আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

বার্মিজদের দুটো গল্প

পরীক্ষার ছুটিতে এসেছি আমাদের চাকমা বিহারে। ডিসেম্বরে ক্লাস শুরু হলে তবেই হোস্টেলে ফিরব। এই চাকমা বিহারের সেয়াদ পছন্দের লোক পেলে গল্প করতে পারেন ভালো। খাওয়ার সময় তাই প্রায়ই তার সাথে টুকটাক কথা হয়। আজ দুপুরে খাওয়ার সময় কথা হচ্ছিল মাংস খাওয়া নিয়ে। সেয়াদ তখন পুরনো এক ঘটনার কথা বললেন।

মাংস খাওয়া এবং মৈত্রী

আমাদের চাকমা সেয়াদ তখন ইয়াঙ্গুনের অন্য একটা বিহারে থাকতেন। সেখানে শ্রীলঙ্কা থেকে এক ভিক্ষু এসেছিল ধর্মশিক্ষা করার জন্য। বার্মার লোকজনের মাংস খাওয়া দেখে সে নাকি অভিযোগ করত, বার্মিজদের মোটেও মৈত্রী নেই। মৈত্রী থাকলে তারা এত মাংস খায় কীভাবে?

বার্মিজ এক ভিক্ষু নাকি তা শুনে পাল্টা জবাব দিয়েছিল, কে বলেছে মৈত্রী নেই? মৈত্রী আছে বলেই তো আমরা মাংস খাই। শ্রীলঙ্কানটা অবাক। সেটা কোন যুক্তিতে সম্ভব? বার্মিজ ভিক্ষুটা তখন ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিল, দেখো, বার্মিজদের প্রতিবেশি দেশ হচ্ছে চীন। চীনারা শুকরের মাংস খায়। তাই প্রতিবেশীর সাথে মৈত্রীর খাতিরে বার্মিজরাও শুকরের মাংস খায়। আরেকটা প্রতিবেশি দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। সেখানে বাঙালিরা গরুর মাংস খায়। তাদের সাথেও মৈত্রীর বন্ধন রাখতে হয়। একারণেই মৈত্রীর খাতিরে গরুর মাংসও খেতে হয়।

শ্রীলঙ্কানটা এই যুক্তি মানতে পারল না। এত মৈত্রী থাকলে দেশে এত যুদ্ধ কেন? কেন শানদের সাথে যুদ্ধ হয়? কেন রাখাইনদের সাথে যুদ্ধ হয়? নিজের দেশের মধ্যেই লোকজন হানাহানি করে মরছে। সেখানে কোথাও মৈত্রীর চিহ্ন আছে কি?

বার্মিজটা আবার বলল, দেখো বাপু, চীনের জনসংখ্যা হচ্ছে ১০০ কোটি। ভারতের জনসংখ্যাও ১০০ কোটি। এদিকে বার্মার জনসংখ্যা মাত্র ৫ কোটি। তাই আত্মরক্ষার খাতিরে একটু ওরকম লাফঝাঁপ দিয়ে দেখিয়ে দিতে হয় যে আমরা লোক অল্প হলেও দুর্বল নই। নাহলে চিরে চ্যাপ্টা বানিয়ে ফেলবে না?

মাতাল পণ্ডিতের তর্কযুদ্ধ

এরপর সেয়াদ আরেকটা গল্প শোনালেন। একবার চীনা সৈন্যবাহিনী অগ্রসর হলো বার্মাকে দখল করার জন্য। বার্মার রাজা তা শুনে প্রমাদ গুণলেন। চীনাদের বিশাল সৈন্যসামন্ত। যুদ্ধ হলে পরাজিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তাই তিনি একটা প্রস্তাব পাঠালেন চীনাদের কাছে। যুদ্ধ হলে তো উভয়পক্ষের ক্ষয়ক্ষতি হবে। বহু লোক হতাহত হবে। সেটা কারোরই কাম্য হওয়া উচিত নয়। তার চেয়ে একটা তর্কযুদ্ধ হোক। তর্কে হারলে বার্মার রাজা বশ্যতা স্বীকার করবেন, আর জিতলে চীনারা ফিরে যাবে। চীনারা রাজি হলো। দিন তারিখ ঠিক হলো।

এদিকে বার্মার রাজা তার রাজধানীতে ঘোষণা করে দিলেন, কে পারবে চীনাদের সাথে তর্কযুদ্ধ করতে? রাজধানীতে কত কত পণ্ডিতের বসবাস। কিন্তু কারোর সাহসে কুলালো না। প্রার্থী না থাকায় এবারে ঢোল পিটিয়ে সারা দেশে ঘোষণা করা হলো। এক মাতাল মদ খেয়ে ঘুমাচ্ছিল। সে ঢোলের শব্দে জেগে উঠে কান খাড়া করে শুনল ঘোষণার কথা। এরপর তাদের কাছে হাজির হয়ে বলল, আমি পারব। তার আপাদমস্তক দেখে কর্মচারীরা খুব একটা ভরসা পেল না। তারা তাকে ভয় দেখিয়ে বলল, দেখো, না পারলে কিন্তু তোমার জান যাবে। কিন্তু তার এক কথা। সে পারবে। প্রার্থীর অভাবে তাই সেই মাতাল পণ্ডিতকেই নিয়ে আসা হলো রাজধানীতে ঢাকঢোল পিটিয়ে।

বার্মা ও চীনের মাঝখানের সীমানা হচ্ছে একটা ছোট নদী। তার ওপাড়ে চীনাদের দল ঘাঁটি গেড়েছে। এপাড়ে বার্মা দেশ। নির্দিষ্ট দিনে মাতাল পণ্ডিতকে দাঁড় করানো হলো নদীর পাড়ে। ওপাড়ে দাঁড়াল চীনা পণ্ডিত। ঠিক হলো, কথা নয়, বরং ভাব বিনিময় হবে ইশারায়। চীনা পণ্ডিত একটা আঙুল উঁচিয়ে দেখাল। মাতাল পণ্ডিত আঙুল উঁচিয়ে ধরল দুটো। চীনা পণ্ডিত বুঝতে পেরে মাথা দোলাল। এবার সে উঁচিয়ে ধরল পাঁচটা আঙুল। তা দেখে মাতাল পণ্ডিত দশটা আঙুল মেলে ধরল। চীনা পণ্ডিত আবার মাথা দোলাল। এবার সে বুকে হাত দিয়ে চাপড়াতে লাগল। মাতাল পণ্ডিত তা দেখে চাপড়াতে লাগল বুক ও পিঠ। চীনা পণ্ডিত যা বুঝার বুঝে নিল। তারা শিবির তুলে নিয়ে ফিরে গেল রাজধানীতে।

চীনা সম্রাট কথোপকথনের ব্যাপারে জানতে চাইলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, পণ্ডিতমশাই, আপনার এক আঙুল উঁচিয়ে ধরার মানে কী? চীনা পণ্ডিত বুঝিয়ে দিল, মহারাজ, এক আঙুল উঁচিয়ে ধরে আমি বুঝাতে চেয়েছিলাম যে আমাদের সম্রাটই হলেন গিয়ে সর্বেসর্বা। কিন্তু তাদের পণ্ডিত দুটো আঙুল উঁচিয়ে বলেছে, তাদের রাজার কাছে রাজা ও প্রজা উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ।

তাহলে পাঁচটা আঙুল উঁচিয়ে ধরার মানে কী? – পাঁচটা আঙুল উঁচিয়ে ধরার মানে হচ্ছে আমাদের সম্রাট সবসময় পঞ্চশীল পালন করে থাকেন। কিন্তু তাদের পণ্ডিত দশটা আঙুল উঁচিয়ে জানিয়েছে, তাদের রাজা দশশীল পালন করে থাকেন।

আর আপনার বুক চাপড়ানোর মানে কী? – এর মানে হচ্ছে আমাদের সম্রাট তার প্রজাদেরকে সবসময় বুকে আগলে আগলে রাখেন। কিন্তু তাদের পণ্ডিত বুকে ও পিঠ চাপড়ে জানিয়েছে যে, তাদের রাজা শুধু বুকে নয়, পিঠেও তুলে রাখেন। অর্থাৎ শুধু রাজকর্মচারীদের নয়, সাধারণ জনগণের সুযোগ সুবিধার দিকেও খেয়াল রাখেন। চীনা সম্রাট তা শুনে মাথা নাড়িয়ে সায় দিলেন।

ওদিকে মাতাল পণ্ডিতকে নিয়ে যাওয়া হলো বার্মিজ রাজদরবারে। সেখানে রাজা জানতে চাইলেন দুই আঙুলের মানে কী? বার্মিজ পণ্ডিত বলল, চীনা পণ্ডিতের একটা আঙুল উঁচিয়ে দেখানো মানে হচ্ছে সে এক ঢোকে এক বোতল মদ খেতে পারে। তাই আমি দুটো আঙুল দেখিয়ে বুঝিয়েছি আমি এক ঢোকে দুই বোতল খেতে পারি। সে বুঝেছে!

তাহলে দশটা আঙুল দেখানোর মানে কী? – চীনা পণ্ডিতের পাঁচটা আঙুল দেখানো মানে হচ্ছে সে দিনে পাঁচ বোতল মদ খায়। আমি তাকে দশটা আঙুল দেখিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছি যে আমি দিনে দশ বোতল খাই। সে সেটাও বুঝেছে।

আর বুক ও পিঠ চাপড়ানোর মানে কী? – চীনা পণ্ডিতের পাঁচ বোতল খেলে নাকি বুক জ্বালাপোড়া করে। আমি বুক ও পিঠ চাপড়ে জানিয়ে দিয়েছি যে, দিনে দশ বোতল খেলে আমার শুধু বুক নয়, পিঠও জ্বালাপোড়া করে! সে সেটাও বুঝে ফেলেছে। শুনে রাজা কী মন্তব্য করেছিলেন তা আর সেয়াদ বলেন নি। আমিও আর জিজ্ঞেস করি নি।

পাঠকদের জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখি, দ্বিতীয় কাহিনীটা খুব সম্ভবত সত্য নয়, বার্মিজদের মনোবল চাঙা রাখার জন্য প্রচলিত রূপক কাহিনী মাত্র। তবে এটা ঠিক, চীনারা বহুবার বার্মা দখল করতে চেয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই গোহারা হেরেছে।

9 thoughts on “বার্মিজদের দুটো গল্প

  1. একচ্চে চ ৰিনিপাতিকাতি চতুঅপাযৰিনিমুত্তা উত্তরমাতা যক্খিনী, পিযঙ্করমাতা, ফুস্সমিত্তা, ধম্মগুত্তাতি এৰমাদিকা অঞ্ঞে চ ৰেমানিকা পেতা। এতেসঞ্হি পীতওদাতকাল়মঙ্গুরচ্ছৰিসামৰণ্ণাদিৰসেন চেৰ কিস থূলরস্সদীঘৰসেন চ কাযো নানা হোতি, মনুস্সানং ৰিয দ্বিহেতুকতিহেতুকঅহেতুকৰসেন সঞ্ঞাপি। তে পন দেৰা ৰিয ন মহেসক্খা, কপণমনুস্সা ৰিয অপ্পেসক্খা দুল্লভঘাসচ্ছাদনা দুক্খপীল়িতা ৰিহরন্তি। একচ্চে কাল়পক্খে দুক্খিতা জুণ্হপক্খে সুখিতা হোন্তি। তস্মা সুখসমুস্সযতো ৰিনিপতিতত্তা ৰিনিপাতিকাতি ৰুত্তা। যে পনেত্থ তিহেতুকা, তেসং ধম্মাভিসমযোপি হোতি পিযঙ্করমাতাদীনং ৰিয। [অ.নি.অর্থ.মহাযঞ্ঞৰগ্গো-৭.৪৪-৪৫]
    ভান্তে ইয়ান বুঝি নপারঅর অভিধর্মার্থ সংগ্রহর লগে ন মিলের।

  2. বন্দনা ভান্তে,আশা করি ভালো আছেন। নিম্নে দেখুন কি প্রশ্ন দার করানো হয়েছে। আমি হুবুৃহু তা তুলে ধরলাম।
    Amit Hill is with Parish Chakma and 2 others.
    জ্ঞান্তশান্ত ভান্তের “বৌদ্ধধর্মের সৃষ্টিতত্ত্ব” এবং আরিফ আজাদের “প্যারাডক্সিকাল সাজিদ” –
    __________________________
    -সম্প্রতি ধম্ম নিয়ে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে জ্ঞানশান্ত ভান্তের বেশকিছু লেখা আমার নজরে এসেছে। আমি উনার কাছে এর চাইতে যৌক্তিক ও বাস্তবভিত্তিক লেখা আশা করেছিলাম, যেহেতু উনি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। কিন্তু তিনি থেরবাদীদের উপন্যাস-সদৃশ গাল-গল্প “অর্থকথা” গুলো নিয়ে পড়ে আছেন। সেজন্য “বৌদ্ধধর্মের সৃষ্টিতত্ত্ব” নামে স্বর্গ- নরক- পরকলোক – দিব্যচক্ষু – দিব্যজ্ঞান নিয়ে একটা ভ্রম তৈরি করছেন। উনার উচিত ছিলো, বুদ্ধের শিক্ষাগুলো কতটা বাস্তবধর্মী ছিলো, কতটা সমসাময়িক ছিলো, কতটা সমাজবদ্ধ ছিলো তা তুলে ধরা। “অর্থকথা” উৎপত্তি এবং নির্দিষ্ট অর্থকথা লেখার পিছনে তার ইতিহাস ও উনার জানা উচিত আছে। প্রতিটি “অর্থকথা” রচিত হয়েছে তৎকালীন সেই নির্দিষ্ট দেশে নির্দিষ্ট সমাজব্যবস্থার প্রয়োজন অনুসারে। সেই নির্দিষ্ট সমাজে মানুষের চাহিদা ও বিশ্বাস কি ছিলো তার উপর ভিত্তি একধরনের ফিকশনাল ক্যারেক্টার ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল। তাই নানা বৌদ্ধ সংস্কৃতিতে আলাদা আলাদা গল্প / অর্থকথা প্রচলন আছে।
    – জ্ঞানশান্ত ভান্তে যে দিব্যচক্ষু ও দিব্যজ্ঞানকে অলৌকিক এবং অদৃশ্য শক্তি হিসেবে বলছেন, কিন্তু বুদ্ধ আদতে কি অলৌকিক ও অদৃশ্য শক্তির কথা বলেছেন? বুদ্ধ মানসিক দুটি অবস্থানের কথা বলেছিলেন – একটি লৌকিক এবং আরেকটি লোকত্ত্বর। অর্থাৎ লৌকিক জ্ঞান এবং লোকত্ত্বর জ্ঞানের পরিধি হলো; সাধারণ চোখে আমরা যাকিছু সুখ, দূঃখ, সত্য- অসত্য বলে দেখি- শুনি তাই লৌকিক জ্ঞান এবং যা আমরা সত্যিকারে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান চক্ষু দিয়ে অনুধাবন ও দর্শন করি তাই লোকত্ত্বর।
    – বুদ্ধ সৃষ্টিতত্ত্ব নামে কোন তত্ত্বই দেননি। আগাঞ্যা সূত্রে বলেছিলেন, প্রাপ্তির জন্য কেন মানুষের শ্রেণিভেদ উল্লেখযোগ্য নয়, বরং নিজের দক্ষতা ও কর্ম কিভাবে প্রাপ্তি নিয়ে আসে তা নিয়ে বলেছেন। সেজন্য একটি ধারণা দ্বার করিয়ে দিয়েছেন – কিভাবে এক বিশ্ব গড়ে উঠেছে- কিভাবে মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে শ্রেণীভেদাভেদ সৃষ্টি করল। এক সামাজিক স্ট্রাকচার গঠন হয় সেই সমাজের প্রয়োজনে, রাজারা নিয়ম নীতি আইন শাসন গড়ে দেন তাদের প্রয়োজনে; নিজেদের প্রয়োজনে তারা সবকিছুর বিধিবিধান বানিয়ে দেয়। এখানে সৃষ্টিকর্তা বা ঈশ্বরের কোন হাত নেই। তবুও মানুষ এসব শাসনবিধি সাধারণদের মাঝে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে- সৃষ্টিকর্তার দোহায় দেয়। বুদ্ধ এমনটি বলতে চেয়েছেন।
    – বর্তমান যুগ আধুনিক বিজ্ঞান যুগ। তৎকালীন ভারত সভ্যতার সমাজে যে গঠনপ্রকৃতি ও গঠনপ্রণালী ছিলো তা আজকের সমাজ ব্যবস্থা হতে যোজন যোজন ফারাক। ব্রাহ্মণ্যধর্মের সেই শ্রেণিভেদে ও এখন আঘাত এসেছে।
    – বুদ্ধের লৌকিক এবং লোকত্ত্বর জ্ঞান নিয়ে একজন ভালোভাবে বুঝলে বুঝতে পারে এখানে দৈবিক – অলৌকিক ও অদৃশ্য বলতে কিছু নেই। বরং পদার্থের যে ক্ষুদাদিক্ষুদ্র অংশকে চর্মচক্ষু দিয়ে দেখা যায় না, যা অন্যসব অণুবীক্ষণযন্ত্রের মাধ্যমে দেখা যায়। ভাবনা (meditation) এর মাধ্যমে মানুষের ব্রেনের সেই অংশটি কার্যকারি হয়। ফলে চারপাশে চলমান ক্ষুদ্রাদিক্ষুদ্র পদার্থের উপস্থিতি তের পাওয়া যায় । যা অনেকে অলৌকিকতা বলেন।
    – ভাবনাকালীন চিন্তাশক্তি যখন একাগ্র হয়, মন কোনকিছুতে বিচলিত হয় না তখন ষড়ন্দ্রিয়গুলো তীক্ষ্ণ, প্রখর ও শক্তিশালী হয়ে উঠে। এতোটা প্রখর ও তীক্ষ্ণ হয় যে ছোট শব্দ ও বড় হয়ে ধরা দেয়। তখন একজন যোগী ধীরে ধীরে গভীর ধ্যানে মগ্ন হন। সেসময় তার ষড়ন্দ্রিয়গুলো ছোট্ট বিচরণ ক্ষমতা ছাড়িয়ে ক্ষুদ্রাদিক্ষুদ্রকে জানতে পারার এক শক্তি হয়ে উঠে। বুদ্ধ এই দেখা এবং জানাকে ও লৌকিক বলেছেন, যা লোকত্ত্বর জ্ঞান নয়।
    – জ্ঞানশান্ত ভান্তের ধারাবাহিক “বৌদ্ধধম্মের সৃষ্টিতত্ত্ব” লেখাটি পড়ে আরিফ আজাদের “প্যারাডক্সিকাল সাজিদ” বইটির কথা মনে পড়ছে। উক্ত বইয়ে আরিফ আজাদ নানা প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছে যে সৃষ্টিকর্তা বলে কেউ আছে। ফলে একজন নাস্তিক সাদিককে সে সৃষ্টিকর্তার উপর আস্থা দিতে পেরেছে। অনুরুপ জ্ঞানশান্ত ভান্তে ও অর্থকথার মাধ্যমে বুঝাতে চেষ্টা করছেন আসলে স্বর্গ নরক ও পরলোক বলে আলাদা স্থান আছে! আমি উনার এই দর্শনের যৌক্তিক বিরোধিতা করছি।

    1. অনেক কষ্ট করে লিখেছে দেখছি। ভালো। এরা আসলে প্রকৃত বৌদ্ধ নয়, বরং বলা যায় Cherry picker. এরা তাদের চিন্তাধারার সাথে বৌদ্ধধর্মের যাকিছু মিলবে সেগুলোকে গ্রহণ করবে এবং বড় গলায় বলবে। কিন্তু যেগুলো তাদের চিন্তাধারার সাথে মিলবে না, সেগুলোকে অস্বীকার করবে। বলবে সেগুলো গালগল্প। গাঁজাখুরি গপ্পো। তাদের মতামত হচ্ছে, তোমার যাকিছু ভাল, আমি সেগুলো গ্রহণ করব, কিন্তু যেগুলো আমি পছন্দ করি না, আমার মতাদর্শের সাথে মেলে না সেগুলো আমি মানব না। এটাই হচ্ছে Cherry picking. এটা হচ্ছে শ্রদ্ধার অভাব, আস্থার অভাব, সম্যক দৃষ্টির অভাব। সোজা কথায় এরা হচ্ছে দীর্ঘনিকায়ের শ্রামণ্যফল সুত্রের উল্লেখিত নাস্তিক ধর্মীয়গুরু অজিত কেশকম্বলীর মতো, যে রাজা অজাতশত্রুকে বলেছিল- মহারাজ, দানের ফল নেই, যজ্ঞের ফল নেই, পূজার ফল নেই, ভালো বা খারাপ কর্মের ফল নেই, ইহলোক নেই, পরলোক নেই, এমন কেউ নেই যে ইহলোক পরলোককে স্বয়ং দেখেছে। বুদ্ধ পর্যন্ত তাদেরকে পরিবর্তন করতে পারেন নি। এই আমলের কথা আর কী বলব?

  3. বন্দনা ভান্তে,আশাকরি ভালো আছেন। একজনের মতামত নিম্নে হুবহু তুলে ধরলাম, কারন আমি এই বিষয়ে সন্দিহান, এই বিষয়ে আপনার অভিমত কি? একটু বুঝিয়ে দিলে ভালো হয়।

    ****থেরবাদীদের অনেকেই না বুঝে, শোনা কথায় দাবী করে যে… সম্রাট অশোকের আমলে যে দুঃশীল ভিক্ষুদের সংঘচ্যুত করা হয়, তারাই হলেন “মহাযানি সংঘ”। এটা ঐতিহাসিক মিথ্যা অপবাদ। কারণ সম্রাট অশোকের আমলে মহাযানিদের সাথে বিনয় কিংবা ধর্ম নিয়ে কোন সংঘর্ষ হয়নি, হয়েছিল স্থবিরদের মধ্যেকার। স্থবিরবাদীরা সেসময় নানাভাগে ভাগ হয়ে গেছিল, যেমন – বনভান্তের অনুপস্থিতে বন সংঘ কয়েকভাগে ভাগ হয়েছে ঠিক অনুরুপ।
    সেসময় স্থবিরবাদীদের মধ্যে কেউ কেউ প্রচার করে ” সর্বং সর্বদা আস্থি (সবকিছু সবসময় আছে)” আর কেউ কেউ প্রচার করে “না, সবকিছু সবসময় নাই”, এ নিয়ে মতাদর্শিক দ্বন্ড বাঁধে। বিভাজ্জ্যাবাদীনরা সংখ্যায় কম হওয়াতে সার্বস্থিবাদীরা বেশি এলাকা দখলে নেই। পরে সম্রাট অশোকের পৃষ্ঠপোষকতায় তৃতীয় সংগীতিতে বিবাদ একেবারে পরিষ্কার হয়ে স্থবিরবাদীরা ৩ ভাগে ভাগ হয়ে যায়; ভাস্তিপুত্রবাদী, বিভাজ্জ্যবাদী ও সার্বস্তিবাদী। থেরবাদের সৃষ্টি এই তিনটি হতে। তারা দাবী করেন বিভাজ্জ্যবাদীনরাই থেরবাদী।
    -ইতিহাস শিক্ষা দেয়, বন-বন ভেজালে দোষ পড়ে পার্বত্য ভিক্ষুদের এই অবস্থা হয়েছিল তৃতীয় সংগীতির সময়কালেও।
    -মহাযানিরা সেই দ্বিতীয় সংগীতিতে মহাসংঘ নিয়ে বেড়িয়ে গিয়েছিল, সেপর আর কাউকে ডিস্টার্ব করেনি।

  4. ভান্তেকে বন্দনা। কোন পূণ্যবানি লোক সারাজীবন পূণ্য করে মৃত্যুর সময় যদি কোন একটি দূর্ঘটনার নিমিত্তে বা পূর্ব জন্মের কর্মফলে হত্যাজনিত মৃত্যু ঘটে এবং উক্ত ব্যক্তি মৃত্যুর পূর্বে যদি রাগচিত্ত নিয়ে মৃত্যুবরন করে তবে সে সাপকুলে জন্মগ্রহন করে তবে তার পূন্যফলগুলো সে কখন ভোগ করবে তবে এটা কি তার অনাগত জন্মের পারমির জন্য জমা হয়ে থাকবে। আরেকটা প্রশ্ন না করে পারছি না আর তা হলো আমাদের মৃত্যুর পর আমরা যদি মনুষ্যকুলে জন্মগ্রহণ করি তবে বৌদ্ধ কুলে জন্মগ্রহণ করব তার গ্যারান্টি কি? সব জ্ঞানী ভান্তেরা আমদের নির্বাণের জন্য দান, শীল, ভাবনা করতে বলে পারমী পূরনের জন্য, আমরা যদি বৌদ্ধ কুলে জন্মগ্রহণ না করি তবে কিভাবে ভবিষ্যৎ জন্মে মার্গ দর্শন সম্ভব? আর দাদা অষ্টশীলের ৮নম্বর শীল উচ্চ শয়ানা মহাশয়ানার উত্তর দিতে হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন। জানি আপনাকে এভাবে প্রশ্ন করে বিব্রত বা বিরক্তিকর অবস্থার মধ্যে ফেলছি। এজন্য ক্ষমা করবেন।

    1. দুঃখিত, উত্তর দিতে দেরী হলো বলে। প্রথম উত্তরে বলা যায়, পুণ্যফলগুলো সাধারণত তার পরবর্তী জন্মগুলোতে ফল দিয়ে থাকে। যেমন ধর্মপদের কাহিনীতে আছে, রাণি মল্লিকাদেবী খুব পুণ্যবান উপাসিকা হলেও তার সামান্য পাপকর্মের জন্য আফসোস করে মারা গিয়ে নরকে জন্মেছিল। কিন্তু সাত দিন পরেই নরক থেকে উদ্ধার পেয়ে স্বর্গে (বোধহয় তুষিত স্বর্গে) জন্মেছে।

      দ্বিতীয় প্রশ্নটা হচ্ছে, বৌদ্ধ কুলে জন্মানোর গ্যারান্টি আছে আপনার কাছেই। আপনি যদি বৌদ্ধকুলকে পছন্দ করেন, তাহলে বৌদ্ধকুলে জন্মাবেন। অবৌদ্ধ কুলকে পছন্দ করলে অবৌদ্ধ কুলে জন্মাবেন। পালিতে একটা কথা আছে না, চিত্তেন নিযতি লোকো। জগত চিত্ত দ্বারাই পরিচালিত হয়। আপনার মন যেদিকে, ঝোঁক যেদিকে, আগ্রহ যেদিকে, সেদিকেই যাবেন। যেমন দীর্ঘনিকায়ের সক্কপঞ্হ সুত্রে তিনজন ভিক্ষুর কথা আছে যারা ছিল ধ্যান লাভী, তাদের শীলও পরিপূর্ণ ছিল। কিন্তু তারা মারা যাওয়ার পরে জন্মেছিল চতুর্মহারাজিক স্বর্গের গন্ধর্ব দেবতা হিসেবে। অর্থকথা বলছে তারা নাকি আগেও সেখানে দীর্ঘকাল ধরে বসবাস করেছিল। তাই সেই স্থানের টানে আপনাআপনিই তারা সেখানে জন্মেছিল। কিন্তু ইউরোপ আমেরিকার অনেকেই আছে যারা খ্রিস্টান বা মুসলিম হয়েও বৌদ্ধধর্মের খোঁজ পেয়েই সরাসরি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছে। তারা অবৌদ্ধকুলে জন্মগ্রহণ করেও খুব সুন্দরভাবে বৌদ্ধধর্মকে খুঁজে নিয়েছে। আমি লোকনাথ ভিক্ষুর কথা একবার লিখেছিলাম। আপনি তার ব্যাপারে পড়তে পারেন এখানে: http://gansanta.org/fbposts/2018/08/25/170/

  5. বন্দনা ভান্তে,কেমন আছেন,ইদানিং আপনাকে ফেসবুকে পাচ্ছিনা, আপনাকে পেলে আমরা খুশি ।

    1. মংশাই বাবু, আপনার মন্তব্য জেনে ভালো লাগল। তবে আমি ভিক্ষু মানুষ। তাই ফেসবুকটা আমার জন্য খুব সুবিধার জায়গা নয়। তার চেয়ে আপনমনে এখানেই মাঝে মধ্যে লেখালেখি করি। ভালো থাকবেন। সময় পেলে মাঝে মধ্যে ঘুরে যাবেন এই সাইট থেকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *