আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

বনবিহার এবং কিছু প্রশ্ন

কয়েকটা বিষয়ে লেখার ইচ্ছে ছিল অনেক দিন থেকে। সেগুলোর কয়েকটা নিয়ে আজ লিখতে বসলাম। কথাগুলোয় হয়তো আপনাদের দ্বিমত থাকতে পারে। দ্বিমত থাকলে আওয়াজ দিয়েন।

আমি এখন যেখানে আছি সেটা হচ্ছে মহাগন্ধয়োন বিহার, অমরপুর, মান্দালয়। পরিয়ত্তি শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে সারা মায়ানমারে সবাই এক নামে চেনে এই বিহারটাকে। আয়তনে রাজবন বিহারের সমান হবে মনে হয়। রাজবন বিহারে ভিক্ষুশ্রমণ সব মিলিয়ে গড়পড়তা ১৫০ জনের মতো থাকে। তাতেও দেখি দায়করা সিয়ং দিতে হিমশিম খায়। সেই লজ্জায় আমি ভিক্ষু হওয়ার পর থেকে এতবছরেও কখনোই রাজবনবিহারের ভোজনশালায় সিয়ং গ্রহণ করি নি। সবসময় পিণ্ডচারণে গিয়েছি। কিন্তু পিণ্ডচারণে গেলেও মাঝেমধ্যে কোনোমতে ভাত মেলে, তরকারি মেলে না। সিনিয়র ভিক্ষু একজন আমাকে বলেছিলেন তিনি নাকি দুয়েকবার টুং শব্দও শোনেন নি, অর্থাৎ সেদিন শুন্য ভিক্ষাপাত্র নিয়েই তাদের ফিরে আসতে হয়েছে। অথচ এখানে এসে দেখলাম একেকটা বিহারে শত শত ভিক্ষু শ্রমণ। এই মহাগন্ধয়োন বিহারেও ভিক্ষুশ্রমণ মিলিয়ে ৭০০-৮০০ জনের মতো হবে। তবুও সিয়ং এর বেলায় কখনো টান পড়তে দেখি নি। তাই আমি বলি, যদি ভিক্ষু হিসেবে জীবন কাটাতে হয় তার জন্য মায়ানমারই উপযুক্ত। যদি ভাবনা শিক্ষা করতে হয় মায়ানমারেই আছে উপযুক্ত ভাবনাকেন্দ্র। যদি ত্রিপিটক শিক্ষা করতে হয় এই মায়ানমারেই আছে শত শত পরিয়ত্তি শিক্ষাকেন্দ্র।

আমি যখন পাঅক ভাবনাকেন্দ্রে ছিলাম, তখন বান্দরবানের রাজবিহারের (উচহ্লা ভান্তের বিহারের) উপাধ্যক্ষ একবার এসেছিলেন সেখানে দুজন ভিক্ষু সঙ্গে নিয়ে। তিনি খুব ভালো বার্মিজ ভাষা বলতে ও পড়তে পারেন। বেচারা হাঁটতে পারছিলেন না, তবুও আমি মহা উৎসাহে উনাকে পাঅকের পাহাড়ের উপরে নিয়ে গিয়েছিলাম। তিনি একসময় আমাকে বলেছিলেন, “তুমি এসেছ যখন বহু বছর থেকে যাও। যা শেখার শিখে নাও ভালো করে। অনেকেই এসেছে বাংলাদেশ থেকে, কিন্তু কয়েক মাস বা বছরখানেক পরেই দেশে ফিরে গিয়ে একেকজন বিদর্শনাচার্য, ভাবনাগুরু হয়ে বসে আছে। তুমিও যেন ওরকম হয়ো না আবার!” আমার খুব পছন্দ হয়েছিল উনার কথা।

এখানে এসব দেখে দেখে আমাদের বনবিহারের কথা মনে পড়ে এবং যথারীতি মেজাজটা খারাপ হয়ে যায়। বনবিহারে কোনো পরিয়ত্তি শিক্ষাকেন্দ্র নেই, পালি শিখতে ও শেখাতে চান যারা তাদের নেই কোনো সমাদর। যারা বিদেশে ঘুরতে যেতে চায় তাদেরকে তারা ঠিকই অনুমতি দেয়, কিন্তু যারা মায়ানমার অথবা থাইল্যাণ্ড অথবা শ্রীলঙ্কায় যেতে চায় ত্রিপিটক স্টাডি ও ভাবনা শিক্ষার জন্য, তাদেরকে তারা অন্য পথ দেখতে বলে। এমন সব উদ্ভট ব্যবহার দেখে কার মেজাজ ঠিক থাকে?

এছাড়াও আমাদের বনবিহারে শ্রমণ হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় দেশনা দেয়ার প্রশিক্ষণ। চিন্তা করে দেখুন, যারা নিজেদেরকে বুঝার জন্যই প্রব্রজ্যা নিয়েছে তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে অন্যদেরকে বুঝানোর গুরুদায়িত্ব। ভিক্ষুরা ওলোঝোলো হবে না কেন? দায়কদায়িকারা ওলোঝোলো হবে না কেন? ধর্মের পরিহানি হবে না কেন?

পাঅক ভাবনাকেন্দ্র থেকে একবার এক ভিক্ষু খুব দক্ষতার সাথে কোর্স সম্পন্ন করেছিল। সাথে সাথে তাকে ধর্মদেশকের দায়িত্ব দেয়া হলো। সেখানে নিয়ম হচ্ছে ধর্মদেশনায় কে কী বলছে তার একটা রিপোর্ট দিতে হয় প্রধান সেয়াদের কাছে। কিন্তু পরে প্রধান সেয়াদ দেখলেন সেই ভিক্ষুর কয়েকটা ধর্মদেশনা ত্রিপিটক অনুসারে হয় নি। সাথে সাথে তাকে সেই পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হলো। এরপর থেকে যারা ভাবনাকোর্স শেষ করেছে তাদেরকে যাচাই বাছাই করে তবেই ধর্মদেশকের দায়িত্ব দেয়া হয়। প্রাধান্য দেয়া হয় যারা পরিয়ত্তিধর তাদেরকে।

সমসাময়িককালে একমাত্র ত্রিপিটক স্টাডি করে ধর্মদেশনা করতে দেখেছি পন্থক ভান্তেকে। তিনি তার দেশনায় বলতে গেলে দাঁড়ি-কমাসহ তুলে ধরেন ত্রিপিটক ও অর্থকথা থেকে। কিন্তু তিনি তো সেটা করেন নিজস্ব আগ্রহে, নিজস্ব বোধ থেকে এবং নিজস্ব স্টাইলে। অন্যরা সেরকম করেন কী? মাঝে মাঝে ভাবি, বনবিহারে যারা দক্ষ ধর্মদেশক তারা যদি পরিয়ত্তি শিক্ষা করতেন তাহলে তারা আরো কত অবদান রাখতে পারতেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *