আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

ইয়াঙ্গুন শহরে পিণ্ডচারণের অভিজ্ঞতা

গতকাল থেরবাদা ইউনিভার্সিটির হোস্টেলে এসে উঠেছি। এখানে বৌদ্ধধর্মের উপরে ডিপ্লোমা পড়ব। হোস্টেলে রুম একটা দিয়েছে, কিন্তু খাওয়ার বন্দোবস্ত হয় নি। নবাগতদের জন্য ডাইনিং খুলবে আগামীকাল। তাহলে আজকে খাব কী ? কাউকে চিনি না, জানি না। মাথায় কোনো আইডিয়া এলো না। শেষে ভিক্ষাপাত্র হাতে রাস্তায় বের হলাম। ফুটপাত দিয়ে হেঁটে চললাম মাথা হেঁট করে। রাস্তায় সাঁই সাঁই করে গাড়ি চলে যাচ্ছে। ইয়াঙ্গুন হচ্ছে ব্যস্ত শহর। কে কাকে দেখে। হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার মোড়ে এসে দেখলাম বেশ বড়সড় গেট। ভিআইপিদের জন্য আবাসিক এলাকা। ভেতরে যাব নাকি? গেটে দারোয়ান আছে কয়েকজন। ঢুকতে দেবে তো? আমি সাহস করে এগিয়ে গেলাম। জানতে চাইলাম, খাদ্য ভিক্ষা করতে এসেছি। ভেতরে যাওয়া যাবে কি? এক দারোয়ান ইনিয়ে বিনিয়ে জানিয়ে দিল, যাওয়া যাবে না। আমি আবারো হাঁটা শুরু করলাম।

কিছুদূর গিয়ে একটা গলি দেখতে পেলাম। একটু দাঁড়িয়ে ভাবলাম সেখানে ঢুকব কিনা। গলির মুখে ছোট ঝুপড়ি। বোধহয় ভাত-তরকারির দোকান হবে। বেঞ্চ পাতানো আছে কয়েকটা। সেখানে কয়েকজন বসে গল্পগুজব করছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি দেখে তাদের গল্প থেমে গেল। কী মনে করে আমি আরো এগিয়ে গেলাম। তারা এবার শশব্যস্ত হয়ে একটা টুল এগিয়ে দিয়ে বলল, ভান্তে বসুন। আমি বসলাম। দোকানের ভেতর থেকে এক মহিলা এসে এক থালা ভাত দিল। ঐ এক থালায় কিছু হবে না। কিন্তু নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো। তারা আমাকে আরেকটু বসতে বলল। এরপর পলিথিন ব্যাগে করে তরকারি দিয়ে দিল। আমি উঠে আবার হাঁটা শুরু করলাম।

হাঁটছি তো হাঁটছি। বড় বড় রেস্টুরেন্ট চোখে পড়ছে। কিন্তু ঢুকতে সাহস হয় না। অবশেষে একটা রেস্টুরেন্টে সাহস করে ঢুকে দাঁড়ালাম। রেস্টুরেন্টটা লোকজনে ভর্তি। কিন্তু কেউ আমার দিকে মন দিল না। একজন ভিক্ষু এসে দাঁড়িয়ে আছে সেটা যেন কেউ দেখেও দেখল না। আমার কাছের টেবিলে বসা লোকটা দুয়েকবার চোখ তুলে দেখল। এরপর উঠে এসে তার প্লেটে পড়ে থাকা সামুচা একটা দিল। আরেক কিশোর ছেলে এসে একটা দুইশ টাকার নোট তুলে দিল আমার ভিক্ষাপাত্রে। আমি বললাম, আমি পয়সা ধরি না। কয়েকবার বলাতে সে টাকাটা আবার ফিরিয়ে নিল। কিন্তু রেস্টুরেন্টের লোকজন তো কেউ এল না। এদিকে আমার একটু একটু অস্বস্তি লাগছে। তাই বেরিয়ে এসে আবার হাঁটা শুরু করলাম।

হাঁটতে হাঁটতে অনেক পথ পেরিয়ে আরেকটা রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়ালাম। এখানেও একই অবস্থা। আমাকে যেন দেখেও দেখে না কেউ। বৌদ্ধ দেশে এই অবস্থা! আমি আবারো হাঁটা শুরু করলাম। কিন্তু কিছুদূর গিয়ে আর যেতে ইচ্ছে হলো না। আর কত হাঁটব? আজকের দিনটা না হয় একটু কম খেয়েই কাটাব। তাই ফিরে চললাম।

ফেরার পথে অনেক লোকজন ঠেলে এগোতে হলো। অফিস টাইম এখন। সবাই ত্রস্ত পায়ে হেঁটে চলেছে। মাঝে মাঝে বাসস্টপ আছে। সেখানে লোকজন দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে বাসের জন্য। আমি তাদের মাঝে পথ করে এগোলাম। রাস্তায় জ্যাম লেগেছে। একজন গাড়ি থেকে চট করে নেমে দুপ্যাকেট বিস্কুট আমার ভিক্ষাপাত্রে তুলে দিয়েই আবার উঠে গেল গাড়িতে। আমি নিরবে হেঁটে ফিরে এলাম হোস্টেলে। এক ঘন্টা ইয়াঙ্গুনের পথে পথে হেঁটে বেড়িয়ে পেলাম এক থালা ভাত, তিন চার টুকরো মাংস, দু প্যাকেট বিস্কুট। সেগুলো খেয়েই সারাটা দিন কাটবে। আহা ভিক্ষু জীবন!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *