আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings
Looking for friends

সত্যিকারের বন্ধু খুঁজে নেবেন কীভাবে?

আপনার হয়তো এক বা একাধিক বন্ধু রয়েছে। কিন্তু আপনি কি জানেন তাদের মধ্যে কারা আপনার প্রকৃত বন্ধু আর কারা নয়? আপাতদৃষ্টিতে সবাই বন্ধু বলে মনে হলেও প্রকৃত বন্ধু চিনতে পারা কঠিন। অথচ বন্ধু ছাড়া জীবনের চলার পথ খুব ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। তাই আমাদের জানা থাকা উচিত এত বন্ধুর মাঝে কীভাবে প্রকৃত বন্ধুকে খুঁজে নিতে হয়। তাহলে বুঝতে পারবেন আপনার আশেপাশে কারা সত্যিকারের বন্ধু, আর কারা বন্ধুর ভান ধরে আছে। বুদ্ধ সেটা খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে বলেছেন দীর্ঘ নিকায়ের সিঙ্গাল সুত্রে। আমি সেটা এখানে একটু সহজ ভাষায় লিখে দিলাম।

কৃত্রিম বন্ধুর লক্ষণ

প্রথমেই আমাদের জেনে নেয়া দরকার কারা আপনার আশেপাশে বন্ধুর ছদ্মবেশে ঘুরঘুর করছে। এরা হচ্ছে চার শ্রেণির-

  • স্বার্থপর বন্ধু:
    • এরা সাধারণত খালিহাতে আসবে। এরপর আপনার কোনো একটা জিনিসের এমন প্রশংসা করতে থাকবে যে আপনার আর বুঝতে বাকি থাকবে না তারা জিনিসটা চায়। কয়েকবার যখন তারা বিষয়টা খুব করে প্রশংসা করবে আপনি তখন লজ্জায় তাদেরকে সেটা এমনিতেই দিয়ে দেবেন। সুযোগসন্ধানীরা এভাবেই আপনার মতো সহজ সরল মানুষের কাছ থেকে বিভিন্ন জিনিস আদায় করে নেয়।
    • এরা আপনাকে দেবে অল্প, কিন্তু বিনিময়ে চাইবে বহুগুণ বেশি। একবার একটা উপকার করেছে বলে তারা সেই উপকারের বহুগুণ প্রতিদান চাইবে।
    • এই শ্রেণির বন্ধুরা আপনাকে এমনিতে তেমন পাত্তা দেবে না। কিন্তু যখন তারা বিপদে পড়বে তখন সেই বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে আপনার পায়ে পায়ে ঘুরবে, এমনকি আপনার চাকরের মতো হয়ে সব কাজ করে দেবে। আপনি বুঝতে পারবেন যে, তারা কিন্তু আপনাকে পছন্দ করে বলে নয়, বরং তাদের নিজেদের গা বাঁচানোর জন্যই আপনাকে তোষামোদ করছে।
    • এরা আপনাকে বন্ধু মনে করে নয়, বরং কোনো একটা স্বার্থের আশায় আপনার সাথে থাকে। আপনি যদি তাদেরকে কোনো একটা কাজের প্রস্তাব দেন তখন তারা আগে দেখবে তাতে নিজেদের লাভ আছে কিনা। নিজেদের লাভ হবে না এমন কোনো প্রস্তাবে তারা রাজি হবে না, এমনকি বন্ধুত্বের খাতিরেও নয়। যে কাজে লাভ আছে, সেই কাজে বন্ধুত্বও গাঢ় হয়, এমন প্রস্তাবে তারা রাজি হয়। এথেকে আপনি বুঝতে পারবেন তারা আপনাকে বন্ধু হিসেবে সাহায্য করতে আন্তরিক নয়। [আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আমিও এই সুযোগসন্ধানী বন্ধুর ক্যাটাগরিতে পড়ে যাচ্ছি! সর্বনাশ।]
  • হেয়প্রতিপন্নকারী বন্ধু:
    • আপনি যদি তাদের কাছে কোনো কিছু চাইতে যান তখন তারা হয়তো অতীতের কথা বলে ফাঁকা বুলি আওড়াবে, ‘তুমি তো গত মাসে আস নি। সেমাসে আমাদের ভালো আয় হয়েছিল। আমরা তোমার জন্য রাস্তায় পর্যন্ত গিয়ে অপেক্ষা করেছিলাম। তুমি না আসাতে সেগুলো আরেকজনকে দিয়ে দিয়েছি। এখন সেগুলো সব ফুরিয়ে গেছে।’
    • অথবা তারা ভবিষ্যতের কথা তুলবে, ‘এবারে তো হবে না। আগামী বারে ভালো আয় হলে তখন তোমাকে কিছু সাহায্য করতে পারব বলে মনে হয়।’
    • তারা আপনাকে হেয় করে কথা বলবে। তারা কোনো একটা চেয়ারে বসেও আপনাকে দেখে বলবে, ‘বন্ধু, এসো। এখানে এসে বস।’ অথচ সেখানে বসার মতো কোনো জায়গা নেই। অথবা তারা খুব সুন্দর পোশাক পরে আপনাকে সুক্ষ্মভাবে বিদ্রুপ করে বলবে, ‘বন্ধু, তোমাকে এরকম একটা পোশাক দিতে পারছি না, দুঃখিত!’
    • যদি আপনি তাদের কাছে কোনো কিছু চাইতে যান, তখন তারা বিভিন্ন অজুহাত তুলবে। যদি গাড়ি চাইতে যান, বলবে, চাকায় হাওয়া নেই। যদি থাকার জায়গা চান, বলবে জায়গা খালি নেই।
  • তোষামোদী বন্ধু: এদের বন্ধুত্ব শুধু মুখের কথায়। আপনি যদি কোনো কুপ্রস্তাব দেন, তাতেও তারা সায় দেবে। আপনি যদি ভালো প্রস্তাব দেন, তাতেও তারা সায় দেবে। আপনার সব কথায় তারা সায় দেবে। তারা শুধু আপনার তোষামোদে ব্যস্ত থাকবে। তারা সামনাসামনি আপনার প্রশংসা করবে কিন্তু পিছনে নিন্দা ঝাড়বে।
  • অসৎ বন্ধু: এরা হচ্ছে আপনার সব অসৎ কাজের সঙ্গী। আপনি যদি বলেন, ‘অমুক জায়গায় নাকি মদ পাওয়া যায়। চলো সেখানে যাই।’ তারা সোৎসাহে রাজি হয়। আপনি যদি বলেন, ‘চলো, সন্ধ্যায় একটু বেড়াতে যাই।’ তারা সোৎসাহে রাজি হয়। আপনি হয়তো মনে করতে পারেন, সন্ধ্যায় রাস্তায় একটু হাঁটলে এমন কী দোষ? কিন্তু নৈশভ্রমণে প্রচুর বিপদের কথা বুদ্ধ বলে গেছেন, আমি হয়তো সেগুলো নিয়ে পরবর্তীতে লিখব। সে যাই হোক, এই অসৎ বন্ধুদেরকে আপনি যদি বলেন, ‘অমুক জায়গায় নাকি পার্টি হচ্ছে। চলো সেখানে পার্টিতে যাই।’ তারা সোৎসাহে রাজি হয়। আপনি যদি বলেন, ‘অমুক জায়গায় নাকি জুয়ার আড্ডা বসেছে। চলো সেখানে জুয়া খেলতে যাই।’ তারা সোৎসাহে রাজি হয়। এভাবে তারা আপনার অধঃপতনের সহায় হয়।

উপরোক্ত চার ধরনের কৃত্রিম বন্ধুদেরকে বুদ্ধ বিপদসংকুল রাস্তা মনে করে দূর থেকে এড়িয়ে চলার উপদেশ দিয়েছেন। সেরকম বন্ধুর সাথে থাকার চেয়ে একাকী থাকাও ভালো। কারণ তারা আপনার বন্ধু হওয়ার মতো উপযুক্ত নয়। তাই উপযুক্ত বন্ধু না পেলে গণ্ডারের শিঙের মতো একা থাকাও ভালো। তবুও এমন অসৎ বন্ধুদের পাল্লায় পড়া উচিত নয়।

সত্যিকারের বন্ধুর লক্ষণ

অসৎ বন্ধুদেরকে চিনে নিয়ে তাদেরকে পরিত্যাগ করে এবারে সত্যিকার বন্ধুদেরকে চেনা দরকার। তাদের লক্ষণগুলো হচ্ছে এরকম-

  • উপকারী বন্ধু: তারা আপনার অসহায় অবস্থার সময়েও আপনার পাশে দাঁড়াবে সবসময়। আপনি যদি মদ খেয়ে রাস্তায় পড়ে থাকেন তারা আপনাকে তুলে নিয়ে বাড়ি পৌঁছে দেবে। আপনি যদি আপনার বাড়িকে অরক্ষিত রেখে কোথাও যান, তারা আপনার বাড়ির দেখাশোনা করবে। আপনি যদি কোনো বিপদআপদের সম্মুখীন হন তাহলে তারা ভরসা যোগাবে, আশ্বাস যোগাবে, “ভয় করো না বন্ধু। আমাদের মতো বন্ধু থাকতে কীসের ভয় তোমার?” কোনো সাহায্য চাইতে গেলে বরং তার দ্বিগুণ সাহায্য করবে। যেমন আপনি যদি কোনো একটা কাজের জন্য কিছু টাকাপয়সার সাহায্য চাইতে যান, তখন তারা বলবে, এখন তো সবকিছুর দাম চড়া। এই টাকায় তোমার কুলাবে না। দ্বিগুণ নিয়ে নাও। এভাবে তারা আপনি যা চাইবেন তার বেশিই দেবে। এভাবে তারা আপনার পাশে থাকবে সবসময়।
  • একনিষ্ঠ বন্ধু: তারা হবে আপনার একনিষ্ঠ বন্ধু। তারা তাদের গোপন কথাগুলো অন্যকে না বলে আপনাকেই বলবে। আপনার গোপন কথাগুলোও তারা গোপন রাখবে, যাতে অন্যকেউ না জানে। বিপদ আসলেও তারা আপনাকে পরিত্যাগ করবে না। এমনকি আপনার মতো বন্ধুর জন্য তারা জীবন পর্যন্ত পরিত্যাগ করতে পিছপা হবে না।
  • সদুপদেশক বন্ধু: তারা আপনাকে পাপের পথ থেকে আগলে আগলে রাখবে। আপনাকে পাপপথে পা বাড়াতে দেখলেই তারা বলবে, ‘আমরা থাকতে তুমি এরকম করতে পারবে না। সেই পাপকাজ করতে পারবে না।’ এভাবে আপনাকে বারবার কোনো পাপকাজ করতে দেখলে তারা তখন বিশেষভাবে সেই কাজ করতে বারণ করবে। এর পরিবর্তে তারা আপনাকে পুণ্যের পথে চলতে উৎসাহিত করবে। তারা আপনাকে ত্রিরত্নের প্রতি শ্রদ্ধাবান হতে উৎসাহিত করবে, পঞ্চশীল পালন করতে উৎসাহিত করবে, দান দিতে উৎসাহিত করবে, ধর্মদেশনা শুনতে এবং ধর্মালোচনা করতে উৎসাহিত করবে। তারা আপনাকে ধর্মের সুক্ষ্ম বিষয়গুলো বুঝিয়ে বলবে, যেগুলো আপনার এর আগে হয়তো অজানা ছিল। তারা আপনাকে পুণ্যকর্মের মাধ্যমে স্বর্গের পথ দেখাবে। এভাবে তারা আপনাকে কল্যাণের দিকে ধাবিত করাবে।
  • সমব্যথী বন্ধু: তারা হবে আপনার সুখদুঃখে সমব্যথী। আপনার পরিবারের, অথবা আপনার আত্মীয়স্বজনের কারোর খারাপ অবস্থা দেখে তারা ব্যথিত হবে। অন্যদিকে আপনার পরিবারের অথবা আপনার আত্মীয়স্বজনের উন্নতি শুনে বা দেখে তারা খুব খুশী হবে। তারা যদি শোনে যে কেউ আপনার নিন্দা করছে এই বলে, “অমুক হচ্ছে একদম বিশ্রী একটা লোক। হীন বংশের, দুশ্চরিত্রের লোক।” তা শুনে সে সেরকম বলতে বাধা দেবে এই বলে, “দয়া করে এরকম বলবেন না। অমুক হচ্ছে খুব ভালো লোক, উচ্চবংশের, সৎ চরিত্রের লোক।” এভাবে সে আপনার নিন্দা শুনে বাধা দেবে। আর সে যদি শোনে যে কেউ আপনার প্রশংসা করছে তাহলে সে তার প্রশংসা করবে। এভাবেই তারা আপনার আনন্দ-বেদনায় পাশে থাকবে।

এভাবে খুঁজলে হয়তো খুব কম পাওয়া যাবে যারা আপনার সত্যিকারের বন্ধু। কিন্তু যদি এরকম বন্ধু কাউকে খুঁজে পান তাহলে তাদেরকে আপনার সুন্দরভাবে আপ্যায়ন করা উচিত, মা যেমন আন্তরিকভাবে নিজের সন্তানের যত্ন নিয়ে থাকে, সেভাবেই তাদেরকে যত্ন নেয়া উচিত।

তবে শুধু বন্ধু খুঁজে পেলেই হবে না। আপনি তাদের সত্যিকার বন্ধু হওয়ার মতো উপযুক্ত কিনা সেটাও একটু ভেবে দেখা দরকার। একজন সত্যিকার বন্ধু হতে চাইলে বন্ধুদের প্রতি আপনারও কিছু দায়িত্ব আছে। কীভাবে বন্ধুদের সাথে চলতে হয়, কীভাবে তাদেরকে ধরে রাখতে হয় সেব্যাপারেও আপনার জানা থাকা উচিত। সেগুলো দীর্ঘনিকায়ের সিঙ্গাল সুত্র থেকে আপনারা দেখে নিতে পারেন। তবে আমি হয়তো পরবর্তীতে লিখব সেগুলো নিয়ে। সেগুলো জেনে সেভাবে বন্ধুদের প্রতি যথাযথ কর্তব্যগুলো পালন করলে তখন আপনি পাহাড়ের চুড়ায় জ্বলতে থাকা অগ্নিশিখার মতো জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠবেন। অন্তত বুদ্ধ আমাদেরকে সেই আশ্বাসই দিয়ে গেছেন। প্রকৃত বন্ধু খুঁজে নিয়ে জ্বলে উঠুন আপনারাও- এই শুভ কামনা রইল।

8 thoughts on “সত্যিকারের বন্ধু খুঁজে নেবেন কীভাবে?

  1. প্রসঙ্গ জন্মান্তর: অভাজনের ভাবনা
    -জয়দেব কর

    ১। আমাকে কৈশোরে বয়স্করা জন্মান্তরের কথা বলতেন। আশি লক্ষ যোনি ভ্রমণ করতে হবে। এও বলা হতো উদ্ভিদ ছাড়া সকল প্রাণীর জন্মান্তর ঘটে। গরু হত্যা করলে গরু হয়ে জন্মগ্রহণ করতে হয়। আমি বেয়াকুবের মতো বলতাম গরু মারলে যদি গরু হতে হয়, তবে মানুষ মারলে তো সবচাইতে ভালো। কারণ আবার মানুষ হয়ে জন্ম নিতে পারব। আবার জিজ্ঞেস করতাম, সকল কুলে যেহেতু জন্ম হবে তো ডাইনোসার বা ডুডু পাখি হয়ে জন্ম নিতে পারব কি? কারণ ঐ দুটি প্রাণী তো বিলুপ্ত! পৃথিবীর কোথাও এই সকল প্রাণী নাই।

    জন্মান্তর প্রথা মানলে তো এও মানতে হয় যে, পৃথবীর প্রাণের সংখ্যা ফিক্সড। কখনওই বাড়বে না কখনওই কমবে না। আমার প্রশ্ন : যেসমস্ত শিকারী পৃথিবীর সকল ডুডু পাখি হত্যা করেছে, তারা কোন লোকে জন্ম নিয়েছে ডুডু পাখি হয়ে?

    1. বৌদ্ধমতে, পৃথিবীর প্রাণির সংখ্যা ফিক্সড নয়, বরং অসংখ্য। গণনাতীত। আর এমন কোনো নিয়ম আমার জানা নেই যে গরু মারলে আবার গরু হয়ে জন্মাতে হবে। গরু হত্যা তো সামান্য মাত্র, ৫৫ বছর ধরে জল্লাদগিরি করেও সামান্য ধর্মদেশনা শুনে মরার পরে তুষিত স্বর্গে জন্মেছে এমন কথাও উল্লেখ আছে ধর্মপদে। পায়াসি রাজা কতজনকে মেরে কেটে পরীক্ষা করেছিলেন মরলে প্রাণ কোথা দিয়ে বের হয় সেটা দেখার জন্য। তিনি মরে জন্মেছিলেন চতুর্মহারাজিক দেবতা হিসেবে। হিন্দুরা যেভাবে জন্মান্তর প্রথা বিশ্বাস করে, বৌদ্ধধর্মে সেরকম নয়।

      ডুডু পাখি যারা মেরেছে তারা কোন লোকে জন্মেছে? নিশ্চয়ই ৩১ লোকভূমির কোনো এক লোকে। তাদের কর্মের ফলে তারা স্বর্গে জন্মাতে পারে, মানুষ হয়ে জন্মাতে পারে, পোকামাকড় হয়ে জন্মাতে পারে। মরার সময়ে সে কোন মন নিয়ে মরছে, সেটার উপরই তার পরবর্তী জন্মের গন্তব্য নির্ভর করে। যদি তার মৃত্যুর সময়ে ডুডু পাখি মারার দৃশ্য দেখতে পায় তাহলে সে মরার পরে ডুডু হিসেবে জন্মাবে। ডুডু পাখি বিলুপ্ত হয়ে গেলে তখন অন্য কোনো প্রাণিকুলে জন্মাবে। সহজ হিসাব। বোধিসত্ত্ব এর আগে এক পাখি কুলে জন্মেছিলেন। তখন সেই পাখিদের সংখ্যা ছিল হাজার হাজার। তবে এরপরে তিনি যখন বুদ্ধ হলেন তখন তিনি ভিক্ষুদেরকে নিয়ে দেখিয়েছিলেন সেই পাখিদেরকে। সেই পাখিদের সংখ্যা তখন খুব অল্প হয়ে এসেছে। বিলুপ্তির মুখে। এভাবেই যেকোনো প্রাণিকুল বিলুপ্ত হতে পারে। সেটা নতুন কিছু নয়।

      1. অসংখ্য ধন্যবাদ ভান্তে উত্তর দেয়ার জন্য।

  2. ভন্তে, আমি পিতা-মাতার একমাত্র ছেলে। আমরা তিন ভাই-বোন। আমার দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। বাড়িতে এখন শুধু বৃদ্ধ পিতা-মাতা আছেন। হাত, পা অচল না হওয়ায় কোনো রকমে সংসারের কাজ করে কষ্টে করে চলছেন।
    আমি প্রব্রজ্জিত, ভিক্ষু। জাতক পড়ে জেনেছি যে, বুদ্ধের সময়কালিন এক ভিক্ষুও ভিক্ষু অবস্থায় থেকে বৃদ্ধ পিতা-মাতার ভরন-পোষণ, সেবা করেছিলেন। তা জেনে ভগবান বুদ্ধও তাঁর কাজের জন্য তাকে সাধুবাদ দিয়েছিলেন।
    আমি ভিক্ষু জীবনের প্রতি অনুরক্ত। ইউনিভার্সিটি ত্যাগ করে এই জীবনটাকে বেছে নিয়েছি। সেসময় এক অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটায় পিতা-মাতা প্রব্রজ্জা মানত করছিলেন এবং বুদ্ধশাসনে দান করেছিলেন। তা না হলে হয়তো অনুমতি দিতেন না।
    এখন, আমি এই সমস্যা কীভাবে সামাল দেবো? মাঝে মাঝে ভাবি বাড়িতে ফিরে গিয়ে তাদের সেবা করলে মনে হয় ভাল হবে।
    ভন্তে, আমি এখন কী করবো? একটু উপদেশ, পরামর্শ দেন।

    1. আমি কী পরামর্শ দেব? সারিপুত্র ভান্তের মা বৃদ্ধা অবস্থায় একাকী থাকতেন। কিন্তু তিনি তো ধনী ছিলেন। তাই বুড়ো হলেও, একা হলেও সমস্যা ছিল না। ধন কিংবা জনের দিক দিয়ে গরীব হলে তো সমস্যা। সেই বুড়োবুড়িদের যদি ধন না থাকে, জন না থাকে, তাহলে তখন সন্তান বাদে আর কে দেখবে? যেমন মহানাম ও অনুরুদ্ধ দুই ভাইয়ের কথা বলা যায়। মহানাম তখন অনুরুদ্ধকে প্রব্রজ্যা নিতে বলে নিজে গৃহী হয়ে স্রোতাপন্ন হয়েছিলেন। পরিবারে কাউকে না কাউকে থাকতে হয়। ইচ্ছে করলেই তো আর সবকিছু করা যায় না। একটা সময় ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করতে হয়। আমি ইন্টারে একবার প্রব্রজ্যা নিয়ে একেবারে থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বাবা-মা বলেছিল কমপক্ষে বিএ পাস করতে হবে। আমি কোনোমতে ডিগ্রি শেষ করে সরাসরি প্রব্রজ্যা নিয়েছিলাম। কিন্তু থাকতে পারি নি বেশিদিন। আপনার মতোই আমারও চিন্তা হয়েছিল, এত কষ্ট করে লেখাপড়া শিখিয়েছে আমাকে বাবা-মা। একগাদা ঋণের বোঝা চেপেছে তাদের মাথায়। তাদের জন্য অন্তত পাঁচ বছর চেষ্টা করে দেখি। তাই কয়েক মাস পরেই প্রব্রজ্যা শেষে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলাম। আমি চাকরি করেছি, বেসরকারি, সরকারি দুটোই করেছি। কিন্তু পাঁচ বছর হতেই মনে হয়েছিল আর কত? পাঁচ বছরে তো তাদের ঋণের বোঝা হালকা করার চেষ্টা কম করি নি। এর শেষ হবে কখন? এখন যদি হঠাৎ দুর্ঘটনায় বা কোনো কারণে মারা যাই তাহলে তাদের কী অবস্থা হবে? তখনো কি তাদের জীবন চলবে না? হয়তো কষ্ট হবে, কিন্তু পৃথিবী বড়ই নিষ্ঠুর। করোনা ভাইরাসে কত প্রিয়জন মারা যাচ্ছে লোকজনের। তারা না থাকাতে তাদের উপর যারা নির্ভর করে বেঁচেছিল তারাও কি মরে যাবে? হয়তোবা। কষ্টে পড়বে? হয়তো বা। আমি উপেক্ষা করতে শিখেছি। নিষ্পলক নয়নে তাকিয়ে থাকতে শিখেছি। সারিপুত্র ও মোগ্গল্লায়ন যখন বিদায় নিতে এসেছিলেন, বুদ্ধ নির্বিকার হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন কোথায় মরতে যাবে তোমরা? এই স্নেহ, করুণা, মায়া মমতার বাঁধন এগুলো মানুষকে প্রতি পদে পদে পিছুটান দিয়ে ধরে রাখে, মুক্ত হতে দেয় না। এক জাতকের কথা মনে পড়ছে। বোধিসত্ত্ব তখন বিয়ে করার পরে সন্ন্যাসী হতে চেয়েছিল। কিন্তু তার স্ত্রী তখন বলেছিল, তুমি চলে গেলে আমি একা হয়ে যাব। বরং একটা সন্তান হলে তখন যেও। কিন্তু সন্তান হওয়ার পরে বলেছিল, সন্তান হাঁটতে পারলে তখন যেও। এখন একলা তাকে দেখাশোনা করতে পারব না। কিন্তু বোধিসত্ত্ব তখন তাদেরকে একসময় ফেলে চলে গিয়েছিল। বোধিসত্ত্ব তার বোনকেও একাকী ফেলে চলে গিয়েছিল এক জাতকে। কিন্তু বুড়ো বাবামাকে ফেলে যেতে দেখা যায় নি। তাই বাবা-মা একটু ব্যতিক্রম এখানে।

      এখন কথা হচ্ছে আপনার বাবা-মা কী চায়? তারা যদি আপনার কাছ থেকে খাদ্য বা ওষুধ চায়, আপনার তাদেরকে সেগুলো যোগান দিতে হবে। সেটা ভিক্ষু হিসেবে বিনয়ের নির্দেশ। তবে সেটা যে একদম বাধ্যগত সেটাও আবার নয়। বিনয় আরো বলছে, যদি কোনো সাহায্য চায়, আপনার যেকোনো প্রকারে সাহায্য করতে হবে। আমি রেফারেন্স দিতে পারি, কিন্তু সেগুলো খুঁজে দেখতে আর ইচ্ছে করছে না। সোজা কথা হচ্ছে বাবা-মা যদি সাহায্য চায় সাহায্য করতে হবে। যেকোনো প্রকারে। আর যদি না চায়, তাহলে আপনি ইচ্ছে করলে তাদেরকে সাহায্য করতে পারেন, নাহলে নেই। অর্থাৎ করা উচিত বটে, কিন্তু সাহায্য না করলে যে আপনার পাপ হবে বা দোষ হবে সেটাও নয়।

      হয়তো আপনি বলতে পারেন, আপনি সাহায্য করলে ওরা একটু সুখে থাকবে, নাহলে কষ্টে থাকবে। অর্থাৎ ওদের সুখদুঃখ আপনার উপর নির্ভর করছে। কিন্তু কর্মনিয়ম সেটা বলে না। ওরা যে সুখদুঃখ অনুভব করবে সেটা তাদের নিজেদেরই কর্মের ফল। আপনি তাদেরকে সুখে রাখতে পারেন। কিন্তু না রাখলে যে আপনার দোষ হবে বা পাপ হবে সেটা নয়।

      আর লিখতে ইচ্ছে করছে না। সোজা কথা, তারা যদি চায়, তাহলে আপনার সাহায্য করতে হবে। কোনো কথা নেই। কিন্তু না চাইলে তখন সেটা আপনার ইচ্ছা।

  3. সাধু ভান্তে,সঠিক বলেছেন। আসলে সমন্বিত ব্যবস্থাতে ভালোফল আসতে পারে।

  4. একটা বিষয়কে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা যায়। তাই যে যার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পারছে সেভাবে ব্যাখ্যা করছে আর কী। কিন্তু কার্যকারণ নীতি অনুসারে, কোনো একটা নির্দিষ্ট কারণ থেকে একটা ফল হয় বলে বলা যায় না। কেউ যদি মনে করে, রতনসুত্র পাঠ করলেই সব রোগ কেটে যাবে, তাহলে দুনিয়ার হাসপাতালগুলো শুন্য হয়ে পড়ে থাকত। তাই শুধু সুত্র পাঠ করে, অথবা শুধু শীল পালন করে করোনা ভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে এরকম বলা যায় না। অন্তত পট্ঠানের নিয়মে সেটা বলে না। অনেকগুলো কারণের সমন্বয় থেকে অনেকগুলো ফল আসে। তাই সুত্রপাঠ, শীল পালন এগুলো তো করা উচিত, আর সেই সাথে সরকারী ও ডাক্তারী যে নির্দেশনাগুলো পাওয়া যাচ্ছে সেগুলোও যথাসম্ভব মেনে চলা উচিত।

  5. সাধু সাধু সাধু ভান্তে।
    একটি প্রশ্ন ছিল ভান্তে। একজনের ফেসবুকের পোষ্ট তা হুবহু তুলে ধরলাম। এটি সে কোথায় হতে পেল?

    আমি ভেবেছিলাম শিক্ষিতদের সংখ্যা বাড়ছে বলে মানুষের যুক্তিবোধ ও বাড়ছে। ফলে ধর্মান্ধতা কমে আসবে। কিন্তু এই সময়ে এসে বুঝতে পারছি একাডেমিক শিক্ষা মানুষকে যুক্তিবাদী করে না। সত্যিকারের চেতনাবোধ দিতে পারে না। এই সময়ে এসেও “রতনসূত্র” দিয়ে মহামারী হতে রক্ষা পাবার তরিকাতে তারা অন্ধভাবে বিশ্বাসী! অনেকে যুক্তিতে না পেরে গালমন্দ ও করছেন। এটা অপ্রত্যাশিত ছিলো।
    -“রতন সূত্র” এর ইতিহাস কতোজনে জানে এবং এ নিয়ে আলোচনা করতে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলাম। রতনসূত্রের উৎপত্তি হয়েছে বুদ্ধের পরিনির্বাণের হাজার বছর পরে। তখন বুদ্ধ পন্ডিতেরা ঐতিহাসিক গল্প লিখে এই সূত্রের উৎপত্তি বৈশালী নগরীতে হিসেবে অর্থকথাতে লিপিবদ্ধ করেছিলেন, তাও চালাকভাবে বলেছিলেন- না, এটি বুদ্ধের মুখনিশ্রিত সূত্র নয়- আনন্দ বুদ্ধের অনুমোদন নিয়ে এই সূত্র বৈশালী নগরীতে পাঠ করেছিলেন। এই সূত্রে কি কি আছে- কতজনে এই “পালি” ভাবার্থগুলো বুঝে? এই সূত্রের দুটি ভাবার্থ আছে- এক. অধিষ্ঠান ও দুই. করণীয় কর্ম। অধিষ্ঠান হলো… অমুক সমুকের নিয়মনীতি পালনের ওপর বিশ্বাস রেখে এই দূর্যোগটি / রোগটি/ মুক্ত হোক.. আর আরেকটি হলো এই হতে মুক্তি পেতে হলে এমন সব করণীয় কর্ম করা বাঞ্চনীয়।
    – এখন, এসব না বুঝে অনেকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে তারা শুধু শুনেই রোগমুক্তি পাবে- এই আশায়। শীল (নিয়মনীতি) পালন ছাড়া কোনকিছু হতে মুক্তি নেই। তাই আগে শীল (নিয়মনীতি) পালন করুন। মহামারী হতে নিজেকে এবং অন্যেকে রক্ষা করুন। ধর্মান্ধতা পরিহার করুন। বুদ্ধ বেঁচে থাকলে আপনাদের কর্মকান্ডকে দেখে “বালা মূর্খ” বলে বোকা দিতেন নিশ্চয়!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *