আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

হাজার বছর ধরে বেঁচে থাকা কোনো অর্হৎকে দেখি না কেন আমরা?

মহাপরিনির্বাণ সুত্রে বুদ্ধ আনন্দকে বলেছিলেন, হে আনন্দ, অলৌকিক শক্তির চারটি ভিত্তি যার সুগঠিত হয়েছে, বহুলভাবে চর্চিত হয়েছে, সুন্দরভাবে আয়ত্ব হয়েছে, তিনি ইচ্ছে করলে কল্পকাল বেঁচে থাকতে পারেন, অথবা কল্পের অবশিষ্টকাল বেঁচে থাকতে পারেন। এই কথার ভিত্তিতে অনেকেই বলে থাকে, ঋদ্ধিমান অর্হতেরা হাজার বছর ধরে বেঁচে আছেন এখনো। সত্যিই কি তাই? আসুন গবেষণায় নামি।

মহাপরিনির্বাণ সুত্রের অর্থকথা বলছে, এখানে কল্প মানে বুঝাচ্ছে আয়ুকল্প। যেসময়ে মানুষের গড় আয়ু যতটুকু হয় তা হচ্ছে তখনকার আয়ুকল্প। বুদ্ধের আমলে মানুষের গড় আয়ু ছিল ১০০ বছর। অর্থাৎ কোনো ঋদ্ধিমান ব্যক্তি যদি ইচ্ছে করে তাহলে সে তখন ঐ ১০০ বছর বা তার কিছুটা বেশি বাঁচতে পারে। কিন্তু সেটা এত বেশি নয় যে হাজার বছর পর্যন্ত বাঁচবে। সেটা সম্ভব নয়। কারণ আবহাওয়া ও আহার তাকে হাজার বছর বাঁচার মতো সাপোর্ট দেয় না।

এই আয়ুর ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করার জন্য দীর্ঘনিকায়ের মহাপদান সুত্রের আয়ুপরিচ্ছেদ বর্ণনায় বলা হয়েছে, যারা গড় আয়ু থেকে বেশি বাঁচে, তাদের সংখ্যা অল্প। বেশিরভাগই বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ বা ষাট বছর বাঁচে। দীর্ঘায়ু ব্যক্তির সংখ্যা খুবই অল্প। উদাহরণস্বরূপ উপাসিকা বিশাখা, পোক্খরসাতি ব্রাহ্মণ, ব্রহ্মায়ু ব্রাহ্মণ, সেল ব্রাহ্মণ, বাৰরি ব্রাহ্মণ, আনন্দ স্থবির, মহাকাশ্যপ স্থবির বেঁচেছিলেন ১২০ বছর করে। অনুরুদ্ধ স্থবির ১৫০ বছর বেঁচেছিলেন। বাকুল স্থবির ১৬০ বছর বেঁচেছিলেন। এরা সবাই দীর্ঘায়ু হলেও ২০০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারেন নি।

সেখানে আরো বলা হয়েছে, সকল বুদ্ধগণই অসংখ্য বছর আয়ুসম্পন্ন কর্ম নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু তাদের আয়ুস্কাল হয় ভিন্ন ভিন্ন। যেমন ককুসন্ধ বুদ্ধ ৪০ হাজার বছর গড়আয়ুকালে জন্মেছিলেন। কিন্তু তিনি ৪০ হাজার বছর বাঁচেন নি, বরং ৩২০০০ বছর হয়েই পরিনির্বাপিত হয়েছিলেন। কোণাগমন বুদ্ধ ৩০ হাজার বছর গড় আয়ুকালে জন্মেছিলেন, কিন্তু তিনি ২৪ হাজার বছর হয়েই পরিনির্বাপিত হয়েছিলেন। কশ্যপ বুদ্ধ ২০ হাজার বছরের সময়ে জন্মেছিলেন, তিনিও আয়ু অপূর্ণ রেখেই পরিনির্বাপিত হয়েছিলেন।

আমাদের গৌতম বুদ্ধও অসংখ্য বছর বেঁচে থাকার মতো কর্ম নিয়ে জন্মেছিলেন। কিন্তু জন্মেছিলেন এমন সময়ে যখন মানুষের গড় আয়ু মাত্র ১০০ বছর। তাই তিনিও অন্যান্য বুদ্ধগণের মতো আয়ু অপূর্ণ রেখেই মাত্র ৮০ বছর বয়সে পরিনির্বাপিত হয়েছিলেন। এভাবে যে যে আয়ুকালে বুদ্ধগণ জন্ম নেন, ততটুকুই বাঁচেন। এর বেশি নয়।

বুদ্ধগণের কর্ম তাদেরকে অসংখ্য বছর আয়ু দিতে সক্ষম হলেও তাদের আয়ুর তারতম্য হয় কেন? এর এক কথায় উত্তর হচ্ছে- ঋতু ও ভোজনের কারণে। যেকালে আবহাওয়া ও খাদ্য যেরকম হয় সেঅনুসারে তখনকার মানুষদের আয়ু বাড়ে ও কমে। বুদ্ধগণের আয়ুও তার ব্যতিক্রম হয় না। আর অর্হৎ এবং সাধারণজনের কথা তো বলাই বাহুল্য।

এরপর এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সেখানে বলা হয়েছে, যখন রাজারা অধার্মিক হয়, তখন উপরাজা, সেনাপতি, ধনী, সারা শহর, সারা রাষ্ট্র অধার্মিক হয়ে যায়। তখন তাদের রক্ষাকারী দেবতা, ভূমিবাসী দেবতা, আকাশবাসী দেবতারাও অধার্মিক হয়ে যায়। এভাবে দেবতা ও মানুষদের মাঝে আর্যশ্রাবকগণ বাদে সবাই অধার্মিক হয়ে যায়। এমন অধার্মিকতার কারণে চন্দ্রসূর্য ঠিকমতো চলে না, বায়ুপ্রবাহ যথানিয়মে হয় না, ফলে বর্ষা-শীত যথানিয়মে হয় না। যথানিয়মে বৃষ্টি হয় না। কখনো বৃষ্টি হয়, কখনো হয় না। কোথাও বৃষ্টি হয়, কোথাও হয় না। বৃষ্টি হলেও প্রায়ই অসময়ে হয়। তাতে শস্যাদি ভালোমতো পরিপক্ক হয় না। সেগুলোর গন্ধ, রং, রস ইত্যাদি পরিপূর্ণ হয় না। সেই শস্যাদি একপাত্রে রান্না করলেও একভাগ সেদ্ধ হয় না, একভাগ বেশি সেদ্ধ হয়ে যায়, একভাগ যথাযথভাবে সেদ্ধ হয়। সেরকম খাদ্য খেয়ে পেটেও তিন প্রকারে হজম করতে হয়। এর ফলে সত্ত্বগণ বহু রোগগ্রস্ত হয়, অল্পায়ু হয়। এভাবে ঋতু ও ভোজনের কারণে আয়ু কমে যায়।

আবার এর বিপরীতে রাজাগণ ধার্মিক হলে উপরাজারাও ধার্মিক হয়, এভাবে ক্রমান্বয়ে সবাই ধার্মিক হয়। এতে চন্দ্রসূর্য যথানিয়মে চলে, বৃষ্টি যথানিয়মে হয়, তাই শস্যাদি সমানভাবে পাকে। সেগুলোর হয় সুন্দর গন্ধ, সুন্দর রং, সুস্বাদু রস, পুষ্টিসম্পন্ন। সেগুলো থেকে রান্নাকৃত খাদ্য খেলে যথাযথভাবে হজম হয়। ফলে সত্ত্বগণ দীর্ঘায়ু হয়। এভাবে ঋতু ও ভোজনের কারণে আয়ু বাড়ে।

অর্থাৎ আপনি যদি মানুষ হিসেবে হাজার বছর বাঁচতে চান, বৌদ্ধধর্মমতে সেটা সম্ভব নয়। কারণ বর্তমান যুগের ঋতু ও আহার সেরকম দীর্ঘায়ু হয়ে বাঁচার অনুকুল নয়। বৌদ্ধধর্মের কী সুন্দর লজিক্যাল ব্যাখ্যা দেখুন তো। একারণেই আমরা হাজার বছর ধরে বেঁচে আছে এমন কোনো অর্হৎকে দেখি না। তবুও গুরুবাদীদের দল দাবি করেই চলে যে, তাদের অর্হৎ বিদ্যাধররা নাকি হাজার বছর বাঁচে। তাতেই তো বলা যায় এই বিদ্যাধররা অর্হৎও নয়, মানুষও নয়। তারা বিদ্যাসাধনা করে মরার পরে প্রেত অথবা নিম্নশ্রেণির দেবতা হয়ে হাজার বছর বেঁচে আছে মাত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *