আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

কল্প নিয়ে গল্প

কল্প নিয়ে অনেকেই গণ্ডগোলে পড়েন। তাই আজ কল্প নিয়ে লিখতে বসলাম।
কল্প মানে হচ্ছে মহাকল্প। মহাকল্প হচ্ছে মহাবিশ্বের সময় পরিমাপের একক। সোজা কথায়, এই বিশ্বজগত সৃষ্টির পর থেকে ধ্বংস হয়ে আবার সৃষ্টি হওয়া পর্যন্ত যতটুকু সময় লাগে, তা হচ্ছে এক কল্প বা এক মহাকল্প।

*** মহাকল্পের ব্যাখ্যা ***
ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলা যাক। আমাদের এই বিশ্বে রয়েছে পৃথিবী, চন্দ্রসূর্য, সাগর, মহাসাগর ইত্যাদি। সেগুলো হচ্ছে দৃশ্যমান জগত। অদৃশ্যমান জগতের মধ্যে রয়েছে স্বর্গ, নরক, ব্রহ্মলোক ইত্যাদি। এসব দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান জগত নিয়ে গঠিত হয়েছে আমাদের এই বিশ্ব।

এরকম অসংখ্য বিশ্ব রয়েছে। এসব বিশ্বজগত সৃষ্টি ও ধ্বংস হয়ে থাকে একটা নির্দিষ্ট নিয়মে। একেকটি বিশ্ব সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে দীর্ঘকাল ধরে টিকে থাকে। অসংখ্য বছর ধরে টিকে থাকে। এরপর একসময় তার ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু হয়। সেই ধ্বংসের প্রক্রিয়াও চলে অসংখ্য বছর ধরে। এরপর বিশ্বজগত ধ্বংস হয়ে একদম শূন্যে বিলীন হয়ে যায়। সেখানে অন্ধকারে তখন পড়ে থাকে শুধু অনন্ত মহাশূন্য। (মহাশূন্য কেন অন্ধকার তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মাতামাতির শেষ নেই। ভন দানিকেন নামের এক সুইস লেখক তো প্রাচীন লিপি পড়ে অবাক। প্রাচীনকালের লোকজন কীভাবে জানল যে মহাশূন্য অন্ধকার? আকাশে সূর্য থাকলে তো সেটা নীল দেখায়। একমাত্র মহাশূন্যে গেলে তবেই জানা যায় যে, মহাশূন্য হচ্ছে অন্ধকার। তাহলে কি প্রাচীনকালের লোকজন মহাশূন্যেও ভ্রমণ করেছিল?)

সে যাই হোক, অসংখ্য বছর ধরে মহাশূন্য হয়ে থাকার পরে সেখানে আবার সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু হয়। সেটাও চলে অসংখ্য বছর ধরে। সৃষ্টি হয়ে এরপর বিশ্ব আবার টিকে থাকে অসংখ্য বছর ধরে। এভাবে বিশ্বের ধ্বংস ও সৃষ্টির প্রক্রিয়া ক্রমাগতভাবে চলতে থাকে চারটি ধাপে – ধ্বংস, শূন্যতা, সৃষ্টি ও স্থিতিকালের মধ্য দিয়ে। এই চারটি ধাপ অতিক্রম করতে যে দীর্ঘ সময় লাগে, সেটাই হচ্ছে এক মহাকল্প। আরো বিস্তারিত জানার জন্য আপনারা অঙ্গুত্তর নিকায়ের কল্প সুত্র (অ.নি.৪.১৫৬) দেখতে পারেন।

অসংখ্যকল্প
মহাকল্পের কথা জানা হলো। আগেই বলেছি যে, সাধারণভাবে আমরা মহাকল্পকে শুধু কল্প নামে উল্লেখ করে থাকি। এই কল্প এত দীর্ঘ সময় যে তার একেকটা ধাপ পেরোতেই অসংখ্য বছর লেগে যায়। তাহলে বুঝে নিন একটা কল্প কত দীর্ঘ।

এই এক কল্প যদি এত দীর্ঘকাল হয়, এত অসংখ্য বছর হয়, তাহলে একশ কল্প কত দীর্ঘকাল হবে? এক হাজার কল্প কত দীর্ঘকাল হবে? এক লক্ষ কল্প কত দীর্ঘকাল হবে? নিশ্চয়ই সেটা অনন্তকালের মতো মনে হবে। এভাবে যখন গণনাতীত অসংখ্য কল্প অতীত হয়ে যায়, ততটা দীর্ঘ সময়কে বলা হয় এক অসংখ্য কল্প। সেটা যে কতটুকু দীর্ঘ সময়, তা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। এর মাঝে আমাদের কত অসংখ্যবার জন্ম নিতে হয়েছে বিভিন্ন প্রাণিকুলে। এভাবেই আমাদের গৌতম বুদ্ধ এমন চার অসংখ্যকল্প এবং আরো এক লাখ কল্পের অধিককাল ধরে পারমী পূরণ করেছিলেন।

*** বুদ্ধের উৎপত্তি অনুসারে কল্প

আবার বুদ্ধের উৎপত্তি অনুসারেও এই মহাকল্পগুলোকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। যেমন পদুমুত্তর বুদ্ধবংশের অর্থকথায় বলা হয়েছে, এক কল্পে যদি একজন মাত্র বুদ্ধ উৎপন্ন হন তাহলে তাকে বলা হয় সারকল্প। দুজন বুদ্ধ উৎপন্ন হলে সেটা হয় মন্ডকল্প। তিনজন হলে হয় বরকল্প। চারজন হলে সারমণ্ডকল্প। পাঁচজন হলে হয় ভদ্রকল্প।

দীর্ঘনিকায়ের মহাপদান সুত্রের অর্থকথা অনুসারে, আমাদের বর্তমান কল্পটা হচ্ছে ভদ্রকল্প। এই ভদ্রকল্পে ককুসন্ধ, কোণাগমন, কশ্যপ ও গৌতম এই চারজন বুদ্ধ জন্মেছেন। পরবর্তীতে আরো জন্মাবেন মৈত্রেয় বুদ্ধ। এভাবে পাঁচজন বুদ্ধ হওয়ার কারণে এই কল্পটিকে বলা হয় ভদ্রকল্প। (দী.নি.অ.২.৪)

যে কল্পে কোনো বুদ্ধ উৎপন্ন হন না, সেটাকে বলা হয় শূন্যকল্প। সাধারণত অধিকাংশ কল্প হয় শূন্যকল্প। যেমন দীপঙ্কর বুদ্ধের পরে এক অসংখ্যকল্প যাবত কোনো বুদ্ধ উৎপন্ন হন নি। বহু দীর্ঘকাল ধরে তখন জগত অজ্ঞানতার অন্ধকারে ডুবে ছিল।

এরপরে অন্তরকল্প রয়েছে। সেটাও তিন ধরনের- দুর্ভিক্ষ অন্তরকল্প, রোগ অন্তরকল্প, অস্ত্র অন্তরকল্প। পরবর্তীতে বিশ্বের সৃষ্টির প্রক্রিয়া নিয়ে আমি বিস্তারিত লিখব। সেখানে এই অন্তরকল্পগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা থাকবে।

4 thoughts on “কল্প নিয়ে গল্প

  1. বন্দনা ভান্তে। অষ্টশীল নিলে দুধ বা দুধ মিশ্রিত চা কিংবা কফি খাওয়া যায় কিনা? খাওয়া না গেলে কেনো? তাহলে মিল্ক ক্যান্ডি কিংবা কফি মিল্ক চকলেট খাওয়া যায় কিভাবে!! আমকে ব্লেন্ড করে শরবত করে খাওয়া যায় কিন? অষ্টশীল নিয়ে মোবাইলে যদি গেম খেলা হয় তবে কি এটা কোন শীলের পরিহানি বা নিয়ম ভঙ্গ হবে? এতগুলো প্রশ্ন করার জন্য ধন্যবাদ।

    1. অষ্টশীল নেয়া মানে হচ্ছে আপনি আটটি বিষয় থেকে বিরত থাকবেন বলে প্রতিজ্ঞা করা। তার মধ্যে বিকালে খাওয়া থেকে বিরত থাকাও অন্তর্ভুক্ত। এই খাওয়ার মধ্যে ভাত-তরকারী থেকে শুরু করে ফলমূল, দুধ, এমনকি নারিকেলের পানিও অন্তর্ভুক্ত। সেগুলো বিকালে খাওয়া যায় না। তবে বিকালে আপনি পানীয় বা ফলের জুস খেতে পারেন। কোল্ড ড্রিংকস খেতে পারেন। প্রয়োজনে আরো খেতে পারেন পাঁচটি ভেষজ ঔষধ- তেল, মধু, চিনি, ঘি, মাখন। সেই সাথে যেকোনো ধরনের ওষুধ খেতে পারেন প্রয়োজনে।

      অষ্টশীলের একটা শীল হচ্ছে বিনোদনমূলক বিভিন্ন জিনিস যেমন- নাচ, গান, সঙ্গীত ও বিভিন্ন ধরনের বিনোদনমূলক শো বা প্রদর্শনী দেখা। তার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের খেলাও অন্তর্গত। তাই নিশ্চিতভাবেই সেখানে অষ্টশীল ভঙ্গ হয়।

      অষ্টশীল পালন করাটা পরিপূর্ণ হয় যদি শীল নিয়ে নিরবে ভাবনায় ডুবে থাকা হয়, অথবা ধর্মীয় বই পড়া হয়। তা না করে বিনোদনে ডুবে থাকলে তাহলে সেটা নামকাওয়াস্তে হয় মাত্র।

      1. ধন্যবাদ ভান্তে বন্দনা। তবে উচ্চশয়ানা মহাশয়ানা আমরা পালন করতে পারি না। যেমন আজ অফিসে চেয়ারে বসে কাজ করেছি। রাতে আবার সোফায় বসি খাটে শুই। তাহলে আমরা এই শীলটা কিভাবে পালন করব।

        1. উচ্চশয়ন মহাশয়ন শীল পালন করতে হলে মেঝেতে শুতে হবে, মেঝেতে বসে কাজ করতে হবে। এক হাতের বেশি উঁচু চেয়ারে বা খাটে শোয়া যাবে না, বসা যাবে না। তোশকের উপরে শোয়া যাবে না, বসা যাবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *