আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

করোনা ভাইরাস কি প্রাণি?

ইদানিং করোনা ভাইরাসের খ্যাতি বিশ্বজোড়া ছড়িয়ে পড়েছে। সেটা নিয়ে আতঙ্ক এখন সবার মনে। কিছুদিন আগেও আমার চোখগুলো লাল হয়ে ফুলে গিয়েছিল। ভেবেছিলাম আমাকেও এই করোনা ভাইরাসে ধরল নাকি। তবে ডাক্তারনী নিশ্চয়তা দিয়ে বলেছেন চোখ লাল হওয়াটা আর যাই হোক, করোনা ভাইরাসের কাজ নয়। আমি হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছি। কিন্তু আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে, আচ্ছা, এই ভাইরাসও কি প্রাণি? সেটা যদি হয় তাহলে বৌদ্ধরা করোনা ভাইরাসের কবলে পড়ে নির্বংশ হবে নিশ্চিত। কারণ চিকিৎসা করলেই তো করোনা ভাইরাস মরে যাবে। তাতে প্রাণিহত্যাজনিত পাপ হয়ে যাবে। কোনো ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধ কি চাইবে করোনা ভাইরাস মরে যাক?

বিষয়টা নিয়ে আসলে আমি বহু আগে থেকেই ভেবে আসছি, বহু বইপত্র ঘেঁটেছি, বহু গবেষণাপত্র পড়ে দেখেছি, বহু অভিধর্মে অভিজ্ঞ সেয়াদের কাছে জিজ্ঞেস করেছি। প্রাণ কী জিনিস? কাকে প্রাণি বলা যায়? গাছপালা কি প্রাণি? ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া কি প্রাণি? জেলিফিশ কি প্রাণি? সেদিন সকালে বিষয়টা নিয়ে আবারো কথা হলো দুই সিনিয়র শ্রীলঙ্কান ভান্তের সাথে। আমি বললাম, প্রাণি হতে হলে সে ছোট হোক বা বড় হোক তার একটা মন তো থাকতেই হবে, তাই না? তারা স্বীকার করলেন মন থাকলে সেটা প্রাণি হতে বাধ্য।

আমি বললাম, সেই মন উৎপন্ন হয় হৃদপিণ্ডের মধ্যে থাকা রক্তের উপর ভিত্তি করে। তাই মনের জন্য একটা রক্তে ভরা হৃদপিণ্ড লাগবেই লাগবে। তাই না?

এবারে মগ্গবিহারী ভান্তে বললেন, কে বলেছে মন থাকতে হলে হৃদপিণ্ড লাগবে? দেবতাদের তো হৃদপিণ্ড নেই, রক্ত নেই। ব্রহ্মাদেরও হৃদপিণ্ড নেই। তারা কি প্রাণি নয়?

শুনে আমি চমকে গেলাম। দেবতাদের গায়ে রক্ত নেই? হৃদপিণ্ড নেই? সেটা আবার কীরকম? মগ্গবিহারী ভান্তে বললেন, দেবতাদের দেহ আমাদের মত অশুচিতে পরিপূর্ণ নয়। তাই দেবতাদের জন্য কায়গতাস্মৃতি বা অশুভ ভাবনা নেই। তাদের দেহে আমাদের মতো রক্ত, মাংস নেই। তাই হৃদপিণ্ডও নেই। কেবল মানুষ ও পশুপাখি এবং ইতর প্রাণিদের দেহে হৃদপিণ্ড থাকে, রক্ত থাকে। তবে হ্যাঁ, যারা ভূমিবাসী দেবতা, যেমন- বৃক্ষদেবতা, যক্ষ ইত্যাদি তাদেরও রক্তমাংস থাকে। তাই তাদেরকে মারা যায়, কাটা যায়। যেমন বিনয়পিটকের কাহিনীতে আছে, এক ভিক্ষু গাছ কাটতে গিয়ে এক দেবকন্যার সন্তানের পুরো হাত কেটে দিয়েছিল। সেই থেকে বুদ্ধ ভিক্ষুদেরকে গাছ কাটতে নিষেধ করেছিলেন।

আমি বললাম, আমি তো সেকথাই বলছি। ব্যাকটেরিয়া ভাইরাস এগুলো তো আর দেবতা বা ব্রহ্মা নয়। তাহলে তাদের কেন হৃদপিণ্ড থাকবে না? রক্ত থাকবে না? ইতর প্রাণি হলে তো তাদের সেগুলো থাকার কথা।

যেখানে পিপড়াদের হৃদপিণ্ড আছে, কেঁচোদের আছে, অক্টোপাসের আছে, অন্যান্য কীটপতঙ্গেরও হৃদপিণ্ড আছে, সেখানে ইতর প্রাণি হলে ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসেরও সেরকম হৃদপিণ্ড থাকার কথা। কিন্তু যেহেতু সেরকম কোনো হৃদপিণ্ড তাদের নেই, তাই তাদেরকে অণুজীব বলা হয় বটে, কিন্তু বৌদ্ধ অভিধর্মমতে, সেগুলো কোনো প্রাণি নয়। সেগুলো হচ্ছে প্রাকৃতিক সৃষ্টি, যেগুলো বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক পরিবর্তনে সাড়া দেয় বটে, কিন্তু তাদের হৃদপিণ্ড নেই, মন নেই, তাই রোবটের মতো জড় পদার্থ হয়ে অবস্থান করে মাত্র।

একটু ভেবে তখন মগ্গবিহারী ভান্তে বললেন, ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের দেহ হচ্ছে একটি মাত্র কোষবিশিষ্ট। সেই একটা কোষ ভাগ হয়ে দুটো হয়, দুটো থেকে চারটা হয়। সেই প্রত্যেকটা কোষ হয় নতুন এক একটি ব্যাকটেরিয়া। নতুন এক একটি ভাইরাস। এভাবেই তারা বংশবৃদ্ধি করে থাকে। কিন্তু এভাবে একটা প্রাণিদেহ যদি দুভাগ হয়ে আরেকটা নতুন প্রাণির জন্ম দেয় সেটা আর যাই হোক, অভিধর্মের হিসেবে সেটা প্রাণি নয়। অভিধর্মমতে কোনো প্রাণিরই সেভাবে জন্মানো সম্ভব নয়।

এখানে আপনাদের বুঝার সুবিধার্থে বলি, অভিধর্মমতে প্রাণিরা মাতৃগর্ভে বা ডিমের মধ্যে ভ্রুণ হিসেবে জন্মায় অথবা দেবতাদের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ দেহধারী হয়ে হঠাৎ আবির্ভূত হয়। এখন ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসেরা এগুলোর কোনোভাবেই জন্মায় না। তারা জন্মায় তাদের দেহটাকে দুভাগে ভাগ করে করে। কোনো প্রাণিদেহ ভাগ হয়ে দুটো প্রাণি হতে পারে সেটা অভিধর্ম সমর্থন করে না। প্রাণিরা এভাবে জন্মাতে পারে না।

আমার মনে পড়ল জেলিফিশের কথা। সাগরে এক প্রকার জেলিফিশ আছে, যার নাম হচ্ছে Immortal Jellyfish. সোজা বাংলায় অমর জেলিফিশ। এই জেলিফিশগুলো নাকি একমাত্র অমর প্রাণি। তাদেরকে মারা যায় না, কাটা যায় না। একটা জেলিফিশকে কেটে একশ টুকরো করলে সেগুলো বড় হয়ে একশটা জেলিফিশ হয়। আর তাদের দেহে কোনো রক্ত নেই, হৃদপিণ্ড নেই। কেবল সাগরের পানিতে ভেসে বেড়ায় স্রোতের তালে তালে।

তা শুনে মগ্গবিহারী ভান্তে বললেন, কোনো প্রাণির একটা অংশ থেকে যদি আরেকটা প্রাণি জন্মায় তাহলে সেটাকে আর যাই হোক প্রাণি বলা যায় না। কারণ কর্ম সেভাবে দেহ গঠন করে না। সেকারণে এই ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াকেও গাছপালার শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, লোকজন যেগুলোকে সজীব মনে করে, সেটা বুদ্ধের আমলেও লোকজন সেরকম মনে করত। কিন্তু অভিধর্মমতে সেগুলো আদৌ জীবন্ত নয়, প্রাণি নয়। সেগুলোও প্রাকৃতিক সৃষ্টি মাত্র, যেগুলো হচ্ছে ঋতু বা তাপমাত্রার কারণে উৎপন্ন। সেগুলো ইট, কাঠ, পাথরের মতোই নির্জীব।

তবে পরে আমার প্রশ্ন জেগেছে, তাহলে ক্লোন করে যে প্রাণিগুলো জন্মানো হলো, সেগুলো কি প্রাণি নয়? আমার মনে পড়ল, ডলি নামের যে ভেড়াকে ক্লোন করা হয়েছিল সেটার জন্য কিন্তু প্রথমে গবেষণাগারে ভ্রুণ তৈরি করতে হয়েছে। সেই ভ্রুণকে আবার আরেকটা ভেড়ার গর্ভে রেখে দিতে হয়েছে বেড়ে ওঠার জন্য। অর্থাৎ মাতৃগর্ভে অবস্থান করতে হয়েছে। কাজেই সেটাকে অভিধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে একটা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যায়। কিন্তু ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসকে সেদিক থেকে কোনোভাবেই প্রাণি হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না।

এভাবেই সব মিলিয়ে আমি মোটামুটি নিশ্চিত, এসব ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসকে প্রাণি বলা হলেও অভিধর্মমতে সেগুলো প্রাণি নয়। কাজেই আপনারা নিশ্চিন্তে করোনা ভাইরাসের চিকিৎসা করতে পারেন। আপনাদের মতামতের প্রত্যাশা রইল।

12 thoughts on “করোনা ভাইরাস কি প্রাণি?

  1. ভান্তে, বন্দনা।

    Source – https://www.prothomalo.com/life-style/article/1255036

    ভান্তে, এধরণের সমস্যা সহ প্রকৃতি এবং মানুষের দেহে বিদ্যমান যেসমস্ত জীব মানুষের এবং উদ্ভিদের জন্য ক্ষতিকারক, প্রাণীহত্যা করে শীল ভঙ্গ করতে না চাইলে এসব জীব মোকাবেলার ধর্মত উপায় কী?

  2. ভান্তে, বন্দনা।
    করোনা ভাইরাসের এই সময়ে মানুষের মনে পৃথিবীতে জীবের উৎপত্তি-বিলুপ্তি, মানুষের অতীত-ভবিষ্যৎ, মহাবিশ্ব-পৃথিবীর সৃষ্টি-ধ্বংস বিষয়ে প্রশ্নের উৎপত্তি এবং এই বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। এই বিষয়ে ত্রিপিটক-অর্থকথা-টিকা ইত্যাদিতে কী বলা হয়েছে সে বিষয়ে ধর্মত যথাযথ বিস্তারিত আলোচনা করলে সবার মঙ্গল হবে।

  3. ভান্তে, বন্দনা।
    করোনা ভাইরাস এবং রতন সূত্র সহ ইত্যাদি সূত্র পাঠের কার্যকারিতা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানারকম মন্তব্যের মধ্যে ধর্মত যথাযথ ব্যাখ্যাটি কী?

      1. ভান্তে, বন্দনা।
        কেও বলছে সূত্র পাঠে ভাইরাস, রোগ-বালাই থেকে মুক্ত থাকা যায়। কেও বলছে সূত্র পাঠে ভাইরাস, রোগ-বালাই থেকে মুক্ত থাকা গেলে বুদ্ধ এবং সংঘ সূত্র পাঠ না করে, ধ্যান না করে চিকিৎসক জীবকের চিকিৎসা কেন গ্রহণ করতেন? ইত্যাদি।
        যাদের ধারণা ভুল তাদের ভুল ধারণার কারণগুলো কী কী? ধর্মত সঠিক ব্যাখ্যাটাই বা কীরূপ?

      2. আমি ভেবেছিলাম শিক্ষিতদের সংখ্যা বাড়ছে বলে মানুষের যুক্তিবোধ ও বাড়ছে। ফলে ধর্মান্ধতা কমে আসবে। কিন্তু এই সময়ে এসে বুঝতে পারছি একাডেমিক শিক্ষা মানুষকে যুক্তিবাদী করে না। সত্যিকারের চেতনাবোধ দিতে পারে না। এই সময়ে এসেও “রতনসূত্র” দিয়ে মহামারী হতে রক্ষা পাবার তরিকাতে তারা অন্ধভাবে বিশ্বাসী! অনেকে যুক্তিতে না পেরে গালমন্দ ও করছেন। এটা অপ্রত্যাশিত ছিলো।
        -“রতন সূত্র” এর ইতিহাস কতোজনে জানে এবং এ নিয়ে আলোচনা করতে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলাম। রতনসূত্রের উৎপত্তি হয়েছে বুদ্ধের পরিনির্বাণের হাজার বছর পরে। তখন বুদ্ধ পন্ডিতেরা ঐতিহাসিক গল্প লিখে এই সূত্রের উৎপত্তি বৈশালী নগরীতে হিসেবে অর্থকথাতে লিপিবদ্ধ করেছিলেন, তাও চালাকভাবে বলেছিলেন- না, এটি বুদ্ধের মুখনিশ্রিত সূত্র নয়- আনন্দ বুদ্ধের অনুমোদন নিয়ে এই সূত্র বৈশালী নগরীতে পাঠ করেছিলেন। এই সূত্রে কি কি আছে- কতজনে এই “পালি” ভাবার্থগুলো বুঝে? এই সূত্রের দুটি ভাবার্থ আছে- এক. অধিষ্ঠান ও দুই. করণীয় কর্ম। অধিষ্ঠান হলো… অমুক সমুকের নিয়মনীতি পালনের ওপর বিশ্বাস রেখে এই দূর্যোগটি / রোগটি/ মুক্ত হোক.. আর আরেকটি হলো এই হতে মুক্তি পেতে হলে এমন সব করণীয় কর্ম করা বাঞ্চনীয়।
        – এখন, এসব না বুঝে অনেকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে তারা শুধু শুনেই রোগমুক্তি পাবে- এই আশায়। শীল (নিয়মনীতি) পালন ছাড়া কোনকিছু হতে মুক্তি নেই। তাই আগে শীল (নিয়মনীতি) পালন করুন। মহামারী হতে নিজেকে এবং অন্যেকে রক্ষা করুন। ধর্মান্ধতা পরিহার করুন। বুদ্ধ বেঁচে থাকলে আপনাদের কর্মকান্ডকে দেখে “বালা মূর্খ” বলে বোকা দিতেন নিশ্চয়!

        1. বন্দনা ভান্তে। উপরোক্ত মন্তব্যটি ছিল ফেসবুকের আরেকজনের। আসলে কি ঘটনাটি এমন? একটু গোল খেলাম।

  4. ভান্তে, তুই সালে হদে, ব্যবিচার হয় ভাবে অয়, মুই তরে হং ব্যাবিচার সাধারনত পাঁচ ভাগে অয়, ১/ স্ত্রী সন্দেহ করা, ২/ স্ত্রী বলে জানা, ৩/ পরের স্ত্রী ধারনা করা, ৪/ কাম চিত্ত উৎপন্ন হওয়া, ৫/ চার কাম চিত্ত উৎপন্ন হওয়ায় যৌন সঙ্গম করায়, ব্যাবিচার হয়। তার আগে নয়। ঠিক কোন পুরুষ কিংবা মেয়ে ভরা যৌবনে একটা মেয়ে, একটা ছেলেকে, ( নিজের আত্বীয় মা, মেয়ে,) ব্যতিত কাউকে লিপ কিস করা, স্বাভাবিক নয়। কোন ছেলে কিংবা মেয়ে কেউই তৃঞ্চা মুক্ত নই। সুতরাং পারাজিকা না হওয়া কোন অবকাশ নেই।

  5. ভিক্ষুবোই হন চিত্তলোই মিলেবুরে লিপ কিস দের, আসক্ত মনে দের নাহি অনাসক্ত মনে লিপ কিস দের। ভিক্ষু বো অবশ্যই তৃঞ্চা মুক্ত নই। হেনে পারাজিকা নঅব।

    1. কন্না কুয়েদে লিপ কিস দিলে পারাজিকা অয়দে? মুই দ এব সিয়ান হবর ন পাং। সিয়ান বিনয়র কুভোত আঘে মরে এক্কা দেঘেই দিলে দোল অব।

  6. ভিক্ষুয়ে মিলেলোই লিপ কিস দে দি গল্ল্যে পারাজিকা অয় নাহি ভান্তে।

    1. নাদেই। ভিক্ষুয়ে যদি মিলে অথবা মরত্তোই ব্যভিচার গরেদে অয় সেক্কে তেহ তার পারাজিকা অয়দে আয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *