আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

বৌদ্ধধর্মে সৃষ্টিতত্ত্ব

আমরা জানি, একটা কল্প হচ্ছে বিশ্বজগতের সৃষ্টি ও ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত গণনাতীত পরিমাণ সময়কাল। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, বিশ্বজগতের সৃষ্টি ও ধ্বংস হয় কীভাবে? কীভাবে সৃষ্টি হলো আমাদের এই পৃথিবী?

সেটা নিয়ে অবশ্যই দীর্ঘ অনেকগুলো লেখা আসবে। তবে তার আগে বর্তমানে বিভিন্ন ধর্ম ও বিজ্ঞান অনুসারে যেসব সৃষ্টিতত্ত্ব প্রচলিত, সেগুলো নিয়ে একটু আলোচনা করলে ভালো হয়। আমরা সেগুলো দীর্ঘনিকায়ের ব্রহ্মজাল সুত্র অনুসারে পর্যালোচনা করে দেখতে পারি।

সৃষ্টিতত্ত্ব-১: ঈশ্বরবাদ

বিশ্বজগতের সৃষ্টি নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য মতবাদটি হচ্ছে ঈশ্বরবাদ। তাদের মতে সৃষ্টিকর্তা একজন আছেন। তার রয়েছে গড, আল্লাহ, ঈশ্বর, যিহোভা, নারায়ণ ইত্যাদি বিভিন্ন নাম। তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। তিনি অজর অমর। কিন্তু তার সৃষ্ট প্রাণিরা মরণশীল।
ব্রহ্মজাল সুত্রমতে, সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করাটা হচ্ছে একটা মিথ্যাদৃষ্টি বা ভ্রান্ত ধারণা। এমন ভ্রান্ত ধারণার উৎস হচ্ছে ধ্যানীদের অপর্যাপ্ত জ্ঞান অথবা যুক্তিবাদীদের যুক্তিতর্কজাত ভ্রান্ত ধারণা।
ধ্যানীদের কীভাবে এমন ভ্রান্ত ধারণা জন্মে? ব্রহ্মজাল সুত্রমতে, যখন এই পৃথিবী ধ্বংস হয়, তখন বেশিরভাগ প্রাণি মারা গিয়ে আলোময় জগতে জন্ম নেয়। তারা হয় জ্যোতির্ময়, আকাশচারী, দীর্ঘায়ুসম্পন্ন।
এদিকে পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার দীর্ঘকাল পরে আবার পৃথিবী সৃষ্টি হয়। পৃথিবীর উপরে মহাশূন্যে তখন ব্রহ্মলোকের সৃষ্টি হয়। আলোময় জগত থেকে তখন কেউ একজন মারা গিয়ে পৃথিবীর উপরে মহাশূন্যে সেই ব্রহ্মলোকে জন্মায়। সে সেখানেও হয় জ্যোতির্ময় দেহের অধিকারী, দীর্ঘায়ু, আকাশচারী।
তার সেখানে অবস্থানকালে এমন ইচ্ছা জাগে, ‘অন্যরাও এখানে আসুক।’ তখন অন্যরাও সেই আলোময় জগত থেকে নতুন সৃষ্ট ব্রহ্মলোকে জন্মায়। তারাও হয় জ্যোতির্ময় দেহের অধিকারী, দীর্ঘায়ু, আকাশচারী। তখন সেখানে যে প্রথম উৎপন্ন হয়েছিল, তার এরকম মনে হয়, ‘আমিই ব্রহ্মা, আমিই ঈশ্বর, আমিই সৃষ্টিকর্তা। আমার ইচ্ছাতেই এরা উৎপন্ন হয়েছে।’ অন্যদেরও এরকম মনে হয়, ‘ইনি আসলেই ব্রহ্মা, ঈশ্বর, সৃষ্টিকর্তা। আমরা তার সৃষ্টি। কারণ আমরা তাকেই প্রথম থেকে দেখে আসছি।’
অন্যদের মধ্য থেকে কেউ কেউ তাদের আয়ু শেষে সেখান থেকে চ্যুত হয়ে পৃথিবীতে মানুষ হিসেবে জন্ম নেয়। মানুষ হয়ে ধ্যানসাধনা করে কেউ কেউ কেবল তার সেই আগেকার জন্মটাকে স্মরণ করে বলে, ‘আসলে তিনিই হলেন ঈশ্বর, সৃষ্টিকর্তা। আমরা তার সৃষ্টি মাত্র। আমাদের তাই সেখান থেকে চ্যুত হতে হয়, অথচ তিনি সেখানে চিরকাল ধরে বিরাজমান।’(দী.নি.১.৩৮-৫২)

তার এই সৃষ্টিকর্তার ধারণাটাকে সে সত্য বলে মনে করে এবং সে তা লোকজনের মাঝে প্রচার করে বেড়ায়। সেটা ধীরে ধীরে লোকজনের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। এভাবেই ধ্যানী ও প্রচারকদের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার ধারণাটি লোকজনের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। খ্রিস্টান, ইহুদি ও ইসলাম ধর্মের লোকজন সবাই এমন সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী। উইকিপিডিয়ামতে, পৃথিবীতে বর্তমানে খ্রিস্টান রয়েছে ২৩০ কোটি, মুসলিম ১৯০ কোটি এবং হিন্দু ১২০ কোটি। এমনকি অনেক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীও বিশ্বাস করে যে, ভগবান হলেন তাদের সৃষ্টিকর্তা। তাহলে দেখুন তো, কতজন এমন ঘোর মিথ্যাদৃষ্টির মধ্যে ডুবে আছে!

সৃষ্টিতত্ত্ব-২: শাশ্বতবাদ

বিশ্বজগতের সৃষ্টি নিয়ে আরেকটি মতবাদ হচ্ছে শাশ্বতবাদ। এই মতবাদ অনুসারে, এই বিশ্বজগতের কোনো সৃষ্টি নেই, ধ্বংস নেই। এটা চিরকাল ধরে ছিল, আছে ও থাকবে। বুদ্ধের মতে, এমন ধারণার উৎস হচ্ছে দুটো। এর মধ্যে একটা হচ্ছে ধ্যানী বা সাধকের ধ্যানলদ্ধ জ্ঞান এবং আরেকটা হচ্ছে যুক্তিবাদীর নিজস্ব যুক্তিবোধ।
ধ্যানীর এমন ধারণা হয় কীভাবে? বুদ্ধ বলেন, কোনো কোনো যোগী বা সাধক ধ্যানে দক্ষ হয়ে উঠলে বহু অতীতজন্মকে স্মরণ করতে পারে। সে দেখে, ‘আমি অমুক জন্মে এই নামে এই বংশে এমন চেহারায় জন্মেছিলাম। তখন আমি এমন খেতাম, এমন সুখদুঃখ লাভ করেছিলাম, এত বছর বেঁচেছিলাম। মারা গিয়ে সেখান থেকে আবার অন্যখানে জন্মেছিলাম। সেখান থেকে এখানে জন্মেছি।’ তাই সে বলে, ‘এই জগত চিরকাল ধরে ছিল, আছে ও থাকবে। বরং সেখানে আমরা প্রাণিরা একজন্ম থেকে আরেক জন্মে ছুটে চলেছি অনন্তকাল ধরে।’
আবার কেউ কেউ হয় যুক্তিবাদী। তারা নিজের বুদ্ধি ও যুক্তির ভিত্তিতে পর্যালোচনা করে এরকম বলে থাকে, ‘এই জগত চিরকাল ধরে ছিল, আছে ও থাকবে। বরং সেখানে আমরা প্রাণিরা একজন্ম থেকে আরেক জন্মে ছুটে চলেছি অনন্তকাল ধরে।’
এই দুধরনের ব্যক্তিরা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টাকে দেখলেও তারা একই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। তারা মনে করে এই জগত অনন্তকাল ধরে বিরাজমান। আর সেখানে প্রাণিরা শুধু ছুটে চলেছে এক জন্ম থেকে আরেক জন্মে। এদেরকে বলা হয় শাশ্বতবাদী। (দী.নি.১.৩০-৩৭)

সৃষ্টিতত্ত্ব-৩: অকারণ সৃষ্টিবাদ

বিশ্বজগতের সৃষ্টি সম্পর্কে আরেকটি তত্ত্ব হচ্ছে অকারণ সৃষ্টিবাদ। এই মতবাদীরা বলে, এই বিশ্বজগত কোনো কারণ ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছে।
এই ভ্রান্ত মতবাদের কারণ সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বুদ্ধ বলেন, ভিক্ষুগণ, এক প্রকার দেবতা আছে যারা অজ্ঞান হয়ে মরার মতো পড়ে থাকে। কিন্তু সংজ্ঞা ফিরে পেলেই তারা সেই দেবলোক থেকে চ্যুত হয়। কখনো এমন হয় যে তাদের মধ্যে কোনো এক দেবতা সেখান থেকে চ্যুত হয়ে মানুষ হয়ে জন্মায়। সে মানুষ হয়ে ধ্যানসাধনা করে সেই দেবজন্মটাকে স্মরণ করতে পারে, কিন্তু তার আগের জন্মগুলোকে আর স্মরণ করতে পারে না। তখন সে বলে, ‘এই বিশ্বজগত ও প্রাণিরা আপনা থেকেই সৃষ্টি হয়। আমিও আগে ছিলাম না, কিন্তু এখন আপনাআপনি সৃষ্টি হয়েছি।’ এভাবে নিজের ধ্যানের অভিজ্ঞতালদ্ধ সীমিত জ্ঞানের ভিত্তিতে সে এমন ভ্রান্ত ধারণা প্রচার করে থাকে।
আবার তার্কিক ও যুক্তিবাদী কেউ কেউ আছে যারা নিজের বুদ্ধিবিবেচনার মাধ্যমে বিচার বিশ্লেষণ করে বলে, ‘এই পৃথিবী ও প্রাণিরা কারণ ছাড়াই আপনাআপনি সৃষ্টি হয়।’ (দী.নি.১.৬৭-৭৩)।

বিশ্বজগত হঠাৎ আপনা থেকেই সৃষ্টি হওয়ার এই মতবাদটি শুধু হাজার বছর আগেই নয়, বর্তমানেও থিওরিটিক্যাল ফিজিক্সের জগতে এটি একটি আলোচিত বিষয়। আপনারা spontaneous creation of the universe নামে গুগলে সার্চ দিয়ে বিষয়টা পড়ে দেখতে পারেন।

এভাবে কেউ কেউ মনে করে, এই বিশ্বজগত চিরস্থায়ী। এর কোনো সৃষ্টি নেই, ধ্বংস নেই। আবার কেউ কেউ মনে করে, একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। আবার কেউ কেউ মনে করে, এই বিশ্বজগতের সৃষ্টির পেছনে কোনো সৃষ্টিকর্তার হাত নেই। এটা অকারণেই আপনাআপনি সৃষ্টি হয়ে থাকে। বুদ্ধ এই মতবাদগুলোকে মিথ্যাদৃষ্টি বা ভ্রান্ত ধারণা বলে অভিহিত করেছেন। আশা করা যায়, বৌদ্ধরা এসব মিথ্যাদৃষ্টি থেকে দূরে থাকবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *