বলা হয়েছে- ‘অপায়’ বলতে বুঝায় নরক, ইতর প্রাণিকুল, প্রেতকুল এবং অসুরকুলকে। এসব কুলে থাকলে ধর্মবিনয়ে আয় বা শ্রীবৃদ্ধি হয় না। বিশেষ করে মার্গফল লাভ তো একদম অসম্ভব। তাই সেগুলোকে অপায় বলা হয়ে থাকে (দী.নি.অ.২.৯৫)। সোজা কথায় সেগুলোতে জন্মালে তখন নির্বাণ সাক্ষাতের আশা করা বৃথা।

চারি অপায়ের অন্যতম হচ্ছে অসুরকুল। অসুরদের মধ্যে যারা দেবতাশ্রেণির তারা অসুরভবনে থাকে, যা হচ্ছে সিনেরু পর্বতের তলদেশে, মহাসাগরের গভীরে। তারা আয়ু, চেহারা, ভোগসম্পত্তি ও শক্তির দিক দিয়ে তাবতিংস দেবগণের মতোই (সং.নি.১.২৪৭)। আমরা এদেরকে উচ্চশ্রেণির অসুর বলতে পারি।

আর যারা কালকঞ্চিক অসুর, তারা দেখতে প্রেতের মতো। তাদের আয়ু, চেহারা, সম্পত্তি, খাদ্যাভ্যাস সবই হচ্ছে প্রেতদের মতো। এমনকি তারা প্রেতদের সাথেও বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকে (কথাবত্থু.৫০৩)। আমরা তাদেরকে নিম্নশ্রেণির অসুর বলতে পারি।

এই উভয়শ্রেণির অসুরকেই অপায়ের দলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে নিম্নশ্রেণির যেসব অসুর তাদেরকে হয়তো অপায়ের অন্তর্ভুক্ত করা যায়, কিন্তু উচ্চশ্রেণির অসুরেরা তো দেবতাদের সমগোত্রীয়। তাদেরকে অপায়ের দলে ফেলা হবে কেন? তাই কেউ কেউ হয়তো মনে করেন শুধুমাত্র নিম্নশ্রেণির অসুরেরাই হচ্ছে অপায়ের পর্যায়ভুক্ত।

কিন্তু আমরা যদি দীর্ঘনিকায়ের মহাসময় সুত্র একটু স্টাডি করে দেখি তাহলে দেখব যে, উচ্চশ্রেণির অসুরেরাও অপায়ের পর্যায়ভুক্ত হতে পারে। কারণ তারা দেবতাদের মতো হলেও তাদের পক্ষে মার্গফল লাভ অসম্ভব, কুশল পুণ্যকাজে শ্রীবৃদ্ধি অসম্ভব। বিষয়টা হচ্ছে এরকম-

বুদ্ধ একসময় কপিলাবাস্তুর মহাবনে অবস্থান করছিলেন পাঁচশজন অর্হৎ ভিক্ষু সহকারে। তখন তাদেরকে দেখতে দশ হাজার বিশ্ব থেকে হাজির হয়েছিল দেবতারা। বুদ্ধ এত বিশাল দেবসমাগম দেখে চিন্তা করলেন, ভিক্ষুরা জানে না যে এখানে এত দেবতার সমাগম হয়েছে। আমি বরং তাদেরকে বলে দিই কারা কারা এসেছে। এই ভেবে তিনি বললেন, “হে ভিক্ষুগণ, দশ হাজার বিশ্বজগত থেকে বেশিরভাগ দেবতা এখানে এসে একত্রিত হয়েছে তথাগতকে দেখতে, ভিক্ষুসঙ্ঘকে দেখতে। অতীতের বুদ্ধগণকে দেখতেও এমন দেবসমাগম হয়েছিল, ভবিষ্যতের বুদ্ধগণের সময়েও এমন দেবসমাগম হবে। হে ভিক্ষুগণ, আমি দেবগণের নামগুলো বলব। তা শোন। ভালো করে মনোযোগ দাও। আমি বলছি।” এই বলে তিনি একের পর এক দেবগণের বিবরণ দিতে শুরু করলেন। তখন সেখানে অসুরেরাও এসেছিল। বুদ্ধ তাদের আগমনের কথা জানাতে গিয়ে বললেন –

বজ্রধারী ইন্দ্রের হাতে পরাজিত সাগরের অসুরেরা,  
যারা অসুরকন্যা সুজার কারণে ইন্দ্রেরই ভাই হিসেবে আখ্যা পেয়েছে,
সেই ঋদ্ধিমান যশস্বী অসুরেরা -
ভীষণরূপী কালকঞ্চা অসুর, দানৰেঘসা নামের আরেক অসুর,
বেপচিত্তি অসুর, সুচিত্তি অসুর, পহারাদ অসুর।
দেবপুত্র মারও এসেছে তাদের সাথে।
বলী মহাঅসুরের বেরোচ নামধারী একশজন পুত্র,
তাদেরকে নিয়ে অসুররাজ রাহু এসেছেন। (দী.নি.৩৩৯)

এভাবে বুদ্ধ একে একে অসুরদের নাম উল্লেখ করে তাদের আগমনের কথা জানিয়ে দিয়েছেন ভিক্ষুদেরকে। অর্থকথা প্রশ্ন তুলেছে, বেপচিত্তি অসুর, সুচিত্তি অসুর এরা মার দেবপুত্রের সাথে এসেছে কেন? অসুরেরা তো থাকে মহাসাগরে, পাতালে। আর দেবপুত্র মার থাকে পরনির্মিত বশবর্তী স্বর্গে। তারা একসাথে মিললো কীভাবে? কোথায় পাতাল, আর কোথায় স্বর্গ।

অর্থকথা তার কারণ হিসেবে বলেছে, অসুরেরা নির্বাণের পথে হাঁটতে অনিচ্ছুক, অক্ষম। মারও হচ্ছে তাদের মতো। স্বভাব একই হওয়ার কারণে তারা একসাথে এসেছে সেই দেবসমাবেশে।

এ থেকেই দেখা যায়, অসুরেরা উচ্চশ্রেণীর বা নিম্নশ্রেণির যা-ই হোক না কেন, তাদের পক্ষে মার্গফল লাভ অসম্ভব, ধর্মবিনয়ে শ্রীবৃদ্ধি অসম্ভব। অর্থাৎ অসুরকুলে জন্ম হলেই হলো, তাহলে আর সেখানে অন্তত ইহজন্মে মার্গফল ও নির্বাণ লাভের আশা বৃথা। একারণেই তাদেরকে অপায়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

4 thoughts on “অসুরেরা কেন অপায়ের অন্তর্ভুক্ত হলো?

  1. বন্দনা ভান্তে। দেবপুত্র মার কিভাবে পরনির্মিত বশবর্তী স্বর্গে থাকে। সে তো সবসময় কুশল কর্মের বিপক্ষে আর অকুশল কর্মের পক্ষে অবস্থান করে। তার কাজ তো হচ্ছে শয়তানের ছায়া হয়ে থাকা। এরপরও মার কিভাবে স্বর্গে অবস্থান করে?

    1. সে তার পুণ্যফলে স্বর্গে অবস্থান করছে। পুণ্যফল শেষ হলে তার কর্ম অনুসারেই তার গতি হবে। যেমন মধ্যমনিকায়ের মারতর্জনীয় সুত্রে বলা হয়েছে, মোগ্গল্লায়ন ভান্তে একসময় দূষী নামের মার হয়েছিলেন। তার ফলে মরণের পরে তাকে বহু হাজার বছর নরকে সেদ্ধ হতে হয়েছে। অতীতের পুণ্য থাকলে তখন সে অকুশল কাজ করেও অতীতের পুণ্যের জোরে সাময়িকভাবে পার পেয়ে যায়। কিন্তু সেই অকুশল কর্ম কিন্তু ঘাপটি মেরে বসে থাকে। তাই পাপকে হেলাফেলা করার উপায় নেই।

      1. বন্দনা ভান্তে। ধন্যবাদ। আপনাকে আমাবস্যার শুভেচ্ছা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *