আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

অদ্ভূত প্রাণিদের কথা

আমার এই একটা অভ্যাস হয়ে গেছে। পিটকের যেখান থেকেই পড়া শুরু করি না কেন, পড়তে শুরু করলে আর ছাড়তে ইচ্ছে করে না। সেখান থেকে কত কী আইডিয়া যে বের হয়! আজকে একটু যুদ্ধের ব্যাপারে সার্চ দিলাম ত্রিপিটকে। বৌদ্ধরাও ইদানিং ‘ধর্ম বাঁচাও’ বলে শ্লোগান দিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে। তবে শান্তিপ্রিয় বৌদ্ধদের ধর্মের জন্য যুদ্ধ করা কতটুকু ধর্মসম্মত? তাদেরও কি জিহাদে নামার অধিকার আছে? ব্যাপারটা কয়েকদিন ধরে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু সেটা নিয়ে না হয় পরে লিখব। এখন আপাতত অদ্ভূত এই প্রাণিদের কাহিনীগুলো একটু বলি।

বুদ্ধের দ্বিতীয় প্রধান শিষ্য ছিলেন মোগ্গল্লায়ন ভান্তে। তিনি ছিলেন অলৌকিক শক্তিতে সবার সেরা। তাই লোকচক্ষুর অগোচরে থাকা জিনিসও তার দৃষ্টি এড়াত না। ভারতের রাজগীরে গৃধকূট পর্বত আছে। সেই পর্বত থেকে নামার সময়ে তিনি বহুবার বহু অদ্ভূত ধরনের প্রাণিকে দেখেছিলেন। সেগুলো দেখলে শ্রেণিবিন্যাস করতে না পেরে ক্যারোলাস লিনিয়াস (carolus linnaeus) নিশ্চিত দিশেহারা হয়ে যেতেন। সে যাই হোক, মোগ্গলায়ন ভান্তে পরে বুদ্ধের কাছে ব্যাপারগুলো উত্থাপন করলে বুদ্ধ জানিয়ে দিয়েছিলেন যে ব্যাপারগুলো সত্য। সেরকম প্রাণি সত্যিই আছে। তারা তাদের কর্মের ফল ভোগ করছে মাত্র। সেই অদ্ভূত প্রাণিগুলো দেখতে কীরকম?

প্রথমে যে প্রাণিটার উল্লেখ আছে সেটা একটা কঙ্কাল। সেটাও আবার আকাশে উড়ে যাচ্ছে। তাকে পিছু ধাওয়া করছে কাক, চিল ও শকুনের দল। সুযোগ পেলেই ঠোকর মারছে। তাতে নাকি কঙ্কালটা ব্যথায় চিৎকার করে উঠছে। কীরকম দৃশ্য হতে পারে, ভাবা যায়? মোগ্গল্লায়ন ভান্তেও নাকি তাই অবাক হয়ে ভেবেছিলেন, এমন প্রাণিও আছে তাহলে? বুদ্ধ তখন ব্যাখ্যা করে দিয়েছিলেন, এই কঙ্কালটা বহু আগে কসাই ছিল। গরু জবাই করত। সেই কর্মের ফলে মরণের পরে লাখ লাখ বছর ধরে নরকের আগুনে পুড়েছে। পরে সেখান থেকে উদ্ধার পেলেও আবারো কঙ্কাল হয়ে জন্মেছে। আমি ভাবি, এই আমলে যারা কসাই, যারা গরু জবাই করে বলি দেয় সৃষ্টিকর্তার কাছে, তাদের কপালে কী আছে তারা কী জানে?

আমাদের অভিধর্মের ক্লাস করান ড. ইন্দক সেয়াদ। তিনি কিছুদিন আগে এমন একটা ঘটনার কথা শুনিয়েছিলেন। তারই ঘনিষ্ঠ এক পরিচিতজন আছে। সে ভিক্ষু হয়ে ছিল অনেক বছর। পরে রংকাপড় ছেড়ে বিয়ে করেছে। কিন্তু এমনই কপাল, বিয়ে করেছে এক কসাইয়ের মেয়েকে। ফলে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের হত্যাযজ্ঞে তাকেও হাত লাগাতে হয়। বিকালে ক্রেতারা বাছাই করে নেয় তাদের পছন্দের শুকর। রাত বাড়তে থাকে, আর তার শ্বশুরবাড়িতে চলে প্রাণি হত্যার আয়োজন। বিশাল আগুন জ্বলতে থাকে। সেখানে বড় কড়াইয়ে পানি ফুটতে থাকে টগবগ করে। প্রতি রাতে কমপক্ষে ৬০/৭০টা শুকর মারা হয়। শুকরগুলো কোনো কোনোটা পালাতে চেষ্টা করে। শ্বশুর তখন যেন খুনের নেশায় মাতাল হয়ে ওঠে। চিৎকার করে গালাগালি শুরু করে দেয়। পালাবে কোথায়? এদিকে আয়। তোকে একটু যমদুয়ার দেখিয়ে দিই। এই বলে সজোরে ছুঁড়ে দেয় বল্লম। এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যায় শুকরের দেহ। তার শ্বশুর এবার এক কোপ বসিয়ে দেয় শুকরের গলায়। শুকর চলে যায় পরপাড়ে।

এভাবে কসাইয়ের জীবন কাটিয়ে তার শ্বশুর শুয়ে থাকে মরণশয্যায়। এমন সময়ে সে হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে, এই আমার বল্লম নিয়ে আয় তো। হতভাগা শুয়োরটা পালাচ্ছে। ধর, ধর। জবাই কর, জবাই কর। যারা অবুঝ তারা হয়তো ভাবতে পারে প্রলাপ বকছে। বৌদ্ধরা কিন্তু জানে সেটা কোনো প্রলাপ নয়। প্রত্যেকের মরণের মুহুর্তে তার কর্ম এসে উপস্থিত হয়। সেই জীবনে সে যে কর্ম করেছে সেটা সে চোখ বন্ধ থাকলেও দেখতে পায়। অজ্ঞানে মরলেও দেখতে পায়। কারণ সে সেটাকে দেখে তার মনের চোখে। অভিধর্মের ভাষায় সেটাকে বলা হয় চ্যুতি চিত্ত। সেই চিত্তের বিষয়বস্তু হয় তার এই জীবনের কোনো একটা কর্ম। সেই কর্মের উপরই নির্ভর করে মরণের পরে তার গতি। ভালো কর্ম হলে তো ভালো। খারাপ কর্ম হলে নরকের টিকেট ধরিয়ে দেয়। এভাবে এর পরপরই তার মৃত্যু হয়। বিষয়টা এর আগেও বহুবার আমার মনে ভেসে উঠেছে। তাই আমি মাঝেই মাঝেই ছটফট করে উঠি। কী করছি? কোন জায়গার টিকেট কাটছি? কোথায় যাব এরপরে?

আবার ত্রিপিটকের কাহিনীতে ফেরা যাক। সেখানে আরেক ধরনের প্রাণির কথা উল্লেখ আছে যেটা দেখতে কেবল একটা মাংসপিণ্ড। সেটাকেও তাড়া করছে শকুন, চিল আর কাকের দল। সুযোগ পেলেই ঠোকর দিচ্ছে। মোগ্গল্লায়ন ভান্তে এরকম দুটো মাংসপিণ্ডকে দেখেছিলেন। তাদের মধ্যে একজন নাকি ছিল ঐ আগে উল্লেখিত কঙ্কালটার মতো গরু জবাইকারী। আরেকজন ছিল পাখি শিকারী বা ব্যাধ। একারণেই আর্যঅষ্টাঙ্গিক মার্গের মধ্যে সম্যক জীবিকায় এই মাংস বাণিজ্য থেকে বিরত থাকার কথা এসেছে।

এরপরে আরেক ধরনের প্রাণির কথা আছে, দেখতে ঠিকই মানুষের মতো, কিন্তু গায়ে কোনো চামড়া নেই। সে নাকি ভেড়া জবাই করত।

আরেক ধরনের প্রাণি আছে যাদের গায়ের লোমগুলো হয় তাদের কর্ম অনুসারে। এদের মধ্যে কারোর লোমগুলো হয় ধারালো তলোয়ার। সেই ধারালো তলোয়ারগুলো তার দেহ থেকে উপরে উঠে গিয়ে আবার নিচে পড়ে তার দেহকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। সে নাকি আগের জন্মে শুয়োর জবাই করত।

আবার কারোর লোমগুলো হয় ধারালো বল্লম। সে নাকি আগের জন্মে হরিণ শিকার ধরত। কারোর লোম হয় তীরের মতো, কারণ সে আগে তীর ধনুক বানাত। কারোর লোম হয় সুঁচের মতো। কারণ সে আগে সারথি ছিল। চিন্তা করুন, রথ চালাতে হলে ঘোড়াকে মারতেই হবে, গুঁতাতেই হবে। কোনো উপায় নেই। অথচ তার কারণে মরেও শান্তি নেই। যেতে হবে নরকে। লক্ষ বছর পরে সেখান থেকে ছাড়া পেলেও আবার জন্ম হবে প্রেতকুলে, লোম হবে সুঁচের মতো। নিজের লোমগুলো নিজেকেই গুঁতাবে, ছিন্নভিন্ন করে দেবে। কী দরকার বাবা রথের সারথি হওয়ার?

আরেকজনের লোমগুলো সুঁচ হয়েছিল তার বিভেদমূলক কথাবার্তার কারণে। তার কারণে লোকজনের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। আমি এখন লিখতেও ভয় পাচ্ছি। সত্য কথা লিখলেই লোকজন ভাগ হয়ে যাবে। কী দরকার এত ঝামেলার? Ignorance is bliss. Sometimes.

আরেকজন নাকি দেখা দিয়েছিল পায়খানার গর্তে ডুবে থাকা অবস্থায়। সে নাকি অন্যের স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করেছিল।

আরেকজনও দেখা দিয়েছিল পায়খানার গর্তে, তবে সে নাকি দুই হাতে ধরে পায়খানা খাচ্ছিল। সে ছিল কশ্যপ বুদ্ধের আমলে এক দুষ্ট ব্রাহ্মণ। সে ভিক্ষুদেরকে নিমন্ত্রণ করে বড় পাত্রে পায়খানা পূর্ণ করে ভিক্ষুদেরকে বলেছিল, ভান্তেগণ, এখান থেকে ইচ্ছেমত পেট পুরে খান, ইচ্ছেমত নিয়ে যান। এখন বেচারা পেট পুরে দুহাতে নিজেই পায়খানা খাচ্ছে।

আরেক নারীকে দেখেছিলেন মোগ্গল্লায়ন ভান্তে। তারও দেহ ছিল চামড়াবিহীন। সে নাকি রাজগীর শহরে পরপুরুষের সাথে অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত থাকত।

আরেক নারী ছিল যে ভাগ্য গণনা করে দিত, অর্থাৎ জ্যোতিষী। সে হয়েছিল দুর্গন্ধযুক্ত। কাজেই জ্যোতিষীরা সাবধান! তবে আমিও একসময় হস্তরেখাবিদ ছিলাম। একটা হাত গণনা করে দিলেই নিতাম ৫০ ডলার। তবে পরবর্তীতে দেখেছিলাম যে, গণনার বিষয়টা শুধু হিসাব নিকাশেই হয় না, সাথে ইনটুইশন বা আধ্যাত্মিক ক্ষমতাও কিছু থাকতে হয়। তবেই কিরোর মতো দৃঢ় সুরে প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলা যায়, “আমি বলছি হবে!” আর এখন তো ভিক্ষু হয়ে গেছি। ভিক্ষুদের নিয়মে সেগুলো একদম নিষিদ্ধ। তা নাহলে …।

যাই হোক, আবার ফিরে আসি পিটকের কাহিনীতে। মোগ্গল্লায়ন ভান্তে দেখেছিলেন পুড়ে দগ্ধ হয়ে যাওয়া আরেক নারীকে। সে নাকি কলিঙ্গ রাজ্যের রাণি ছিল। কিন্তু সে একবার কোন এক মেয়ের গায়ে তপ্ত জ্বলন্ত অঙ্গার ঢেলে দিয়েছিল। তার ফলেই তার আজ এই অবস্থা।

আরেক প্রাণির কোনো মাথা নেই। কেবল ধড়টা ভেসে বেড়ায় আকাশে। তার চোখ ও মুখ হচ্ছে বুকের মাঝে। কী বিদঘুটে সেই প্রাণি! সে নাকি জল্লাদ ছিল। অপরাধীদেরকে ধরে ধরে জবাই করত।

মোগ্গল্লায়ন ভান্তে আরো দেখেছিলেন ভিক্ষু, ভিক্ষুণী, ছয়শীলধারিনী, শ্রামণ, শ্রামণীদেরকে। তাদের চীবর জ্বলছে, পাত্র জ্বলছে, কটিবন্ধনী পর্যন্ত জ্বলছে, দেহও জ্বলছে। জ্বলে পুড়ে হাহাকার করছে তারা। আমার ভয় লাগল খুব। ভিক্ষু, শ্রামণরা পর্যন্ত কর্মের শাস্তি ভোগ করছে। কিন্তু কী করেছিল তারা? তারা ছিল কশ্যপ বুদ্ধের আমলে। লোকজনের শ্রদ্ধাভরে দেয়া জিনিস পরিভোগ করেও তারা কায়িক ও বাচনিকভাবে অসংযত হয়ে চলাফেরা করত। মনের ইচ্ছেমত যা খুশি করে বেড়াত। পরে তারা এক কল্প নরকে শাস্তি ভোগ করে আবার প্রেতকুলে ভিক্ষুর মতো করে জন্মেছে। ভাবার সময় এসেছে আমাদের। আমরা কী করছি? কীসের টিকেট কাটছি? সুগতির নাকি দুর্গতির?

রেফারেন্স:

কাহিনীগুলো পড়তে পারেন বিনয় পিটকের পারাজিকা গ্রন্থের তৃতীয় পারাজিকার উদাহরণমালায়। [পারাজিকা.২২৮-২৩১]

2 thoughts on “অদ্ভূত প্রাণিদের কথা

  1. ভয়ংকর বললে ও কম বলা হয় ।
    ভান্তে
    সশ্রদ্ধ চিত্তে বিনম্র বন্দনা নিবেদন করছি ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *