আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

মাংস কিনে খেলে প্রাণিহত্যা সমর্থন হয়?

বৌদ্ধরা মাংস খায় কেন সেব্যাপারে আমি অনেক আগে একটা পোস্ট করেছিলাম। তাতে কয়েকজন প্রশ্ন তুলেছেন এরকম: আমরা মাংস খাই বলেই তো বাজারে মাংস বিক্রি হয়। ভিক্ষু শ্রামণেরা মাংস খায় বলেই তো মাংস পিণ্ডদান দেয়া হয়। আর এটা তো একটা ছোট বাচ্চাও বুঝে মাংস আসে প্রাণি থেকে। তাহলে কি মাংস খাওয়া প্রাণিহত্যা সমর্থন করার মত নয়?

সোজা কথায়, আপনি যদি মাংস কিনে খান, তাহলে মাংস বিক্রেতা যে প্রাণিহত্যার অপরাধ করেছে সেই দায় আপনার উপরও পড়বে। আপনারও পাপ হবে। এই হচ্ছে তাদের কথা। কিন্তু আমি বলি সেটা তাদের খোঁড়া যুক্তি মাত্র।

প্রাণিহত্যার কাজে সমর্থন কীভাবে করতে হয়

কাউকে কোনো কাজে সমর্থন করার ক্ষেত্রে আমরা সেটা মানসিক, বাচনিক অথবা দৈহিকভাবে সমর্থন করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ এই প্রাণিহত্যার কথা ধরা যাক। এক কসাই বাজারে বিক্রির জন্য বিসমিল্লাহ বলে একটা গরু জবাই করল। তাতে তার প্রাণিহত্যা হলো। এখন আপনি গেলেন বাজারে। বাজার থেকে কিনলেন সেই গরুর মাংস। আপনি যদি মনে মনে বলেন, গরু মেরেছে, ভালো করেছে। তাহলে সেটা হয় মনে মনে সমর্থন। আর যদি প্রকাশ্যে বলেন, গরু মেরেছেন, ভালো করেছেন। তাহলে সেটা হয় কথার মাধ্যমে সমর্থন। দৈহিকভাবে প্রাণিহত্যা সমর্থন হয় যদি আপনি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, হাততালি দিয়ে, মাথা ঝাঁকিয়ে অথবা বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে প্রাণিহত্যার প্রতি আপনার সমর্থন প্রকাশ করেন।

এখন চিন্তা করে দেখুন তো, যখন মাংস কিনতে গেছেন বাজারে, তখন কি আপনার মনে হয়েছে, গরু মেরেছে, ভালো করেছে। এরকম চিন্তা কি এসেছে? নাকি প্রশংসা করে বলেছেন, গরু মেরেছেন ভালো করেছেন! নাকি গরু মারার জন্য হাততালি দিয়েছেন। আমি বাজি ধরে বলতে পারি, মাংস কেনার সময়ে লোকজনের মাথায় এসব চিন্তাও থাকে না, এধরনের কথাও বলে না, এধরনের হাততালিও দেয় না। তারা তখন সেটাকে কেবল মাংস হিসেবে দেখে, প্রাণি হিসেবে দেখে না। তাই তাতে প্রাণিহত্যা সমর্থনের প্রশ্নই আসে না।

কিন্তু যুক্তিবাদীদের অনেকেই তা মানতে চান না। তখন আমি বলি, কিনে খেলে যদি তা প্রাণিহত্যা সমর্থন হয়, তাহলে আপনি প্রতিদিন যে ভাত খাচ্ছেন সেটাও তো প্রাণিহত্যা সমর্থনের মতো হয়। চিন্তা করুন, আপনি যে ভাত খান সেই ভাত আসে চাল থেকে। সেই চাল আসছে ধান থেকে। ধান উৎপন্ন করছে কে? কৃষক। সেই ধান উৎপাদন করতে গিয়ে তার বহুবার কীটনাশক দিতে হচ্ছে। তাতে বহু কীটপতঙ্গ মারা যায়। জমি চাষ করতেও কত শত কীটপতঙ্গ মারা যায় তার লেখাজোখা নেই। আপনি যদি ভাত না খেতেন তাহলে কৃষকেরও এত কীটপতঙ্গ মারতে হতো না। তাহলে ভাত খাওয়াটা প্রাণিহত্যা সমর্থন করার মতো নয় কি? মহাকশ্যপ ভান্তে জমিদার ছিলেন। কিন্তু জমিচাষে কত কীটপতঙ্গ মারা যায় সেই পাপের ভয়ে মহাকশ্যপ ভান্তে গৃহত্যাগ করেছিলেন। অথচ গৃহত্যাগের পরেও তো তিনি ভাত খেয়েছিলেন। কই তিনি তো বলেন নি, ভাত খাওয়া মানে প্রাণিহত্যায় সমর্থন হয়!

এই যুক্তিতে আপনি আম, আনারস ইত্যাদি যেগুলো বাজারে পাওয়া যায় সেগুলো কোনোটাই কিনে খেতে পারবেন না। খেলে প্রাণিহত্যা সমর্থন করা হবে। অথচ আপনি যখন সেগুলো কিনে খান, সত্যিই কি আপনি খাওয়ার সময় বলেন, কীটপতঙ্গ মরুক, আমি আম খাব, আনারস খাব। আমি নিশ্চিত, কেনার সময় বা খাওয়ার সময় আপনার কীটপতঙ্গকে মারার কাজে সমর্থনের চিন্তাও আসে না। সেরকম চিন্তা যখন মাথায় আসে না, তখন যুক্তিবাদীরা যদি অভিযোগ করে, আম খাওয়ার মাধ্যমে আপনি কীটপতঙ্গকে মারার কাজে সমর্থন করছেন, তখন কি তারা আপনার প্রতি যথার্থ বলছে? নাকি অহেতুক অভিযোগ করছে? একটু ভেবে দেখুন তো।

আচ্ছা, তাতেও যদি আপনি সন্তুষ্ট না হন, তাহলে আরেকটা উদাহরণ দিই। ধরা যাক, খাদ্যগুদাম থেকে চাল গোপনে বাজারে বিক্রি করে এক ধরনের অসাধু ব্যবসায়ী। এখন আপনি বাজার থেকে সেই চাল কিনে এনে খেলেন। আপনার পরিবারের লোকজনও খেল। ওদিকে ব্যবসায়ীরা ধরা পড়ল। তারা বলল, বাজারে চালের চাহিদা আছে বলেই তো আমরা এভাবে বিক্রি করেছি। ক্রেতারা না কিনলে আমরা সেটা বিক্রি করব কেন? ক্রেতাদেরও দোষ আছে নিশ্চয়। এবার তাদের কথামত তদন্ত করে দেখা হলো কারা কারা সেই চাল কিনে খেয়েছে। তাদের মধ্যে আপনিও ধরা পড়লেন পরিবার সহ। চাল কিনে খাওয়ার মাধ্যমে আপনি বিক্রেতার অবৈধভাবে চাল পাচারের কাজে সহযোগিতা করেছেন, এই যুক্তিতে বিক্রেতার সাথে সাথে আপনাকে এবং আপনার পরিবারের সবাইকে সেই চাল কেনার অপরাধে ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হলো। সেটা কি আপনার প্রতি সুবিচার হলো? নাকি অবিচার হলো? আপনি কি সত্যিই বিক্রেতার অবৈধ কাজে সমর্থন করেছিলেন? নাকি আপনার পরিবারের কেউ করেছিল? তারা তো শুধু ভাত খেয়েছে মাত্র। কোথায় কোন বিক্রেতা কোন অবৈধ উপায়ে সেই চাল বিক্রি করেছে তা তারা জানেই না। অথচ কিনলে বিক্রেতার কাজে সমর্থন হবে এমন খোঁড়া যুক্তিতে আপনার ও আপনার পরিবার নিরপরাধ হয়েও শাস্তি পেতে হলো। তবুও কি তারা এমন অকাজের যুক্তি আঁকড়ে ধরে থাকবে? কাদের মাথায় আসে এমন খোঁড়া যুক্তি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *