আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

সঙ্ঘদান এবং অন্যান্য

কিছুদিন আগে অভিধর্মের ক্লাসে সেয়াদ কথা প্রসঙ্গে সঙ্ঘের নয়টি গুণের কথা বলেছিলেন। আমি সেগুলো আগেও জানতাম। কিন্তু তা সত্ত্বেও উনার ব্যাখ্যাটা বেশ অসাধারণ বলে মনে হলো আমার কাছে। তিনি নাকি সেটা শুনেছেন ত্রিপিটকধর মিনগুন সেয়াদের দেশনায়।

ব্যাপারটা হচ্ছে এরকম। আমরা সবসময়ই বলি, সঙ্ঘ হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ পুণ্যক্ষেত্র। আমরা বলি, কোনো কিছু দান দিলে সঙ্ঘের উদ্দেশ্যেই দান করুন। বিহার করবেন? সঙ্ঘকে দান করুন। তাহলেই সেটা উত্তম দান হবে। ভোজন দান করবেন? তাহলে এক সঙ্ঘ ভিক্ষু এনে খাওয়ান। কোনো মঙ্গল অনুষ্ঠান করবেন? সঙ্ঘকে আমন্ত্রণ করুন। তাহলেই সেটা ইহকাল ও পরকালে মঙ্গলময় হবে। এভাবে সঙ্ঘে দান দিলে সর্বশ্রেষ্ঠ পুণ্যক্ষেত্রে পুণ্যের বীজ বপন করা হয়ে যায়। তাই আমরা ভিক্ষুরা সবসময়ই সঙ্ঘে দান দিতে উৎসাহ দিই। কিন্তু কেন সঙ্ঘকে সর্বশ্রেষ্ঠ পুণ্যক্ষেত্র বলা হয়ে থাকে?

সঙ্ঘ কেন সর্বশ্রেষ্ঠ পুণ্যক্ষেত্র?

সহজ ভাষায় ব্যাপারটা হচ্ছে এরকম। ভিক্ষুসঙ্ঘ হচ্ছে সুপথের পথিক। এখন এই সুপথের পথিক মানে কী? সুপথ মানে হচ্ছে ভালো পথ, সুন্দর পথ। যারা প্রাণিদের প্রতি নিষ্ঠুর, চুরিডাকাতি-ছিনতাই করে বেড়ায়, মিথ্যা বলতে বাঁধে না, অবৈধ প্রণয়ে লিপ্ত হয়, মদ বা নেশায় মাতাল হয়ে থাকে তাদেরকে আপনি নিশ্চয়ই ভালো বলবেন না। একমাত্র ভালো বলবেন তাদেরকে, যারা প্রাণিদের প্রতি দয়াশীল হয়, চুরিছিনতাই থেকে দূরে থাকে, মিথ্যা বলাকে এড়িয়ে চলে সযতনে, অবৈধ প্রণয় থেকে দূরে থাকে, মদ নেশা থেকে দূরে থাকে। শুধু এই পাঁচটি বিষয়ই নয়, ভিক্ষুদের এমন ২২৭টি নিয়ম পালন করতে হয় খারাপ থেকে দূরে থাকার জন্য। সেটা হচ্ছে শীলের শিক্ষা। এই শীলের শিক্ষার কারণেই ভিক্ষুসঙ্ঘকে সুপথের পথিক বলা হয়ে থাকে।

এছাড়াও আপনি আরেকটা বিষয় খেয়াল করুন। একজন খুব চঞ্চলমনা। তার কথাবার্তা, কাজকর্ম ও চলাফেরা সবকিছুই যেন চঞ্চল বানরের মতো। আরেকজন হচ্ছে শান্তশিষ্ট। তার কথাবার্তা, কাজকর্ম ও চলাফেরা সবকিছুই শান্ত। এদের মধ্যে কাকে আপনার ভালো মনে হয়? চঞ্চল ব্যক্তিকে, নাকি শান্ত ব্যক্তিকে? নিশ্চয়ই শান্ত ব্যক্তিকে। এই শান্ত ব্যক্তি মনটাকে শান্ত করতে শিক্ষা করেছে। তাই যেকোনোকিছুতে সে থাকে ধীরস্থির, অচঞ্চল। সেটা হচ্ছে সমাধি বা ধ্যানের শিক্ষা। এই ধ্যানের শিক্ষার কারণেও ভিক্ষুসঙ্ঘকে সুপথের পথিক বলা হয়ে থাকে।

সর্বশেষ বিষয়টি হচ্ছে জ্ঞান লাভের শিক্ষা। এটা হচ্ছে বিশেষ শিক্ষা যে শিক্ষায় শিক্ষিত হলে বাস্তবতাকে বুঝতে পারা যায়। সংসারে কারোর প্রতি মায়ায় অন্ধ হয়ে থাকাকে তখন অসার বলে উপলদ্ধি হয়। অনিত্যের জ্ঞান জাগে। সেই জ্ঞান থেকে আসে বিরাগ, আসে মোহমুক্তি, সাক্ষাৎ হয় চিরশান্তির নির্বাণের। এটাই হচ্ছে প্রজ্ঞার শিক্ষা। এই প্রজ্ঞা শিক্ষা বৌদ্ধধর্মের বাইরে অন্যকেউ করে না। একমাত্র ভিক্ষুসঙ্ঘই এই প্রজ্ঞা শিক্ষা করে থাকে। একারণেও ভিক্ষুসঙ্ঘকে সুপথের পথিক বলা হয়ে থাকে।

যারা এভাবে শীলের পথে আছে, ধ্যানের পথে আছে, প্রজ্ঞার পথে আছে তাদের পথটা হচ্ছে নির্বাণের সোজা পথ, শান্তির পথ, সম্মানের পথ। সেই পথে যারা দিনরাত পথ চলতে থাকে, তারাই হচ্ছে সেবার যোগ্য, আতিথেয়তার যোগ্য, উৎকৃষ্ট জিনিস দেয়ার যোগ্য, হাত জোড় করে সম্মান জানানোর যোগ্য।

সাহারা মরুভূমির কথা ধরা যাক। সেরকম মরুভূমিতে শুধু আছে বালি আর বালি। সেরকম বালিতে হাজার একর জুড়ে একজন রোপণ করল আলু বা শসা। অন্যদিকে আরেকজন আলু বা শসা রোপণ করল নদীর পাড়ে মাত্র এক একর আয়তনের এক উর্বর শস্যক্ষেত্রে। কার ফসল ভালো হবে বলে আপনার মনে হয়? মরুভূমিতে, নাকি নদীর পাড়ের শস্যক্ষেত্রে? নিশ্চয়ই নদীর পাড়ের পলিমাটিতে শস্য ভালো হবে। মরুভূমিতে হাজার একর জুড়ে শস্য রোপণ করলেও সেটা থেকে আশানুরূপ ফলন আশা করাটা হবে বোকামি।

ঠিক একইভাবে শীলহীন, ধ্যানহীন ও প্রজ্ঞাহীন অন্যান্য যেকাউকে সেবা করলে, আপ্যায়ন করলে, দান করলে, সম্মান প্রদর্শন করলে সেটা অপাত্রে দানের মতো হয়। মরুভূমিতে আলু বা শসা রোপণের মতো হয়। কষ্ট করলেও খুব একটা ফসল ফলে না। অন্যদিকে শীল, ধ্যান ও প্রজ্ঞার শিক্ষায় শিক্ষিত ভিক্ষুসঙ্ঘ হচ্ছে সুপথের পথিক, সোজা পথের পথিক, শান্তির পথের পথিক, সম্মানের পথের পথিক। সেকারণে ভিক্ষুসঙ্ঘকে সেবা করলে, আপ্যায়ন করলে, দান করলে, সম্মান প্রদর্শন করলে তা যেন হয় নদীর পাড়ের উর্বর জমিতে শস্য রোপণের মতো। সেই পুণ্যের কাজগুলো তখন আশাতীত ফসল দিয়ে থাকে। একারণেই ভিক্ষুসঙ্ঘ হচ্ছে পুণ্য অর্জনের জন্য শ্রেষ্ঠ পুণ্যক্ষেত্র।

কাকে দান দেবেন? গরীবকে? নাকি ভিক্ষুসঙ্ঘকে?

অতএব কোনো গরীব পরিবার এবং কোনো ভিক্ষুসঙ্ঘ এই দুইয়ের মধ্যে কাকে আগে দান দেয়া উচিত? সাধারণ যুক্তিতে মানবতাবাদীরা বলে উঠবে, গরীব লোকদেরকেই আগে দান করা উচিত। কিন্তু একজন পুণ্যার্থী সবার আগে বিবেচনা করবে কোথায় দিলে বেশি পুণ্য হয়।

এব্যাপারে একটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে। ড. নন্দমালাভিবংশ সেয়াদকে একজন বিদেশি জিজ্ঞেস করেছিল, বার্মার লোকজন পাড়ায় পাড়ায় বড় বড় জাদী বানায় জাঁকজমক করে। কত টাকাপয়সা খরচ করে। অথচ সেই টাকা দিয়ে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল করতে পারত। কত লোকের কর্মসংস্থান হতো। কত লোকের উপকার হতো। করে না কেন তারা? আপনারা কেন এব্যাপারে কিছু বলেন না?

সেয়াদ বলেছিলেন সেটা যার যার ইচ্ছা বা দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার। তাদের কাছে জাদী বানানোটাই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, তাই তারা জাদী বানিয়েছে। পর্বতারোহীরা লাখ লাখ টাকা খরচ করে এভারেস্টের চুড়ায় ওঠার জন্য। ঐ পাহাড় পর্বতে উঠে কী লাভ হয়? তার চেয়ে ওদেরকে বলুন ঐ টাকা দিয়ে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল করুক। অনেকের উপকার হবে। হবে না?

এভাবে মানবতাবাদীরা দেখে কেবল এই জন্মটাকে। কিন্তু পুণ্যার্থীরা গুরুত্ব দেয় ইহকাল ও পরকাল উভয়কে। তাই ভিক্ষুসঙ্ঘের দেখা পেলে তারা চোখ বন্ধ করে নিশ্চিন্তমনে দান করে থাকে। কারণ অর্হৎ থেকে শুরু করে আট প্রকার আর্য ব্যক্তি কেবল এই বুদ্ধশাসনেই বিদ্যমান। এর বাইরে কোথাও নেই। মহাপরিনির্বাণ সুত্রে বুদ্ধ সুভদ্র পরিব্রাজককে বলেছিলেন, যে ধর্মে আর্যঅষ্টাঙ্গিক মার্গ নেই সেখানে আর্যব্যক্তি নেই। তাই অন্য ধর্মগুলো শুন্য, অসার। একারণে ভিক্ষুসঙ্ঘ লাভ হলে ভিক্ষুসঙ্ঘকেই খুশিমনে দান করা উচিত। সেই দান অসংখ্য জন্ম ধরে তার ফল দেয়। এমনই শক্তিশালী সেই পুণ্যফল।

একারণেই দক্ষিণাবিভঙ্গ সুত্রে (ম.নি.৩.৩৭৬) গৌতমী যখন বুদ্ধকে চীবর দান করতে চেয়েছিলেন তখন বুদ্ধ বলেছিলেন, সঙ্ঘকে দাও। সঙ্ঘকে দিলে আমিও পূজিত হব, সঙ্ঘও পূজিত হবে। আবার সঙ্ঘদানের ক্ষেত্রেও ভাগ আছে। বুদ্ধ সহ ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীসঙ্ঘকে দিলে সেটা হয় সর্বশ্রেষ্ঠ দান। এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ সঙ্ঘদান আর নেই।

তা না হলে আরেকভাবে সঙ্ঘদান করা যায়। “সঙ্ঘ থেকে আমাকে এতজন ভিক্ষু দিন” এভাবে একজন বা দুজন বা তারো বেশি ভিক্ষুকে নিমন্ত্রণ করে দান দিলে সেটাও সঙ্ঘদান হয়। 

অথবা সেটা না বলে কোনো গ্রামের মধ্যে যতজন ভিক্ষু আছে, অথবা কোনো জেলার মধ্যে যতজন ভিক্ষু আছে তাদের সবাইকে নিমন্ত্রণ করে দান দিলে সেটাও হয় মহাসঙ্ঘদান।

বুদ্ধকে সহ সঙ্ঘদান করবেন যেভাবে

এখন তো আর বুদ্ধ জীবিত নেই, ভিক্ষুণীসঙ্ঘও নেই। তাই উভয় সঙ্ঘকে দান করতে পারার প্রশ্নই আসে না। তবে অর্থকথামতে, বুদ্ধ সহ ভিক্ষুসঙ্ঘকে দান করা যেতে পারে। তার জন্য ভিক্ষুসঙ্ঘের সামনের আসনে বুদ্ধধাতু নিহিত আছে এমন বুদ্ধমূর্তি বসিয়ে, তার সামনে পাত্র, হাত ধোয়ার পানি ইত্যাদি রেখে দিতে হবে। এরপর দেয়ার সময় প্রথমে বুদ্ধকে দান দিয়ে এরপর ভিক্ষুসঙ্ঘকে দান দিতে হবে। সোজা কথায় প্রথমে বুদ্ধকে সিয়ং দিয়ে পরে ভিক্ষুসঙ্ঘকে দিতে হবে। এভাবে দান দিলে বুদ্ধকে সহ দান করা হয়। 

কিন্তু বুদ্ধকে দেয়া সিয়ং বা খাদ্যদ্রব্য, ফুল, সুগন্ধি, চীবর ইত্যাদি নিয়ে কী করা উচিত?  সেগুলো কি ফেলে দিতে হয়? নাকি কাউকে দেয়া যায়? অর্থকথা বলছে সেগুলো ভিক্ষুসঙ্ঘকে দেয়া উচিত। কারণ পিতার সম্পত্তিতে পুত্রেরই অধিকার আছে। তবে তেল, ঘি থাকলে সেগুলো দিয়ে প্রদীপ জ্বালানো যায়। কাপড় থাকলে পতাকা বানানো যায়। সোজা কথায় সেগুলো গৃহী লোকজনের ব্যবহারযোগ্য নয়। বুদ্ধকে দেয়া জিনিস কীভাবে একজন গৃহী ভোগ করতে পারে সেটা আমার মাথায় আসে না। 

বুদ্ধ সিয়ং কি ফেলে দেয়া উচিত?

তাহলে লোকজন প্রায়ই তাদের ঘরে যে বুদ্ধকে সিয়ং তুলে রেখে দেয়, সেগুলো কী করা যায়? সেগুলো দুপুরের মধ্যেই ফেলে দেয়া উচিত। নিজেরা খাওয়া উচিত নয়।

কোনো ভিক্ষু যদি নিজেদের খাওয়ার পরে উচ্ছিষ্ট থাকে, তাহলে সেগুলো সে শ্রামণ অথবা গৃহীকে দিতে পারে। তবে সঙ্ঘকে বা বিহারের দেয়া অন্য কোনো জিনিসই গৃহীদের ভোগ করার অধিকার নেই। সেগুলো সাঙ্ঘিক সম্পত্তি। বিহারের মাটি পর্যন্ত কোনো গৃহীকে দেয়া যায় না। দিলেও সেটা সাঙ্ঘিক সম্পত্তি হিসেবেই রয়ে যায়। সেই সাঙ্ঘিক সম্পত্তি কোনো গৃহী যদি ব্যবহার করে থাকে, তাহলে তার খুব পাপ হয়। বিম্বিসার রাজার জ্ঞাতিরা সঙ্ঘের জন্য রাখা খাদ্য খেয়ে কত বুদ্ধান্তর কল্প প্রেতকুলে জন্মে দুঃখ ভোগ করেছে চিন্তা করুন।

কেন ব্যক্তিকে দানের চেয়ে সাঙ্ঘিক দান শ্রেষ্ঠ?

ব্যক্তিকে দানের চেয়ে সঙ্ঘের উদ্দেশ্যে দান যে শ্রেষ্ঠ তা একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। মধ্যম নিকায়ের দক্ষিণাবিভঙ্গ সুত্রে বুদ্ধ বলেছেন, হে আনন্দ, ব্যক্তিকে দেয়া দান কোনোভাবেই সঙ্ঘদানের চেয়ে মহাফলদায়ক হয় না। ভবিষ্যতে ভিক্ষুরা হবে নামে মাত্র ভিক্ষু। তারা কেবল গলায় অথবা হাতে এক টুকরো চীবর পেঁচিয়ে ভিক্ষু হিসেবে বিচরণ করবে। অথচ তাদের ঘরে থাকবে স্ত্রী ও পুত্রকন্যার দল। তারা কৃষিকাজ করবে, বাণিজ্য করবে, ক্ষেতখামার করবে, আরো কত কী করবে! ( আমার মনে হয় বর্তমানেও আমরা দেখতে পাচ্ছি এরকম ভিক্ষু! ) এমন দুঃশীল ভিক্ষুদেরও যদি লোকজন ভিক্ষুসঙ্ঘকে উদ্দেশ্য করে দান দেয় সেই দানের ফলও হয় অপরিমেয়। তবে সেখানে শর্ত হচ্ছে একটাই। সঙ্ঘের প্রতি থাকতে হবে অগাধ শ্রদ্ধা। বর্তমানের দুঃশীল ভিক্ষুদেরকে দেখে নয়, বরং মনে রাখতে হবে যে ভিক্ষুসঙ্ঘের মধ্যে সারিপুত্র, মোগ্গলায়ন ইত্যাদি আর্যব্যক্তিগণও আছেন। এভাবে সঙ্ঘ সবসময়ই বিশুদ্ধ। সেই বিশুদ্ধ সঙ্ঘের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা রেখে যদি বর্তমানের নামেমাত্র ভিক্ষুদেরকেও দান করা হয় সেই দানের ফল হয় অগাধ, অপরিমেয়।

সঙ্ঘের প্রতি এমন অগাধ শ্রদ্ধা প্রকাশ পায় কীভাবে? কেউ যদি সঙ্ঘদানের উদ্দেশ্যে বিহারে গিয়ে বলে, ভান্তে, সঙ্ঘ থেকে একজন স্থবির দিন আমাকে। কিন্তু তার কাছে পাঠানো হয় একজন শ্রামণ। তখন যদি সে আফসোস করে, চেয়েছিলাম স্থবির, পেলাম একজন শ্রামণ। তার সেই দান আর পরিপূর্ণ সাঙ্ঘিক দান হয় না। আবার মহাথেরো পেলে যদি খুব খুশি হয় তাতেও সেই দান পরিপূর্ণ সাঙ্ঘিক দান হয় না।

কিন্তু সে যদি সঙ্ঘ থেকে কোনো শ্রামণ বা ভিক্ষু পায়, সে তরুণ হোক, বুড়ো হোক, মুর্খ হোক, পণ্ডিত হোক, যেকোনো একজনকে পেয়েই মনেপ্রাণে সঙ্ঘের উদ্দেশ্যে দান করবে বলে স্মরণ রাখে, তার সেই দান হয় পরিপূর্ণ সাঙ্ঘিক দান। ঐ একজনকে দান করলেও সেটা সাঙ্ঘিক দান হয়ে যায়। এমন দানই হয় শ্রেষ্ঠ দান।

কিন্তু এমন দুঃশীল ভিক্ষুদেরকে দেয়া দান বিশুদ্ধ হয় কাদের দ্বারা? অর্থকথা বলছে, সারিপুত্র, মোগ্গল্লায়ন ইত্যাদি আশিজন মহাথেরো থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যেসব অর্হৎ উৎপন্ন হয়েছেন তারা এমন সাঙ্ঘিকদানকে বিশুদ্ধ করে দেন। তাই অর্থকথা বলছে, সঙ্ঘে চিত্তীকারং কাতুং সক্কোন্তস্স হি খীণাসৰে দিন্নদানতো উদ্দিসিত্বা গহিতে দুস্সীলেপি দিন্নং মহপ্ফলতরমেৰঅর্থাৎ, সঙ্ঘের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা নিয়ে সঙ্ঘকে উদ্দেশ্য করে কোনো দুঃশীল ভিক্ষুকে দান দিলেও সেটা একজন অর্হৎকে দানের চেয়ে শ্রেষ্ঠ দান বলে গণ্য হয়।

কিন্তু সঙ্ঘদান করতে না পারলে?

সঙ্ঘকে দানের সুযোগ না পেলে ব্যক্তিকেও দান করা যায়। এক্ষেত্রে এমনকি স্রোতাপত্তি ফল লাভের চেষ্টাকারী ব্যক্তিকে দান দিলেও অসংখ্য অপরিমেয় জন্ম ধরে তার ফল লাভ হয়। অর্থকথামতে, কমপক্ষে ত্রিশরণধারী হলেও সে স্রোতাপত্তি ফল লাভের চেষ্টাকারী ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হয়। সেই ত্রিশরণধারীকে দানের ফল পর্যন্ত অসংখ্য, অপরিমেয় জন্ম ধরে লাভ হয়। পঞ্চশীল পালনকারীকে দিলে তো আরো বেশি। তার উপর দশশীল পালনকারীকে দিলে আরো বেশি। তার চেয়েও বেশি ফল লাভ হয় প্রব্রজিত শ্রামণকে দান করলে। ভিক্ষুকে দান করলে আরো বেশি ফল লাভ হয়। শীল ও ব্রত পরিপূর্ণকারী ভিক্ষুকে দিলে তো আরো বেশি ফল। বিদর্শন ভাবনাকারীকে দিলে আরো বেশি। আর যে সবসময় বিদর্শনে রত, কঠোর ভাবনায় রত থাকে সবসময়, এমন ভাবনাকারীকে দিলে আরো বেশি ফল লাভ হয়। তার চেয়েও ভালো হয় স্রোতাপত্তি মার্গস্থ ব্যক্তিকে দিতে পারলে।

মার্গস্থ ব্যক্তিকে দান দেবেন যেভাবে

কেউ যদি স্রোতাপত্তি মার্গ অথবা অন্য কোনো মার্গ লাভ করে থাকে তাহলে সে হয় মার্গস্থ ব্যক্তি। এখানে মার্গস্থ ব্যক্তি মানে হচ্ছে তার মার্গচিত্ত উৎপন্ন হয়েছে। কিন্তু তার সেই মার্গচিত্ত উৎপন্ন হয়ে নিমেষেই বিলীন হয়ে যায়। এরপরে উৎপন্ন হয় ফলচিত্ত। অর্থাৎ সে মার্গস্থ ব্যক্তি হয়ে অবস্থান করে থাকে মাত্র এক চিত্তক্ষণের জন্য। এরপরেই সে স্রোতাপত্তি ফলস্থ ব্যক্তি বা স্রোতাপন্ন হয়ে যায় চোখের পলকে। তাহলে এত ক্ষণিক মুহুর্তের মাঝে কীভাবে কোনো মার্গস্থ ব্যক্তিকে দান করা সম্ভব? অর্থকথা বলছে, সম্ভব।

ধরা যাক, দিনরাত সবসময় বিদর্শন ভাবনায় রত ভিক্ষু পিণ্ডচারণের জন্য গ্রামে আসল। সে এসে দাঁড়াল কোনো এক বাড়ির সামনে। বাড়ির লোকজন তখন তার হাত থেকে ভিক্ষাপাত্র নিয়ে সেখানে ভাত ও তরকারী দিতে লাগল। ঠিক সেই সময়েই তার মার্গলাভ হলো। সেই লোকজনের ঠিক সেই সময়ে দানটা হলো একজন মার্গস্থ ব্যক্তিকে দান। 

অথবা ভিক্ষুটি ভোজনশালায় বসে আছে। লোকজন গিয়ে তার ভিক্ষাপাত্রে ভাত তরকারি দিয়ে দিচ্ছে। সেই সময়ে তার মার্গলাভ হলো। সেই দানটাও তখন হয় মার্গস্থ ব্যক্তিকে দান। 

অথবা ভিক্ষুটি বিহারে অথবা ভোজনশালায় বসে আছে। লোকজন তার ভিক্ষাপাত্রটি নিয়ে গেল তাদের বাড়িতে। সেখানে তারা পাত্রের মধ্যে ভাত তরকারি দিতে লাগল। এদিকে সেই সময়েই বিহারে বা ভোজনশালায় বসে থাকা ভিক্ষুুটির মার্গলাভ হলো। সেই দানও হয় মার্গস্থ ব্যক্তিকে দান। এমন দানের ফল হয় অনন্ত, অপরিমেয়।

অন্য ধর্মের লোকজনকে দান দেওয়া যায় না?

পারতপক্ষে দান দেয়ার ক্ষেত্রে কমপক্ষে ত্রিশরণধারী বৌদ্ধকে দান দিতে পারলে ভাল। সেরকম দানের ফলে অসংখ্য জন্ম ধরে দানের ফল লাভ করা যায়। কিন্তু তাও যদি না পাওয়া যায় তাহলে যেসব সাধু সন্ন্যাসীরা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হলেও কর্ম ও কর্মফলে বিশ্বাসী, যারা ধ্যান ও অভিজ্ঞা বা অলৌকিক শক্তি লাভী, তাদেরকে দান দিলেও লক্ষকোটি জন্ম ধরে সেই দানের ফল পাওয়া যায়। 

আবার ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বহু গৃহী লোকজন আছে যারা শীলবান, যারা কৃষিকাজ, অথবা ব্যবসার মাধ্যমে সহজ সরল জীবন যাপন করে। তাদেরকে দান দিলেও লক্ষ জন্ম ধরে তার ফল পাওয়া যায়। 

আবার ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বহু লোকজন আছে যারা দুঃশীল। তারা মাছ ও পশুপাখি শিকার করে, অন্যান্য নিষ্ঠুর পেশার মাধ্যমে জীবন ধারণ করে। তাদেরকে দান দিলে হাজার জন্ম ধরে ফল পাওয়া যায়।

সেরকম ব্যক্তি না পেলে পশুপাখি অথবা কীটপতঙ্গকে দান করতে পারেন। পশুপাখিকে দানের ফল পাওয়া একশ জন্ম ধরে। 

পোষা প্রাণিকে খাওয়ালেই সেটা দান হয় না

বলা ভালো, পোষা প্রাণিকে আদর করে, ভালোবেসে, অথবা বাঁচানোর উদ্দেশ্যে, ভরণপোষণের উদ্দেশ্যে যে খাবার দেয়া হয়, যেসব জিনিস দেয়া হয় সেগুলো এখানে গণ্য হয় নি। বরং দানের ফলের আকাঙ্খা করে যদি কোনো কুকুর, শুয়োর, কাক, ইত্যাদি যেকোনো প্রাণিকে উদ্দেশ্য করে কোনোকিছু দেয়া হয়, তাহলেই সেটা পশুপাখিকে দান বলে গণ্য হয়। তাই যেকোনো দান দেয়ার সময় সবসময় পুণ্যের ফলের আকাঙ্খা করা দরকার।

উদাহরণস্বরূপ কোনো কুকুরকে খাবার দেয়ার সময় মনে এই চেতনা থাকা দরকার, “এই দানময় পুণ্য আমার ভবিষ্যতের সুখের কারণ হোক।” এভাবে কর্মফলকে মনে রেখে উচ্ছিষ্ট খাদ্যও যদি কোনো ইতর প্রাণিকে দান করা হয় সেটা শক্তিশালী পুণ্যকর্ম হয়, যা একশ জন্ম ধরে পাওয়া যায়। অন্যান্য দানের ক্ষেত্রেও এরকম চেতনা থাকতে হয়। এমন চেতনাই হচ্ছে ত্রিহেতুক চেতনা, যেখানে অলোভ এবং অদ্বেষ তো থাকেই, কর্মফলের প্রতি বিশ্বাস রেখে দান করার কারণে সেখানে তখন অমোহও থাকে। সেই ত্রিহেতুক চেতনা  নিয়ে মানুষ হিসেবে জন্ম নিলে সে চেষ্টা করলেই মার্গফল লাভ করতে পারে। 

তাই মানবতাবাদীরা হয়তো দুর্গত মানুষদের সেবায় নিজেদের সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে পারে। কিন্তু তারা যদি দানের ফলের আকাঙ্খা না করে দান করে, তাহলে সেটা খুব একটা ফলদায়ক হয় না। বেস্সন্তর রাজা পর্যন্ত তার পুত্রকন্যাকে দান দেয়ার সময়ে বুদ্ধত্ব লাভের আকাঙ্খা করে দান দিয়েছিলেন। 

দান নিয়ে লেখা আপাতত এই পর্যন্তই। শেষ কথা হিসেবে বলা যায়, সুযোগ পেলেই দান দেয়া উচিত। রাস্তায় ভিক্ষুককে দেখলে দান দেয়া উচিত। ক্ষুধার্তকে খাবার দেয়া উচিত। দুর্গতকে সাহায্য করা উচিত। এবং সময়ে সময়ে অতি অবশ্যই সঙ্ঘদান করা উচিত। তবে যেকোনো দানের ক্ষেত্রে মনে এই চেতনা রাখা উচিত, এই দানের ফল আমার ভবিষ্যতের সুখের হেতু হোক। এভাবে দান করলেই হয় উত্তম দান।

10 thoughts on “সঙ্ঘদান এবং অন্যান্য

  1. বন্দনা ভান্তে! বুদ্ধশাসনে আট প্রকার আর্য ব্যক্তি কারা?

  2. বন্দনা ভান্তে!!!!!!!!!!
    বিম্বিসার রাজার জ্ঞাতিরা সঙ্ঘের জন্য রাখা খাদ্য খেয়ে কত বুদ্ধান্তর কল্প প্রেতকুলে জন্মে দুঃখ ভোগ করেছে কাহিনী বা জাতক টা জানি না ভান্তে ,আপনাকে হাতজোড় করে বন্দনা করে বলছি যদি একটু লিখতেন !!!!!!!!!!!

    1. বন্দনা ভান্তে!!!!!!!!!!
      আনন্দ ভান্তের আত্মত্যাগের কাহিনী‘হে ভিক্ষুগণ, শুধু এখন নয়, অতীতে ইতর প্রাণি হিসেবে জন্ম নিয়েও আমার জন্য সে জীবন ত্যাগ করেছিল।’ এই বলে তিনি ভিক্ষুদের অনুরোধে সেই অতীত জন্মের কথা তুলে ধরলেন। সেটা বড়ই করুণ কাহিনী। আমি সময় পেলে লিখব সেটা।ভান্তে আপনাকে হাতজোড় করে বন্দনা করে বলছি যদি একটু লিখতেন !!!!!!!!!!!

  3. বন্দনা ভান্তে। তাহলে যারা বনে জঙ্গলে ধ্যান সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করার জন্য তারা কিভাবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করে বিদর্শন ভাবনা করে? এই প্রশ্নটা শুধু জানার জন্য তর্ককরার জন্য নয়। অপরাধ করলে ক্ষমা করবে।

  4. ভান্তে বন্দনা। আমার নিম্নের তিনটা প্রশ্নের উত্তর পেলে খুশি হবো ঃ
    ১। প্রত্যেকবুদ্ধের সম্পর্কে জানার খুব আগ্রহ। তাই ওনাদের সম্পর্কে আর্টিকেল লিখলে ভালো হয়।
    ২। আমরা সকলে জানি যে তির্যক প্রাণীরা কোন প্রকার বিপদ ঘনিয়ে আসলে তার আঁচ সর্বপ্রথম তারাই পায়। সে হিসাবে বুড়ো বুড়ীরা মনে করে গভীর রাতে বিড়াল, কুকুর, পেঁচা কিংবা কাক ডাকলে নাকি ঐ পরিবারের কোন না কোন অমঙ্গল হবে জেনে তা তারা অগ্রীম জানিয়ে দেয় এটা বুদ্ধ ধর্ম মতে কতোটুকু সঠিক? এটা কি মিথ্যাদৃষ্টি বা অবিদ্যা জনিত ভ্রান্ত ধারনা নয়!!!
    ৩। আমরা সবাই জানি পাক পবিত্র থেকে ধর্মচর্চা বা ধর্মানুশীলন অথবা সব ধরনের ধর্মিয় আচার অনুষ্ঠান পালন করা উত্তম মঙ্গল। যদি এমন কোন পরিস্থিতিতে পরে জলবিয়োগ করে পানি বা টিস্যু ব্যবহার করতে না পারলে কিংবা জলবিয়োগ করার সময় গায়ে ছিটা পড়লে কিন্তু সে যদি না জানে বা সন্দেহ হয় তবে কি তার প্রার্থনা করা বা ধর্মদেশনা শোনা বা ধর্মীয় কোন কাজে অংশগ্রহণ করতে পারবে কিনা? যদি না পারে তবে আমার প্রশ্ন যারা বুদ্ধের নির্দেশিত ধুতাঙ্গব্রত পালন করে তারা কিভাবে পাক পবিত্রতা বজায় রেখে বনে জঙ্গলে ধর্মাচরণ করে? আবারো বন্দনা জানিয়ে অবান্তর প্রশ্ন করে বিব্রত করলে ক্ষমা করবেন।

    1. একচ্চে চ ৰিনিপাতিকাতি চতুঅপাযৰিনিমুত্তা উত্তরমাতা যক্খিনী, পিযঙ্করমাতা, ফুস্সমিত্তা, ধম্মগুত্তাতি এৰমাদিকা অঞ্ঞে চ ৰেমানিকা পেতা। এতেসঞ্হি পীতওদাতকাল়মঙ্গুরচ্ছৰিসামৰণ্ণাদিৰসেন চেৰ কিস থূলরস্সদীঘৰসেন চ কাযো নানা হোতি, মনুস্সানং ৰিয দ্বিহেতুকতিহেতুকঅহেতুকৰসেন সঞ্ঞাপি। তে পন দেৰা ৰিয ন মহেসক্খা, কপণমনুস্সা ৰিয অপ্পেসক্খা দুল্লভঘাসচ্ছাদনা দুক্খপীল়িতা ৰিহরন্তি। একচ্চে কাল়পক্খে দুক্খিতা জুণ্হপক্খে সুখিতা হোন্তি। তস্মা সুখসমুস্সযতো ৰিনিপতিতত্তা ৰিনিপাতিকাতি ৰুত্তা। যে পনেত্থ তিহেতুকা, তেসং ধম্মাভিসমযোপি হোতি পিযঙ্করমাতাদীনং ৰিয।[অ.নি.অর্থ.৭.৪৪-৪৫]ভান্তে ইয়ান বুজি ন পারংঅর; অভিধর্মার্থ সংগ্রহর লগে ন মিলের; চিয়ৎ দ লেগা আগেদে ঊনিশ প্রকার প্রতিসন্ধি চিত্তের মধ্যে দুই উপেক্ষাসহগত সন্তীরণ চিত্ত চারি অপায়/অহেতুক প্রতিসন্ধি ।

      1. উপেক্ষাসহগত সন্তীরণ চিত্ত হচ্ছে অহেতুক চিত্ত। সন্তীরণ চিত্ত সেটা কুশল বা অকুশল যাই হোক না কেন, সেটা মনুষ্যকুলে জন্ম দিলে সে হবে জন্মান্ধ, বধির, পঙ্গু ইত্যাদি। আর নরকে, ইতর প্রাণি হিসেবে, অসুর হিসেবে অথবা প্রেত হিসেবে জন্ম নিলে তো কথাই নেই। তাদের মার্গফল লাভের কোনো সুযোগই নেই।
        কিন্তু আটটি মহাবিপাক চিত্ত সেগুলো দ্বিহেতুক বা ত্রিহেতুক প্রতিসন্ধি দেয় মানুষ হিসেবে এবং ছয়টি কামাবচর দেবলোকে। তাদের মধ্যে একটি হচ্ছে চতুর্মহারাজিক দেবলোক, যার মধ্যে ভূমিবাসী দেবতারাও অন্তর্ভুক্ত। এই ভূমিবাসী দেবতাদেরকেই সাধারণত আমরা যক্ষ বলে থাকি। যেসব যক্ষ খুব প্রভাবশালী, তাদের দিব্য প্রাসাদ থাকে। যেমন আলবক যক্ষ, ইন্দক যক্ষ ইত্যাদি। কিন্তু তাদের অনুচর হিসেবে বহু যক্ষ থাকে যারা তাদের পরিচারক হয়ে জন্মায়। আর যেসব যক্ষ খুব অল্প পুণ্য নিয়ে জন্মায় তারা খুব কষ্ট করে থাকে। যেমন প্রিয়ঙ্কর মাতা (সং.নি.১.২৪০), উত্তরা মাতা ইত্যাদি। এসব যক্ষদেরকে বৈমানিক প্রেত বলা হলেও এরা চতুর্মহারাজিক দেবলোকের পর্যায়ভুক্ত। আর অসুরেরা তো অবশ্যই দেবতা। তারা স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়েছে মাত্র। এছাড়া চারি অপায়ের মধ্যে নরকের অনেক যমরাজা থাকে। তারাও বৈমানিক প্রেত। তারাও মার্গফল লাভ করতে পারে বলে অর্থকথায় উল্লেখিত হয়েছে।

    2. ১. আপনার আইডিয়াটা মন্দ নয়। তাই পরে একটু সময় করে এব্যাপারে ভেবে দেখা যেতে পারে।
      ২. কোনো ভূমিকম্প হলে পশুপাখিরা আগেভাগে জানে, সেটা ঠিক। কারণ তারা প্রকৃতির সবচেয়ে কাছাকাছি থাকে। তারা আগে খবর পাবে না তো কারা খবর পাবে? আর যখন তারা এভাবে জেনে যায় যে ভূমিকম্প আসছে, সুনামি আসছে তখন তো তাদের জানপ্রাণ বাঁচানোই ফরজ। আর যখন তারা বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে দলে দলে দৌড় দেয়, তখন লোকজন ভাবে, পশুপাখিরা নিশ্চয়ই টের পেয়েছে কোনো বিপদ হবে। এভাবে দেখে দেখে লোকজনের মধ্যে এমন ধারণা গড়ে ওঠা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন, বৌদ্ধধর্মের সাথে এসবের কোনো সম্পর্ক নেই। আমার মনে হয় সেগুলো প্রচলিত ধারণা মাত্র। সেগুলো সত্যও হতে পারে, মিথ্যাও হতে পারে। বৌদ্ধধর্ম পৃথিবীর সমস্ত কিছুর উত্তর দেবে এমন আশা আমি করি না।
      ৩. আপনার এই পাক পবিত্র বা অপবিত্র হওয়ার ধারণাটা খুব সম্ভবত মুসলিমদের কাছ থেকে আমদানি করা। বৌদ্ধধর্মমতে এগুলো ভিত্তিহীন। আমাদের পুরো দেহটাই অশুচি, অপবিত্র। আপনি নিশ্চয়ই ৩২ প্রকার অশুচির কথা জানেন। আপনি হয়তো সুন্দরী ব্রাহ্মণ কন্যা মাগণ্ডিয়ের কথা জানেন। এত সুন্দরী হয়েও বুদ্ধ তাকে পায়ে পর্যন্ত স্পর্শ করার ইচ্ছে করেন নি। সেটা মেয়ে বলে নয়, সেটা হচ্ছে মানবদেহ অশুচির আধার বলে।
      পবিত্র বা অপবিত্র থাকাটা সেটা মূলত সংস্কৃতির ব্যাপার, আচার-অভ্যাসের ব্যাপার। আপনি বিভিন্ন সংস্কৃতির তুলনা করলেই ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন। তাই অজান্তে জলবিয়োগের ছিটা পড়লে দেহ অপবিত্র হবে, আপনার পুণ্যকর্ম বাধাগ্রস্ত হবে বলে সন্দেহ করাটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। আপনার পুণ্যকর্ম আপনার মনই করে দেয়, দেহ নয়। তাই আপনি প্রয়োজনীয় দৈহিক কাজ সেরে নিশ্চিন্ত মনে ধর্মদেশনা শুনতে পারেন বা প্রার্থনা করতে পারেন।

      1. অসংখ্য ধন্যবাদ ভান্তে। আপনি আমার মনের কথাই বলেছেন। আমিও মনে করি মন পবিত্র হলেই ধর্মীয় কাজগুলো সাহজেই করা যায়। এরজন্য পাক পবিত্রের প্রয়োজন নেই।

        1. এখানে অবশ্য একটা কথা উল্লেখ করা উচিত। বন্দনা বা ভাবনার জন্য একটু সাফসুতরো হয়ে নিলে ভালো হয়। বিশেষ করে ভাবনার জন্য। সেটা বিশুদ্ধিমার্গে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে, ভাবনার আগে নখ লম্বা থাকলে কাটা উচিত, চুলদাড়ি লম্বা থাকলে ছাঁটা উচিত। কাপড় ময়লা হলে ধোয়া উচিত। দেহমন তখন ঝরঝরে হয়, ধ্যানসাধনাও সতেজ হয়। তাই আমার মনে হয় যেকোনো ধর্মীয় কাজে স্বাভাবিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হওয়াটা ভালো। কিন্তু তাই বলে একটু এদিক ওদিক হলেই যে শুচিবায়ুগ্রস্তের মত একদম জাত গেল জাত গেল বলে অনুশোচনা করতে হবে সেরকম ভাবাও ঠিক নয়। আপনি ধর্মপদের বালবর্গের জম্বুক স্থবিরের কাহিনী পড়তে পারেন। বেচারা পঞ্চাশ বছর ধরে শুধু পায়খানা খেয়ে বেঁচেছে। কিন্তু বুদ্ধের এক ধর্মদেশনা তাকে অর্হৎ বানিয়েছে। সেই ধর্মদেশনা শোনার আগে তো সে গোসল করতে গেছে বলে কোথাও উল্লেখ নেই!

Leave a Reply to Sadananda Chakma Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *