আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

বর্তমানের গাড়িটানা উৎসব এবং এর সম্ভাব্য উৎপত্তি

আপনারা হয়তো দেখেছেন, কোনো বিশিষ্ট বৌদ্ধ ভিক্ষু মারা গেলে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া উপলক্ষে গাড়িটানা নামের একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে ভিক্ষুটির মৃতদেহকে কাঁধে তুলে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নাচ প্রদর্শন করা হয়। আমার কাছে বিষয়টা বরাবরই বিদঘুটে লেগেছে। একজন ভিক্ষুর মৃতদেহকে এভাবে ঘুরানোর কোনো মানে আছে? লোকজন কী যে করে আজকাল! কিন্তু ত্রিপিটক ঘাঁটতে ঘাঁটতে একটা বিষয় জেনে বেশ অবাক হলাম। বিষয়টা বলছি।

আপনাদের হয়তো জানা আছে, বুদ্ধের প্রথম শিষ্য ছিলেন কৌণ্ডিণ্য ভিক্ষু। সংযুক্তনিকায়ের অর্থকথামতে, দেবতা ও মানুষেরা বুদ্ধের কাছে গিয়ে সুগন্ধি ফুল ইত্যাদি অর্পণ করে বুদ্ধকে পূজা করত। এরপর তারা ‘বুদ্ধের ধর্মজ্ঞানলাভী প্রথম শিষ্য জেনে এই কৌণ্ডিণ্য স্থবিরের কাছে গিয়ে তাকেও পূজা করত। কিন্তু লোকজনের মাঝে থাকার চেয়ে নিরিবিলিতে থাকাটাই তার পছন্দের ছিল। তাই তিনি হিমালয়ে গিয়ে মন্দাকিনি হ্রদের তীরে পচ্চেকবুদ্ধগণের বাসস্থান ছদ্দন্তভবনে অবস্থান করতেন। তিনি সেখানে বারো বছর কাটিয়েছিলেন।

তার নিরিবিলিতে চলে যাওয়ার আরো একটা কারণ ছিল। পিণ্ডচারণে বা ভোজনশালায় ভিক্ষুরা সবাই সিনিয়রিটি বজায় রেখে যেতেন। কিন্তু ধর্মদেশনাকালে একটু অন্যরকম হতো। মঞ্চে তখন মাঝখানে বুদ্ধের আসন সাজানো হতো, তার ডানে ধর্মসেনাপতি সারিপুত্র বসতেন। বুদ্ধের বামে বসতেন মহামোগ্গল্লান স্থবির। কৌণ্ডিণ্য স্থবিরের আসন থাকতো তাদের পিছনে।

কিন্তু এভাবে কৌণ্ডিণ্য স্থবিরকে পিছনে রেখে বসতে মনে মনে বেশ অস্বস্তিতে ভুগতেন সারিপুত্র ও মোগ্গল্লায়ন। কারণ কৌণ্ডিণ্য স্থবির ছিলেন সারিপুত্র ও মোগ্গল্লায়ন থেকে বয়সে বড়, ভিক্ষুত্বের দিক দিয়েও সিনিয়র। অথচ তাকে বাদ দিয়ে সামনের আসন দেয়া হয়েছে তাদেরকেই। কিন্তু কিছু করার নেই। এটাই নিয়তি। বয়সে নবীন হলেও তারা সামনের আসন পাবার মতো কর্ম করে এসেছে বহু জন্ম ধরে। সেকারণেই বুদ্ধ তাদেরকে তার ডানে ও বামে বসিয়েছেন। তাদের প্রার্থনা ও এতজন্মের কর্মের ফলে তো তারা সামনের আসন পাবেই।

কৌণ্ডিণ্য ভান্তে চিন্তা করলেন, ‘এরা দুজন সামনের আসন পাবার জন্য এক লক্ষ অসংখ্য কল্পেরও বেশি সময় ধরে পারমী পূরণ করেছে। অথচ এখন তারা আমার কারণে সেই সামনের আসনে বসতে সংকোচ বোধ করে, লজ্জা বোধ করে। ঠিক আছে। আমি তাদের অস্বস্তি দূর করব।’ তাই তিনি বুদ্ধের কাছে গিয়ে বললেন, ‘ভান্তে, আমি প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেতে চাচ্ছি।’ বুদ্ধ তাকে অনুমতি দিলেন।

কৌণ্ডিণ্য স্থবির তখন তার বাসস্থান গুছিয়ে রেখে পাত্র ও চীবর নিয়ে হিমালয়ের মন্দাকিনি হ্রদের তীরে চলে গেলেন। সেখানে অবস্থান করত ৮০০০ হাতি। তারা আগে পচ্চেক বুদ্ধগণকে সেবাযত্ন করত। কিন্তু সম্যকসম্বুদ্ধের আবির্ভাবের সময়ে পচ্চেকবুদ্ধগণও আর থাকেন না। এখন বহুদিন পরে কৌণ্ডিণ্য ভান্তেকে দেখে তারা খুশি হয়ে ভাবল, ‘আমাদের পুণ্যক্ষেত্র এসে গেছে!’ সেখানকার পথঘাট সব ঘাস ও ঝোপঝাড়ে ঢেকে গিয়েছিল। হাতিরা নখ দিয়ে সেগুলোকে তুলে সাফ করে ফেলল। ভান্তের বাসস্থানকে পরিষ্কার করে দিল। এরপর তারা সবাই মিলে আলোচনা করে বারিকনাগ নামের এক হাতিকে ভান্তের সেবক হিসেবে ঠিক করল। সেই হাতিটা সকালে কৌণ্ডিণ্য ভান্তেকে মুখ ধোয়ার পানি এনে দিত, দাঁত মাজার কাঠি এনে দিত। এভাবে সে ভান্তের সকালবেলার কাজগুলো করে দিত।

ফুল ফোটার সময়ে বাতাস এসে ফুলের রেণুগুলোকে উঠিয়ে নিয়ে পদ্মপাতার উপরে ফেলে দিত, সেখানে পানিও থাকত। সেগুলো সূর্যের তাপে তপ্ত হয়ে ঘন দুধের রসের মতো হয়ে যেত। এটাকেই বলা হয় পোক্খরমধু বা পদ্মমধু। হাতিরা সেটা এনে ভান্তেকে দিত। শ্বেতপদ্মের মূলগুলো লাঙ্গলের ফলার মতো বড় হতো। তারা সেগুলোও তুলে এনে ভান্তেকে দিত। শ্বেতপদ্মের ডাঁটাগুলো বড় বড় ঢোলের মতো হতো। সেগুলোর এক একটা পর্বে ছোট পাত্রের পরিমাণে দুধ হতো। তা এনে ভান্তেকে দিত। পদ্মফুলের বীজগুলো মধু ও গুড়ের সাথে মিশিয়ে ভান্তেকে দিত। আখ এনে পাথরের উপরে রেখে পা দিয়ে পিষত। তা থেকে রস বের হলে শুঁড়ের আগায় রেখে দিয়ে সূর্যতাপে গরম করে নিত। সেই রস তখন দুধের গোলকের মতো শক্ত হয়ে যেত। সেটা এনে ভান্তেকে দিত। আর পাকা কাঁঠাল, কলা, আম ইত্যাদির কথা তো বলাই বাহুল্য।

কৈলাস পর্বতে নাগদত্ত নামক দেবতা বসবাস করত। কৌণ্ডিণ্য ভান্তে মাঝেমাঝে সেই দেবতার বিমানের দরজায় গিয়ে দাঁড়াতেন। দেবতা তখন ঘি ও পদ্মমধুচুর্ণ মিশ্রিত বিশুদ্ধ পায়েস দিয়ে ভান্তের পাত্র পূর্ণ করে দিত। এই দেবতা নাকি কশ্যপ বুদ্ধের আমলে বিশ হাজার বছর ধরে সুগন্ধি ঘি সহকারে ভিক্ষুসঙ্ঘকে দুধভাত দিয়েছিল। তার পুণ্যফলে তার এমনিতেই এই ভোজন উৎপন্ন হতো।

এভাবে বারো বছর পর্যন্ত সেখানে বসবাস করে কৌণ্ডিণ্য ভান্তে একদিন নিজের আয়ু দেখে জানতে পারলেন তার আয়ু ফুরিয়ে আসছে। তিনি চিন্তা করলেন কোথায় পরিনির্বাপিত হবেন। এই হাতিরা তাকে দীর্ঘ বারো বছর যাবত সেবাশুশ্রুষা করে এসেছে। বড়ই দুঃসাধ্য কাজ করেছে। বুদ্ধকে জানিয়ে তাদের কাছেই শেষ দিনগুলো কাটানো উচিত হবে। এই চিন্তা করে তিনি আকাশে উঠে নিমেষেই বুদ্ধের কাছে গিয়ে হাজির হলেন। তিনি বুদ্ধের পায়ে মাথা রেখে বন্দনা করলেন, বুদ্ধের পায়ে চুমু খেলেন, পাগুলোতে হাত বুলিয়ে দিলেন, নিজের নামও ঘোষণা করে দিলেন, ‘হে ভগবান, আমি কৌণ্ডিণ্য। হে সুগত, আমি কৌণ্ডিণ্য।’

তার এমন নাম ঘোষণা দেয়ার কারণ কী? তিনি বুদ্ধের প্রথম ধর্মজ্ঞানলাভী মহাশিষ্য। বুদ্ধের কাছে তার নতুন করে পরিচয় দেয়ার দরকার আছে নাকি? আসলে কারণটা ছিল এরকম। বুদ্ধের সামনে ছিল বহু ভিক্ষু, ভিক্ষুণী, উপাসক, উপাসিকার দল। তাদের মধ্যে যারা প্রবীণ তারা তাকে চিনত, কিন্তু নবীনরা তাকে দেখে নি, তাই তাকে চিনতও না। কৌণ্ডিণ্য ভান্তে চিন্তা করেছিলেন, আমাকে না চিনে কেউ কেউ মনে মনে ভাবতে পারে, কে এই পাকাচুলো কুঁজো হয়ে থাকা বুড়ো যে বুদ্ধের সাথে এমনভাবে আলাপ সালাপ করছে যেন অতি পরিচিত! এভাবে মনে ক্ষোভ নিয়ে ভাবলে তারা দুর্গতিতে পড়ে যাবে। কিন্তু আমার পরিচয় জানলে তারা তখন ভাববে, ইনিই তাহলে সেই কৌণ্ডিণ্য ভান্তে! বুদ্ধের একজন মহাশিষ্য। এভাবে যারা মনে শ্রদ্ধাসহকারে ভাববে, তাদের সুগতি হবে। এই ভেবে তিনি উপস্থিত লোকজনের প্রতি দয়া করে নিজের নাম জানিয়েছিলেন।

বুদ্ধের সাথে প্রীতি সম্ভাষণমূলক আলাপ শেষে তিনি বললেন, ‘ভান্তে, আমার আয়ু শেষ হয়ে এসেছে। আমি পরিনির্বাপিত হবো।’ বুদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় পরিনির্বাপিত হবে, কৌণ্ডিণ্য? কৌণ্ডিণ্য ভান্তে তখন মন্দাকিনি হ্রদের তীরে হাতিদের কাছে ফিরে যাওয়ার কথা জানালেন। বুদ্ধ নিরবে অনুমোদন দিলেন।

কৌণ্ডিণ্য ভান্তে বুদ্ধের চারপাশে প্রদক্ষিণ করে বললেন, ভান্তে, এই আপনার সাথে আমার শেষ দেখা। লোকজন বুদ্ধকে বন্দনা করে বের হয়ে বিহারের গেটে জড়ো হয়েছিল। কৌণ্ডিণ্য ভান্তে তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘শোক করো না। হাহুতাশ করো না। বুদ্ধ হোক বা বুদ্ধের শিষ্যই হোক, উৎপন্ন সংস্কারগুলো বিলীন হয়ে যায় না এমন কিছু নেই।’ এভাবে তিনি লোকজনকে উপদেশ দিয়ে তাদের চোখের সামনেই আকাশে উঠে হিমালয়ের মন্দাকিনি হ্রদের তীরে চলে আসলেন।

তিনি সেখানে বাসস্থান গুছিয়ে পরিষ্কার করে রাখলেন শেষবারের মতো। এরপর হ্রদে নেমে গোসল করে অন্তর্বাস ও চীবর পরিধান করে ধ্যানমগ্ন হলেন। সারারাত ধ্যানে কাটিয়ে দিয়ে ভোরবেলায় পরিনির্বাপিত হলেন। তার পরিনির্বাণের সাথে সাথে হিমালয়ের গাছপালাগুলো দুলে উঠলো, যেন প্রবল বাতাস বয়ে গেল তাদের উপর দিয়ে।

বারিক হাতি তখনো জানত না কৌণ্ডিণ্য ভান্তে পরিনির্বাপিত হয়েছেন। তাই সে আগের মতোই সাতসকালে মুখ ধোয়ার পানি ও দাঁত মাজার কাঠি এনে রেখে দিল যথাস্থানে। এরপর ফলমূল সংগ্রহ করে এনে ভান্তের পায়চারি করার পথে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় রইল। সূর্যোদয়ের পরেও ভান্তে আসছেন না দেখে সে ভাবল, কী হলো? আগে তো ভান্তে সকালে উঠেই পায়চারি করতেন, মুখ ধুয়ে নিতেন। আজ দেখি কুটির থেকেও বের হচ্ছেন না। এই ভেবে সে কুটিরের দরজা দিয়ে দেখল ভান্তে তখনো বসে আছেন। তখন সে হাত বাড়িয়ে ভান্তেকে ছুঁয়ে দেখল। কোনো সাড়া নেই দেখে ভান্তে শ্বাস নিচ্ছেন কিনা দেখল। শ্বাস নিচ্ছেন না দেখে বুঝতে পারল ভান্তে পরিনির্বাপিত হয়েছেন। সে তখন শুঁড় মুখে দিয়ে বিশাল শব্দে কেঁদে উঠল। সারা হিমালয় সেই শব্দে কেঁপে উঠল। ৮০০০ হাতি সবাই মিলে ভান্তের মৃতদেহকে পিঠে তুলে নিয়ে, ফুলে ফুলে ভরা ডালপালা সহকারে সারা হিমালয় পাক খেয়ে আগের স্থানে ফিরে আসল।

দেবরাজ সক্ক (ইনি সাধারণত আমাদের কাছে দেবরাজ ইন্দ্র হিসেবেই বেশি পরিচিত) তখন বিশ্বকর্মাকে ডেকে বললেন, ‘বাপু, আমাদের বড়ভাই পরিনির্বাপিত হয়েছেন। তার যথাযোগ্য সৎকার করতে হবে। ৯ যোজন বিস্তৃত একটা ঘর বানাও।’ বিশ্বকর্মা তখন একটা সুঁচালো চুড়াওয়ালা ঘর বানিয়ে তাতে কৌণ্ডিণ্য ভান্তের মৃতদেহকে শুইয়ে দিয়ে সেটা হাতিদেরকে দিল। হাতিরা ঘরটাকে তুলে নিয়ে আবারো হিমালয়ের চারপাশে ঘুরিয়ে আনল। তাদের হাত থেকে দেবতারা সেই ঘরটাকে তাদের কাঁধে তুলে নিল। তারা সাধুবাদ দিতে দিতে সেটাকে ঘোরাতে লাগল, যেটাকে বলা হয় সাধুক্রীড়া। দেবতাদের হাত থেকে ব্রহ্মারা ঘরটাকে তুলে নিয়ে সেভাবে ঘুরিয়ে এনে আবার দেবতাদের কাছে তুলে দিল। দেবতারা এবার সেটাকে হাতিদের কাছে ফিরিয়ে দিল।

এবার প্রত্যেক দেবতা চার আঙুল মাপের চন্দন এনে চিতা সাজাল। সব মিলিয়ে ৯যোজন বিস্তৃত চন্দন কাঠের চিতা হয়ে গেল। এরপর ঘরটাকে তুলে দেয়া হলো সেই চিতার উপর। পাঁচশত ভিক্ষু গিয়ে সেখানে সারারাত সুত্র আবৃত্তি করল। অনুরুদ্ধ স্থবির সেখানে গিয়ে ধর্মদেশনা দিলেন। বহু দেবতার ধর্মজ্ঞান লাভ হলো। পরদিন সকালে চিতার আগুন নেভানো হলো। চিতা থেকে জুঁই ফুলের মতো ধবধবে সাদা রঙের ধাতু পাওয়া গেল। সেগুলো ভিক্ষুরা জলছাঁকনিতে পুরে নিয়ে বুদ্ধের হাতে দিয়ে দিল। বুদ্ধ জলছাঁকনি নিয়ে ভূমির দিকে হাত বাড়ালেন। অমনি মাটি ভেদ করে রৌপ্যময় জাদী বের হয়ে এলো। বুদ্ধ নিজ হাতে সেই ধাতুগুলো সেখানে রেখে দিলেন। সেই জাদী নাকি এখনো বর্তমান। (সং.অ.১.২১৭)

আমাদের মধ্যেও বর্তমানে কোনো বিশিষ্ট ভিক্ষু মারা গেলে এরকমভাবে ঘর বানিয়ে গাড়ি টানা নামের একটা উৎসব করা হয়। সেটার উৎপত্তি বোধহয় এই এখান থেকেই হয়েছে।

ছবি ক্রেডিট: Maung Hla Pru Pintu
https://www.facebook.com/maung.pintu

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *