আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

ব্রহ্মজাল সুত্রের সারসংক্ষেপ

পৃথিবীর বেশির ভাগ লোকজন আত্মা ও সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করে। বর্তমানে তিনটি প্রধান ধর্ম হচ্ছে খ্রিস্টান (২৪০ কোটি), ইসলাম (১৮০ কোটি) ও হিন্দু ধর্ম (১১৫ কোটি)। সবগুলোই আত্মা এবং সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী। তাহলে চিন্তা করুন তো, পৃথিবীর ৭২০ কোটি মানুষের মধ্যে ৫৩৫কোটি মানুষ বিশ্বাস করে আত্মা আছে এবং একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন। এমনকি একবার কয়েকজন মধ্যবয়স্কা উপাসিকার কাছ থেকেও এধরনের কথা শুনেছি। আমি সরল মনে তাদেরকে বুঝাতে চেয়েছিলাম যে তাদের ধারণা ভুল। বৌদ্ধধর্ম এরকম কোনো সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী নয়। কিন্তু কে শোনে কার কথা। উল্টো আমাকে ধমকাল! তখন বুঝলাম বিষয়টি বড়ই স্পর্শকাতর। সেই থেকে আর এব্যাপারে উচ্চবাচ্য করি না আমি।
তবুও কয়েকজন উপাসক উপাসিকা নাছোড়বান্দা। তারা প্রায়ই তাগাদা দেয় এব্যাপারে লেখার জন্য। তাই তাদের প্রার্থনা কবুল করলাম। তবে তার ফল হিসেবে ঈশ্বরবাদীদের কাছ থেকে আরো কিছু কটু কথা শুনতে হবে সন্দেহ নেই।
আসল কথায় আসি। ত্রিপিটকের প্রথম সুত্রটি হচ্ছে দীর্ঘনিকায়ের ব্রহ্মজাল সুত্র। সুত্রটিতে বুদ্ধ মূলত আত্মা, জগত ও সৃষ্টিকর্তা নিয়ে মোট ৬২টি মিথ্যাদৃষ্টি বা ভ্রান্ত ধারণাকে কারণ সহকারে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, ‘ভিক্ষুগণ, সাধারণ লোকজন আমার শীলের ব্যাপারে অল্পমাত্রই জানে। অথচ অন্য আরো অনেক গম্ভীর বিষয় আছে যেগুলো দেখা কঠিন, দুর্বোধ্য, তর্ক দিয়ে যেগুলোর সমাধান মেলে না। সেসব বিষয় আমি স্বয়ং জেনে তোমাদেরকে বলে দিই। কী সেই গম্ভীর বিষয়গুলো?’
এরপর বুদ্ধ সেই ৬২ প্রকার মিথ্যাদৃষ্টি বা ভ্রান্ত ধারণাগুলোকে একটা একটা করে ব্যাখ্যা করেন। বর্তমানে সাধারণ লোকজনের পক্ষে সেগুলো বেশ গোলমেলে, বুঝা কঠিন। তাই সহজে বুঝার সুবিধার্থে আমি প্রথমে সৃষ্টিতত্ত্বগুলোকে একত্রিত করেছি। এরপরে স্থান দিয়েছি আত্মা সম্পর্কিত মতবাদগুলোকে। এরপরে বাদবাকি মতবাদগুলোকে।
সৃষ্টিতত্ত্ব

সৃষ্টিতত্ত্ব-১: শাশ্বতবাদ

বিশ্বজগতের সৃষ্টি নিয়ে প্রথম মতবাদটি হচ্ছে শাশ্বতবাদ। এদের মতে, আত্মা ও এই বিশ্বজগতের কোনো সৃষ্টি নেই, ধ্বংস নেই। সেগুলো চিরকাল ধরে ছিল, আছে ও থাকবে। কিন্তু কেন তারা এরকম মনে করে? বুদ্ধ এই ধারণার পেছনে দুটো কারণ তুলে ধরেন। এর মধ্যে একটা হচ্ছে ধ্যানী বা সাধকের ধ্যানলদ্ধ জ্ঞান এবং আরেকটা হচ্ছে যুক্তিবাদীর নিজস্ব যুক্তিতর্কজাত ধারণা।
বুদ্ধ বলেন, কোনো কোনো যোগী বা সাধক ধ্যানে দক্ষ হয়ে বহু অতীতজন্মকে স্মরণ করতে পারে। সে দেখে, ‘আমি অমুক জন্মে এই নামে এই বংশে এমন চেহারায় জন্মেছিলাম। তখন আমি এমন খেতাম, এমন সুখদুঃখ লাভ করেছিলাম, এত বছর বেঁচেছিলাম। মারা গিয়ে সেখান থেকে আবার অন্যখানে জন্মেছিলাম। সেখান থেকে এখানে জন্মেছি।’ তাই সে বলে, ‘এই জগত চিরকাল ধরে ছিল, আছে ও থাকবে। বরং সেখানে আমরা প্রাণিরা একজন্ম থেকে আরেক জন্মে ছুটে চলেছি অনন্তকাল ধরে।’
আবার কেউ কেউ হয় যুক্তিবাদী। তারা নিজের বুদ্ধি ও যুক্তির ভিত্তিতে পর্যালোচনা করে এরকম বলে থাকে, ‘এই জগত চিরকাল ধরে ছিল, আছে ও থাকবে। বরং সেখানে আমরা প্রাণিরা একজন্ম থেকে আরেক জন্মে ছুটে চলেছি অনন্তকাল ধরে।’
এই দুধরনের ব্যক্তিরা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টাকে দেখলেও তারা একই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। তারা মনে করে এই জগত অনন্তকাল ধরে বিদ্যমান। আর সেখানে প্রাণিরা শুধু ছুটে চলেছে এক জন্ম থেকে আরেক জন্মে। এদেরকে বলা হয় শাশ্বতবাদী। (দী.নি.১.৩০-৩৭)

সৃষ্টিতত্ত্ব-২: ঈশ্বরবাদ

বিশ্বজগতের সৃষ্টি নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য মতবাদটি হচ্ছে ঈশ্বরবাদ।ঈশ্বরবাদীরা মনে করে ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তা একজন আছেন। তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। তিনি অজর অমর। কিন্তু তার সৃষ্ট প্রাণিরা মরণশীল। তাদের এমন ভ্রান্ত ধারণার পেছনেও কারণ হচ্ছে ধ্যানীদের অপর্যাপ্ত জ্ঞান অথবা যুক্তিবাদীদের যুক্তিতর্কজাত ভ্রান্ত ধারণা।
সেই ভ্রান্ত ধারণাগুলোকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বুদ্ধ প্রথমে ধ্যানীদের অপর্যাপ্ত জ্ঞানকে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভিক্ষুগণ, বহু দীর্ঘকাল পরে এমন সময় আসে যখন এই পৃথিবী ধ্বংস হয়। তখন বেশিরভাগ প্রাণি মারা গিয়ে আলোময় জগতে জন্ম নেয়। তাদের দেহ থেকে তখন আলো বিচ্ছুরিত হয়, তারা হয় আকাশচারী, দীর্ঘায়ুসম্পন্ন। পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার দীর্ঘকাল পরে আবার পৃথিবী সৃষ্টি হয়। পৃথিবীর উপরে মহাশূন্যে তখন ব্রহ্মলোকের সৃষ্টি হয়। আলোময় জগত থেকে তখন কোনো এক প্রাণি মারা গিয়ে পৃথিবীর উপরে মহাশূন্যে সেই ব্রহ্মলোকে জন্মায়। সে সেখানেও হয় জ্যোতির্ময় দেহের অধিকারী, দীর্ঘায়ু, আকাশচারী। তার সেখানে অবস্থানকালে এমন ইচ্ছা জাগে, ‘অন্যরাও এখানে আসুক।’ তখন অন্যরাও সেই আলোময় জগত থেকে নতুন সৃষ্ট ব্রহ্মলোকে জন্মায়। তারাও হয় জ্যোতির্ময় দেহের অধিকারী, দীর্ঘায়ু, আকাশচারী। তখন সেখানে প্রথম উৎপন্ন ব্যক্তির এরকম মনে হয়, ‘আমিই ব্রহ্মা, আমিই ঈশ্বর, আমিই সৃষ্টিকর্তা। আমার ইচ্ছাতেই এরা উৎপন্ন হয়েছে।’ অন্যদেরও এরকম মনে হয়, ‘ইনি আসলেই ব্রহ্মা, ঈশ্বর, সৃষ্টিকর্তা। আমরা তার সৃষ্টি। কারণ আমরা তাকেই প্রথম থেকে দেখে আসছি।’ এদের মধ্যে প্রথম উৎপন্ন ব্যক্তি হয় সবচেয়ে দীর্ঘায়ু, সবচেয়ে রূপবান, সবচেয়ে প্রভাবশালী। অন্যরা হয় তার চেয়ে কম আয়ুসম্পন্ন, কম শক্তিশালী।
অন্যদের মধ্য থেকে কেউ কেউ তাদের আয়ু শেষে সেখান থেকে চ্যুত হয়ে পৃথিবীতে মানুষ হিসেবে জন্ম নেয়। মানুষ হয়ে ধ্যানসাধনা করে কেউ কেউ কেবল তার সেই আগেকার জন্মটাকে স্মরণ করতে পারে, কিন্তু তার আগের জন্মগুলো আর স্মরণ করতে পারে না। সে কেবল আগেকার জন্মটাকে স্মরণ করে বলে, ‘আসলে তিনিই হলেন ঈশ্বর, সৃষ্টিকর্তা। আমরা তার সৃষ্টি মাত্র। আমাদের তাই সেখান থেকে চ্যুত হতে হয়, অথচ তিনি সেখানে চিরকাল ধরে বিরাজমান।’ এটা পড়ে কী মনে হয় আপনাদের? খ্রিস্টান, ইহুদি ও ইসলাম ধর্মের আদম ও ইভের স্বর্গ থেকে পতনের সাথে মিল পাওয়া যায় না?
আবার কেউ কেউ মনে করে, শুধু সৃষ্টিকর্তা নয়, অনেক দেবতাও আছে যারা অজর অমর। তাদের এমন ভ্রান্ত ধারণার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বুদ্ধ বলেন, কোনো কোনো দেবতা স্বর্গ থেকে চ্যুত হয়ে মানুষ হিসেবে জন্ম নেয়। তারা তখন ধ্যানসাধনা করে কেবল তার আগের দেবজন্মটাকে স্মরণ করতে পারে। তাই তারা বলে, ‘দেবতাদের মধ্যে কেউ কেউ অজর অমর আছে, আবার আমাদের মতো কেউ কেউ চ্যুত হয়।’(দী.নি.১.৩৮-৫২)

সৃষ্টিতত্ত্ব-৩: স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণবাদ

বিশ্বজগতের সৃষ্টি সম্পর্কে আরেকটি তত্ত্ব হচ্ছে স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণবাদ। এই মতবাদীরা বলে, এই বিশ্বজগত ও তার প্রাণিরা কোনো কারণ ছাড়া আপনাআপনিই সৃষ্টি হয়। এই ভ্রান্ত মতবাদের কারণ সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বুদ্ধ বলেন, ভিক্ষুগণ, এক প্রকার দেবতা আছে যারা অজ্ঞান হয়ে মরার মতো পড়ে থাকে। কিন্তু সংজ্ঞা ফিরে পেলেই তারা সেই দেবলোক থেকে চ্যুত হয়। কখনো এমন হয় যে তাদের মধ্যে কোনো এক দেবতা সেখান থেকে চ্যুত হয়ে মানুষ হয়ে জন্মায়। সে মানুষ হয়ে ধ্যানসাধনা করে সেই দেবজন্মটাকে স্মরণ করতে পারে, কিন্তু তার আগের জন্মগুলোকে আর স্মরণ করতে পারে না। তখন সে বলে, ‘এই বিশ্বজগত ও প্রাণিরা আপনা থেকেই সৃষ্টি হয়। আমিও আগে ছিলাম না, কিন্তু এখন আপনাআপনি সৃষ্টি হয়েছি।’ এভাবে নিজের ধ্যানের অভিজ্ঞতালদ্ধ সীমিত জ্ঞানের ভিত্তিতে সে এমন ভ্রান্ত ধারণা প্রচার করে থাকে।
আবার তার্কিক ও যুক্তিবাদী কেউ কেউ আছে যারা নিজের বুদ্ধিবিবেচনার মাধ্যমে বিচার বিশ্লেষণ করে বলে, ‘এই পৃথিবী ও প্রাণিরা আপনা থেকেই সৃষ্টি হয়।’ (দী.নি.১.৬৭-৭৩)। এই মতবাদ শুধু হাজার বছর আগেই নয়, বর্তমানেও থিওরিটিক্যাল ফিজিক্সের জগতে এটি একটি আলোচিত বিষয়। আপনারা spontaneous creation of the universe নামে গুগলে সার্চ দিয়ে বিষয়টা পড়ে দেখতে পারেন।

সৃষ্টিতত্ত্ব-৪: অন্ত-অনন্তবাদ

এই মতবাদগুলো আদৌ সৃষ্টিতত্ত্বের মধ্যে পড়ে না, বরং এগুলো হচ্ছে বিশ্বজগতের আকার ও সীমানার ব্যাপারে মতবাদ। বুদ্ধ এই মতবাদগুলো ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, কোনো কোনো ব্যক্তি ধ্যানে অদক্ষ হয়। সে তার ধ্যানের বিষয়টিকে বড় করতে জানে না। তাই সে সেই সীমিত স্থানের মধ্যেই জগতটাকে দেখে। একারণে জগতকে সীমিত মনে করে সে বলে, ‘এই বিশ্বজগত হচ্ছে সসীম এবং গোলাকার।’
[এই কথাগুলো ধ্যান সম্পর্কিত। তাই সেগুলো সাধারণের কাছে দুর্বোধ্য লাগতে পারে। একারণেই ধ্যানে কী হয় সেব্যাপারে সামান্য ধারণা দেয়া ভালো। ধ্যান করার জন্য অনেকগুলো বিষয় রয়েছে। যেমন- মাটি, পানি, আগুন, বাতাস। এগুলো নিয়ে ধ্যান করা যায়। আবার কয়েক ধরনের রঙ আছে। সেগুলোও ধ্যানের বিষয়। সেগুলো নিয়েও ধ্যান করা যায়। উদাহরণস্বরূপ কেউ কেউ মাটির ধ্যান করে। তার জন্য তারা মাটির চাকা বানায়, অথবা মাটিতে গোলাকার করে দাগ কেটে সেটাতে তাকিয়ে ‘মাটি মাটি’ অথবা ‘পৃথিবী পৃথিবী’ বলে মনে মনে জপতে থাকে। বহু দিন বহু মাস ক্রমাগত চর্চার ফলে তার মন একাগ্র হয়ে ওঠে। তখন চোখ বন্ধ করেও সে সেই মাটির চাকাকে দেখতে পায়। তখন আর তার মাটির চাকাকে দেখার প্রয়োজন হয় না। যেকোনোখানে মাটি মাটি বলে মন একাগ্র করলেই তার সামনে সেই মাটির চাকার প্রতিবিম্বটি এসে আবির্ভূত হয়। এটাতে দুই তিন ঘন্টা ধরে মনটাকে একাগ্রভাবে ধরে রাখতে পারলে সেটা আরো উজ্জ্বল ও ঝলমলে হয়ে ওঠে। এই উজ্জ্বল প্রতিবিম্বটাই হচ্ছে ধ্যানের বিষয়। সেটাকে বড় করতে চাইলে বড় করা যায়। কিন্তু কেউ কেউ সেই টেকনিকটা জানে না। ফলে তারা সেটাকে সীমিত মনে করে।]
এরপরে বুদ্ধ আবার বলেন, কিন্তু কেউ কেউ তার ধ্যানের বিষয়টিকে বড় করতে জানে। তখন তার ধ্যানের চোখে দেখা বিশ্বটা হয় অনন্ত অসীম। একারণে সে বিশ্বজগতকে অসীম মনে করে বলে, ‘এই বিশ্বজগত হচ্ছে অসীম। যারা বলে বিশ্বজগত হচ্ছে সসীম এবং গোলাকার, তারা ভুল বলে।’
আবার কোনো কোনো ব্যক্তি তার ধ্যানের বিষয়টিকে চারপাশে বিস্তৃত করতে জানে, কিন্তু উপরে নিচে বড় করতে জানে না। তাই তার মহাবিশ্বটা তখন চারপাশে অসীম হয়, কিন্তু উপরে নিচে হয় সসীম। একারণে সে বিশ্বজগতটাকে সসীম ও অসীম মনে করে, ‘এই বিশ্বজগত হচ্ছে উপরে নিচে সীমিত, কিন্তু চারপাশে অনন্ত। যারা বলে বিশ্বজগত হচ্ছে সসীম এবং গোলাকার, তারা ভুল বলে। আর যারা বলে বিশ্বজগত হচ্ছে অসীম তারাও ভুল বলে।’
আবার কোনো কোনো ব্যক্তি ধ্যান না করেও নিজের বুদ্ধি ও যুক্তির ভিত্তিতে পর্যালোচনা করে এরকম বলে থাকে, ‘এই বিশ্বজগত অসীমও নয়, সসীমও নয়। যারা সেরকম দাবি করে তারা ভুল দাবি করে।’ (দী.নি.১.৫৩-৬০)
এভাবে মহাবিশ্বের সৃষ্টি, তার আকার আকৃতি ও সীমানা নিয়ে গণ্ডগোল সেই হাজার বছর আগেও ছিল, এখনো আছে।
আত্মাতত্ত্ব
এরপরে রয়েছে আত্মা সম্পর্কিত মতবাদগুলো। সেগুলো যে কত ধরনের হয়! কেউ বলে আত্মাকে দেখা যায়, কেউ বলে দেখা যায় না। কেউ বলে আত্মা ছোট, কেউ বলে সারা বিশ্বটাই আত্মা! কেউ বলে আত্মা সুখী, কেউ বলে আত্মা দুঃখী! কেউ বলে আত্মা অজর অমর, আবার কেউ বলে আত্মাও মারা যায়! আসুন দেখি বুদ্ধ কী বলেন এদের ব্যাপারে।

আত্মাতত্ত্ব-১: আত্মাকে কি দেখা যায়?

যারা আত্মায় বিশ্বাস করে তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলে আত্মাকে দেখা যায়, কেউ বলে দেখা যায় না। বিষয়টা নিয়ে অনেকের অনেক ধরনের মতবাদ রয়েছে। বুদ্ধ সেগুলো একে একে বর্ণনা করেন এভাবে:
কেউ কেউ ধ্যান করার সময়ে তার ধ্যানের বিষয়টি উজ্জ্বল ও ঝলমলে হয়ে দেখা দেয়। সে সেটাকেই আত্মা মনে করে বলে, ‘আত্মাকে দেখা যায়।’
আবার কেউ কেউ নিরাকারের ধ্যান করে থাকে। সে বলে, ‘আত্মাকে দেখা যায় না।’
আবার কেউ কেউ উপরোক্ত উভয় প্রকারে ধ্যান করে থাকে। তাই সে বলে, ‘আত্মাকে কখনো দেখা যায়, আবার কখনো দেখা যায় না।’(দী.নি.১.৭৬)
আবার কোনো কোনো ব্যক্তি হয় যুক্তিবাদী। সে নিজের বুদ্ধি ও যুক্তির ভিত্তিতে পর্যালোচনা করে এরকম বলে থাকে, ‘এই দেহটা হচ্ছে ভঙ্গুর, মরণশীল। কিন্তু আত্মা হচ্ছে অজর অমর। সেটা দৃশ্যমানও নয়, আবার অদৃশ্যও নয়।’ (দী.নি.১.৪৯; দী.নি.১.৭৬)

আত্মাতত্ত্ব-২: আত্মা দেখতে কীরকম?

আত্মা দেখতে কীরকম? সেটা কি মানুষের মতো? আচ্ছা, মানুষের আত্মা যদি মানুষের মতো হয় তাহলে কুকুর বিড়ালের আত্মা কীরকম? সেগুলোও কি মানুষের মতো? কেঁচো, পিঁপড়ার আত্মাও কি মানুষের মতো? আত্মা কি ছোট হয় নাকি বড় হয়? সেটা ঠিক কীরকম হয়? এব্যাপারে বুদ্ধ তার আমলে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণাগুলোর ব্যাপারে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন,
কারো কারো ধ্যানের সময়ে তার ধ্যানের বিষয়টি উজ্জ্বল ও ঝলমলে হয়ে দেখা দেয়। সে সেটাকেই আত্মা মনে করে। কিন্তু সেটা সীমিত ও ক্ষুদ্র আকারে দেখা দেয় বলে সে বলে, ‘আত্মা হচ্ছে ছোট।’
আবার কারো কারো ধ্যানের মধ্যে তার ধ্যানের বিষয়টি অনন্তবিস্তৃত হয়ে দেখা দেয়। সে এমন অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখে সেটাকেই আত্মা মনে করে বলে, ‘আত্মা হচ্ছে বিশাল ও অসীম।’ এটাকে ভিত্তি করেই নব্য আধ্যাত্মিক মতবাদীরা একটা Universal consciousness এর কথা বলে। সেটা নাকি চিরকাল আছে ও থাকবে! বুদ্ধের মতে, এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা।
আবার কারো কারো ধ্যানের বিষয়টি উপরে-নীচে সীমিত কিন্তু চারপাশে অনন্তবিস্তৃত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। তখন সে সেটাকেই আত্মা মনে করে বলে, ‘আত্মা সীমিতও হয়, অসীমও হয়।’
অন্যদিকে ধ্যান বাদেও কোনো কোনো যুক্তিবাদী ব্যক্তি নিজের বুদ্ধি ও যুক্তির ভিত্তিতে পর্যালোচনা করে এরকম বলে থাকে, ‘আত্মা সীমিতও নয়, অসীমও নয়।’ (দী.নি.১.৭৬)

আত্মাতত্ত্ব-৩: আত্মা কতটুকু জানে?

আত্মা কোনোকিছু জানে কিনা সেব্যাপারেও রয়েছে অনেকের অনেক মত। সেগুলো ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বুদ্ধ বলেন, কেউ কেউ একটা বিষয়েই ধ্যানমগ্ন থাকে। সেই ধ্যানের মধ্যে তার সেই ধ্যানের বিষয়টি উজ্জ্বল হয়ে দেখা দিলে তখন সে সেটাকে আত্মাকে মনে করে বসে থাকে। তাই সে বলে, ‘আত্মা কেবল একটা বিষয়েই জানে।’
আবার কেউ কেউ কয়েক ধরনের ধ্যানে দক্ষ হয়। ধ্যান ভিন্ন ভিন্ন হওয়ার কারণে তার ধ্যানের বিষয়গুলোও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে দেখা দেয়। তখন সে বলে, ‘আত্মা বিভিন্ন বিষয়ে জানে!’ (দী.নি.১.৭৬)

আত্মাতত্ত্ব-৪: মরণের পরে আত্মা কোথায় যায়?

মরণের পরে আত্মা কোথায় যায়? কীভাবে থাকে? সুখে থাকে নাকি দুঃখে থাকে? সজ্ঞানে থাকে, নাকি মারা গিয়ে বেহুঁশ বা অজ্ঞান হয়ে যায়? নাকি একদম মারা যায়? কেউ কি বলতে পারবেন? চিন্তা করবেন না। তার জন্যও অনেক মতবাদ রয়েছে। বুদ্ধ সেগুলোর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, কেউ কেউ ধ্যানের চোখে প্রাণিদেরকে মরণের পরে চিরসুখী দেবতাদের জগতে জন্মাতে দেখে। তাই সে বলে, ‘পরকালে আত্মা কেবল সুখে থাকে।’
আবার কেউ কেউ ধ্যানের চোখে দেখে যে প্রাণিরা মরণের পরে নরকে জন্মাচ্ছে। তাই সে বলে, ‘পরকালে আত্মা কেবল দুঃখে থাকে।’
আবার কেউ কেউ ধ্যানের চোখে দেখে যে প্রাণিরা মানুষ হয়ে জন্মাচ্ছে। তাই সে বলে, ‘পরকালে আত্মা সুখদুঃখ উভয়ই পায়।’
আবার কেউ কেউ ধ্যানের চোখে দেখে যে প্রাণিরা মরণের পরে উচ্চতর দেবলোকে জন্মাচ্ছে যেখানে সুখও নেই, দুঃখও নেই। তাই সে বলে, ‘পরকালে আত্মা হয়ে যায় সুখদুঃখহীন।’ (দী.নি.১.৭৬)
আবার কেউ কেউ ধ্যানের চোখে দেখে যে, প্রাণিরা মরণের পরে এমন এক জগতে জন্মাচ্ছে যেখানে তারা মরার মতো পড়ে থাকে (অসংজ্ঞসত্ত্বলোক)। তাই তারা বলে, ‘আত্মা চিরস্থায়ী কিন্তু মরণের পরে পরকালে গিয়ে আত্মা অজ্ঞান হয়ে যায়!’ (দী.নি.১.৭৯)
আবার কেউ কেউ ধ্যানের চোখে দেখে যে প্রাণিরা মরণের পরে এমন এক জগতে জন্মাচ্ছে যেখানে তারা থাকে এক ঘোরের মধ্যে। তখন তারা সজ্ঞানে আছে বলে বলা যায় না, আবার অজ্ঞান হয়ে আছে বলেও বলা যায় না। তাই তারা বলে, ‘আত্মা চিরস্থায়ী কিন্তু মরণের পরে পরকালে গিয়ে আত্মা সজ্ঞানে থাকে না, অজ্ঞান হয়েও থাকে না।’ (দী.নি.১.৮২)
অন্যদিকে, পরকালে কে কোথায় জন্মাচ্ছে সেগুলো কেবল ধ্যানের চোখে জানা যায়। কিন্তু সবাই তো আর ধ্যান করে না। সবাই দিব্যচোখের অধিকারী হয় না। একারণে বেশিরভাগই মরণের পরে কী হয় জানে না। কিন্তু ধ্যান করতে না জানলে কী হবে? নিজের বুদ্ধি বিবেচনা তো আছে। তাই কোনো কোনো যুক্তিবাদী পণ্ডিত ব্যক্তি নিজ নিজ বুদ্ধি ও বিচারবিবেচনায় এরূপ বলে, ‘গাছ থেকে পুরনো পাতা ঝরে যায়। সেগুলো নতুন করে জীবিত হয় না। প্রাণিরাও হচ্ছে ঠিক সেরকম। এই প্রাণিদেহ চারটি মৌলিক উপাদানে গঠিত, পিতামাতা থেকে উৎপন্ন। কিন্তু দেহের মরণে আত্মাও মারা যায়, মরণের পরে আর কোথাও জন্মায় না।’
তখন ধ্যানীদের কেউ কেউ বলে, ‘সেরকম আত্মা আছে। সেরকম আত্মা নেই বলে আমি বলি না। কিন্তু আত্মা সেভাবে মারা যায় না। (স্বর্গলোকের) অন্য আত্মাও আছে যেগুলো হচ্ছে দিব্যদৃষ্টিতে দৃশ্যমান, যারা আমাদের মতোই খাওয়াদাওয়া করে। তুমি সেগুলোকে দেখ না। আমি কিন্তু সেগুলোকে দেখি, জানি। তবে তাদের দেহের মরণে সেই আত্মাগুলোও মারা যায়। মরণের পরে আর সেগুলো কোথাও জন্মায় না।’
আবার উচ্চতর ধ্যানলাভী কেউ কেউ বলে, ‘সেরকম আত্মা আছে। সেরকম আত্মা নেই বলে আমি বলি না। কিন্তু আত্মা এভাবে মারা যায় না। (ব্রহ্মলোকের) অন্য আত্মাও আছে যা হচ্ছে দিব্যদৃষ্টিতে দৃশ্যমান। তারা হচ্ছে মনোময়, তারা আমাদের মতো খাওয়াদাওয়া করে না, কিন্তু তাদের সর্বাঙ্গ পরিপূর্ণ হয়। তুমি তাদেরকে দেখ না। আমি কিন্তু তাদেরকে দেখি, জানি। তবে তাদের দেহের মরণে সেই আত্মাগুলোও মারা যায়। মরণের পরে আর সেগুলো কোথাও জন্মায় না।’
আরো উচ্চতর ধ্যানলাভী কেউ কেউ বলে, ‘সেরকম আত্মা আছে। সেরকম আত্মা নেই বলে আমি বলি না। কিন্তু আত্মা এভাবে মারা যায় না। (নিরাকার ব্রহ্মলোকের) অন্য আত্মাও আছে যারা আকার অবয়বহীন। তারা কেবল দিব্যচোখে ধরা পড়ে। তুমি তাদেরকে দেখ না। আমি কিন্তু তাদেরকে দেখি, জানি। তবে তাদের মরণে সেই আত্মাগুলোও মারা যায়। মরণের পরে আর সেগুলো কোথাও জন্মায় না।’ (দী.নি.১.৮৫-৯২)

অধরাবাদ

আবার কেউ কেউ সৃষ্টিতত্ত্ব, আত্মাতত্ত্ব এসব ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে এড়িয়ে যায়। একটা জিজ্ঞেস করলে আরেকটা বলে। বুদ্ধ এর কারণ বলতে গিয়ে বলেন, এখানে কেউ কেউ বিষয়গুলো যথাযথভাবে জানে না। তাই সে ভাবে, আন্দাজে বললে সেটা মিথ্যা বলা হয়ে যেতে পারে অথবা অন্যদের সমালোচনার মুখে পড়তে হতে পারে। এমনকি তর্কযুদ্ধের মুখে পড়াটাও বিচিত্র নয়। এই ভয়ে সে ভালো মন্দ কোনোটাই বলে না, বরং সেব্যাপারে প্রশ্ন করলে এড়িয়ে যায়। সে বলে, ‘আমি এরকম বলি না, সেরকমও বলি না, অন্যরকমও বলি না। নয় বলেও বলি না, হয় বা নয় বলেও বলি না।’
আবার কেউ কেউ মুর্খ হয়। সে নিজের অজ্ঞতার মাত্রাও জানে না। তাই তাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, ‘পরকাল বলে কি কিছু আছে?’ সে তখন বলে, ‘পরকাল থাকলে আমি বলতাম পরকাল আছে, কিন্তু আমি এরকম বলি না, সেরকমও বলি না, অন্যরকমও বলি না। নয় বলেও বলি না, হয় বা নয় বলেও বলি না।’ তাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, ‘তাহলে পরকাল নেই?’, তখন সে বলে, ‘পরকাল না থাকলে আমি বলতাম পরকাল নেই, কিন্তু আমি এরকম বলি না, সেরকমও বলি না, অন্যরকমও বলি না। নয় বলেও বলি না, হয় বা নয় বলেও বলি না।’ (দী.নি.১.৬১-৬৬)

চরম বস্তুবাদ

সুখ কোথায়? নির্বাণ কোথায়? সেগুলো নিয়েও আছে অনেকগুলো মতবাদ। বুদ্ধ তার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, কেউ কেউ বলে, ‘এই জীবনে কামসুখে আনন্দ ও বিনোদনে মগ্ন হয়ে থাকলে সেটাই পরম সুখ, পরম শান্তির নির্বাণ।’ পাল রাজাদের সময়ে সহজযানীরা বৌদ্ধধর্মকে বিকৃত করতে করতে একসময় এমন করেছিল যে তারা প্রচার করেছিল এভাবে কামসুখে মগ্ন থাকাটাই নির্বাণ। আধুনিক কালের চরম বস্তুবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গিও হচ্ছে এরকম। কিন্তু সেটা হচ্ছে ধ্যানহীনদের মতবাদ।
ধ্যানীরা কিন্তু বলে, ‘হ্যাঁ। কামসুখ আছে। কিন্তু তাই বলে সেটাই সর্বোত্তম নয়। কারণ সেই কামসুখের আনন্দ ও বিনোদনগুলো স্থায়ী নয়, সেগুলো পরবর্তীতে দুঃখ দেয়, সেগুলো থেকে একসময় না একসময় বিচ্ছিন্ন হতে হয়। তার ফলে আসে শোক দুঃখ হতাশা মনোকষ্ট। কিন্তু ধ্যানসুখে মগ্ন হয়ে থাকলে সেটাই পরম সুখ, পরম শান্তির নির্বাণ।’ (দী.নি.১.৯৩-৯৯)
এভাবে বাষট্টি প্রকার ভ্রান্ত ধারণাকে কারণ সহকারে ব্যাখ্যা করে বুদ্ধ এরপর বলেন, হে ভিক্ষুগণ, তারা যথাযথভাবে না জেনে, না দেখেই এসমস্ত ভ্রান্ত ধারণা, ভ্রান্ত মতবাদের সংস্পর্শে আসে। সেগুলোর সংস্পর্শে এসে তারা সেগুলোকে গ্রহণ করে, উপভোগ করে, সেগুলোকে কামনা করে, সেগুলোতে আনন্দিত হয়। এমন আনন্দের অনুভূতি তাদেরকে তৃষ্ণায় জড়িয়ে ফেলে। তখন তারা সেগুলোকে আরো দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে। দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার কারণে তা থেকে আসে কামজগত, সুক্ষ্ম পদার্থের জগত অথবা নিরাকার জগতের প্রতি আকর্ষণ। সেই টানে তারা তখন সেই জগতেই জন্ম নেয়। আর জন্ম হলেই সেখান থেকে আসে জরা, মরণ, শোক, হাহুতাশ, দুঃখ, মনোকষ্ট।
এভাবেই যারা সৃষ্টিতত্ত্ব ও আত্মাতত্ত্ব নিয়ে বিভিন্ন মতবাদী হয় তারা এই বাষট্টি প্রকার ভ্রান্ত মতবাদের জালে জড়িয়ে সংসারচক্রে হাবুডুবু খেতে থাকে। (দী.নি.১-১৪৬)
এগুলোর মধ্যে আত্মার কথা বৌদ্ধধর্ম একদমই স্বীকার করে না। আর ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তার কথা তো নয়ই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *