আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

তপোদা নদীর খোঁজে

আজ সারাদিন ধরে তপোদা নদীকে খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে গেলাম। তপোদা নদী ছিল রাজগৃহের কাছেই বয়ে যাওয়া একটি গরম পানির নদী। সেই নদীর পানি থেকে বেশ বড়সড় একটি গরম পানির হ্রদের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই হ্রদের নাম ছিল তপোদা হ্রদ। সেই হ্রদের সামনে তখন একটা বিহার ছিল। হ্রদের নামেই সেই বিহারেরও নাম হয়েছিল তপোদারাম বিহার। (মজ্ঝি.অ.০৩.২৭৯)

এখন এই তপোদা নদীর পানি গরম হলো কেন? এর উত্তরে পারাজিকা গ্রন্থে বুদ্ধ বলেছেন, তপোদা নদী বেরিয়েছে বেভার পর্বতের নিচে অবস্থিত একটি হ্রদ থেকে। সেখান থেকে বের হয়ে এটি দুটো মহানরকের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে। সেকারণে তার পানি এত গরম। (পারা.২৩১)

অর্থকথায় এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, রাজগিরের চারদিক ঘিরে নাকি মহাপ্রেতলোক রয়েছে। সেখানে দুটো বিরাট লৌহকুম্ভী নরক রয়েছে। লৌহকুম্ভী মানে হচ্ছে লোহার হাঁড়ি। সেই লোহার হাঁড়িতে নরকের পাপী লোকজনকে সেদ্ধ করা হয়। তাই নরকগুলো থাকে সবসময় গরম। একারণে নরকের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পানিও সেই আগুনের তাপে গরম হয়ে বয়ে যায়। (পারা.অ.২৩১)

বাস্তবে ব্যাপারটা একটু খোঁজ নেয়ার ইচ্ছে হলো। নাগভবন, নরক এগুলো তো অদৃশ্য জগতের। তাই সেগুলো খুঁজে পাওয়ার আশা বৃথা। কিন্তু এই নদীর উৎস বেভার পর্বতটা কোথায়? তপোদা নদীই বা এখন কোথায়? আসলেই কি সেই নদীর পানি গরম?

গুগল ম্যাপে বেভার পর্বত নামে কিছুই পাওয়া গেল না। তপোদা নদীরও নামনিশানা নেই। অবশেষে সারাদিন খুঁজে খুঁজে ওমল্লে (L.S.S. O`malley) নামক লেখকের রচিত Bihar And Orissa District Gazetteers Patna বইতে বিম্বিসার রাজার আমলের পুরনো রাজগৃহের মানচিত্রটি খুঁজে পেলাম। বুদ্ধের আমলের রাজগৃহ শহরকে ঘিরে ছিল ৰেভার, ৰেপুল্ল, গিজ্ঝকূট, ইসিগিলি ও পণ্ডৰ এই পাঁচটি পর্বত (সুত্তনি.অ.৪১১)। সেই ৰেভার পর্বত বর্তমানে বৈভারগিরি নামে পরিচিত। ৰেপুল্ল পর্বতের নাম হয়ে গেছে বিপুলগিরি। গিজ্ঝকূট পর্বত গৃধকুট নামে পরিচিত। ইসিগিলি পর্বত হয়ে গেছে স্বর্ণগিরি বা শ্রমণগিরি। পণ্ডৰ পর্বতের নাম বোধহয় উদয়গিরি।

প্রাচীন রাজগৃহ নগরী

তাহলে বৈভারগিরির নিচেই রয়েছে নাগভবন! হুম। তপোদা নদী তাহলে সেখান থেকেই বেরিয়েছে। তবে তপোদা নদী এখন আর নেই। তপোদা হ্রদও নেই। তপোদারাম বিহারের জায়গায় বিশাল একটা লক্ষী নারায়ণ মন্দির হয়েছে। গুগলম্যাপে মন্দিরটা সহজেই খুঁজে পাওয়া গেল বৈভার পর্বতের কাছে। দুয়েকটা ভিডিওতে সেখানে লোকজনকে গাদাগাদি করে গরমপানিতে গোসল করতে দেখলাম। গরমপানিতে নাকি সালফার বা গন্ধক রয়েছে। তাই সেই পানিতে গোসল করলে অনেক চর্মরোগ ভালো হয়। তবে গোসলের দৃশ্যগুলো দেখে খুব একটা স্বাস্থ্যকর মনে হলো না আমার কাছে।

আরেক ভিডিও থেকে জানা গেল রাজগিরে নাকি এরকম অনেকগুলো গরম পানির কুপ রয়েছে। তার মধ্যে নাকি ব্রহ্মকুণ্ড নামের গরম পানির কুপটাই সবচেয়ে বড়। ভিডিওর লোকটা ভারতীয়। সে খুব সুন্দরভাবে হিন্দিতে সবকিছু বুঝিয়ে দিল। সেখানকার পানি নাকি আগে খুবই গরম ছিল। আগে নাকি পুণ্যার্থীরা সেখানে গিয়ে চাউলের পাত্রে এই গরম পানি রেখে দিলেই সেগুলো সেদ্ধ হয়ে যেত। সময়ের পরিবর্তনে কতকিছু পাল্টে যায়।

আপনারা যারা রাজগিরে গেছেন তারা দয়া করে আমাদের মতো অভাগাদের একটু রাজগিরের গল্প শোনান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *