আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

ত্রিপিটকধরদের নিয়ে কিছু তথ্য

ত্রিপিটকধরদের নিয়ে বাংলাদেশের বৌদ্ধদের মধ্যে কৌতুহলের সীমা নেই দেখছি। তাই এব্যাপারে কিছু তথ্য দিলাম।

ত্রিপিটকধর নির্বাচন পরীক্ষা (Tipitakadhara TipitakaKovida Selection Examination) হচ্ছে মায়ানমারের সর্বোচ্চ ধর্মীয় পরীক্ষা। এর ৭০তম ত্রিপিটকধর নির্বাচন পরীক্ষা শুরু হয়েছিল গত ২৬ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে। মোট ৩৩ দিন ধরে এই পরীক্ষা চলে। শেষ হয় ২৭ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখে। এভাবে প্রতিবছর ৩৩দিন ধরে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

ত্রিপিটকধর পরীক্ষায় অংশ নিতে হলে কমপক্ষে পথমজি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। এই পথমজি পরীক্ষা খুবই কঠিন। এক সেয়াদ নাকি ১২ বছর ধরে পথমজি পরীক্ষা দিয়ে পাস করতে না পেরে কাপড় ছেড়ে গৃহী হয়ে গিয়েছিল। ভিয়েতনামের এক ভিক্ষু ৬ বছর ধরে পথমজি পরীক্ষা দিয়ে পাস করতে না পেরে মনের দুঃখে ভিয়েতনামে ফিরে গেছে। এগুলো খুবই শক্ত পরীক্ষা। আমি এখনো বার্মিজ স্টাইলে পড়ালেখা শুরু করি নি। হিসেব করে দেখেছি প্রথম থেকে শুরু করে (অর্থাৎ বার্মিজ শ্রামণরা যেখান থেকে শুরু করে সেখান থেকে) বছর বছর পাস করলেও ঐ পথমজি পরীক্ষায় পাস করতে আমার ৮/১০ বছর লাগবে। তারপর ত্রিপিটকধর হতে চাইলে আরো ৫ বছর লাগবে। ততদিনে বোধহয় মরেই যাব!!

সে যাই হোক, প্রার্থীকে প্রথমে ত্রিপিটকধর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। ত্রিপিটকধর পরীক্ষাটা চলে ৫বছর ধরে। প্রতিবছর ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত ৩৩দিন ধরে পরীক্ষা চলে। প্রতিবছর বিভিন্ন ভিক্ষুরা সেখানে ত্রিপিটকের বিভিন্ন অংশের পরীক্ষা দিয়ে থাকে। প্রার্থীকে প্রথম ও দ্বিতীয় বছরে বিনয় পিটকের পরীক্ষা দিতে হয় ২০ দিন ধরে। বিনয় পিটকের ৫টি গ্রন্থ। প্রত্যেকটি গ্রন্থের জন্য ৩দিন ধরে পরীক্ষা চলে। এর সাথে বাকি ৫দিন চলে অর্থকথা ও টীকাগুলোর উপরে লিখিত পরীক্ষা। তৃতীয় বছরে সুত্রপিটকের উপর পরীক্ষা হয়। চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে চলে অভিধর্মের উপরে পরীক্ষা।

এভাবে যিনি সবগুলো মুখস্থ পরীক্ষায় পাস করতে পারেন তিনি হন ত্রিপিটকধর। মুখস্থ পরীক্ষার চেয়েও কঠিন হচ্ছে লিখিত পরীক্ষা। যিনি সবগুলো লিখিত পরীক্ষায় পাস করতে পারেন তিনি হন ত্রিপিটককোবিদ।

মায়ানমারের ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোট ১৪জন ‘ত্রিপিটকধর ত্রিপিটককোবিদ’ হয়েছেন। এরা হচ্ছেন সর্বোচ্চ সম্মানিত ধর্মীয় গুরু। আর ‘ত্রিপিটকধর’ হয়ে আছেন ৮ জন। তারা পরবর্তীতে লিখিত পরীক্ষায় পাস করলে হবেন ‘ত্রিপিটকধর ত্রিপিটককোবিদ’।

******************ত্রিপিটকধর ত্রিপিটককোবিদ********************
নিচে রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বোচ্চ সম্মানিত ‘ত্রিপিটকধর ত্রিপিটককোবিদ’ সেয়াদগণের তালিকা দেয়া হলো:
১=> ১৯৫৩ সাল: মিনগুন তিপিটকধর সেয়াদ ভদন্ত ৰিচিত্তসারাভিৰংস (১৯১০-১৯৯২)
২=> ১৯৫৯ সাল: পাখোকু তিপিটকধর সেয়াদ ভদন্ত নেমিন্দ (১৯২৮-১৯৯১)
৩=> ১৯৬৩ সাল: পিয়ে তিপিটকধর সেয়াদ ভদন্ত কোসল্ল (১৯২৭-১৯৯৫)
৪=> ১৯৭২ সাল: ইয়ানগুন তিপিটকধর সেয়াদ মহাগন্ধায়োন সেয়াদজি ভদন্ত সুমঙ্গলালঙ্কার (১৯৪৬ – ২০০৬)
৫=> ১৯৮৪ সাল: য়োহ্ তিপিটকধর সেয়াদ ভদন্ত সিরিন্দাভিৰংস (১৯৪৩ – )
৬=> ১৯৯৪ সাল: য়েসাজো তিপিটকধর সেয়াদ ভদন্ত ৰাযামিন্দাভিৰংস (১৯৫৫-)
৭=> ১৯৯৯ সাল: মজুন তিপিটকধর সেয়াদ ভদন্ত সীলক্খন্ধাভিৰংস (১৯৬৪ – )
৮=> ১৯৯৯ সাল: ম্যিংমু তিপিটকধর সেয়াদ ভদন্ত ৰংসপালালঙ্কার (১৯৬৫ – )
৯=> ২০০০ সাল: ম্যিংছাং তিপিটকধর সেয়াদ ভদন্ত গন্ধমালালঙ্কার (১৯৬৮ – )
১০=> ২০০৩ সাল: ম্যাঁই সুনলুন সেয়াদ তিপিটকধর সেয়াদ ভদন্ত সুন্দর (১৯৫৫ – )
১১=> ২০০৩ সাল: রম্মাৰতী তিপিটকধর সেয়াদ ভদ্দন্ত ইন্দপাল (১৯৬০ – )
১২=> ২০০৯ সাল: সাগাইং তিপিটকধর সেয়াদ অশিন অভিজাতাভিৰংস (১৯৬৮ – )
১৩=> ২০১২ সাল: সাগাইং তিপিটকধর সেয়াদ অশিন ইন্দাচরিয (১৯৬৪ – )
১৪=> ২০১৭ সাল: দাগন তিপিটকধর সেয়াদ ভদন্ত ৰীরিযানন্দ (১৯৭০ -)

******************ত্রিপিটকধর********************
২০১৮ সাল পর্যন্ত শুধু ‘ত্রিপিটকধর’ হয়েছেন ৮ জন। নিচে এই ‘ত্রিপিটকধর’ সেয়াদগণের তালিকা দেয়া হলো:
১=> ১৯৯৭ সাল: ত্রিপিটকধর সেয়াদ অশিন কোণ্ডঞ্ঞ
২=> ২০১১ সাল: ত্রিপিটকধর সেয়াদ অশিন পঞাসিরিলঙ্কার
৩=> ২০১২ সাল: ত্রিপিটকধর সেয়াদ অশিন ৰিচিত্তালঙ্কার
৪=> ২০১৪ সাল: ত্রিপিটকধর সেয়াদ অশিন সেকিন্দ
৫=> ২০১৪ সাল: ত্রিপিটকধর সেয়াদ অশিন ৰাসেট্ঠালঙ্কার
৬=> ২০১৪ সাল: ত্রিপিটকধর সেয়াদ অশিন পঞাৰংসাভিৰংস
৭=> ত্রিপিটকধর সেয়াদ অশিন ৰিচিত্তসার
৮=> ২০১৮ সাল: ত্রিপিটকধর সেয়াদ অশিন সট্ঠঞাণলঙ্কার

এই ৮ জন ত্রিপিটকধর সেয়াদ যদি পরবর্তীতে লিখিত পরীক্ষায় পাস করতে পারেন তাহলে তারা সর্বোচ্চ সম্মানিত ‘ত্রিপিটকধর ত্রিপিটককোবিদ’ খেতাব প্রাপ্ত হবেন।

ত্রিপিটকধরদের জন্য মায়ানমারে রাষ্ট্রীয়ভাবে অনেক সুযোগ সুবিধা দেয়া হয়ে থাকে। সার্টিফিকেট তো দেয়া হয়ই, জলেস্থলে ভ্রমণের জন্য প্রথম শ্রেণিতে ভ্রমণের ফ্রি টিকেট, মাসে মাসে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে চাল ও প্রয়োজনীয় কাজের জন্য সম্মানী ভাতা দেয়া হয়।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: দুয়েকজনের পোস্টে দেখেছি, ত্রিপিটকধরেরা নাকি অনুবুদ্ধ! অনুবুদ্ধ মানে হচ্ছে অর্হৎ। ত্রিপিটকধর হলে অর্হৎ হয় এমন কথা জীবনে শুনি নি। এভাবে যারা বলে তারা ধর্মের অপব্যাখ্যাই করে। কাজেই সাধু সাবধান!

রেফারেন্স:
১. http://www.president-office.gov.mm/en/…
২. http://www.moi.gov.mm/moi:eng/?q=news/27/12/2017/id-12411
৩. http://www.myanmarnet.net/nibbana/tipitaka/tpdkdhra.htm
৪. https://web.facebook.com/groups/682465148532463/permalink/1453976734714630/
৫. https://web.facebook.com/permalink.php?story_fbid=527220750992799&id=366881310360078
৬. http://www.mahana.org.mm/…/tipitakadhara-selection-examina…/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *