আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

মায়ানমারের চাকমাদের গল্প

সেয়াদ আজকে বললেন তার ছোটবেলার কথা। সময়টা ছিল ষাটের দশকের শেষের দিকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তখনো শুরু হয় নি। মায়ানমারের চাকমারা তখনো সেই সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে ঘুমিয়ে ছিল। বাইরে যে বিশাল চাকমা জনগোষ্ঠী ছিল সেব্যাপারে তারা মোটেও জানত না। তারা কেবল শুনেছিল যে ব্রিটিশ আমলে তাদের গ্রাম থেকে চার-পাঁচজন নাকি বুদ্ধগয়ায় বেড়াতে গিয়েছিল। ফিরে এসে তারা বলেছিল এক অভাবনীয় কাহিনী। সেখানে নাকি তাদের দেখা হয়েছিল চাকমা রাজার ছেলের সাথে। সেই চাকমা রাজপুত্র নাকি তাদেরকে বলেছিল, চাকমাদের একটা দেশ আছে। তোমরা বেড়াতে এসো চাকমাদের দেশে।

লোকজন তখন সেই বুদ্ধগয়া ফেরত লোকদেরকে জিজ্ঞেস করেছিল, তা তোমরা কী করলে? বেড়াতে গিয়েছিলে সেখানে?

উত্তরে নাকি তারা বলেছিল, কীভাবে যাব? আমাদের সাথে এক তরুণী কন্যা আছে না? সেখানে গেলে রাজা যদি বলেন, তোমাদের বার্মাদেশ থেকে আসা এই চাকমা কন্যাকে আমার কাছে দিয়ে যাও, তখন তো সর্বনাশ হয়ে যাবে। সেই ভয়ে আমরা আর যাই নি!

এভাবে বার্মার চাকমারা নাকি শুধু এই একবারই শুনেছিল যে বাইরে একটা চাকমা দেশ আছে। কিন্তু সেটা যে কোথায় সেব্যাপারে তাদের কোনো ধারণা ছিল না।

তখন বরিশাল, পটুয়াখালি ইত্যাদি উপকুলীয় অঞ্চল ছিল রাখাইনদের আবাস। সেখানকার এক মারমা ভিক্ষু এসে থাকত বার্মার একটা চাকমা বিহারে। সে গল্প করত “থেকতাঁও” নামের এক দেশের কথা। সেই দেশে বেড়াতে গেলে লোকজন নাকি তাকে জিজ্ঞেস করত, বুত্থু কুত্থু। সেই ভিক্ষুটা অবশ্য বুঝত না ওরা কী বলছে। এখানকার চাকমারাও ভাবত, এই থেকতাঁও দেশটা কোথায়! আর এই বুত্থু কুত্থু কথাটাই বা কী?

পরে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো। যুদ্ধ থেকে বাঁচতে কিছু চাকমা লোকজন পালিয়ে আসল বার্মায়। তারা নাকি “থেক্” জাতির। এই থেক লোকজনের গ্রাম তো বার্মাতেও আছে। তাই তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হলো “থেক্” লোকজনের গ্রামে। কিন্তু দেখা গেল তারা পরস্পরের ভাষাও বোঝে না। তাহলে তাদের সাথে থেকে লাভ কী?

পরে কীভাবে যেন “দাইনেক” লোকজনের গ্রামে গিয়ে হাজির হলো তারা। অবাক হয়ে দেখল যে তারা পরস্পরের কথাগুলো বুঝতে পারছে। এভাবে বার্মার চাকমারা সেই প্রথমবারের মতো দেখল বাইরে থেকে আসা চাকমাদেরকে। বহু অতীতে বিচ্ছিন্ন হওয়া দুই দেশের চাকমারা ঘটনাক্রমে আবার এক হলো।

### প্রাচীন বার্মিজ ও মারমাদের ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে চাকমাদেরকে উল্লেখ করা হয়েছে “থেক্” নামে। পরবর্তীতে মারমা রাজা তাদেরকে ধরে এনে “দাইনেক্” নাম দেয়। কিন্তু আমি দেখেছি, এই দাইনেক লোকজন এখনো পরস্পরের সাথে কথা বলার সময়ে বলে থাকে, “আমা চাঙমাউন, আমা চাঙমাউন!”

### সেয়াদ বলেন, এখন যে তঞ্চঙ্গ্যা লোকজন নিজেদেরকে আলাদা হিসেবে দাবি করছে, সেই তঞ্চঙ্গ্যা নামটাও হচ্ছে মারমাদের দেয়া নাম। রোহিঙ্গা নামটাও হচ্ছে মারমাদের দেয়া। সেয়াদের ছোটবেলায় নাকি বাঙালিরা চাকমাদের গ্রামে এসে মজুর খাটত। পরে সেই লোকজনই কয়েক দশক পরে নিজেদেরকে রোহিঙ্গা বলে পরিচয় দিতে শুরু করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *