আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

অভিধর্ম এবং রাগ করার তিনটা গল্প

আমাদের অভিধর্মের ক্লাস করাচ্ছেন ড. ইন্দক ভান্তে। অভিধর্মার্থ সংগ্রহ বইটা পড়ানো শুরু করেছেন। আজকে পড়ালেন অকুশল চিত্তগুলোর ব্যাপারে। লোভ, দ্বেষ ও মোহমূলক চিত্তগুলো ব্যাখ্যা করে দিলেন। আপনাদের কাছে সেগুলো নিরস মনে হবে। তাই সেগুলো নিয়ে লিখব না। তবে দ্বেষমূলক চিত্তের আলোচনা করতে গিয়ে একটা বাস্তব উদাহরণ দিলেন। সেটা একটু বলি।

মায়ানমারে গ্রামাঞ্চলে পুরুষেরা ক্ষেতখামারে কাজ করতে যায়, সন্ধ্যায় ফিরে আসে। কিন্তু ফেরার পথে তারা মদের দোকানে ঢুঁ মেরে আসে। সেখানে দুয়েক বোতল  টেনে তবেই ঘরে ফেরে। কিন্তু বাড়ি ফিরে দেখে গিন্নী রান্না করেছে কেবল শাকসবজি। তা দেখে তার মাথায় আগুন চড়ে যায়। রেগেমেগে সে তার বউকে পেটাতে থাকে। আর যদি বউকে মারতে ভয় পায় তো থালা বাসন আছড়াতে থাকে মাটিতে। এই হচ্ছে দ্বেষমূলক চিত্তের কাজ। তখন তার মধ্যে যতগুলো দ্বেষমূলক চিত্ত উৎপন্ন হয়ে বিলীন হয়ে যায় তা গণনাতীত। সেগুলোর একটা চিত্তই তাকে সুযোগ পেলে মরণের পরে নরকে নিয়ে যেতে পারে। তাই সাধু সাবধান।

সেয়াদ আরো দুটো ঘটনার কথা বললেন। সেগুলো ৩০/৪০ বছর আগের ঘটনা। তিনি তখন সাগাইং পাহাড়ের কোলে এক বিহারে পরিয়ত্তি শিক্ষা করছিলেন। কাছেই এক গ্রামে এক পরিবার ছিল। সেই পরিবারে ছিল ৮০ বছরের এক বুড়ো এবং তার জামাই। একদিন কীকারণে জানি দুজনের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হলো। জামাইবাবু তাগড়া জোয়ান। সে বুড়োকে হুমকি দিল, সাহস থাকে তো সামনে এসো। একহাত হয়ে যাক। বুড়ো এককালে ডাকাবুকো ধরনের ছিল। কতজনকে মেরেছে, কেটেছে। কিন্তু এখন তো বুড়ো হয়ে গেছে। শক্তিতে কুলোয় না। কী করা যায়? সে শুধুু ভাবে। ভেবে ভেবে আরো গরম হয়ে যায়। জামাইটা বেশি বাড় বেড়েছে। ওকে একটা উচিত শিক্ষা দিতে হবে। একদম মেরে ফেলতে হবে। সরিয়ে দিতে হবে পৃথিবীর বুক থেকে।

ভেবে ভেবে বুড়োটা কয়েকদিন ধরে প্রস্তুতি নিল। ধারালো ছুরি আরো ধারালো করতে লাগল। তারপর একরাতে সে ঢুকে পড়ল জামাইয়ের রুমে। মায়ানমারের গ্রামের বাড়িগুলোতে কোনো ছিটকিনি থাকে না। তাই সে রুমে ঢুকে অনায়াসে জামাইবাবুর গলা কেটে পালিয়ে এল বিহারে। এরপরে কী হলো তা সেয়াদ আর বলেন নি। আমরাও কেউ জিজ্ঞেস করি নি।

দ্বিতীয় ঘটনাটা হচ্ছে সাগাইং পাহাড়ের এক বুড়ো সেয়াদকে নিয়ে। সেয়াদের বয়স নাকি তখন ছিল ৯০ বছর। এই বুড়ো বয়সে একটু হাঁটাচলা করলে ভালো লাগে। তাই তিনি হাঁটতে বেরোলেন। সেখানকার রাস্তাগুলো খুব নুড়িপাথরে ভরা ছিল তখন। তিনি সাবধানে পা ফেলে হাঁটতে লাগলেন। কিন্তু বুড়ো বয়সে সবকিছু নড়বড়ে যায়। তাই নড়বড়ে পায়ে হাঁটতে গিয়ে একসময় একটা পাথরে হোঁচট খেলেন। পায়ের বুড়ো আঙুলে খুব ব্যথা পেলেন। ব্যথা পেয়ে বুড়ো সেয়াদ খুব গরম হয়ে গেলেন। তিনি পাথরটাকে লাথি মেরে মেরে বলতে লাগলেন, এত বড় সাহস! আমাকে ব্যথা দিতে চাও! দেখি কত ব্যথা দিতে পার। কিন্তু এত লাথি খেয়েও পাথর নিরব হয়ে রইল। এদিকে সেয়াদের পা ফেটে রক্ত বেরোতে লাগল। অবশেষে হাসপাতালে বয়ে নিতে হলো তাকে।

কাজেই কারো সাথে রাগ না করলেই ভালো। অভিধর্ম বলছে, রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন।

6 thoughts on “অভিধর্ম এবং রাগ করার তিনটা গল্প

  1. ভান্তেকে বন্দ।
    ১। ভান্তে অরহৎ হলে কি তিনি মৃত্যুর সময়কাল জ্ঞান থাকা অবস্থায় বা স্মৃতি থাকা অবস্থায় মৃত্যু বরণ করতে হয়?
    ২। অরহৎ ভান্তেদের মৃত দেহে কি পচন ধরে না। মৃত্যুর পর ফ্রিজে রাখতে হয়না, ঔষধ দিয়ে বছরের পর বছর রাখার প্রয়োজন হয়না নাকি এমনিতেই পেটিকাবদ্ধ করে রাখা যায়।
    ৩। কোন ভিক্ষুকে যদি অরহৎ না হয়েও ষড়াভিগ্গা অরহ, অনুবুদ্ধ কিংবা আর্য্যশ্রাবক বিশেষনে বিশেষিত বা সম্মানিত করা হয় তিনি যেনেও যদি মানা না করে তবে তিনি পারিজাত দোষে দুষি হবেন। আর এমন ভান্তেদের দান দিলে দাতার কি অবিদ্যাজনিত পাপ হবে না দাতার দানীয় চেতনার হেতু বশত পূণ্যপ্রাপ্তি হবে।

  2. সময় ফেলে মাঝেমধ্যে আমাদের জন্যে আপনার জানা অজানার কিছু কথা আমাদের সাথে শেয়ার করবেন ভান্তেজী।

  3. বন্দনা ভান্তে,দান এবং দানের ফল নিয়ে বিস্তারিত লেখনি যদি লেখেন তাহলে খুব সবার উপকার হয়।

  4. দান এবং দানের ফল নিয়ে বিস্তারিত লেখনি লেখার অনুরোধ করলাম ভান্তে। আশা করি সবার উপকার হবে

  5. পড়লাম ভান্তে, আপনার লেখনি গুলো খুব মনদিয়ে পড়ি ভান্তে। আপনার লেখনি গুলো খুবই মূল্যবান লেখনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *