আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

হে সতীর্থ ভিক্ষুগণ! আপনারা আগামী দিনের ভিক্ষুদের মত হবেন না যেন!

ফুস্স ভিক্ষু ছিলেন এক প্রাদেশিক শাসনকর্তার সন্তান। প্রাপ্তবয়স্ক হলে তিনি ক্ষত্রিয়দের শিল্পবিদ্যায় বেশ দক্ষ হয়ে উঠলেন। কিন্তু পূর্বজন্মে তার নির্বাণ প্রার্থনা করা ছিল, তাই ভোগসুখে তার মন বসল না। এক মহাথেরোর কাছে ধর্মদেশনা শুনে তার শ্রদ্ধা জেগে উঠল। তিনি ভিক্ষু হয়ে নিজের উপযোগী একটা ধ্যানের কলাকৌশল শিখে নিয়ে ধ্যানলাভী হলেন। এরপর সেটাকে ভিত্তি করে বিদর্শনে মন দিলেন। এভাবে তিনি অচিরেই ছয় অভিজ্ঞা বা ছয়টি বিশেষজ্ঞান লাভ করে অর্হৎ হলেন।

একদিন পণ্ডরসগোত্র নামের এক সন্ন্যাসী এল তার কাছে। সেই সন্ন্যাসীটি দেখল কয়েকজন ভিক্ষু ধর্মদেশনা শুনতে শুনতে বসে আছে। সেই ভিক্ষুরা ছিল সুশীল, সদাচারী, দেহ ও মনে সুসংযত। এমন শান্ত সংযত ভিক্ষুদের দেখে সন্ন্যাসীর খুব ভালো লাগল। সে ভাবল, আহা! এমন শিক্ষা, এমন আচরণ জগতে যদি দীর্ঘকাল টিকে থাকত!
তাই সে ফুস্স থেরোকে জিজ্ঞেস করল, “ভান্তে, ভবিষ্যতে ভিক্ষুদের আচার আচরণ কেমন হবে? তাদের ইচ্ছা কীরকম হবে? তাদের কি হীনকাজ করার ইচ্ছা হবে, নাকি উত্তম কাজের ইচ্ছা হবে? তাদের আগ্রহ কিরকম হবে? সেটা কি কলুষতায় ভরপুর হবে, নাকি কলুষতাহীন হবে? তাদের বেশভূষা কীরকম হবে? তারা কি চরিত্রবান হবে, নাকি স্বেচ্ছাচারী হবে?”

তখন ফুস্স থেরো অনাগতজ্ঞান দিয়ে আগামী দিনের ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীদের বিষয়ে দেখে বললেন, “হে পণ্ডর ঋষি, আপনি যে প্রশ্ন করেছেন আমি তার উত্তরে সেই আগামী দিনের কথা বলব। মন দিয়ে আমার কথা শুনে রাখুন।”

বদরাগী, মনে ক্ষোভ পুষে রাখে, অন্যের গুণকে খাটো করে দেখায়, অহংকারী, জ্ঞানী না হলেও জ্ঞানী বলে ভাব দেখায়, ঈর্ষাকাতর, একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে নানান কথা বলে ঝগড়া করে থাকে, এমন বহুজন আসবে আগামীতে।
(কেন? তখনো কি সেরকম ঝগড়াটে স্বভাবের ভিক্ষু ছিল না নাকি? ছিল। কিন্তু তখন কল্যাণমিত্র ছিল অনেক। তাদেরকে উপদেশ দেয়ার মতো দক্ষ আচার্যগণ ছিলেন। কলুষতাগুলোর প্রতি সতর্ক থাকার কারণে তখন বেশির ভাগ ভিক্ষু রাগ বা ক্রোধহীন ছিল। কিন্তু আগামীতে বেশিরভাগ ভিক্ষু হবে বদরাগী, ক্ষোভপরায়ণ।)

ধর্মের গম্ভীর বিষয়গুলোকে না জানলেও তারা সেগুলোকে জানে ও দেখে বলে ভাব দেখাবে, এভাবে তারা নদীর এপারেই পড়ে থাকবে। চঞ্চলমতি হবে, ধর্মকে গৌরবতার চোখে দেখবে না, ভিক্ষুসঙ্ঘকে ও সতীর্থ ভিক্ষুদেরকে মান্যগণ্য করবে না।

এধরনের বহু দোষ ও অন্তরায় আগামীতে লোকজনের মাঝে আবির্ভূত হবে। সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক যে সুন্দরভাবে ধর্ম দেশিত হয়েছে, যেটা হচ্ছে শুরুতে, মধ্যে ও শেষে কল্যাণময়, প্রজ্ঞাহীন লোকজন সেই এমন সদ্ধর্মকে কলুষিত করে তুলবে। বিনয়ে যেটা করলে অপরাধ হয় তারা সেটাকে নিরপরাধ বলে চালিয়ে দেবে। গুরুতর অপরাধকে তারা বলবে ছোটখাট অপরাধ। এভাবে আরো বহুভাবে তারা দুরাচার, ভুল দৃষ্টিভঙ্গি ও তৃষ্ণাজনিত কলুষগুলোকে মিশ্রিত করে সদ্ধর্মকে মলিন করে তুলবে। (যেমন অঙ্গুত্তর নিকায়ের পঞ্চকনিপাতের তৃতীয় অনাগতভয় সুত্রে বুদ্ধ বলেছেন, “হে ভিক্ষুগণ, ভবিষ্যতকালে ভিক্ষুদের হবে অভাবিত দেহ-মন, অভাবিত শীল ও প্রজ্ঞা। ফলে তারা অভিধর্মের কথা বললে বুঝবে না, জ্ঞানমিশ্রিত কথোপকথন করলে বুঝবে না। হে ভিক্ষুগণ, ভবিষ্যতে এমন তৃতীয় অনাগতভয় উৎপন্ন হবে। সেটা বুঝতে হবে। সেটা বুঝে তা পরিত্যাগের জন্য প্রচেষ্টা চালাতে হবে। (অ.নি.৫.৭৯)”)

দুঃশীল, নির্লজ্জ ও দুরাচারী, ধর্মবিনয় বলতে কিছু নেই এমন ভিক্ষুরা শুধুমাত্র লাভ ও সম্মানের উদ্দেশ্যে কিছু গুণাবলী গঠন করে বহুজনের সমর্থনে শক্তিশালী হয়ে উঠবে। তারা হয়ে উঠবে খুব মুখরা। তারা বহুশ্রুত না হয়েও ধর্মকে অধর্ম বলবে, অধর্মকে ধর্ম বলবে, বিনয়কে বলবে অবিনয়, অবিনয়কে বলবে বিনয়। এভাবে তারা সঙ্ঘের মাঝে নিজের ইচ্ছেমত যেকোনো বিষয়কে প্রতিষ্ঠা করার মতো বলবান ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। ফলে সঙ্ঘের মাঝে কোনো একটা বিষয়ে আলোচনা চললে সেখানে তারা নির্ভয়ে যা-তা বলতে শুরু করবে।

সুশীল ভিক্ষুরা যথার্থই ধর্মকে ধর্ম এবং অধর্মকে অধর্ম বললেও সঙ্ঘের মাঝে নির্লজ্জ ভিক্ষুদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় তারা দুর্বল হয়ে পড়বে। যার কারণে তাদের কথাগুলো গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। তারা হবে লজ্জাশীল এবং তারা কারো মনে আঘাত দিতে চাইবে না। ধর্মবিনয় অনুসারে যেকোনো বিষয় যথাযথভাবে সমাধান করার মতো সামর্থ্য থাকলেও তারা যেচে পড়ে কারো সাথে বিরোধিতা করতে চাইবে না। তারা পাপকে ঘৃণা করবে এবং বেশি ঝামেলায় যেতে চাইবে না। তাই ধর্ম ও বিনয়সম্মতভাবে নিজেদের মতামতকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করবে না। তারা নিরবে চুপ করে থাকবে।

ভবিষ্যতে মেধাহীন বা প্রজ্ঞাহীন ভিক্ষুরা কপ্পিয়-অকপ্পিয় না জেনে (অর্থাৎ বিনয়ের নিয়ম অনুসারে কোনগুলো ভিক্ষুদের উপযুক্ত, কোনগুলো অনুপযুক্ত তা না জেনে) নিজেদের জন্য টাকাপয়সা, মণিরত্ন, শস্যক্ষেত্র ও অনাবাদী জমি, গরু, মোষ, ছাগল ইত্যাদি পশু, দাসদাসী ইত্যাদি গ্রহণ করবে।

ভিক্ষুদের জন্য বুদ্ধ কর্তৃক নির্দেশিত পাতিমোক্ষ শীলে তারা সংযত থাকবে না। চোখ, কান ইত্যাদি ইন্দ্রিয়গুলোতে তারা সংযত হবে না। চীবর, বাসস্থান, খাদ্য ও ওষুধপত্র তারা যথাযথভাবে পর্যালোচনা না করে ব্যবহার করবে। তারা প্রশংসা, চাটুকারিতা, তোষামোদী কথা বলে লাভসৎকার আদায় করবে। সেই মুর্খরা এভাবে চার প্রকার পরিশুদ্ধিশীলে সংযত না হয়ে বরং অন্যকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখবে। নিজেকে বিরাট একটা কিছু মনে করবে। প্রতিবাদী মন নিয়ে থাকবে। কী করতে হবে না করতে হবে সেব্যাপারে তর্কবিতর্কে লিপ্ত হয়ে বিচরণ করবে, যেন নিজের পছন্দসই ঘাসের অন্বেষণে কলহে লিপ্ত হরিণের মতো।
তারা হবে অস্থিরমনা, অনুপযোগী রঙে রাঙানো নীল রঙের চীবর পরিধান করবে, কুহকগিরি করবে (অর্থাৎ ঈপ্সিত জিনিস লাভের আশায় সেটাকে নিয়ে আকারে ইঙ্গিতে কথা বলা ইত্যাদি করবে), ক্রোধে ও অভিমানে কঠিন মন নিয়ে থাকবে। কৌশলে এমনভাবে আলাপ করবে যাতে শ্রদ্ধাবান লোকজন বলতে বাধ্য হবে, “ভান্তের কী লাগবে বলুন”। শেয়ালের মতো এমন ধুর্তামিতে ভরা হবে যে তারা আর্যব্যক্তির মতো ভাব ধরে বিচরণ করবে।

চুলে তেল দিয়ে, দেহে প্রসাধনী মেখে, চোখে কাজল দিয়ে, দাঁতের মতো সাদা রঙের চীবর পরিধান করে সেজেগুজে এদিক ওদিক দেখতে দেখতে তারা পিণ্ডচারণে অথবা রাস্তায় বের হবে।

বিমুক্ত আর্যগণের কাছে প্রিয় এমন উপযুক্ত রঙে রাঙানো অর্হতের ধ্বজা হওয়া চীবরকে তারা ঘৃণা করবে। তার বদলে তারা সাদা রঙের প্রতি বিমোহিত হয়ে উঠবে।

তারা হবে লাভসৎকার লাভে উন্মুখ। পিণ্ডচারণে অলস হবে। ধ্যানসাধনা করতে উৎসাহী হবে না। বনেজঙ্গলে বসবাসে অনিচ্ছুক হয়ে তারা গ্রামের বাসস্থানে বসবাস করবে।

যারা সর্বদা মিথ্যাজীবিকার মাধ্যমে লাভসম্মান লাভ করবে, সেরকম শীল ও সংযম বিহীন ব্যক্তিদের কাছে তারা শিক্ষা লাভ করবে। অতঃপর স্বয়ং তাদের মতো মিথ্যাজীবিকার মাধ্যমে লাভসম্মান পাওয়ার জন্য রাজকুল, উচ্চকুল, ধনীকুলের সাথে মেলামেশা করবে।
যেসব ভিক্ষু মিথ্যাজীবিকা বর্জন করে থাকবে, অথচ অল্পপুণ্যের কারণে অত লাভসম্মানও পাবে না, তারা ভবিষ্যতে পূজনীয় হবে না, প্রশংসিত হবে না। এমনকি তারা ধর্মবিনয়ে খুব দক্ষ হলেও তখন লাভেচ্ছুক ভিক্ষুরা তাদের সাথে মেলামেশা করবে না।

নিজেদের ধ্বজা হওয়া চীবরকে ঘৃণা করে তাদের কেউ কেউ কালো ডুমুর রঙে রাঙানো চীবর ব্যবহার করবে। আর কেউ কেউ ভিক্ষু হিসেবে পরিচয় দিলেও অন্যধর্মের ধ্বজা হওয়া সাদা বস্ত্রকেই পরিধান করবে।

তখন চীবরের প্রতি ভিক্ষুদের আর গৌরবতা থাকবে না। এমনকি চীবর প্রত্যবেক্ষণ বা পর্যালোচনা করে ব্যবহার করাটাও তাদের মধ্যে থাকবে না।

ছদ্দন্ত নাগরাজ বর্শাবিদ্ধ হয়ে দেহের ভীষণ ব্যথায় অভিভূত হয়েও অর্হতের ধ্বজা হওয়া এমন চীবরকে দেখে অর্থপূর্ণ গাথা বলেছিল এভাবে:

রঙিনমনা হয়েও যে চীবর পরিধান করে, 
সংযম ও সত্য থেকে দূরে থাকে, সে চীবরের যোগ্য নয়।
মনের রং পরিষ্কার করে, শীলে সংযত,
সংযম ও সত্যের আশ্রয়ে থাকে, সে হচ্ছে চীবরের যোগ্য।
শীল ভঙ্গ করেও তা বিশোধনের চেষ্টা করে না,
দুঃশীল ও স্বেচ্ছাচারী, বিভ্রান্তমনা,
কুশলধর্ম বিরহিত, সে চীবরের যোগ্য নয়।
যে শীলসম্পন্ন, লোভহীন, একাগ্রমনা,
অনাবিল চিন্তা চেতনা, সে হচ্ছে চীবরের যোগ্য।
চঞ্চলমতি, উদ্ধতমনা মুর্খ, যার কোনো শীল নেই,
সাদা বস্ত্রই তাকে মানায়, চীবর দিয়ে তার কী হবে?

ভবিষ্যতের ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীরা দূষিতমনা ও পরস্পরের অগৌরবকারী হবে। তাদের প্রতি মৈত্রীভাবকারীকেও তারা উত্যক্ত করে তাড়াবে। আচার্যগণ তাদেরকে চীবর পরিধান ইত্যাদি শিক্ষা দিলেও তারা তাদের কথা শুনবে না।

তারা সেভাবে শিক্ষিত মুর্খ হয়ে পরস্পরের অগৌরবকারী হবে। এমনকি দুষ্ট ঘোড়া যেমন সহিসের শিক্ষায় কান দেয় না, তেমনি তারাও আচার্যগণকে ভয় পাবে না, লজ্জা পাবে না।
এভাবে আগামীতে বুদ্ধশাসনের শেষকালে ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীদের এমন আচার আচরণ হবে।

(এখানে বুদ্ধশাসনের শেষকাল কোনটা? বুদ্ধশাসনের পাঁচটি যুগ। সেগুলোর মধ্যে প্রথমে হচ্ছে বিমুক্তিযুগ। সেটা অতিবাহিত হলে আসবে সমাধিযুগ। সেটা অতীত হলে আসবে শীলযুগ। সেটার পরে আসবে শ্রুতিযুগ। এরপরে আসবে দানের যুগ। শীলযুগের সময়ে শীল অপরিশুদ্ধ হলেও কেউ কেউ লাভসম্মানের আশায় পরিয়ত্তি ও বহু শাস্ত্র শিক্ষা করবে। সেটা হবে শ্রুতির যুগ। কিন্তু যখন সম্পূর্ণ পরিয়ত্তি বিনষ্ট হয়ে হারিয়ে যাবে, তখন থেকে কেবল ভিক্ষুর চিহ্নমাত্র অবশিষ্ট থাকবে। তখন নাকি ভিক্ষুরা এখান থেকে ওখান থেকে ধন সংগ্রহ করে দান করতে থাকবে। সেটাই নাকি তখন তাদের যথাযথ ভিক্ষুচিত আচরণ বলে গণ্য হবে। সেটা হবে দানের যুগ। সেটাই হবে শ্রুতিযুগের শেষকাল, অথবা শীলযুগের শেষকাল।)

এভাবে বুদ্ধশাসনের শেষকালে এমন মহাভয়ের কথা দেখিয়ে ফুস্স থেরো সেখানে উপস্থিত ভিক্ষুদেরকে উপদেশ দেয়ার উদ্দেশ্যে বললেন,

আগামী এই মহাভয় না আসা পর্যন্ত,
আপনারা সুবাধ্য হোন, ভদ্রনম্র হোন,
একে অপরকে মান্যগণ্য করুন।
মৈত্রীমনা হোন, করুণাপ্রবণ হোন,
শীলে সংযত হোন, নির্বাণের প্রতি উৎসাহী হোন,
দৃঢ় উদ্যমী হয়ে থাকুন সর্বদা।
প্রমাদকে ভয় হিসেবে দেখুন।
অপ্রমাদকে নিরাপদ স্থান হিসেবে দেখুন।
অষ্টাঙ্গিক মার্গ ভাবনা করুন।
অমৃতের পথ নির্বাণ সাক্ষাৎ করুন।

*** প্রমাদ মানে হচ্ছে পুণ্যকাজ না করা, পাপকাজে মনোযোগ দেয়া
*** অপ্রমাদ মানে হচ্ছে প্রমাদের বিপরীত, অর্থাৎ পুণ্যকাজ করা এবং পাপকাজ থেকে বিরত থাকা।
*** রেফারেন্স: থেরগাথাপাল়ি → ১৭. তিংসনিপাতো → ১. ফুস্সত্থেরগাথা (থেরগাথা.৯৪৯-৯৮০ এবং তার অর্থকথা)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *