আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

ভিক্ষু ও মেয়ে সম্পর্কিত দুটো গল্প

আমি ভিক্ষু। তাই আমার লেখায় ভিক্ষুদের নিয়ে গল্প থাকবেই। আসুন দুটো গল্প শুনি। প্রথমে মহাযানী গল্পটি বলা যাক। গল্পটি হচ্ছে এরকম – এক ভিক্ষু এক মেয়েকে বয়ে নিয়ে নদী পার করে দিল। আরেক ভিক্ষু তাকে বলল, কী ব্যাপার? তুমি তাকে বয়ে নিয়ে নদী পার করিয়ে দিলে? ভিক্ষুরা মেয়েদেরকে ধরতেও পারে না, বয়ে নেয়া তো দূরের কথা। তখন প্রথম ভিক্ষুটি বলল, আমি তো মেয়েটাকে অনেক আগেই নদীর পাড়ে নামিয়ে দিয়ে এসেছি। অথচ তুমি তাকে এখনো মনে মনে বয়ে বেড়াচ্ছ।

এটা মূলত মহাযানী জেন বৌদ্ধধর্মের শিক্ষা। এটা শিক্ষা দেয় যে, আপনি হয়তো পরিস্থিতির মুখে পড়ে অতীতে এমন কিছু করেছিলেন যা আসলে করা অনুচিত ছিল। কিন্তু আপনার সেটির জন্য আফসোস বা অনুশোচনা করা উচিত নয়। অতীত হচ্ছে অতীতই। সেটা নিয়ে চিন্তা করে মনের বোঝা বাড়ানোর কোনো অর্থ হয় না। অথচ আমাদের ভিক্ষুদের অনেকেই [সাথে তার কতিপয় উপাসক উপাসিকা] এর অর্থ বুঝে নেয় এভাবে- মনই হচ্ছে সবকিছুর মূলে। মনে পাপ না থাকলে কোনো সমস্যা নেই। মেয়ে ধরতেও সমস্যা নেই, কোলে করে নাচতেও কোনো সমস্যা নেই। অন্য আরো অনেক কিছু করতেও কোনো সমস্যা নেই।

কিন্তু ত্রিপিটক কী বলে? তার জন্য আমরা ধর্মপদের একটা কাহিনীর উদাহরণ দিতে পারি। এক মেয়ে মহাকাশ্যপ ভান্তেকে দান দিয়ে মরণের পরে স্বর্গে জন্ম নিয়েছিল দেবকন্যা হিসেবে। পুণ্য যাতে আরো বেশি হয় তার জন্য ভোর না হতেই সেই দেবকন্যা স্বর্গ হতে নেমে এসে মহাকাশ্যপ ভান্তের কুটিরের আশপাশ ঝাড়ু দিয়ে দিত, পানি এনে রেখে দিত। এক রাতে মহাকাশ্যপ ভান্তে দেখলেন কুটিরের বেড়ার ফাঁক দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে। বের হয়ে দেখলেন সেই মেয়েটি। তিনি মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলেন তুমি কে? ভান্তে আমি আপনার উপাসিকা খই দেবকন্যা।

ভান্তে বললেন, এই নামে তো আমার কোনো উপাসিকা নেই। দেবকন্যা বলল, ভান্তে আমি আপনাকে খই দান দিয়ে স্বর্গে জন্ম নিয়েছি। তাই পুণ্য আরো বাড়াতে আপনার সেবা করতে এসেছি।

ভান্তে জিজ্ঞেস করলেন, গতরাত ও তার আগের রাতে ঝাড়ু দিয়েছ, পানি তুলে রেখে দিয়েছ, সেটাও কি তুমিই? দেবকন্যা স্বীকার করল।

ভান্তে এবার বললেন, চলে যাও, দেবকন্যা। যা করেছ, করেছ। এরপর আর এখানে এসো না। দেবকন্যা কাতর স্বরে বলল, ভান্তে, আমার সর্বনাশ করবেন না। আপনার সেবা করে আমার পুণ্য আরো দীর্ঘস্থায়ী হতে দিন।

ভান্তে আবার বললেন, চলে যাও। ভবিষ্যতকালে ভিক্ষুরা ‘রাতে নাকি এক দেবকন্যা এসে মহাকাশ্যপ ভান্তেকে সেবা করত’ এরকম যাতে বলাবলি করতে না পারে। যাও যাও। এরপর থেকে আর এসো না। কিন্তু দেবকন্যা নাছোড়বান্দার মতো বলতেই থাকল, ভান্তে আমার সর্বনাশ করবেন না।

মহাকাশ্যপ ভান্তে দেখলেন দেবকন্যা কোনো কথা শুনছে না। তাই তিনি সজোরে তুড়ি মেরে বললেন, ‘এই, তুমি কিন্তু বাড়াবাড়ি করছ!’ দেবকন্যা তখন আর সেখানে থাকতে না পেরে আকাশে উঠে কাঁদতে শুরু করল।

জেতবনে বসে দেবকন্যার কান্না শুনতে পেলেন বুদ্ধ। তিনি সেখান থেকেই দেবকন্যাকে বুঝালেন, হে দেবকন্যা, আমার পুত্র কাশ্যপের সংযত থাকাটা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু পুণ্যার্থীদের পুণ্য করাটা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এভাবে বুদ্ধও মহাকাশ্যপ ভান্তের সংযত থাকার প্রশংসা করেছিলেন। (ধম্মপদ অর্থকথা=> ৯.পাপৰগ্গ => ৩. লাজদেৰধীতাৰত্থু)

দেখলেন তো, অর্হৎ হয়েও মহাকাশ্যপ ভান্তে কত সংযত। অথচ মহাযানী গল্পে কী বুঝানো হয়েছে, আর ত্রিপিটকে কী আছে। একারণেই মহাযানী বৌদ্ধধর্মকে অনুসরণ করলে পদে পদে বুদ্ধশাসনের অবনতি ঘটা অবশ্যম্ভাবী। সেটা ঠেকাতে হলে চাই সুশীল ভিক্ষু, চাই বিনয়কে সম্মানকারী ভিক্ষু। বড় বড় বিহার নির্মাণ নয়, ঘন্টার পর ঘন্টা দেশনা দেয়া নয়, হাজার হাজার উপাসক উপাসিকার ভিড় নয়। বরং বিনয়নিয়ম পালনকারী সুশীল ভিক্ষুদের মাধ্যমেই বুদ্ধশাসন দীর্ঘস্থায়ী হয়। সাধারণ লোকজনের চোখে হয়তো মনে হতে পারে, বাহ, কত বড় বড় বিহার হচ্ছে। কত বড় বড় বুদ্ধমূর্তি হচ্ছে। দেশে বিদেশে কত মানুষ বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করছে। এক একটা অনুষ্ঠানে কত লোকের সমাগম হচ্ছে। কিন্তু বৌদ্ধধর্ম যারা গভীরভাবে জানে, তারা জানে যে এগুলো লোক দেখানো মাত্র। ওসব বড় বড় দালানকোঠা দিয়ে বৌদ্ধধর্ম দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বৌদ্ধধর্ম টিকে থাকে সুশীল ভিক্ষুদের উপরে। যতদিন ভিক্ষুরা নিজেদের খেয়াল খুশিমত না চলে বুদ্ধের বেঁধে দেয়া বিনয় নিয়মগুলোকে আদরের সাথে পালন করবে ততদিন সদ্ধর্ম বা সত্যধর্ম বেঁচে থাকবে।

যদিও লেখাটা বেশি লম্বা হয়ে যাচ্ছে, তবুও আরেকটু আলোচনা করতে ইচ্ছে করছে। বিশুদ্ধি মার্গে বলা হয়েছে, বিনয় নিয়মগুলো পালন করতে হয় শ্রদ্ধা দ্বারা। আমাদের যদি কারো প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা থাকে, তাহলে শ্রদ্ধার খাতিরে আমরা তার সব কথা চোখ বুজে মেনে নিই। কারণ কী? তার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা আছে, আস্থা আছে। অন্তরের মধ্যে আমাদের বিশ্বাস আছে যে তার কথা সঠিক। তাই আমরা সেই শ্রদ্ধাস্থানীয় ব্যক্তির কথা নির্দ্বিধায় পালন করি।

বিনয় পালনের ক্ষেত্রেও সেরকম। বিনয়শীলগুলো কেউ প্রজ্ঞাপ্ত করে নি। বুদ্ধ স্বয়ং এগুলো সর্বজ্ঞতা জ্ঞানে প্রজ্ঞাপ্ত করেছেন। নির্বাণ আমরা চোখেও দেখি নি, মার্গফল লাল নাকি কালো সেটাও আমরা জানি না। কিন্তু বুদ্ধের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা আছে, বিশ্বাস আছে। তাই শ্রদ্ধার খাতিরে আমরা তার সব কথা চোখ বুজে মেনে নিই। অন্তরের মধ্যে আমরা বিশ্বাস করি যে বুদ্ধের শিক্ষা সঠিক। তার বেঁধে দেয়া নিয়মগুলো ধরে চললেই আমরা নির্বাণ পাব।

এখন কারো যদি বুদ্ধের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা না থাকে, বুদ্ধের সর্বজ্ঞতাজ্ঞানকে বিশ্বাস না করে, নির্বাণকে বিশ্বাস না করে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তার তখন বিভিন্ন সন্দেহ এসে মনে উঁকি দেবে। বিভিন্ন প্রশ্ন এসে মনে উঁকি দেবে। মনে হবে বুদ্ধের নিয়মগুলোকে পরিবর্তন করার সময় এসেছে। এভাবে তারা তখন বিভিন্ন অজুহাতে বুদ্ধের উপর গুরুগিরি করতে চাইবে। যেটা অতীতেও মহাযানীরা করেছিল। এখনো অনেক ভিক্ষু করছে বা করতে চাইছে। কিন্তু কিছু ভিক্ষু থাকে বুদ্ধের বিনয়ের প্রতি বিশ্বস্ত। তাই তারা সেগুলো অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। এরকম ভিক্ষুই দেবমানবের প্রশংসার যোগ্য। তাদের দ্বারাই বুদ্ধের শাসন আরো অন্তত কিছু বছর নির্মলভাবে বেঁচে থাকবে।

এখন অনেক ভিক্ষুকে দেখি মেয়েদের সাথে কত কী করে। আর এই ভিক্ষুরা সমাজসেবামূলক কাজ করে বলে সমাজের প্রভাবশালী অনেকেই তাদের পক্ষ হয়ে গুণগান করে। তারা বলে, মনে পাপ না থাকলে মেয়ে পিঠে করে বয়ে নিয়ে বেড়ালেও সমস্যা নেই! অথচ মহাকাশ্যপ ভান্তে অর্হৎ হয়েও কত সংযত ছিলেন। এবার আপনারাই বুঝে নিন কার কথা ধরলে মঙ্গল হবে, বুদ্ধশাসন দীর্ঘস্থায়ী হবে। কার কথা ধরলে সর্বনাশ হবে, বুদ্ধশাসনের পরিহানি হবে।

(সরি, লেখাটা লম্বা হয়ে গেল। তবে এটা নিশ্চিত থাকতে পারেন, আমার সাথে থাকলে মাঝে মাঝেই এরকম উদো-ন-পিয়ে লেখা পড়ার সুযোগ হবে। 😊😊😊)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *