আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

বার্মায় তান্ত্রিকতা: বিদ্যাধরদের উৎসের সন্ধানে

বার্মার তান্ত্রিকতার একটা আলাদা স্টাইল আছে। এখানে তান্ত্রিকতাকে বলা হয় অগ্গিয়, যার মানে হচ্ছে ‘আগুন নিয়ে কাজ করা’তান্ত্রিক সাধক এখানে আগুনের মাধ্যমে বিভিন্ন ধাতুকে মূল্যবান ধাতুতে রূপান্তর করার চেষ্টা করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ সে এমন একটা পদ্ধতি আবিষ্কারের চেষ্টা করতে থাকে যার মাধ্যমে সীসাকে রূপায় পরিণত করা যায়, পিতল পরিণত হয় সোনায়। সোজা কথায়, সে একটা পরশ পাথর বানানোর চেষ্টা করতে থাকে। তার বিভিন্ন গুপ্ত ফর্মূলা আছে, যেগুলো খুব গোপনে সযত্নে সংরক্ষিত থাকে গুরুশিষ্য পরম্পরায়কিন্তু সেটা হচ্ছে লক্ষ্যের প্রথম ধাপ মাত্র। এর চরম লক্ষ্য হচ্ছে দিব্য দেহ এবং অনন্ত যৌবন।

বহু প্রচেষ্টার পরে সে হয়তো পরশ পাথর বানানোর কাজে সফল হয়, যেটার মাধ্যমে পিতলকে সোনায় পরিণত করা যায়। সেটা করতে পারলে এরপরে তার লক্ষ্য হয় সেটাকে জীবন্ত করে তোলা। তার জন্য সে বিভিন্ন ধাতু ও পদার্থ নিয়ে আরো পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতে থাকে। পরশপাথর জীবন্ত হলে সেটি দিয়ে আকাশে উড়ে যাওয়া যায়, পানিতে ডুবে থাকা যায়, মাটিতে ঢুকে যাওয়া যায়। সেটি সাথে থাকলে অর্থাৎ সেটি তার মুখের মধ্যে, চুলের খোঁপার মধ্যে, তার হাতের মুঠোয়, অথবা বগলের মধ্যে রাখলে তখন তাকে কোনো প্রকার ক্ষতি করা যায় না। তার মধ্যে তখন কোনো ক্লান্তি আসে না, কোনো রোগ হয় না।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এমন জীবন্ত পরশপাথর বানানোর ফলে তার উপর বিভিন্ন অপদেবতা ও অন্যান্য তান্ত্রিকের নজর থাকে কীভাবে সেই পরশপাথরটাকে হাতানো যায়। বার্মিজ লোককাহিনীতে আছে যে, এক ভারতীয় রাজপুত্রের নাকি এমন একটা জীবন্ত পরশপাথর ছিল। তার রাজ্য ছিল বঙ্গে। সে সেখান থেকে প্রতিদিন উড়ে আসত তৎকালীন বার্মার বাগান রাজ্যে, এক বার্মিজ রাজকন্যার সাথে দেখা করতে। সে কোনো তান্ত্রিক ছিল না, কিন্তু কীভাবে কীভাবে যেন তার হাতে এসেছিল এরকম একটা জীবন্ত পরশপাথর। সেটি মুখে দিয়ে সে আকাশে উড়তে পারত।

জীবন্ত পরশপাথর পেয়েও তান্ত্রিক সাধক তাতে থেমে থাকে না। সে সেটি দিয়ে আরো পরীক্ষানিরীক্ষা করতে থাকে। এবারে তার লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি ওষুধ আবিষ্কার করা, যেটি তার দেহটাকে দিব্যদেহের মতো করে দেবে। সেই ওষুধটি কিন্তু সাধারণ ওষুধের মতো খেলেই হয় না। সেটা তার দেহে মিশে যেতে সময় লাগে। এক সপ্তাহ ধরে তার দেহ মরার মতো পড়ে থাকে। এই সময়টুকু সে মাটির ভেতরে কবরস্থ হয়ে থাকে। সেটা তার সাময়িক মৃত্যুর মতো হয়। এসময়ে কোনো কারণে তার দেহ বাতাসের সংস্পর্শে এলে তখন আর সে জীবিত হয়ে উঠতে পারে না। এই এক সপ্তাহ হচ্ছে তার জীবনের সবচেয়ে নাজুক অবস্থা। তার দেহ তখন তার শত্রু, অপদেবতা ও অন্যান্য তান্ত্রিকদের কাছে অসহায় হয়ে পড়ে।

অপদেবতারা হয়তো কেবল ক্রোধবশত তাকে খুঁজে বেড়ায়, কিন্তু অন্যান্য তান্ত্রিকেরা সুযোগ খোঁজে তার দেহটাকে খাওয়ার জন্য। কারণ এসময়ে তার দেহটা খুব সুস্বাদু ও সুগন্ধিময় হয়ে ওঠে। আর তার দেহের মাংস খেলে সেই খাদক ব্যক্তিও অসাধারণ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বার্মিজ ইতিহাসে থাটন রাজ্যের দুজন বীরের কথা উল্লেখ আছে যারা ছিল অসাধারণ শক্তিশালী। তারা ছিল এক তান্ত্রিক ভিক্ষুর শিষ্য। সেই ভিক্ষুটি একবার আরেক তান্ত্রিকের দেহকে মাটির নিচ থেকে খুঁড়ে বের করেছিল। কিন্তু এই দুই শিষ্য তাদের গুরু ভিক্ষুর অজান্তে সেই তান্ত্রিকের দেহটাকে খেয়ে ফেলেছিল এবং প্রচণ্ড শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। অবশেষে রাজা অনরথ তাদেরকে পরাজিত করে থাটন রাজ্য দখল করেন।

বৌদ্ধদের মধ্যে একটা বিশ্বাস প্রচলিত যে, অর্হতের মৃতদেহ ধাতুতে পরিণত হয়। তাই বিদ্যাধর লাইনের লোকজন মনে করে যে, অর্হতের মৃতদেহের মাংস খেতে পারলে, অথবা তাদের দেহের অংশকে বিভিন্ন ওষুধের সাথে মিশিয়ে নিজের দেহে চামাহ্ বা আধ্যাত্মিক অক্ষর ও চিহ্ন এঁকে নিজের দেহে মিশিয়ে নিতে পারলে তারা হয়ে যাবে অজেয়। কোনো বিপদ তাদের ধারেকাছে ঘেঁষতে পারবে না। এই ধারণা থেকেই বিদ্যাধর লাইনের লোকজন চিত্রবিচিত্র অক্ষর সহকারে গায়ে উল্কি আঁকে। সেই উল্কির রঙের মধ্যে মিশ্রিত থাকে অরহতের মৃতদেহ বা অর্হতের ধাতু। সেটা যে তারা কবে কোন ভিক্ষুর মৃতদেহ থেকে তুলে এনেছে কে জানে!

উদাহরণস্বরূপ সামঞ্ঞতং সেয়াদের কথা এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়। তিনি খুবই বিখ্যাত ছিলেন সারা বার্মায়। তিনি মারা যান ২০০৩ সালে। তার দেহ রাখা হয় একটি কফিনে। কিন্তু ২০০৮ সালে একরাতে একদল সশস্ত্র লোক এসে তার দেহ চুরি করে নিয়ে যায়। চারদিন পরে এক অজ্ঞাতনামা টেলিফোন কল অনুযায়ী অনুসন্ধান করে সেয়াদের মৃতদেহের পোড়া হাড়গোড় ও সামান্য ছাইয়ের স্তুপ পাওয়া যায় কাছেই একটি বিহারের আঙিনায়।1 এখানকার লোকজনের ধারণা হচ্ছে, সেটা ছিল তান্ত্রিক অনুসারীদের কাজ। তাদের বিশ্বাস যে, সামঞ্ঞতং সেয়াদের মতো সিদ্ধপুরুষের মৃতদেহ যে খাবে সে আরো শক্তিশালী হয়ে উঠবে। সেই বিশ্বাসে তারা সেয়াদের মৃতদেহ চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল। সামঞ্ঞতং সেয়াদ তান্ত্রিক সিদ্ধপুরুষ ছিলেন কিনা তা আমি আর জিজ্ঞেস করি নি, কিন্তু তান্ত্রিকের অনুসারীরা বাস্তবে যে কতটা বেপরোয়া হতে পারে তা এই ঘটনা থেকে কিছুটা আঁচ করা যেতে পারে।

বাংলাদেশেও এই তান্ত্রিক বা বিদ্যাধরের অনুসারীরা দিনদিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। সেখানে অর্হৎ বলে খ্যাত পূজ্য বনভান্তের মৃতদেহ রাখা হয়েছে কফিনে। তার মৃতদেহের যথাযথ পাহারা দেওয়া দরকার। বিদ্যাধরের অনুসারীরা যদি বনভান্তের মৃতদেহও চুরি করে নিয়ে যায় তাহলে আফসোসের সীমা থাকবে না। বনবিহার কর্তৃপক্ষের সেব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

সে যাই হোক, কোনো তান্ত্রিক যদি এমন সঠিক ওষুধ বের করতে পারে, তখন তার প্রথম কাজ থাকে একজন বিশ্বস্ত শিষ্য খুঁজে বের করা। বিশ্বস্ত একজন শিষ্য পাওয়া গেলে সে তাকে লোকালয় থেকে দূরে কোনো জঙ্গলের মধ্যে মাটির নিচে গর্ত খুঁড়তে বলে। এরপর সে সেই গর্তে ঢুকে ওষুধ খেয়ে নেয়। শিষ্যটি তখন গর্তটাকে মাটি দিয়ে ভরাট করে দেয়। তান্ত্রিকের দেহটি সেই গর্তে সাতদিন ধরে মরার মতো পড়ে থাকে। শিষ্যটি সেখানে ততদিন ধরে পাহারা দেয় এবং মন্ত্র জপতে থাকে যেন অপদেবতা ও অন্যান্য তান্ত্রিকেরা কাছে ঘেঁষতে না পারে। সাতদিন পরে তান্ত্রিক আবার জীবিত হয়ে ওঠে এবং নিজেই গর্ত থেকে উঠে আসে। সে তখন হয়ে যায় যজি (ဇော်ဂျီ Zawgyi),একজন তান্ত্রিক সিদ্ধপুরুষ। জীবন্ত পরশপাথরের গুণগুলোও তখন তার এমনিতেই এসে যায়। সে তখন ইচ্ছেমতো উড়ে যেতে পারে, মাটির ভেতর দিয়ে যেতে পারে, শরীরে ক্লান্তি থাকে না, কোনো প্রকার খাদ্যেরও দরকার হয় না। মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত তার দেহটি চিরযৌবন নিয়ে থাকে। সে বেঁচে থাকে বহু হাজার বছর ধরে। তার আর সেই পরশপাথরের দরকার হয় না। তার শিষ্যকে সে তখন সেই পরশপাথর দিয়ে যায় এবং নির্জন বনে প্রবেশ করে। তখন থেকে সে লোকালয়ে খুব কমই আসে।

সত্যিকথা বলতে কী, সকল সংস্কার অনিত্য থেরবাদী বৌদ্ধধর্মের এই অনিত্যতার ধারণাটি যতদিন পর্যন্ত সাধারণ বার্মিজদের মধ্যে প্রচলিত হয় নি ততদিন পর্যন্ত তারা বিশ্বাস করেছে যে, এই যজি বা তান্ত্রিক সিদ্ধপুরুষরা চিরযৌবন নিয়ে অনন্তকাল ধরে বেঁচে থাকে। বৌদ্ধধর্মের অনিত্যতার মতবাদে হেরে গিয়ে পরবর্তীতে এই বার্মিজ তান্ত্রিক ও তাদের শিষ্যরা স্বীকার করে যে, মৃত্যু সবার হয়, এমনকি তান্ত্রিক সিদ্ধপুরুষদেরও হয়। তবে তারা এখনো দাবি করে যে, আমরণ পর্যন্ত তাদের দেহ চিরযৌবনসম্পন্ন থাকে, কোনো রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয় না। একারণেই গুরুবাদীরা দাবি করে যে, তাদের গুরুরা নাকি হিমালয়ে হাজার হাজার বছর ধরে বেঁচে থাকে। সোজা কথায়, বৌদ্ধধর্মের অনিত্যতার মতবাদ তারা এখনো ভালোমতো বুঝতে শেখে নি।

কিন্তু এতসব প্রচেষ্টার পেছনে কোনো অর্থ আছে কি? একটু ভেবে দেখুনমানুষের যৌবন ক্ষণস্থায়ী, মরণ নিশ্চিত। বার্মিজ তান্ত্রিকতা তাই এমন এক জীবন খোঁজে যেখানে দেহমন থাকে অনন্তযৌবনা, সৌন্দর্য সেখানে থাকে চিরকাল অটুট, অজর, অমর।

কিন্তু মনের আশা পূরণ হওয়ার পরে কি তান্ত্রিক সিদ্ধপুরুষ খুব সুখী হয়? সুখী হয় বটে, তবে তার নিজস্ব কিছু সমস্যাও থাকে। তার জীবনটা হয় খুব একাকীত্বের জীবন। তার খাওয়ার দরকার হয় না বটে, কিন্তু মাঝেমধ্যে সে ফলমূল খায়। তবে মাংস সে মোটেও খেতে পারে না বিশ্রী গন্ধের কারণে। অথচ মানুষেরা সাধারণত মাংস খায়। তাই সাধারণ মানুষজনের দেহ থেকে বিদঘুটে গন্ধ বের হয়। একারণে সে লোকজনের সাথে কয়েক মিনিটের বেশি থাকতে পারে না।

তান্ত্রিক সিদ্ধপুরুষ হলেও সে যেহেতু রক্তমাংসের মানুষ, তাই সে নারীসঙ্গী খোঁজে। কিন্তু রক্তমাংসে গড়া নারীদেহ থেকে বিদঘুটে গন্ধ বের হয় বলে সে বিকল্প পদ্ধতিতে তার কামতৃষ্ণা মেটায়। হিমালয়ের কোলে এমন গাছ আছে যেগুলোর ফল হয় আকার ও আকৃতির দিক দিয়ে একদম নারীদেহের মতো। তান্ত্রিক সিদ্ধপুরুষ তার অলৌকিক শক্তি দিয়ে সেই ফলগুলোতে কৃত্রিম প্রাণ প্রবেশ করিয়ে দেয়। ফলে সেগুলো নড়াচড়া করতে পারে। সে তাদের সাথে কামসুখে মগ্ন হয়। কিন্তু এতকিছুর পরেও সেগুলো হচ্ছে গাছের ফল মাত্র। তাই অল্পসময় পরেই সেগুলো ভেঙেচুরে নষ্ট হয়ে যায়। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এই গাছগুলো খুব দুর্লভ। হিমালয়ের কোলেও সেগুলো খুব সহজে দেখা পাওয়া ভার। একারণে সেই ফলগুলো কাড়াকাড়ি করতে গিয়ে অন্যান্য তান্ত্রিক সিদ্ধপুরুষদের সাথে তার প্রায়ই মারামারি ও ঝগড়াঝাঁটি হয়ে থাকে।

তবে নারীরূপী ফলগুলোকে কাড়াকাড়ির যে কাহিনী, সেটা বোধহয় তান্ত্রিক বিরোধী প্রচারণা থেকে সৃষ্টি হয়েছে। থেরবাদ আসার পরে বেশির ভাগ বার্মিজ লোকজন এধরনের তান্ত্রিক পরীক্ষানিরীক্ষাকে খুব একটা সুনজরে দেখে না। তারা মনে করে, তান্ত্রিকেরা কেবল সোনা খুঁজে বেড়ায়, এবং কামসুখের পেছনে ছোটে। কিন্তু তান্ত্রিক পক্ষাবলম্বীরা দাবি করে যে, তারা হাজার বছর ধরে বাঁচতে চায় যৌবনের সুখ ভোগ করার জন্য নয়, বরং পরবর্তী বুদ্ধ আবির্ভাবের সময়ে যেন সে জীবিত থাকতে পারে। এতে করে সে সেই বুদ্ধকে পূজা করতে পারবে এবং নির্বাণ লাভ করতে পারবে।

তান্ত্রিক বিরোধীরা তখন বলে যে, পরবর্তী বুদ্ধ আসতে আসতে তো হাজার হাজার বছর চলে যাবে। অত দীর্ঘ সময় ধরে বেঁচে থাকতে থাকতে তান্ত্রিকের তখন সময়ের হিসাবই আর থাকবে না। সে ঐ নারীরূপী ফলগুলো নিয়ে ঝগড়াঝাঁটিতে ব্যস্ত থাকায় বুদ্ধের কাছে গিয়ে দেখা করার কথাও তার মনে জাগবে না।

এভাবে তান্ত্রিক পক্ষের ও বিপক্ষের বহু যুক্তিতর্ক বার্মিজদের মধ্যে প্রচলিত। কিন্তু তারপরেও যজি বা তান্ত্রিক সিদ্ধপুরুষের নিরিবিলি একাকী শান্তিপূর্ণ জীবন বহু সন্ন্যাসীকে আকর্ষিত করে, বহু পণ্ডিতকে আলোড়িত করে। তাই বিখ্যাত বার্মিজ নাট্যকার উ জিনউ2 একজন যজির আদর্শকে বর্ণনা করেছেন সহানুভূতির চোখে এভাবে:

যজি: অবশেষে এতকাল ধরে যা কামনা করে আসছিলাম তা পেয়েছি। জীবন্ত পরশপাথর পেয়েছি, একজন যজি বা তান্ত্রিক সিদ্ধপুরুষ হয়েছি। আমার পরশপাথর সীসাকে রূপা বানাতে পারে, পিতলকে করতে পারে সোনা। আমি সেই অমরত্বের ওষুধ খেয়েছি যা আমাকে প্রকৃতির উর্ধ্বে নিয়ে গেছে, পার্থিবতার উর্ধ্বে নিয়ে গেছে। বন্দুকের গুলি ও বোমা আমাকে মারতে পারে না। ছুরি, বল্লম আমাকে কোনো ক্ষতি করতে পারে না। আমি চাইলে রাজা হতে পারি। কিন্তু এমন পার্থিব ক্ষমতায় কী হবে? সরে যাও, সরে যাও। আমি লোকালয় থেকে দূরে যেতে চাই, নির্জন বনে গিয়ে থাকতে চাই।

আহা। আমি সুন্দর একটা বনে পৌঁছে গেছি। ঐ দেখ ফুলের পাঁপড়িগুলো। ঐ দেখ পাহাড়ি ঝরণা। এদিকে আছে একটা ছোট নদী। ওখানে আছে একটা ছোট পুকুর। এখানে আছে নুড়িপাথর, রূপালি বালি। পাথর ছেয়ে আছে সবুজ শেওলায়। তার নিচ দিয়ে নিরবে বয়ে চলেছে সবুজ পানির ধারা। মাঝদুপুরের কড়া রোদও এই শান্তিময় স্থানে এসে যেন কোমল হয়ে গেছে। ছোট গাছ ও বড় গাছ সব পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। এই গাছটি তার প্রিয়তমার দিকে ঝুঁকে আছে, ঐ গাছটি যেন বিদ্রোহী! এই ঝোপটি যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এই বাঁশটি এত সুন্দর। ঐ গাছের নিচে কেউ যেন কোমল ঘাসগুলো ছেঁটে দিয়েছে যত্ন করে। আমি আসার আগে কোনো পরীদের দল কি সেখানে খেলা করছিল? আমি আসাতে কি তাদের খেলা ভঙ্গ হলো? এত সৌন্দর্য নিয়ে কবিতা লিখে লিখেই তো একজন কবি এখানে অনন্তকাল কাটিয়ে দিতে পারে!

এবারে বার্মিজ তান্ত্রিক পরীক্ষানিরীক্ষার পেছনের মূল তত্ত্বকে একটু ব্যাখ্যা করা যাক। সমগ্র মহাবিশ্ব হচ্ছে চারটি মৌলিক উপাদান নিয়ে গঠিত। সেগুলো হচ্ছে মাটি, আগুন, পানি ও বায়ু। একারণে এই পৃথিবীর সকল জিনিস, সেগুলো জৈব হোক বা খনিজ হোক, সেগুলো এই চারটি উপাদান নিয়ে গঠিত। মানুষের দেহও হচ্ছে এই চারটি উপাদানের সমষ্টি। কিন্তু এই চারটি উপাদানের পেছনে একটি অপরিহার্য উপাদান থাকে, যার কোনো পরিবর্তন হয় না, কোনো ক্ষয় হয় না। যেকোনো জিনিস ক্ষয় হয় তার চারটি উপাদানের কারণে। যদি চারটি উপাদান থেকে সেই অপরিহার্য উপাদানকে বিশুদ্ধ করে আলাদা করা যায়, তখন সেটিকে পরিবর্তন বা ক্ষয় হওয়া থেকে রক্ষা করা যায়। তান্ত্রিক পরীক্ষা নিরীক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে সেই অপরিহার্য উপাদানটিকে খুঁজে বের করা যা সকল ধাতুর মধ্যে থাকে। ধাতুর মধ্য থেকে সেই উপাদানকে বের করে এনে সেটাকে মানবদেহে প্রবেশ করিয়ে দেয়া, যার প্রভাবে মানবদেহটি অমর ও চিরযৌবনসম্পন্ন হবে।

বার্মিজ তান্ত্রিকেরা নয়টি ধাতু ও বারটি ধাতব পদার্থ সম্পর্কে জানে। নয়টি ধাতুকে ‘নারী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। বারটি ধাতব পদার্থকে অভিহিত করা হয় ‘পুরুষ’ হিসেবে। মহাবিশ্বের মধ্যে যেমন নারী ও পুরুষের মিলিত হলে তবেই সম্পূর্ণতা আসে, তেমনি ধাতুর মধ্যে থাকা সেই অপরিহার্য উপাদানকে পাওয়া যায় কেবলমাত্র নারী ধাতুর সাথে পুরুষ ধাতব পদার্থের মিশ্রণের ফলে। নয়টি নারী ধাতু হচ্ছেসীসা, টিন, এন্টিমনি, দস্তা, তামা, রূপা, সোনা, লোহা ও পারদ।

প্রথম পাঁচটি ধাতুকে মৌলিক ধাতু হিসেবে গণ্য করা হয়। রূপা ও সোনাকে গণ্য করা হয় মহান ধাতু হিসেবে। মৌলিক ধাতুগুলোকে রূপা ও সোনায় পরিণত করা যায়। লোহা ও পারদ কোনো মৌলিক ধাতুও নয়, মহান ধাতুও নয়। একারণে সব ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা অবশ্যই করতে হয় লোহা বা পারদের মাধ্যমে। জীবন্ত পরশপাথরও লাভ হয় এই লোহা বা পারদের মধ্যে। তাই তান্ত্রিকদেরকে দুভাগে ভাগ করা হয়। যারা লোহার উপর কাজ করে, এবং যারা পারদের উপর কাজ করে। বার্মিজ তান্ত্রিকেরা মনে করে যে, ১৬৭ ধরনের লোহা রয়েছে। এর মধ্যে স্টীল বা ইস্পাতও অন্তর্ভুক্ত।

বারটি ধাতব পদার্থ হচ্ছেসালফার বা গন্ধক, এলাম বা ফিটকিরি, লবণ, নাইট্রেট, বোরাক্স, এমোনিয়া লবণ, কর্পূর, চুন, সোডা এ্যাশ, আর্সেনিক, আর্সেনিক সালফাইড এবং মার্কিউরিক সালফাইড।

আরি ভিক্ষুরা ভেষজ উদ্ভিদ ও গাছের শেকড়বাকড়কেও ব্যবহার করত। তাই বার্মিজ তান্ত্রিকেরা বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদ ও সেগুলোর শেকড়কে এই ধাতুর পরীক্ষায় ব্যবহার করে থাকে।

এসব তান্ত্রিক পরীক্ষানিরীক্ষার ফর্মূলা এবং পদ্ধতি ঘিরে বেশ বড়সড় বার্মিজ সাহিত্যভাণ্ডার রয়েছে। কিন্তু সেগুলো লিখে রাখা হয় সংকেতের মাধ্যমে। আরি ভিক্ষুরা যেভাবে রাজা অনরথ কর্তৃক নিগৃহীত হয়েছিল, তান্ত্রিকেরা সেভাবে নিগৃহীত হয় নি। কিন্তু রাজা অনরথের নতুন থেরবাদী বৌদ্ধধর্মে এসব তান্ত্রিকতার চর্চাকে খুব ভালো চোখে দেখা হয় নি। তাই তান্ত্রিকেরা হয়ে গেল সমাজব্যবস্থার বাইরে। এগার শতকের পরে তান্ত্রিকেরা তাদের তান্ত্রিকতার চর্চা করত গোপনে। কিন্তু পরীক্ষানিরীক্ষা ও ফলাফল জানানোর জন্য তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখত। সেই গোপন ফর্মূলাগুলো হাতে হাতে বিনিময় হত। দুর্ভাগ্যবশত এই তান্ত্রিকেরা দেশজুড়ে সংগঠিত হতে পারে নি, বরং বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল বিভিন্ন দলে। বিভিন্ন দল তাদের আবিষ্কারগুলো নিজ নিজ সংকেতে লিখে রাখত। সংকেতগুলো অত জটিল ছিল না। ধাতু ও ধাতব পদার্থগুলোর জন্য ছদ্মনাম ব্যবহার করা হত। যেমন– ‘সিংহ’, ‘বাঘ’, ‘বহু সন্তানের জননী’, ‘নিঃসন্তান স্ত্রী’, ‘বহু স্বামীওয়ালা স্ত্রী’, ‘ইঁদুর’, ‘সাদা বেড়াল’। সব দলই এই ছদ্মনামগুলো ব্যবহার করে থাকে। তবে একেকদল একেক ধাতুর জন্য একেক নাম ব্যবহার করে থাকে। একদল যেখানে সোনার ছদ্মনাম হিসেবে ‘বড় ঈগল’ ব্যবহার করে থাকে, সেখানে আরেকদল হয়তো ব্যবহার করে ‘সিংহ’ ছদ্মনামটি। এভাবে পনের কি ষোল শতকে এসে বার্মিজ তান্ত্রিকের বেশিরভাগ শক্তি ব্যয় হত গোপন তান্ত্রিক ফর্মূলার মর্ম উদ্ধারের কাজে।

সেই প্রাচীনকালে বার্মায় তান্ত্রিকতার চর্চা কীভাবে এত প্রসার পেল তার অন্যতম কারণ হচ্ছে তখন দেশটি খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ ছিল। সকল ধাতু ও ধাতব পদার্থগুলো এই দেশেই সহজে পাওয়া যেত। কিন্তু তবুও সেটা ছিল খুবই ব্যয়বহুল একটা কাজ। রাজা অনরথের আগে তৎকালীন রাজাগণ নিজেরাই তান্ত্রিকতার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। বার্মিজ লোককাহিনীগুলোতে অনেক ঘটনার উল্লেখ আছে যেখানে ভিক্ষুর তান্ত্রিক পরীক্ষানিরীক্ষার খরচ যোগাতে গিয়ে রাজভাণ্ডার পর্যন্ত শুন্য হয়ে গিয়েছিল। এগার শতকের আগে তান্ত্রিকতার চর্চা করত আরি ভিক্ষুরা। কিন্তু এর পরে সেগুলোর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে জ্যোতিষী, বৈদ্য, স্বর্ণকার ও শাস্ত্রজ্ঞদের মাঝে। জ্যোতিষী ও বৈদ্যরা তাদের পরীক্ষা নিরীক্ষার ফল হিসেবে প্রাপ্ত ধাতুগুলো তাবিজ ও কবচ হিসেবে বেচতে থাকে, অথবা কোনো জটিল রোগের ওষুধ হিসেবে বেচতে থাকে। i

রেফারেন্স:

  1. https://www.tuninst.net/FLK-ELE/ch04-alchem/ch04-alchem.htm

  2. http://www.alchemywebsite.com/Burmese_alchemy_Aung.html

  3. http://www2.irrawaddy.com/article.php?art_id=12596&page=1

  4. Buddhism and Society: A Great Tradition and Its Burmese Vicissitudes; By Melford E. Spiro

  5. http://www.chinabuddhismencyclopedia.com/en/index.php/Burmese_Tantric_Buddhism

  6. http://factsanddetails.com/southeast-asia/Myanmar/sub5_5c/entry-3036.html

1 http://www2.irrawaddy.com/article.php?art_id=12596&page=1

2 U Kyin U (Burmese: ဦးကြင်ဥ; c. 1773 – c. 1838)

ihttp://www.alchemywebsite.com/Burmese_alchemy_Aung.html

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *