আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

আনন্দ ভান্তের আত্মত্যাগের কাহিনী

আনন্দ ভান্তে বুদ্ধের প্রতি প্রচণ্ড নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। তিনি এমনকি নালাগিরি হাতির সামনে দাঁড়িয়ে নিজের জীবন দিয়ে হলেও বুদ্ধকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। এর কাহিনীটা হচ্ছে এরকম।

নালগিরি হাতিকে দমনের দিনে ভোররাতেই বুদ্ধ জানলেন, আজ নালাগিরি দমনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে চুরাশি হাজার সত্ত্বের ধর্মজ্ঞান লাভ হবে। তাই বুদ্ধ সকালেই আনন্দকে বললেন, আজ রাজগৃহের চারদিকে আঠারটি মহাবিহারের সমস্ত ভিক্ষুকে আমার সাথে রাজগৃহে যেতে বলো। বুদ্ধের আদেশ শুনে সকল ভিক্ষু সকালে বেলুবনে সম্মিলিত হলো। সেই মহাভিক্ষুসঙ্ঘ নিয়ে বুদ্ধ বেলুবনের অরণ্য থেকে বের হয়ে রাজগৃহ নগরে প্রবেশ করলেন।

নগরীতে আগেই ঘোষণা দেয়া হয়েছিল সেদিন যেন কেউ পথেঘাটে বের না হয়। তখন বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাবহুল লোকজন ভাবল, ‘আজকে বুদ্ধের নালাগিরি দমন দেখব।’ এই ভেবে তারা ঘরবাড়ি, প্রাসাদ ইত্যাদির উপরিতলে ও ছাদে গিয়ে জড়ো হলো। অন্যদিকে মিথ্যাদৃষ্টি সম্পন্ন লোকজন ভাবল, ‘নালাগিরি হচ্ছে হিংস্র নরঘাতক হাতি। সে তো আর বুদ্ধের গুণ জানবে না। আজ নিশ্চয়ই সে বুদ্ধকে পায়ে পিষ্ট করে মেরে ফেলবে। আজকে আমরা আমাদের শত্রু শ্রমণ গৌতমের পিঠ দেখতে পাব।’ এই ভেবে তারাও মহাউৎসাহে ঘরবাড়ি ও প্রাসাদের উপরিতল ও ছাদে গিয়ে জড়ো হলো।

বুদ্ধকে আসতে দেখে নালাগিরি হাতি শুঁড় উঁচিয়ে, কান খাড়া করে মানুষজনের দিকে তেড়ে গিয়ে, ঘরবাড়ি ধ্বংস করে, গরুর গাড়িগুলো চূর্ণবিচূর্ণ করে বিশাল পর্বতের মতো ধেয়ে এলো। তাকে আসতে দেখে ভিক্ষুরা বলল, ‘ভান্তে, নালাগিরি হচ্ছে হিংস্র নরঘাতক। এ তো বুদ্ধগণের গুণ জানে না। ফিরে চলুন ভগবান। ফিরে চলুন সুগত।’ বুদ্ধ তাদেরকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘ভিক্ষুগণ, তোমরা ভয় করো না। আমি নালাগিরিকে দমন করতে পারব।’

তখন সারিপুত্র ভান্তে বললেন, ‘ভান্তে, পিতার কাজ তো বড়ছেলেকেই করতে হয়। তাই আমিই তাকে দমন করব।’ বুদ্ধ কিন্তু তাকে নিষেধ করে বললেন, ‘সারিপুত্র, বুদ্ধবল হচ্ছে একরকম। শিষ্যদের বল হচ্ছে অন্যরকম। তুমি থামো।’ এভাবে আশিজন মহাথেরোর সবাই প্রার্থনা করলেও বুদ্ধ তাদেরকে অনুমতি দিলেন না।

তখন আনন্দ আর থাকতে না পেরে ‘মারতে হলে প্রথমে আমাকে মারুক’ এই ভেবে নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে বুদ্ধের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। বুদ্ধ তাকে বললেন, ‘সরে যাও আনন্দ। আমার সামনে দাঁড়িয়ে থেকো না।’ আনন্দ বললেন, ‘ভান্তে, এই হাতি হিংস্র নরঘাতক। কল্প ধ্বংসকারী আগুনের মতো ভয়ংকর। সে যদি আপনাকে মারতে চায় তাহলে প্রথমে আমাকে মেরে তবেই আপনার কাছে আসতে হবে।’ বুদ্ধ তিনবার তাকে সরে যেতে বললেও আনন্দ ভান্তে সরে গেলেন না। তখন বুদ্ধ অলৌকিক শক্তিবলে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে মহাভিক্ষুসঙ্ঘের ভেতরে রেখে দিলেন।

এইসময়ে নালাগিরিকে এমন ভয়ংকর রূপে ছুটে আসতে দেখে এক মেয়ে মরণভয়ে পালাচ্ছিল। নালাগিরি সেই মেয়ের পিছে পিছে তাড়া করে গেল। তখন দুর্ভাগ্যক্রমে মেয়েটির কোল থেকে ছোট্ট শিশুটি পড়ে গেল। পড়বি তো পড় একদম নালাগিরির সামনে! নালাগিরি মেয়েটিকে বাদ দিয়ে এবার শিশুটির কাছে গেল। বুদ্ধ তখন নালাগিরিকে উদ্দেশ্য করে মৈত্রীসহকারে বললেন, ‘ওহে নালাগিরি, তোমাকে যে ষোল কলসি মদ খাইয়ে দিয়ে মাতাল করিয়েছে, সে তো অন্যকে মারার জন্য নয়। আমাকে মারার উদ্দেশ্যেই মাতাল করিয়েছে। কাজেই অকারণে এদিক ওদিক না গিয়ে এদিকে এসো।’

বুদ্ধের কথা শুনে সেই হাতি তখন চোখ মেলে বুদ্ধের দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তার মদের নেশা ছুটে গেল। একটু ধাতস্থ হয়ে এরপর সে শুঁড় লম্বা করে ধরে, কান নাড়তে নাড়তে বুদ্ধের পায়ের কাছে এসে নতজানু হলো। বুদ্ধ তাকে বললেন, ‘নালাগিরি, এরপর থেকে নিষ্ঠুর নরঘাতক হয়ো না। সকল প্রাণির প্রতি মৈত্রীচিত্ত হও।’ এরপর ডান হাত বাড়িয়ে দিয়ে হাতির কপাল ছুঁয়ে দিয়ে বললেন,

‘হে হস্তীরাজ, বুদ্ধকে আঘাত করো না।
বুদ্ধকে আঘাত করলে দুঃখই পেতে হয়।
বুদ্ধকে আঘাতে পরবর্তীতে সুগতি হয় না।
মাতাল হয়ো না, উন্মাতাল হয়ো না।
মাতালেরা সুগতিতে যায় না।
তুমি এমনই করো যেন সুগতিতে যেতে পার।’

বুদ্ধের কথা শুনে হাতির সারা শরীর প্রীতিতে পরিপূর্ণ হলো। সে যদি ইতর প্রাণি না হতো তাহলে নাকি স্রোতাপত্তিফল লাভ করত। ছাদে ও উপরিতলে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষেরা এমন হিংস্র হাতিকে এভাবে দমিত হতে দেখে উল্লসিত হয়ে চিৎকার করে উঠল। খুশিতে তারা নিজের পরিহিত অলঙ্কারগুলো ছুঁড়ে দিতে লাগল হাতির পিঠে। এতে সেই হাতির পিঠটাই ঢেকে গেল অলঙ্কারের স্তুপে। তখন থেকে নালাগিরির নাম হয়ে গেল ধনপালক হাতি। বুদ্ধ তাকে পঞ্চশীল দিলেন। সে শুঁড় দিয়ে বুদ্ধের পায়ের ধুলো নিজের মাথায় তুলে নিয়ে পিছু হটে গিয়ে বন্দনা করে হাতিশালে ফিরে গেল। এরপর থেকে সে একদম শান্ত সুবোধ হয়ে গেল। আর কাউকে আক্রমণ করত না।

বুদ্ধ তখন পড়ে থাকা অলঙ্কারের স্তুপকে দেখে অধিষ্ঠান করলেন, ‘যার যার অলঙ্কার সেগুলো সে ফিরে পাক।’ এরপর ভাবলেন, ‘আজ মহা অলৌকিক ঘটনা দেখানো হয়েছে। এখন নগরে পিণ্ডচারণ করা ঠিক হবে না।’ এই ভেবে ভিক্ষুসঙ্ঘসহ নগর থেকে বের হয়ে বেলুবনের অরণ্যে চলে গেলেন। নগরবাসী বহু খাদ্যভোজ্য নিয়ে বেলুবন বিহারে গিয়ে মহাদান দিল।

সেদিন বিকেলে ভিক্ষুরা ধর্মসভায় সম্মিলিত হয়ে বলাবলি করছিল, ‘বন্ধুগণ, বুদ্ধের জন্য আনন্দ নিজের জীবন ত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। তিনবার বলার পরেও বুদ্ধের সামনে থেকে সরে যান নি। বড়ই কঠিন কাজ করেছেন।’ তখন বুদ্ধ আনন্দকে প্রশংসা করার উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়ে বললেন, ‘হে ভিক্ষুগণ, শুধু এখন নয়, অতীতে ইতর প্রাণি হিসেবে জন্ম নিয়েও আমার জন্য সে জীবন ত্যাগ করেছিল।’ এই বলে তিনি ভিক্ষুদের অনুরোধে সেই অতীত জন্মের কথা তুলে ধরলেন। সেটা বড়ই করুণ কাহিনী। আমি সময় পেলে লিখব সেটা।

তবে একটা বিষয় লক্ষণীয়। অন্যান্যদের মতো আনন্দ ভান্তে কিন্তু অলৌকিক ক্ষমতাধর ছিলেন না। হাতিটা যদি তাকে আক্রমণ করত তিনি কিছুই করতে পারতেন না। মৃত্যু ছাড়া কোনো গতি ছিল না। তবুও বুদ্ধের প্রতি প্রচন্ড মমতাবশতই তিনি এরকম করেছিলেন। বর্তমানেও অনেক ঘটনা শুনি যেখানে অন্যকে বাঁচাতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে বা মৃত্যুর মুখে ঝাঁপ দিয়েছে কোনো দুঃসাহসী কেউ। কিন্তু সেগুলো হয়তো কর্তব্যের খাতিরে হতে পারে, অথবা কারোর প্রতি খুব মায়ামমতার জোরেও হতে পারে। জন্মে জন্মে একসাথে থাকলে প্রচণ্ড স্নেহ, মায়া, ভালোবাসা উৎপন্ন হয়। সেটা ত্রিপিটকের এমন কাহিনীগুলোতে আমরা পদে পদে দেখতে পাই। সে যাই হোক, সবার প্রতি মৈত্রী ও শুভেচ্ছা রইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *