আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

এক মেয়ের সাতশ বছর বেঁচে থাকার কাহিনী

পশ্চিমা বিশ্বে এলিয়েন ও ইউএফও নিয়ে মাতামাতির শেষ নেই। এই তো দুয়েক মাস আগেও আমেরিকার নৌবাহিনী ইউএফওর একটা ভিডিও প্রকাশ করে হইচই ফেলে দিয়েছিল। সেই ইউএফও নাকি ভিনগ্রহের নভোযান। তাতে চড়ে নাকি এলিয়েন বা ভিনগ্রহের প্রাণিরা এই পৃথিবীতে আসে, মানুষদেরকে ধরে নিয়ে যায়। এরকম কত জল্পনা কল্পনা।

কিন্তু আমি আপনাদেরকে এর থেকেও রোমাঞ্চকর একটা কাহিনী শোনাব। সেটা হচ্ছে দেবতা কর্তৃক এক মেয়েকে ধরে নিয়ে তার দিব্যবিমানে শত শত বছর ধরে রেখে দেয়ার কাহিনী। কাহিনীটা হচ্ছে এরকম-

বুদ্ধের জন্মের ৭০০ বছরেরও আগের সময়ের কথা। ভারতে এখন যে শ্রাবস্তী আছে, তখন সেটারই আশেপাশে এক গ্রামে থাকত এক তরুণ। সে বিয়ে করতে যাচ্ছিল এক সুন্দরী তরুণীকে। কিন্তু বিয়ের দিনে তরুণটি তার বন্ধুবান্ধব সহকারে গোসল করতে যাওয়ার পথে সাপের কামড় খেয়ে মারা গেল। তরুণটি বেশ ধার্মিক ছিল। সে সবসময় এক পচ্চেকবুদ্ধকে সেবা করত। সেকারণে তার বহু পুণ্যকর্ম সঞ্চিত ছিল। কিন্তু সেই মেয়েটির প্রতি মনের টান থাকায় পুণ্য থাকা সত্ত্বেও সে মারা গিয়ে জন্মাল এক শক্তিশালী ভূমিবাসী দেবতা হিসেবে।

দেবতা হয়ে সে চিন্তা করল কীভাবে সেই মেয়েকে তার বিমানে নিয়ে যাওয়া যায়। তার জন্য মেয়েটিরও থাকতে হবে শক্তিশালী পুণ্যকর্ম। পুণ্য না থাকলে সে সেই বিমানে থাকতে পারবে না।

সে চিন্তা করতে করতে দেখল, পচ্চেকবুদ্ধ চীবর সেলাই করছেন। তখন সে পচ্চেকবুদ্ধের কাছে মানুষের বেশে গিয়ে বন্দনা করে জিজ্ঞেস করল, ভান্তে, সুতা লাগবে নাকি?
পচ্চেকবুদ্ধ বললেন, চীবর সেলাই করছি, উপাসক। কাজেই সুতা তো লাগবে।
তখন সে মেয়েটির ঘর দেখিয়ে দিয়ে বলল, তাহলে ভান্তে অমুক জায়গায় সুতা ভিক্ষার জন্য যান।

পচ্চেকবুদ্ধ সেই ঘরের দরজার সামনে দিয়ে দাঁড়ালেন। মেয়েটি পচ্চেকবুদ্ধের সুতা লাগবে জেনে খুশিমনে এক দলা সুতো দিল। তখন সেই দেবতা মানুষের বেশে সেই ঘরে গিয়ে মেয়েটির মায়ের সাথে দেখা করল। দেখা করে তার কন্যাকে বিয়ে করার ইচ্ছার কথা জানাল। সে সেখানেই মেয়েটির সাথে কয়েকদিন বসবাস করে এরপর তাকে নিজের বিমানে নিয়ে গেল। যাওয়ার আগে মেয়েটির মায়ের জন্য ঘরে থাকা সমস্ত থালাবাটিগুলো সোনায় পরিপূর্ণ করে দিয়ে সেগুলোতে লিখে দিল, “এই ধন হচ্ছে দেবতার দেয়া ধন। এগুলো কেউ নিতে পারবে না।” তার মা সেই ধন পেয়ে সেগুলো আত্মীৃয়স্বজনকে দিল, গরীবদুঃখীদেরকেও দিল, নিজেও জীবনযাপনের কাজে ব্যয় করল। এভাবে একসময় বুড়ো হয়ে মারা যাওয়ার সময়ে সেই ধনগুলো আত্মীৃয়স্বজনের হাতে রেখে দিয়ে বলল, আমার মেয়ে ফিরলে এই ধনগুলো তাকে দিও।

এভাবে সাতশ বছর কেটে গেল। এদিকে পৃথিবীতে গৌতম বুদ্ধ উৎপন্ন হলেন। তিনি ধর্মপ্রচার শুরু করে একসময় শ্রাবস্তীতে বসবাস করতে শুরু করলেন। সেই সময়ে সেই মেয়েটির সেই দেবতার সাথে বসবাস করতে করতে বাড়ির জন্য মন চঞ্চল হয়ে উঠল। সে দেবতাকে বলল,
আমি আগে এক প্রব্রজিত ভিক্ষু সুতা চাওয়াতে তাকে সুতা দিয়েছিলাম। তার পুণ্যফলে আমার শত হাজার ধরনের পোশাক উৎপন্ন হয়েছে। বিমানে চারদিকে ফুলের ছড়াছড়ি। বহু ধরনের চিত্রকর্ম আঁকা এই বিমানে। আছে বহু পরিচারক ও পরিচারিকা। আমি যতই খাই বা পরি, এত ধনসম্পদের তবুও ক্ষয় হয় না। সেই কর্মের সুখময় ফল আমি এই বিমানে পেয়েছি। তাই মনুষ্যলোকে গিয়ে আমি আবার পুণ্য করব। হে আর্য্যপুত্র, আমাকে মনুষ্যলোকে নিয়ে যান।

দেবতা কিন্তু তাকে ছেড়ে দিতে অনিচ্ছুক ছিল। সে বলল, তুমি এখানে এসেছ সাতশ বছরেরও বেশি হয়ে গেল। দিব্য আবহাওয়া ও আহারের বলে যে পুণ্যকর্ম তোমাকে এতকাল ধরে এখানে তরুণী হিসেবে ধরে রেখেছে, এখান থেকে চলে গেলে কিন্তু সেই পুণ্যকর্ম দুর্বল হয়ে যাবে, মনুষ্যলোকের আবহাওয়া ও আহারের কারণে তুমিও জরাজীর্ণ হয়ে বুড়ো হয়ে যাবে। এই দীর্ঘকালের মধ্যে তোমার সকল পরিচিত আত্মীৃয়স্বজন মারা গেছে। তাই মনুষ্যলোকে গিয়ে আর কী হবে? অবশিষ্ট আয়ু এখানেই কাটাও।
কিন্তু মেয়েটি অস্থির হয়ে উঠেছিল। সে বলল, এখানে এসে দিব্যসুখের মাঝে সাত বছর হয়ে গেল। তাই মনুষ্যলোকে গিয়ে আমি আবার পুণ্য করব। হে আর্য্যপুত্র, আমাকে মনুষ্যলোকে নিয়ে যান।

মেয়েটি কতকাল দিব্যসুখে কাটিয়েছে তা ভুলেই গিয়েছিল। তাই সে মনে করেছিল মাত্র সাত বছর কেটে গেছে। কিন্তু মেয়েটির কথা শুনে তখন দেবতা তাকে বলল, তুমি সেখানে গেলে এক সপ্তাহের বেশি বাঁচবে না। আমি যে ধনসম্পদ দিয়ে এসেছিলাম সেগুলো তোমার মা রেখে দিয়ে গেছেন। সেগুলো শ্রমণ ব্রাহ্মণদেরকে দান দিয়ে আবার এখানে আসার জন্য প্রার্থনা কর। এই বলে তাকে হাতে ধরে তুলে নিয়ে গ্রামের মাঝে রেখে দিল। বিমান থেকে বের হওয়া মাত্রই মেয়েটি একদম জরাজীর্ণ বৃদ্ধা হয়ে গেল।

চলে আসার আগে দেবতা আবার বলে দিল, প্রিয়তমা, তুমিও পুণ্য করবে। তোমাকে দেখতে আসা লোকজনকেও বলবে যাতে চরম বিপদে পড়লেও সেই বিপদ উপেক্ষা করে তারা দান, শীল, ভাবনা ইত্যাদি পুণ্যকর্ম করে। পুণ্যকর্ম করলে নিশ্চিতভাবেই সুখের ফল পাওয়া যায়। এতে সন্দেহ করতে মানা করবে।

বৃদ্ধা হয়ে সে নিজের আত্মীয়দের কাছে গিয়ে ধনসম্পদ নিয়ে সাতদিন ধরে পুণ্যকর্ম করে মারা গিয়ে তাবতিংস স্বর্গে জন্ম নিয়েছিল।

বুদ্ধ এভাবে বিশেষ করে সেই পচ্চেকবুদ্ধকে করা দানের ফল খুব ফলাও করে প্রকাশ করে দিলেন। তা শুনে লোকজন অকৃপণ হাতে দান ও অন্যান্য পুণ্যকর্মে রত হলো। তাই আপনারাও এই কোভিড-১৯ এর দুর্যোগের সময়ে বেশি বেশি করে পুণ্যকর্ম করুন।

শেষের কথা

এরকম আরো বহু কাহিনী আছে ত্রিপিটক ও অর্থকথায়। সেগুলো পর্যালোচনা করে আমার একটা ধারণা হয়েছে, এলিয়েন বা ভিনগ্রহের প্রাণী বলতে এখন লোকজন যেগুলো মনে করছে সেগুলো হচ্ছে এধরনেরই দেবতা। তারা মাঝে মাঝে এভাবে মানুষদেরকে মমতাবশত, অথবা অন্য কারণেও ধরে নিয়ে যায়। ধরে নিয়ে রেখে দেয় তাদেরই দিব্য বিমানে। অথচ লোকজন সেই দিব্যবিমানকে মনে করে ইউএফও। সেখানে তারা মানুষদেরকে রেখে দেয় কয়েকদিনের জন্য, পরে আবার ছেড়ে দেয়।

দিব্যবিমানগুলো ঠিক এই জগতে অবস্থান করে না। সেগুলো যে জগতে থাকে সেটা হচ্ছে দেবতাদের জগত। আমরা সেটাকে ভিন্ন মাত্রার জগতও বলতে পারি, অথবা প্যারালাল ইউনিভার্সও বলা যায়।

পৃথিবীর সময়ের সাথে সেখানকার সময় মেলে না। সেখানকার জগতও হচ্ছে আলাদা। সোজা কথায় স্পেস-টাইম আমাদের পৃথিবীর মতো নয়। সেখানে সময় দীর্ঘ হয়ে থাকে। ঋতু ও আহার প্রচুর অনুকুল হয়ে থাকে। তাই সেখানে মানুষের দেহ নিয়েও শত শত বছর ধরে বেঁচে থাকা যায়। কিন্তু অনেকগুলো ঘটনা আছে যেখানে মানুষেরা সেখানে শত হাজার বছর বেঁচে থাকলেও সেখান থেকে পৃথিবীতে ফিরে আসা মাত্রই বুড়ো হয়ে কয়েকদিন পরে মারা গিয়েছে।

রেফারেন্স:

[১] পেতৰত্থুপাল়ি=>২. উব্বরিৰগ্গো => ১১. সুত্তপেতৰত্থুৰণ্ণনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *