আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

বার্মার দিনলিপি

গত তিন/চারদিন ধরে অসুস্থ হয়ে আছি। সাধারণত ঘুম থেকে উঠলেই হাঁচি এবং সেই সাথে সর্দি হয় আমার সকালের সঙ্গী। তাই সেটা নিয়ে আমি মাইণ্ড করি না। কিন্তু গত তিন চারদিন থেকে চোখ ফুলে লাল হয়ে গেছে। আর সাথে দোসর হিসেবে জুটেছে হালকা জ্বর। এখন তাই আক্ষরিক অর্থেই চোখে সর্ষেফুল দেখছি মাঝেমাঝে।

আমার চোখ লাল দেখে আঁতকে উঠেছিল পাশের রুমের ভিয়েতনামিজ ভিক্ষুটি। তাই দুদিন ধরে সে আমাকে দেখা হলেই বলছে, ভান্তে, ডাক্তারের কাছে যান। ডাক্তার দেখান। প্রতিবার আমি শুকনো হেসে বলেছি, সমস্যা নেই। দুয়েকদিনে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সে নাছোড়বান্দা। পরে তার এক আত্মীয়ের উদাহরণ দিল। তারও নাকি চোখ এরকম লাল হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু চিকিৎসা না করার কারণে সপ্তাহ দুয়েকের মাঝেই একটা চোখ অন্ধ হয়ে গেছে। আমি মনে মনে চমকে গিয়েছিলাম শুনে। এত মারাত্মক হয় চোখ লাল হলে? সে বলল, ভান্তে, আপনি খরচের চিন্তা করবেন না। আমি যা লাগে সব ব্যবস্থা করে দেব। আপনি শুধু একজন বার্মিজ লোক ঠিক করুন যে আপনার সাথে যাবে। আমি তাকে আশ্বস্ত করে বলি, আমি একজন ট্যাক্সিওয়ালাকে চিনি। তার সাথে কথা বলে দেখব।

ট্যাক্সিওয়ালার সাথে কথা বললাম। টাকাপয়সার বিষয়টা বলতে একটু লজ্জা লেগেছে। সে যদিও জানে, তবুও আবার বললাম। শেষের ঝগড়া আগেভাগে করে নিলে ভালো। তাকে বুঝিয়ে দিলাম যে আমার কোনো টাকা নেই। কাজেই ভাড়া এখন দিতে পারব না। ওষুধপত্র, ডাক্তারের ফি ইত্যাদি খরচও আছে। সেগুলো কী করা যায় আমার মাথায় আসছে না। সে আমার অবস্থা সম্পর্কে জানত। তাই সে বলল সে বুঝেছে। সে খোঁজ নিয়ে দেখবে কোন হাসপাতালে যাওয়া যায়।

পরদিন সকালে দশটার দিকে সে তার ট্যাক্সি নিয়ে হাজির হল। যেতে যেতে জানাল এক মহিলা নাকি আমার চিকিৎসার জন্য ৩০হাজার টাকা দান করেছে। আমি অবাক। কোন মহিলা? সে কেন হুট করে অত টাকা দান করতে যাবে? মিয়ানমারের টাকাগুলোর মান কম। কিন্তু ৩০হাজার তো কম কথা নয়। বাংলাদেশি টাকায় ২হাজার টাকা। এমনি এমনি কি কেউ এত টাকা দান দেয়? আমার সন্দেহ হলো, আকারে ইঙ্গিতে এই দীনদরিদ্র ভিক্ষুর জন্য সাহায্য চেয়ে বসেছে নাকি এই ট্যাক্সি ড্রাইভার? কিন্তু ট্যাক্সিওয়ালা জানাল মহিলাটি হচ্ছে কোন এক অফিসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। সেই অফিসে পৌঁছে দেয়ার সময়ে কথা প্রসঙ্গে সে মহিলাটিকে জানিয়েছিল আমার চোখের সমস্যার জন্য সঙ্ঘ হাসপাতালে যাওয়ার কথা। তা জেনে মহিলাটি নিজেই ফোন করেছিল সঙ্ঘ হাসপাতালে। ফোন করে জানল যে সেখানে গিয়ে লাভ হবে না। চোখের ডাক্তার কয়েক দিন ধরে আসছেন না। তাহলে কোথায় যাওয়া যায়? সে একটা প্রাইভেট ক্লিনিকের ঠিকানা দিল। আর টাকা দিল ৩০হাজার। ব্যাপারটা শুনে আমি একটু আশ্বস্ত হলাম।

সে আমাকে বলল, ভান্তে, আপনি টাকার জন্য চিন্তা করবেন না। আমি আমার স্ত্রীর কাছ থেকে ১ লাখ টাকা নিয়ে এসেছি। খরচ যা হবার হবে। শুনে আমি হেসে উঠলাম। আমি জানি সে যা কামাই করে তা তার বউকে দিয়ে দেয়। বউ হচ্ছে তার সংসারের ম্যানেজার। তাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম এই দেশে চালের দর কত? সে বলেছিল সেটা সে জানে না। জানে তার বউ। সে শুধু টাকা কামায় আর বউকে দেয়। বউ তার বাদবাকি সংসারের খরচের বিলিবন্দোবস্ত করে দেয়। কী সুন্দর একটা বৌদ্ধ পরিবার। আমি বললাম, ঠিক আছে। সেগুলো শোধ করার ব্যবস্থা আমি পরে করব।

কিছুক্ষণ পরে পৌঁছে গেলাম Myittar OO Eye Care Center – এ. ট্যাক্সি থেকে নেমে বড় রাস্তা ধরে হাঁটতে হলো কিছুদূর। লোকজন ব্যস্ত হয়ে এদিকওদিক যাচ্ছে। আমার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময়ে তাদের অনেকেই কুঁজো হয়ে মাথা হেঁট করে হেঁটে যাচ্ছে। কেউ কেউ আবার ড্যাম কেয়ার ভাব নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। মায়ানমারে আমি যেখানেই গেছি, সবখানেই দেখেছি লোকজন এরকমই করে থাকে। তারা ভান্তের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময়ে একটু কুঁজো হয়ে মাথা নত করে চলে। সেটা তাদের ভান্তেদের প্রতি সম্মান জানানোর সংস্কৃতি। তাই এখানে যেকোনোখানে রাস্তায় বের হলে আমি খুব নিরাপদ বোধ করি। প্রতিরূপ দেশে বাস করার এই একটা সুবিধা। অন্যদিকে বাংলাদেশের রাস্তায় বের হওয়ার কথা চিন্তা করলেই আমি শিউরে উঠি। থাক সে কথা।

ক্লিনিকে পৌঁছে দেখলাম লোকজনের যথেষ্ট ভিড়। এত লোকজন কেন? খুব কি চোখের রোগ হচ্ছে সবার? আমি ট্যাক্সিওয়ালার পেছন পেছন গেলাম। আমার অবশ্য লাইনে দাঁড়াতে হলো না। ঝটপট নামধাম লিখে নিয়ে একটা রুমে ডেকে নিয়ে গেল। সেখানে এক বার্মিজ কন্যা হড়বড় করে কী বলল বুঝলাম না। হা করে চেয়ে রইলাম শুধু। আমার বার্মিজ শব্দভাণ্ডার এখনো খুব কম। ১৫০০ শব্দ পারি কিনা সন্দেহ। আগে মনে করতাম আমি বেশ ভালো বার্মিজ আয়ত্ব করেছি। কিন্তু এই বার্মিজ কন্যাদের মুখোমুখি হলে আমার সেই ধারণা মুখ থুবড়ে পড়ে। ভাগ্য ভালো ট্যাক্সিওয়ালা আমার পাশেই ছিল। সে বলল আয়নার অক্ষরগুলো পড়তে বলছে। বার্মিজ অক্ষরগুলো আমার জানা আছে। তাই সেগুলো অনায়াসে বলে দিলাম। শেষের একটা অক্ষর মনে করতে পারলাম না। সেটা আঙুল দিয়ে এঁকে দেখিয়ে দিলাম। বার্মিজ কন্যাটা হেসে জানাল সে বুঝেছে।

এবারে আরেকজন এসে ডেকে নিয়ে গেল বারান্দা পেরিয়ে আরেকটা রুমে। সেখানে ডাক্তারনী বসে আছেন। মায়ানমারে দেখেছি একমাত্র ডাক্তাররা ভালো ইংরেজি বলতে পারেন। তাদের সাথে কথা বলে মনটা হালকা করা যায়। ডাক্তারনী বললেন কী সমস্যা। আমি চোখগুলো দেখিয়ে বললাম, দেখতেই পাচ্ছেন কী সমস্যা। আরো কিছু কথা হলো। দুটো ড্রপ লিখে দিলেন। দুই সপ্তাহ পরে আবার যেতে বললেন। তার মানে আবার হোস্টেল থেকে বেরোতে হবে। কোথাও বের হওয়ার কথা বললেই আমার গায়ে জ্বর আসে। কে দেবে গাড়ি ভাড়া? কিন্তু সেই কথা ডাক্তারনীকে কেমনে বুঝাই। আমি বললাম সেটা পরে দেখা যাবে।

ট্যাক্সিওয়ালা ওষুধ কিনে নিয়ে এল। আমরা ট্যাক্সির উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করলাম। একজন এসে ছাতা মেলে ধরল আমার উপরে। আমি একটু বিব্রত বোধ করলাম। এ আবার কী জিনিস রে বাবা। এটা এমন কোনো রাজকীয় অনুষ্ঠান নয় যে আমার মাথার উপরে ছাতা মেলে ধরতে হবে। আমাদের হাঁটতেও হবে কিছুদূর। কিন্তু লোকটা নাছোড়বান্দা। সে বলল, এতে তার পুণ্য হবে। আমি কি আর তাতে বাধা দিতে পারি। তাই নিরবে ভাবনায় মন দিয়ে হাঁটা ধরলাম। তার পুণ্য আরো বেশি হোক।

হোস্টেলে যখন ফিরলাম তখন সাড়ে এগারটা বাজছে। ডাইনিং হল থেকে খেয়েদেয়ে ফিরছে অনেকেই। নিন্দুকেরা যাই বলুক, খাওয়ার উপরে কোনো কথা নেই। তাই আমিও এক দৌড় দিলাম। খেয়েদেয়ে রুমে ফিরে ড্রপ দিলাম চোখে। আজ ক্লাসে যাব না। তাই এলার্ম বন্ধ করে ঘুম দিলাম একটা। স্বপ্ন দেখলাম কোন একটা জীপগাড়ির ছাদে করে যাচ্ছি। গাড়িটা নামছে খাড়া ঢাল বেয়ে। পতন নিশ্চিত। কিছুদূর পরেই গাড়িটা খাদে পড়ে গেল। আমরা দিলাম ঝাঁপ। আমি গিয়ে পড়লাম নরম কাদার মাঝে। দেখলাম কোনো হাড়গোড় ভাঙে নি। হাঁফ ছেড়ে বাচলাম যেন। এরপরেই জেগে গেলাম আমি।

একটু পরেই দরজায় টোকা দিল আরেক ভিয়েতনামিজ ভিক্ষু। তার নাম হচ্ছে বু। সে বলল আমি নাকি দুদিন ধরে ক্লাসে যাচ্ছি না। ঘটনা কী? আমি বললাম Stay a hundred miles away from me. কিন্তু সে বলল, ঠিক আছে তো। তোমার কোনো কিছু লাগলে আমাকে বল। কোথাও যেতে হলে আমাকে বলো। আমি নিয়ে যাব। আমরা বন্ধু তো, ঠিক না? আমি বললাম, সেটা কীভাবে হয়? ঐদিন তো বলেছিলে তুমি নাকি আমার বন্ধু নও। এখন আবার বন্ধু হলে কীভাবে? সে হেসে উড়িয়ে দিল সেকথা। বলল, তোমার তো ভিটামিন সি দরকার। অরেঞ্জ জুস দরকার। খাবে? আমি বললাম অরেঞ্জ জুস তো আমার নেই। সে বলল, তাহলে আমি মার্কেটে গিয়ে কিনে নিয়ে আসব। বলা ভালো সে হচ্ছে এক ধরনের মহাযানী ভিক্ষু, কাজেই টাকাপয়সা সে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু আমি তাকে জানিয়ে দিলাম আমি ঠিক আছি। অনেক ধন্যবাদ। আমার কিচ্চু লাগবে না।

এর মাঝে পাশের রুমের ভিয়েতনামিজ ভিক্ষুটা এসে হাজির। সে এসে জিজ্ঞেস করল সে যদি ফলমূল নিয়ে আমাকে দান করে তাহলে আমি সেগুলো গ্রহণ করতে পারব কিনা।

আমি জানি এরা হয়তো মনেপ্রাণে আন্তরিক হয়ে আমাকে সাহায্য করতে চায়। কিন্তু কেন জানি তাদের সাহায্য গ্রহণ করতে আমার বিবেকে বাধে। এটা কি জেনোফোবিয়া বা বিদেশি লোকজনের ভয় কিনা সেটাও আমি নিশ্চিত নই। এভাবেই গত তিন চারদিনের অসুস্থতার কাহিনী একটু জানিয়ে দিলাম আমার গুটিকয় পাঠকদেরকে। ভালো থাকবেন সবাই। সবার জন্য রইল শুভকামনা।

4 thoughts on “বার্মার দিনলিপি

  1. ভান্তে আপনার দিনলিপির লেখা পরে চোখ দিয়ে পানি চলে আসল!!!!
    ভান্তে আমার নাম প নকজ । আমি আনার সব লেখাগুলিপ পরি । আপনি আমার কাছে কি তা আমি বুজাতে পারব না।

  2. ভান্তে, বন্দনা।
    রোগের সংজ্ঞা কী? সব শারীরিক ও মানসিক কষ্ট, রোগ কি কর্মের ফল? বার্ধক্য কি কর্মের ফল?

  3. তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠেন,সেই প্রার্থনা করছি ।
    নতশিরে বিনম্র বন্দনা জানাচ্ছি ভান্তে।

  4. ভান্তে, তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন। এই প্রার্থনা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *