আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

অধিমাসের ব্যাপারে আমার মতামত

আমাদের ভিক্ষুদের বর্ষাবাসের সময় ঘনিয়ে এসেছে। আর বর্ষাবাস কখন শুরু হবে তাই নিয়ে অনেকেই বিভ্রান্তিতে পড়েছেন। অনেকেই আমাকে মেসেজ দিয়ে এব্যাপারে জানতে চেয়েছেন। আমি কোনো বিনয় বিশারদ নই। তবুও তারা আমার মতামত জানতে চান। আমি তাই অনেকটা নিরুপায় হয়ে গত দুতিন দিন ধরে এব্যাপারে একটু পড়াশোনা করেছি। বিশেষত বিনয়সঙ্গহ অর্থকথা এবং বিনয়লঙ্কার টীকা খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছি। তার সাথে বিনয়পিটকের মহাবর্গ, তার অর্থকথা, টীকাগুলো তো আছেই। আর এর সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে তিথি নক্ষত্র, প্রতিপদ ইত্যাদি বিষয়গুলো। তার জন্য দ্বারস্থ হতে হয়েছে ইন্টারনেটের বিভিন্ন ওয়েবসাইটের। এভাবে অনেক গবেষণা করে এই লেখাটা লিখলাম। রেফারেন্স দিয়েছি। বিজ্ঞজনেরা সেগুলো চেক করে দেখতে পারেন। ভুল তথ্য দেখলে অনুগ্রহ করে জানানোর অনুরোধ রইল।

মায়ানমারে বর্ষাবাস হচ্ছে অগাস্ট থেকে

মায়ানমারে বর্ষাবাস শুরু হবে অগাস্টের ৪ তারিখ থেকে। কারণ হচ্ছে এবছর অধিমাস বা মলমাস হবে আশ্বিন মাসে, সেটা হচ্ছে অক্টোবরে, কারণ তখন অক্টোবরে দুটো পূর্ণিমা হবে। কিন্তু সেটা অক্টোবরে হলেও মলমাসটা যোগ করা হয় বর্ষাঋতুর আগে, কারণ বৌদ্ধ নিয়ম অনুযায়ী কোনো বছরে মলমাস পড়লে সেটা সবসময় বর্ষাবাসের আগে যোগ করে দিতে হয়। সেটাই বিনয়ের নিয়ম। বিষয়টা বিনয়পিটকের মহাবর্গে উল্লেখ আছে এভাবে-

বিনয়পিটকের অধিমাস

সেই সময়ে মগধরাজ সেনিয় বিম্বিসার বর্ষাকে পিছিয়ে দিতে ইচ্ছুক হলেন। অর্থাৎ বর্ষার প্রথম মাসকে পিছিয়ে দিতে চাইলেন। বর্ষার প্রথম মাস হচ্ছে আষাঢ় মাস। এরপরে হয় শ্রাবণ মাস। কিন্তু তিনি শ্রাবণ মাসকে শ্রাবণ হিসেবে না ধরে আবার আষাঢ় মাস হিসেবে গণনা করতে চাইলেন। অন্যকথায়, তখন দুটো আষাঢ় মাস হবে। প্রথম আষাঢ় এবং দ্বিতীয় আষাঢ়। তিনি চাইলেন দ্বিতীয় আষাঢ় মাস থেকেই বর্ষাঋতু শুরু হোক। সেঅনুযায়ী এরপরে স্বাভাবিকভাবে শ্রাবণ, ভাদ্র ইত্যাদি মাস গণনা করা হবে। তাই তিনি ভিক্ষুদের কাছে দূত পাঠালেন, ভান্তেগণ আগামী পূর্ণিমায় বর্ষাবাস ধরুন। ভগবানকে ব্যাপারটা জানানো হলো। ভগবান বললেন, হে ভিক্ষুগণ, রাজাদের আদেশ অনুসারে চলার অনুমোদন করছি (মহাৰ. ১৮৬; মহাৰ.অ. ১৮৬)। এভাবেই বিনয়পিটকে অধিমাসের ব্যাপারটা এসেছে।

বিনয়লঙ্কার টীকা বলছে, এখানে বিম্বিসার রাজা ভগবানকে অধিমাস প্রজ্ঞাপ্ত করারও অনুরোধ করেন নি। ভগবানও কোনো অধিমাস প্রজ্ঞাপ্ত করেন নি। আর ত্রিপিটকে, অর্থকথায় বা টীকায় অমুক বছরে অমুক অধিমাস হবে বলেও কোথাও লেখা নেই। শুধুমাত্র কোনো বছরে অধিমাস হলে তখন ভিক্ষুরা কীভাবে বর্ষাবাস শুরু করতে পারেন বুদ্ধ শুধু সেটারই অনুমোদন করেছিলেন।

তাহলে কোনো বছরে অধিমাস হবে কিনা সেটা কীভাবে জানা যাবে? সেটার জন্য আমাদেরকে জ্যোতিষশাস্ত্রের হিসাবের উপরই নির্ভর করতে হবে। বিম্বিসার রাজাও জ্যোতিষশাস্ত্রের হিসেবে অধিমাস হবে এই জেনে ভিক্ষুদেরকে তা জানিয়ে দিয়েছিলেন। আর বুদ্ধ তখন বর্ষাবাস পেছানোটা অনুমোদন করেছিলেন।

বিনয়পিটকের মহাবর্গ অর্থকথায় বলা হয়েছে, “এখানে বর্ষা পেছালে ভিক্ষুদের কোনো পরিহানি নেই। তাই সেক্ষেত্রে রাজাদেরকে অনুসরণ করার অনুমোদন করা হয়েছে” (মহাৰ.অ. ১৮৫)।

বিনয়লঙ্কার টীকামতে, রাজা যদি বর্ষা পিছিয়ে দিতে চান তো সেঅনুসারে তখন জ্যেষ্ঠ মাসের কৃষ্ণপক্ষের উপোসথ চতুর্দশী বা পঞ্চদশীতে করা যায়। এর পরে প্রথম আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষ, কৃষ্ণপক্ষ এবং দ্বিতীয় আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চদশী তিথিতে উপোসথ করে প্রতিপদ দিবসে ভোরে অরুণোদয়ের সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী অুরুণোদয় পর্যন্ত সময়ে সারা দিনরাতের মধ্যে যখন খুশি বর্ষাবাস শুরু করলে কোনো দোষ নেই। সেখানে তিথিযোগ বা নক্ষত্রযোগ অতকিছু দেখার কোনো দরকার নেই।

রাজা না থাকলে কী করা যায়?

এভাবে আমরা দেখলাম অধিমাসের ব্যাপারে বুদ্ধের অনুমোদিত বিধি হচ্ছে, রাজাদের অনুসরণে একমাস পিছিয়ে বর্ষাবাস শুরু করা। বর্তমানে বৌদ্ধদেশে হলে তা সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশ ও ভারতের বৌদ্ধদের জন্য সেরকম কোনো সরকারী নির্দেশনা নেই। তাহলে তারা কী করবেন?

আমার মতামত হচ্ছে, বুদ্ধ রাজাদেরকে অনুসরণ করতে বলেছেন। আর রাজারা জ্যোতিষীদের পরামর্শ অনুসরণ করেন মাত্র। অন্যদিকে জ্যোতিষীরা জ্যোতিষশাস্ত্রের হিসাব মোতাবেক বলে দেন কখন অধিমাস হবে, আর কখন হবে না। অতএব রাজার আদেশ না থাকলে সেক্ষেত্রে আমাদের জ্যোতিষশাস্ত্রের সিদ্ধান্তকেই অনুসরণ করা উচিত। জ্যোতিষশাস্ত্র মোতাবেক যেবছর অধিমাস হয় সেবছর বর্ষাকে পেছানো উচিত, মায়ানমারের মতো। আমার কাছে সেটাই যৌক্তিক বলে মনে হয়।

বিনয়লঙ্কার টীকাও কিন্তু সেটা বলছে। সেখানে বলা হয়েছে- ইতো পরম্পি ৰিৰিধেন আকারেন কথেন্তি। সুদ্ধৰেদিকাপি এৰং ৰদন্তি, ৰিনযধরা ভিক্খূ ৰিনযসমযৰসেন ৰদন্তি। অম্হাকং পন ৰেদসমযে হত্থগতগণনৰসেনেৰ জানিতব্বন্তি অলমতিপপঞ্চেন।

অর্থাৎ, “এতকিছুর পরেও বহুজন বহুভাবে এব্যাপারে মতামত দিয়ে থাকেন। জ্যোতিষীরা বলেন জ্যোতিষের দৃষ্টিকোণ থেকে, বিনয়ধর ভিক্ষুরা বলেন বিনয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে। আমাদের কিন্তু বর্তমান জ্যোতিষশাস্ত্র অনুসারেই এই অধিমাসের ব্যাপারটা জানা উচিত। এত ঝামেলায় যাওয়ার দরকার নেই।”

বর্ষা পেছানোর অসুবিধা

মায়ানমারে বর্ষা পেছালে সমস্যা নেই। তাদের নিজস্ব ক্যালেণ্ডার আছে। জ্যোতিষশাস্ত্র মতে এই বছর হচ্ছে অধিমাস। তাই তারা পিটকীয় নিয়মেই তাদের ক্যালেণ্ডারে প্রথম আষাঢ়, দ্বিতীয় আষাঢ় যোগ করে দিয়েছে। ফলে অন্যান্য মাসগুলোও পিছিয়ে গেছে। কঠিন চীবরের সময়ও একমাস পিছিয়ে গেছে। ফলে পরবর্তী বুদ্ধপূর্ণিমাও পিছিয়ে যাবে একমাস। এবং তাদের পরবর্তী নতুন বছরের পানি খেলার উৎসবও পিছিয়ে যাবে এক মাস।

কিন্তু বাংলাদেশ ও ভারতে সাধারণত মাস গণনা করা হয় বাংলা ক্যালেণ্ডার অনুসারে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ইত্যাদি গণনা করে। সেখানে বর্ষা পেছানোর কোনো রেওয়াজ নেই। হিন্দু পঞ্জিকায়ও মাস পেছানোর কোনো ব্যাপার নেই। ফলে বৌদ্ধদের হয়ে যায় সমস্যা। তারা যদি অধিমাসের কারণে বর্ষাবাস একমাস পিছিয়ে শ্রাবণী পূর্ণিমা থেকে শুরু করে তাহলে বৌদ্ধ মাসগণনায় কঠিন চীবরের সময়ও এক মাস পিছিয়ে যাবে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, তখন পরবর্তী বুদ্ধপূর্ণিমা একমাস পিছিয়ে গিয়ে পড়বে জ্যৈষ্ঠপূর্ণিমায়। সেটা আমাদের জন্য বেশ তালগোল পাকিয়ে দেয়।

তবে সেটা আমার মনে হয় কোনো বড় ব্যাপার নয়। কারণ বাংলা বর্ষপঞ্জি অথবা হিন্দু পঞ্জিকায় যে বৈশাখ মাস, জ্যৈষ্ঠ মাস রয়েছে এগুলো এখন শুধু নামে মাত্র। প্রাচীনকালে যে মাসে চাঁদের পূর্ণিমা হত বিশাখা নক্ষত্রে, সেই মাসটাকে বলা হতো বৈশাখ মাস। যে মাসে চাঁদের পূর্ণিমা হতো জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রে, সেই মাসকে বলা হতো জ্যৈষ্ঠ মাস। এভাবে আষাঢ়, ভাদ্র, আশ্বিন ইত্যাদি মাসগুলোও সবই হচ্ছে নক্ষত্রের নামে।

কিন্তু এখন তো সময় পাল্টে গেছে। এখন বৈশাখ মাসের সময়ে পূর্ণিমার চাঁদ আর বিশাখা নক্ষত্রে থাকে না। যেমন আপনি পঞ্জিকার এ্যাপস চেক করে দেখুন। দেখবেন গত বৈশাখ মাসে পূর্ণিমা হয়েছিল ৬ই মে রাতে। তখন চাঁদ কিন্তু বিশাখা নক্ষত্রে ছিল না। সেটি অবস্থান করছিল চিত্রা নক্ষত্রে।

আর আপনি যদি তারাগুলোকে চিনে থাকেন, আকাশের কোথায় কখন কোন নক্ষত্র দেখা যায়, তা জানেন, তাহলে খালি চোখে আকাশের দিকে তাকিয়েই বলে দিতে পারবেন আজ চাঁদ কোন নক্ষত্রে অবস্থান করছে।

এভাবে আমরা দেখি যে, বর্তমানে বৈশাখী পূর্ণিমা আর বিশাখা নক্ষত্রে হয় না। জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা আর জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রে হয় না। কিন্তু মাসের নামগুলো রয়ে গেছে সেই আগের মতন। তাই বৌদ্ধ হিসেবে অধিমাস ধরলে তখন বৌদ্ধদের নিজস্ব নিয়মেই মাসগুলো গণনা করতে হবে। বাংলা বা হিন্দু পঞ্জিকার বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করলে মাসগুলো একটু গড়বড় হয়ে যাবে।

কিন্তু অধিমাস না ধরলে কী হবে?

অধিমাস না ধরে বরাবরের মতোই আষাঢ়ী পূর্ণিমায় অর্থাৎ জুলাইয়ের ৫ তারিখে বর্ষাবাস শুরু করলে তখন সেটা বিনয়ের মহাবর্গে বুদ্ধ যে অধিমাসের সময়ে রাজার আদেশ অনুসারে এক মাস পিছিয়ে বর্ষাবাস শুরু করতে বলেছেন তার অন্যথা হবে। যার কারণে দুক্কট আপত্তি হওয়ার কথা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *