আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

সুসিম সুত্র: অর্হৎ হলেই যে সবকিছু পারবে এমন নয়

মায়ানমারে বিদর্শন ভাবনা খুব জনপ্রিয়। সেই বিদর্শনেরও আবার নানা পদ্ধতি বের হয়েছে। মহাসি পদ্ধতি, মোগোক পদ্ধতি, সুনলুন পদ্ধতি, গোয়েঙ্কা পদ্ধতি, ইত্যাদি আরো কত কী আছে। এসব পদ্ধতিতে কেবল বিদর্শন ভাবনার উপরে জোর দেয়া হয়। আমার কেন জানি এসব বিদর্শন ভাবনাকেন্দ্রে যাওয়ার উৎসাহ জাগে না। কিন্তু একদিন আমাদের ডিপ্লোমা ক্লাসে এক সেয়ামা বা মহিলা শিক্ষক আমাদেরকে পড়ানোর সময়ে বললেন, যখন সাধারণ লোক কোনো কিছু দেখে, তখন সে দেখে কোনো পুরুষ অথবা নারীকে, অথবা পশুপাখি বা কোনো জীবকে। কিন্তু বিদর্শন ভাবনাকারী সেটাকে দেখে কেবল দেহ ও মনের নিরন্তর প্রবাহ হিসেবে। দেহ হচ্ছে অসংখ্য কণার সমষ্টি, যেগুলোকে বলা হয় রূপকলাপ। এই কণাগুলো আমাদের দেহে উৎপন্ন হয়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে খুব খুব দ্রুতগতিতে। কিন্তু সেগুলোকে আমরা খালিচোখে দেখতে পাই না বলে মনে করি আমাদের দেহটা নিরেট ও আস্ত একটা দেহ।

আমার মনে প্রশ্ন জাগল, বিদর্শনে কি ভাবনাকারীরা এই কণাগুলোকে দেখে থাকে? মনে তো হয় না। শক্তিশালী ধ্যান লাভ না করলে চোখ বন্ধ করে নিজের দেহকেও দেখা যায় না। সেখানে দেহের কণাগুলোকে দেখা তো আরো কঠিন হবে। আজ সকালে বিজয়ধম্মা ভান্তের সাথে এব্যাপারে একটু কথা বললাম। তিনি বললেন, মার্গফল পেতে হলে যে রূপকলাপকে দেখতেই হবে সেরকম তো হওয়ার কথা নয়। তিনি সুসিম সুত্রের কথা উল্লেখ করলেন। সেটা নাকি এখানে বিএ ফার্স্ট ইয়ারে পড়ানো হয়ে থাকে। সেখানে বুদ্ধ উল্লেখ করেছেন যে, ধ্যানলাভ না করে শুধু বিদর্শন ভাবনা দিয়েও অর্হৎ হওয়া যায়। তবে তাতে বিভিন্ন অলৌকিক শক্তিগুলো লাভ হয় না, এই হচ্ছে তফাত।

আমি একটু খুঁজে দেখলাম সুত্রটাকে। সেটা আছে সংযুক্ত নিকায়ের নিদানবর্গে 1। সুত্রটি হচ্ছে এরকম:

বুদ্ধ একসময় রাজগৃহের বাঁশবনে অবস্থান করছিলেন। সেই সময় বুদ্ধ ও ভিক্ষুসঙ্ঘ খুব জনগণের সম্মান ও দান পেতেন। তাদের চীবর, খাদ্য, বাসস্থান ও অন্যান্য জিনিসের কোনো ঘাটতি ছিল না। বুদ্ধ ও ভিক্ষুসঙ্ঘ ছিলেন জনগণের প্রিয়পাত্র। তাদেরকে দেখলেই লোকজন শ্রদ্ধাভরে হাতি ঘোড়া ইত্যাদি থেকে নেমে রাস্তা করে দিত, কাঁধ থেকে কাপড় নামিয়ে সম্মান দেখাত 2, আসন থেকে উঠে বন্দনা জানাত। অন্যান্য সন্ন্যাসীরা কিন্তু তখন অতটা সম্মান ও দান পেত না।

এদের মধ্যে ছিল সুসিম নামের একজন ভবঘুরে সন্ন্যাসী। সে ছিল বেদশাস্ত্রে পণ্ডিত। তার সঙ্গীসাথীও ছিল অনেক। তারাও রাজগৃহে অবস্থান করছিল। তাদের নাকি মনে হয়েছিল, এই শ্রমণ গৌতমের কিন্তু জন্ম বা বংশের কারণে এত নামযশ হচ্ছে না। বরং সে হচ্ছে একজন সেরা কবি। সে সুন্দর সুন্দর কবিতা রচনা করে তার শিষ্যদেরকে সেগুলো শিক্ষা দেয়। তারাও সেগুলো শিখে নিয়ে লোকজনকে বলে বেড়ায়। আর লোকজনের সেগুলো পছন্দ হয়। তারা খুশি হয়ে শ্রমণ গৌতম ও তার শিষ্যদেরকে ভালো ভালো দান দেয়। আমরা যদি শ্রমণ গৌতম থেকে সামান্যও শিখতে পারি তাহলে সেটার সাথে আমাদের ধর্মমত মিশিয়ে লোকজনকে শোনাব। এতে আমরা আরো ভালো ভালো দান পাব। আমাদের মধ্যে এমন মেধাবী কে আছে যে শ্রমণ গৌতমের কাছে প্রব্রজ্যা নিয়ে খুব দ্রুত তার ধর্মকে শিখে নিতে পারবে? তারা ভেবেচিন্তে সুসিমকেই একাজে উপযুক্ত মনে করল।

তাই তারা একদিন সুসিমকে বলল, বন্ধু সুসিম, তুমি শ্রমণ গৌতমের কাছে প্রব্রজ্যা নাও। তার কাছে ধর্মশিক্ষা করে পরে আমাদেরকে শিক্ষা দিতে পারবে। আমরা সেই ধর্ম শিক্ষা করে গৃহী লোকজনকে দেশনা করব। তখন আমরাও শ্রমণ গৌতমের মতো মহা সম্মান ও প্রচুর দান পাব। সোজা কথায়, বুদ্ধের ধর্মটাকে চুরি করে এনে নিজেদের মতো করে প্রচার করা।

সুসিম দেখল আইডিয়াটা মন্দ নয়। সে ভেবে দেখল কার কাছে গেলে ভালো হবে। বুদ্ধের কাছে অসময়ে যাওয়াটা ভালো নয়। সারিপুত্র, মোগ্গল্লায়ন ইত্যাদি অনেক বড় বড় শিষ্য আছেন। তাদের কাছে গেলেও তার উদ্দেশ্য কতটুকু সার্থক হবে কে জানে। আনন্দ হচ্ছেন ত্রিপিটকধর, তার কাছে গেলেই দ্রুত শেখা যাবে। এই ভেবে সে গেল আনন্দ ভান্তের কাছে।  আনন্দ ভান্তে ভাবলেন, এই অন্য ধর্মাবলম্বীরা নিজেই এক একজন বুদ্ধ বলে নিজেকে জাহির করে বেড়ায়। এখানে প্রব্রজ্যা নিলে পরে হয়তো উল্টো আমাদেরকেই ক্ষতি করার চেষ্টা করতে পারে। একে বরং বুদ্ধের কাছে নিয়ে যাই। কোনো অসৎ উদ্দেশ্য থাকলে বুদ্ধ সেটা বুঝতে পারবেন।

তাই আনন্দ ভান্তে তাকে নিয়ে গেলেন বুদ্ধের কাছে। বুদ্ধকে জানালেন, ‘ভান্তে, এই সুসিম পরিব্রাজক বলছে সে নাকি আমাদের কাছে প্রব্রজ্যা নিতে চায়।’ বুদ্ধের মনে অনেকগুলো চিন্তা খেলে গেল। এই সন্ন্যাসীরা নিজেই এক একজন বুদ্ধ বলে জাহির করে বেড়ায়। এখন এখানে প্রব্রজ্যা নিতে চায়। সে কেন এরকম বলছে? সে কি আমার প্রতি প্রসন্ন বলে এরকম বলছে? নাকি আমার শিষ্যদের প্রতি প্রসন্ন বলে এরকম বলছে? নাকি আমার অথবা আমার শিষ্যদের ধর্মকথায় প্রসন্ন বলে এরকম বলছে?

বুদ্ধ তার সর্বজ্ঞতা জ্ঞানে দেখলেন এই সন্ন্যাসীর এসবের কোনোটাই নেই। সে কেবল ধর্মকে চুরি করার উদ্দেশ্যে প্রব্রজ্যা নিতে এসেছে। আচ্ছা, এর আগমন তাহলে অপরিশুদ্ধ। ভালো কথা, অবশেষে কী ঘটবে? বুদ্ধ দেখলেন, যদিও এ ধর্মকে চুরি করার উদ্দেশ্যে প্রব্রজ্যা নিয়েছে, কিন্তু কয়েক দিন প্রচেষ্টার পরে অর্হত্ব লাভ করবে। তাই তিনি প্রব্রজ্যার অনুমতি দিলেন। এভাবে সুসিম তখন পরিব্রাজক বা ভবঘুরে সন্ন্যাসী থেকে ভিক্ষু হয়ে গেল।

তখন কয়েকজন ভিক্ষু বুদ্ধের কাছ থেকে ভাবনার নিয়ম জেনে নিয়ে বর্ষার তিন মাস কঠোর ভাবনা করে  অর্হত্ব লাভ করেছিল। বর্ষাবাস শেষে তারা বুদ্ধের কাছে গিয়ে তাদের অর্হত্ব প্রকাশ করছিল এভাবে, ‘ভান্তে, আমার জন্ম ক্ষয় হয়েছে, প্রব্রজ্যা সার্থক হয়েছে, যা করার করা হয়ে গেছে, এরপর আর করার কিছু নেই বলে জেনে গেছি।’ সুসিম নাকি চুপি চুপি বিভিন্ন ভিক্ষুদের কাছাকাছি গিয়ে শুনত কে কী আলাপ করছে। এভাবে সে শুনল সেই ভিক্ষুদের অর্হত্ব লাভের কথা। তার মনে হলো এই অর্হত্বটা মনে হয় এই ধর্মের মূল সার বা সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস। সেটা কীভাবে পাওয়া যায় সেবিষয়ে তাদের কাছে জিজ্ঞেস করতে হবে। তাই সে সেই ভিক্ষুদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ভান্তেগণ, আপনারা নাকি বুদ্ধের কাছে গিয়ে এভাবে এভাবে বলেছেন?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ, বন্ধু।’

– তাহলে তো ভান্তেগণ, আপনারা বহু ধরনের ঋদ্ধি বা অলৌকিক শক্তি আয়ত্ব করেছেন। আপনারা একজন থেকে বহুজন হতে পারেন, বহুজন থেকে আবার একজন হতে পারেন। চোখের পলকে আবির্ভূত হতে পারেন, আবার অদৃশ্য হয়ে যেতে পারেন। দেয়াল, পাহাড় পর্বত ভেদ করে যেতে পারেন অবলীলায়। মাটিতে ডুব দিতে পারেন, পানির উপরে হাঁটতে পারেন, বসে বসেই আকাশে উড়ে যেতে পারেন। এমনকি চন্দ্রসূর্যের গায়ে পর্যন্ত হাত বুলাতে পারেন। তাই নয় কি?

কিন্তু সেই ভিক্ষুরা কেবল বিদর্শন ভাবনা করে অর্হৎ হয়েছে। তাদের কোনো ধ্যানসমাধি ছিল না। তাই অর্হৎ হলেও স্বীকার করতেই হলো যে তারা সেরকম পারে না। তারা বলল, আমরা তো সেরকম পারি না, বন্ধু।

– আচ্ছা, তা নাহলেও আপনারা নিশ্চয়ই দিব্যকানে কাছে ও দূরের, দিব্য ও মনুষ্য উভয় ধরনের শব্দ শুনতে পান? – সেরকম তো পারি না বন্ধু।

– আচ্ছা, তা নাহলেও আপনারা নিশ্চয়ই অন্যজনের মনের খবর জানতে পারেন? কে কী ভাবছে তা জানতে পারেন? – সেরকমও পারি না, বন্ধু।

– তা নাহলেও আপনারা নিশ্চয়ই আপনাদের অতীত জন্মগুলোর কথা স্মরণ করতে পারেন। কোন জন্মে কোন নাম ছিল, কোন বংশে জন্মেছিলেন, চেহারা কেমন ছিল, খাবার দাবার কেমন ছিল, কত বছর বেঁচেছিলেন, সেখান থেকে মরে গিয়ে কোথায় জন্মেছিলেন ইত্যাদি সবই স্মরণ করতে পারেন নিশ্চয়ই? – সেরকম তো পারি না, বন্ধু।

– তা নাহলেও আপনারা নিশ্চয়ই দিব্যচোখে দেখতে পারেন কে মারা গিয়ে কোথায় জন্মাচ্ছে। পাপকর্ম করে নরকে জন্মাচ্ছে, পুণ্যকর্ম করে স্বর্গে জন্মাচ্ছে। এভাবে বিশুদ্ধ দিব্যচোখে প্রাণিদেরকে মরতে ও পুনর্জন্ম হতে দেখেন? – সেরকম তো পারি না, বন্ধু।

– তাহলে আপনারা অরূপ ধ্যানে মগ্ন হয়ে অবস্থান করেন? – সেরকমও পারি না, বন্ধু।

– আপনারা বলছেন আপনারা মুক্ত, অথচ এই বিষয়গুলোর কোনোটাই আপনারা পারেন না। সেটা কোন ধরনের কথা হলো তাহলে? – বন্ধু সুসিম, আমরা হলাম প্রজ্ঞাবিমুক্ত।

কিন্তু সুসিম তাদের এই এককথার উত্তর বুঝতে পারল না। এখানে প্রজ্ঞাবিমুক্ত মানে হচ্ছে প্রজ্ঞা দ্বারা মুক্ত হয়েছেন এমন। তারা কোনো ধ্যান লাভ করেন নি। তারা শুধু বিদর্শন ভাবনা করে দেহমনের অনিত্যতাকে প্রজ্ঞা দ্বারা দর্শন করে ক্লেশমুক্ত অর্হৎ হয়েছেন। সেটা সুসিমের বুঝার কথা নয়। তাই সে আরো একটু বুঝিয়ে বলতে বলল। কিন্তু সেই ভিক্ষুদের মনে হলো, একে আমরা বুঝাতে পারব না। বরং বুদ্ধের কাছে গিয়ে বলে সন্দেহ দূর করুক। এই উদ্দেশ্যে তারা বললেন, বন্ধু সুসিম, তুমি বুঝতে পার বা না পার, আমরা হলাম প্রজ্ঞাবিমুক্ত।

তাদের কাছে কোনো সদুত্তর না পেয়ে তখন সুসিম গেল বুদ্ধের কাছে। সে ব্যাপারটা বুদ্ধকে খুলে বলল। বুদ্ধ বললেন, ‘সুসিম, প্রথমে ধর্মস্থিতি জ্ঞান আসে। পরে নির্বাণের জ্ঞান আসে।’

– ভান্তে, আপনার এই কথাটা আমি বুঝতে পারছি না। আরেকটু বুঝিয়ে বললে ভালো হয়, যাতে আমি বুঝতে পারি। – সুসিম, তুমি বুঝতে পার বা না পার, প্রথমে ধর্মস্থিতি জ্ঞান আসে। পরে আসে নির্বাণের জ্ঞান।

এখানে ধর্ম মানে হচ্ছে সৃষ্টিজগতের যেকোনো জিনিস। সেটা জীব হোক বা জড় হোক, দেহ হোক বা মন হোক যেকোনো জিনিস। সেটার অনিত্য, দুঃখ ও অনাত্মমূলক স্থিতি বা স্বভাব হচ্ছে ধর্মস্থিতি। সেই স্বভাবে জ্ঞান হচ্ছে ধর্মস্থিতি জ্ঞান, যেটা হচ্ছে বিদর্শন জ্ঞান। এখানে বুদ্ধের উক্তির মর্মার্থ হচ্ছে এরকম- মার্গ বা ফল কিন্তু ধ্যানসমাধি থেকে আসে না, ধ্যানসমাধির ফলে হয় না। বিদর্শন থেকেই আসে মার্গ বা ফল। বিদর্শনের ফলে আসে এই মার্গ বা ফল। সেটা তুমি জান বা না জান, ব্যাপারটা এরকমই হয়। প্রথমে বিদর্শন জ্ঞান আসে, এরপরে হয় নির্বাণের জ্ঞান।

এরপর বুদ্ধ সুসিমকে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলেন। দেহ ও মন হচ্ছে সবসময় পরিবর্তনশীল, অনিত্য। যেটা অনিত্য, সেটা দুঃখজনক। যেটা অনিত্য, দুঃখজনক ও বিলয়ধর্মী, সেটাকে তো আর বলা যায় না, এটা আমার, এই হচ্ছি আমি, এই হচ্ছে আমার আত্মা।

একারণে দেহ বা মন সেটা অতীত হোক, অনাগত হোক, অথবা বর্তমানের হোক; অভ্যন্তরীণ অথবা বাহ্যিক হোক, সুক্ষ্ম অথবা স্থুল হোক, হীন বা উত্তম হোক, দূরে অথবা কাছে হোক, সকল দেহ ও মনকে সম্যক প্রজ্ঞা দ্বারা যথাযথভাবে দেখতে হবে যে, এটা আমার নয়, এটা আমি নই, এটা আমার আত্মা নয়।

এভাবে দেখলে শিক্ষিত আর্যশিষ্যরা দেহমনের প্রতি নিরুৎসুক হয়, বিরাগ জন্মে, বিরাগ থেকে আসে বিমুক্তি। বিমুক্ত হলে বিমুক্ত হয়েছি বলে জ্ঞান জাগে। তারা তখন নিজেরাই প্রকৃতভাবে জানে যে, জন্ম ক্ষয় হয়েছে, প্রব্রজ্যা সার্থক হয়েছে, যা করার করা হয়ে গেছে, এরপর আর করার কিছু নেই।

ধর্মদেশনা শেষে সুসিম সেখানেই অর্হত্ব লাভ করল। প্রতীত্যসমুৎপাদ বা কারণসাপেক্ষ উৎপত্তিকে সে এবার যেন পরিষ্কারভাবে নিজের চোখে দেখতে পেল। এবার বুদ্ধ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, বার্ধক্য ও মরণ আসে জন্মের কারণে। জন্মের নিরোধে বার্ধক্য ও মরণ নিরোধ হয়। সেটা দেখতে পাও সুসিম? – হ্যাঁ ভান্তে।

জন্ম হয় জীবনের কারণে। জীবনের নিরোধে জন্মের নিরোধ হয়। সেটা দেখতে পাও সুসিম? – হ্যাঁ ভান্তে।

জীবন হয় দৃঢ়ভাবে ধরে থাকার কারণে। দৃঢ়ভাবে ধরে থাকাটা নিরোধ হলে জীবনও নিরোধ হয়।  সেটা দেখতে পাও সুসিম? – হ্যাঁ ভান্তে।

দৃঢ়ভাবে ধরে থাকাটা হয় তৃষ্ণার কারণে। তৃষ্ণার নিরোধ হলে দৃঢ়ভাবে ধরে থাকাটা নিরোধ হয়। সেটা দেখতে পাও সুসিম? – হ্যাঁ ভান্তে।

তৃষ্ণা আসে অনুভূতির কারণে। অনুভূতি নিরোধ হলে তৃষ্ণাও নিরোধ হয়। সেটা দেখতে পাও সুসিম? – হ্যাঁ ভান্তে।

অনুভূতি জাগে সংস্পর্শে আসার কারণে। সংস্পর্শ নিরোধ হলে অনুভূতি নিরোধ হয়। সেটা দেখতে পাও সুসিম? – হ্যাঁ ভান্তে।

সংস্পর্শে আসে ছয়টি ইন্দ্রিয়ের কারণে। ছয় ইন্দ্রিয় নিরোধ হলে সংস্পর্শ নিরোধ হয়। সেটা দেখতে পাও সুসিম? – হ্যাঁ ভান্তে।

ছয়টি ইন্দ্রিয় হয় দেহমনের কারণে। দেহমন নিরোধ হলে ছয়টি ইন্দ্রিয় নিরোধ হয়। সেটা দেখতে পাও সুসিম? – হ্যাঁ ভান্তে।

দেহমনের সৃষ্টি হয় মনের কারণে। মনের নিরোধ হলে দেহমনের সৃষ্টি হওয়াটা নিরোধ হয়। সেটা দেখতে পাও সুসিম? – হ্যাঁ ভান্তে।

মন সৃষ্টি হয় সংস্কার বা কর্মের কারণে। সংস্কারের নিরোধ হলে মনের নিরোধ হয়। সেটা দেখতে পাও সুসিম? – হ্যাঁ ভান্তে।

সংস্কার বা কর্ম সৃষ্টি হয় অবিদ্যার কারণে। অবিদ্যার নিরোধ হলে সংস্কার বা কর্ম নিরোধ হয়। সেটা দেখতে পাও সুসিম? – হ্যাঁ, ভান্তে।

এখন সুসিম, সেই ভিক্ষুরা হচ্ছে বিশুদ্ধ বিদর্শন ভাবনাকারী। অথচ তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছ তাদের মধ্যে বিভিন্ন অলৌকিক শক্তি আছে কিনা। দিব্যকানে শুনতে পারে কিনা। অন্যজনের মনের খবর জানতে পারে কিনা। নিজের পূর্বজন্মগুলো দেখতে পারে কিনা। কে মরে গিয়ে কোথায় জন্মাচ্ছে সেটা দিব্যচোখে দেখতে পারে কিনা। অরূপ ধ্যানে মগ্ন থাকতে পারে কিনা। তারা বলেছে তারা এসব পারে না। তুমিও তো এখন তাদের মতো বিশুদ্ধ বিদর্শনজ্ঞানে অর্হৎ হয়েছ। তুমি কি সেগুলো পার? – সেরকম তো পারি না, ভান্তে।

এখন সুসিম, তুমি বলছ তুমি [প্রতীত্যসমুৎপাদ এবং নির্বাণকে] জান এবং দেখ। অন্যদিকে তুমি বলছ এই [বিবিধ অলৌকিক শক্তি, দিব্যকান, পূর্বজন্ম স্মরণ, দিব্যচোখ, অরূপধ্যান] বিষয়গুলো তুমি পার না। সেটা কোন ধরনের কথা হলো তাহলে? বুদ্ধের প্রশ্নে সুসীম নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করল। সে কথা দিল, এবার থেকে সে সংযত হয়ে থাকবে। বুদ্ধ বললেন, ভুল স্বীকার করে যথাযথভাবে সংযত হলে তার শ্রীবৃদ্ধিই ঘটে থাকে।

কাজেই, সব অর্হৎই যে মনের খবর বলে দিতে পারবে সেরকম বলা যায় না। যদি তারা ধ্যান লাভ করে তাহলে পারবে, কিন্তু ধ্যান লাভ না করলে সেটা সম্ভব নয়।

Notes:

  1. সংযুত্তনিকায=>নিদানৰগ্গপাল়ি=>১. নিদানসংযুত্তং=>৭. মহাৰগ্গো=> ১০. সুসিমসুত্তং
  2. অর্থাৎ কাপড় দিয়ে উভয় কাঁধ ঢাকা থাকলে ডানকাঁধ থেকে কাপড় নামিয়ে নিত, অথবা উভয় কাঁধ থেকে কাপড় নামিয়ে নিত। সেটা নাকি তখনকার দিনে সম্মান দেখানোর আদবকায়দা ছিল। বর্তমানেও ভিক্ষুরা কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ ভিক্ষুকে বন্দনা অথবা সম্মান জানাতে গিয়ে এককাঁধ অনাবৃত করে বা চীবর একাংশ করে থাকে। সেটা হচ্ছে সেই ২৬০০ বছর আগেকার সম্মান দেখানোর নিয়ম, যা বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত ভিক্ষুসঙ্ঘের মধ্যে গুরুশিষ্য পরম্পরায় প্রচলিত হয়ে আসছে।

10 thoughts on “সুসিম সুত্র: অর্হৎ হলেই যে সবকিছু পারবে এমন নয়

  1. Vante,
    Thanks for uploading susim sutta and its explanation. At present I am reading the essays of your website. Very interesting and written in a scientific and logical way. wish your success in the study of Buddhism in ITBMU.

  2. বন্দনা ভান্তে, বার্মায় শেয়ানা (বালায়-মেশিলা) কখন, কিভাবে চালু হয়েছিল ? লিখিত আকারে দেশনা করার জন্য করজোরে বন্দনা করছি ।

  3. ভান্তে, বন্দনা। অর্হত্ত্ব মার্গফল লাভ করতে হলে কি পূর্বের মার্গফলগুলো লাভ করা আবশ্যক? পূর্বের মার্গফলগুলো লাভ না করেই কেবলমাত্র অর্হত্ত্ব মার্গ চিত্ত এবং অর্হত্ত্ব ফল চিত্ত উৎপন্ন হওয়া কি সম্ভব?

      1. শ্রদ্ধেয় ভান্তেকে করজোড়ে বন্দনা নিবেদন করছি। আপনার ধর্ম জ্ঞানের ভান্ডার দেখে অভিভূত। আমি মনে মনে এমন একজনকে খুঁজছিলাম যিনি আমার কিছু অজানা প্রশ্নের উত্তর দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন। আমি কোন নাস্তিক কিংবা অধার্মিক নই শুধু মাত্র নিজের মনের মধ্যে উকি দেয়া প্রশ্ন নিজে জেনে নিজে বুঝে অন্যদের যাতে শুদ্ধ এবং সঠিকভাবে বুদ্ধ ধর্ম প্রচার করতে পারি, সবধরনের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি সেজন্যে । আমি গত দুই কিংবা তিন বর্ষাবাষ থেকে বেসরকারী চাকরির পাশাপাশি অষ্টশীল পালন করছি। আমার মধ্যে হঠাৎ করে বুদ্ধ ধর্ম জানার আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে আমি রাজা মিলিন্দ এবং ভান্তে নাগসেনের প্রশ্ন এবং উত্তর বইটি পড়ছি। ভাষা কঠিনতার কারণে কিছু বুঝছি কিছু বুঝতে পারছিনা। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমার কিছু প্রশ্নের উত্তর পেলে খুশি হতাম।
        ১। আমি অনেক ভান্তে কিংবা দেশককে বলতে শুনি মানুষ মৃত্যুর সাথে সাথে তার অতীত জন্মের কর্মের হেতু অনুসারে সে সাথে সাথেই (সেকেন্ডের মধ্যে সম্ভবত) অন্য যোনিতে জন্মলাভ করে সেটা মানুষ কিংবা তির্যক প্রাণী যাই হোক। কিন্তু আমার প্রশ্ন যদি এই কথা সত্য হয় তবে মানুষ মৃত্যুর পরে (তার কর্মের হেতুতে) কখন নরক যন্ত্রনা ভোগ করে কিংবা কখন স্বর্গে সুখ ভোগ করে। আমরা যতটুকু জানি নরক কুলের ১ দিন মানে মানবজাতির ১ লক্ষ বছরের সমান।
        ২। অস্টশীলের ৮ নাম্বার শীল উচ্চা শয়না মোহা শয়ানা মানে খাট, সোফা, চেয়ার চৌকি (১’-০” উচ্চতায়), পিড়া কিংবা যেকোন উচু স্থানে আরাম আয়েশের মধ্যে অবস্থান না করার জন্য বলা হয়েছে কিনা? আমার জানা মতে উচ্চশয়ানাউচ্চ শয়ানা মহাশয়ানা মানে অতি আরাম আয়েশের সহিত (নরম গদি কিংবা নরম আরামদায়ক মেট্রেস বা বেডে) না বসা বা না শোয়ার কথা বলা হয়েছে যার কারণে ব্রম্মচর্চা বা শীল প্রতিপালনে অন্তরায় সৃষ্টি না হয়।
        ৩। বুদ্ধকে উৎসর্গিত বুদ্ধপূজা (সোয়াইং তরিতরকারী, ফলমূল ইত্যাদি) তীর্যক প্রাণীদেরকে দেয়া যায় কিনা? অনেক আগে শুনেছিলাম পূজ্য বনভান্তে নাকি বলেছিলেন তীর্যকপ্রাণীদেরকে বুদ্ধপূজার দানীয় বস্তু খেতে দিলে নাকি ওরা আর তীর্যকপ্রাণী থেকে আর কখনো মুক্ত হতে পারবে না।

  4. vante, gansanta.org/fbposts ei link er lekha gula pora geleo gansanta.org page er lekha 4ta te dhukle error 404-not found dekhacche…

      1. Bhanthe…
        Could you pls give me the android app project of Tipitaka app you developed. IDo you remember that I asked the same help of you when you doing the app.
        thank you..
        I am a Srilankan monk.
        Ven Kapilawansa.

  5. প্রণাম আমার আলোর পথ 🙏।আজ প্রথম সুসিম সূত্র পড়ার সুযোগ করে দিলেন ভান্তে। আপনার নতুন লেখা কখন বের হবে সবসময় আপনার সাইটে চেক করি। আশা করি আমাদের জন্য দয়া করে আপনার মূল্যবান লেখাগুলো সবসময় লিখে যাবেন।

  6. সাধু৩ ভান্তে, আজ বিদর্শন নিয়ে নতুন কিছু জানলাম।
    সুসিম সূত্রটিন এই প্রথম জানলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *