আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

বুদ্ধের আমলের ছয়জন গুরুর কথা

আপনারা হয়তো জানেন, পৃথিবীতে বুদ্ধ জন্মানোর এক হাজার বছর আগে থেকেই ব্রহ্মলোকের দেবতারা মানুষের বেশে পৃথিবীতে বিচরণ করে করে জগতজুড়ে রটিয়ে দেয়, একজন বুদ্ধ আসবেন, একজন বুদ্ধ আসবেন। তা শুনে মানুষেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বলাবলি করতে থাকে, একজন বুদ্ধ আসবেন। কে সে? কে সে? এটাকে বলা হয় বুদ্ধকোলাহল। (খুদ্দকপাঠ অর্থকথা / মঙ্গলসুত্তৰণ্ণনা)
এই কানাঘুষার মধ্যে কেউ কেউ তখন নিজেকে অর্হৎ হিসেবে দাবি করতে থাকে। প্রচারেই হয় প্রসার। তাই তাদের ক্রমাগত অর্হৎ হিসেবে নিজেদেরকে প্রচারের ফলে বোকা জনগণও তাদেরকে অর্হৎ হিসেবে মানতে থাকে, পূজা করতে থাকে। বুদ্ধের আবির্ভাবের আগে সেরকমই বহু ধর্মগুরু নিজেকে অর্হৎ হিসেবে দাবি করতে থাকে। (চুল্লৰগ্গ.২৫২)
বুদ্ধের সময়ে সেরকম ছয়জন প্রসিদ্ধ ধর্মীয় নেতা ছিলেন। তারাও নিজেদেরকে অর্হৎ বলে দাবি করতেন। তারা দীর্ঘকাল ধরে সন্ন্যাসী হিসেবে জীবন কাটিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে তাদের গড়ে উঠেছিল বহু অনুসারী ও বেশ বড়সড় শিষ্যসঙ্ঘ। লোকজন তাদেরকে খুব বিশ্বাস করত। রাজা অজাতশত্রু একবার তাদের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন।

পূরণকাশ্যপ বলেন, “কর্ম বলতে কিছু নেই!”

এই ছয়জন বিখ্যাত লোকগুরুর মধ্যে প্রথমজন ছিলেন পূরণকাশ্যপ। তিনি ছিলেন দাসীর সন্তান। তার মনিবের তখন নাকি ৯৯জন দাস ছিল। তার জন্মের মাধ্যমে শততম দাস পূর্ণ হলো। তাই তার নাম রাখা হলো ‘পূরণ’। কাশ্যপ ছিল তার গোত্রের নাম। তিনি একদিন তার দাসত্ব থেকে পালিয়ে গেলেন। পথে ডাকাতেরা তার কাপড়চোপড় সব কেড়ে নিল। তিনি লতাপাতা দিয়ে নিজেকে না ঢেকে জন্মদিনের পোশাকে এক গ্রামে পৌঁছে গেল। তাকে এই অবস্থায় দেখে গ্রামের লোকজন ভাবল, ‘এই শ্রমণ হচ্ছেন অর্হৎ। তিনি এত অল্প ইচ্ছা করেন যে কাপড় পর্যন্ত ব্যবহার করেন না। এর মতো কেউ নেই।’ এই ভেবে তারা খাদ্যদ্রব্য নিয়ে তার কাছে গিয়ে হাজির হলো। পূরণ কাশ্যপ ভাবলেন, ‘কাপড়চোপড় পরি না বলেই এই জিনিসগুলো আমার লাভ হলো।’ তাই সেই থেকে তিনি আর কাপড়চোপড় পেলেও পরিধান করতেন না। এভাবেই শুরু হয়েছিল তার সংসারত্যাগী প্রব্রজ্যা জীবন। তার কাছে একজন দুজন করে শিষ্য হতে হতে একসময় পাঁচশজন শিষ্য গড়ে উঠল। লোকগুরু হিসেবে তার নাম ছড়িয়ে পড়ল। (সা.দী.টীকা.৩.২৫২)
তার খ্যাতি শুনে রাজা একদিন গেলেন এই পূরণকাশ্যপের কাছে। তাকে রাজা জিজ্ঞেস করলেন, “মাননীয় কাশ্যপ, নানা ধরনের শিল্পবিদ্যা আছে, যেগুলো শিখলে ইহজন্মেই তার ফল পাওয়া যায়। সেগুলোর মাধ্যমে টাকাপয়সা আয় করে নিজেও সুখে থাকা যায়, মা-বাবা এবং স্ত্রীপুত্রকেও সুখে ভরণপোষণ করা যায়, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের সাথেও সুখে থাকা যায়, শ্রমণ-ব্রাহ্মণকে দান দিয়ে স্বর্গে উৎপত্তির কর্ম করা যায়। এভাবে শিল্পবিদ্যা শিখলে ইহজীবনেই তার ফল লাভ হয়। আপনার ধর্মেও কি এরকম ইহজীবনেই ফল লাভ হয় বলে দেখানো যায়?”
পূরণকাশ্যপ বললেন, “মহারাজ, প্রাণিহত্যা, চুরিডাকাতি, ছিনতাই, ব্যভিচার, মিথ্যা বললে তাতে কোনো পাপ নেই। আবার দান করলে, সম্মান প্রদর্শন করলে, সেবা করলেও তাতে কোনো পুণ্য নেই। দান, শীল, ভাবনা ও সত্যকথায় কোনো পুণ্য হয় না।” এভাবে পূরণকাশ্যপ কর্মকে স্বীকার করতেন না।
রাজা জিজ্ঞেস করেছিলেন ইহজন্মে ফল লাভ হয় কিনা। কিন্তু পূরণকাশ্যপ সেকথার উত্তর না দিয়ে এককথায় বলে দিলেন কর্ম বলতে কিছু নেই। তাহলে আর সন্ন্যাসী হয়েই বা লাভ কী? তাদেরকে অভিবাদন করেই বা লাভ কী? তাদেরকে দান দিয়েই বা লাভ কী? রাজা বেজার হয়ে কিছু না বলে চলে এলেন। (দী.নি.১৬৫-১৬৬)

মক্খলিগোসাল বলেন, “সবই নিয়তি!”

দ্বিতীয় লোকগুরু ছিলেন মক্খলিগোসাল। তিনিও ছিলেন দাসীর পুত্র। গোশালায় জন্ম বলে তার আরেক নাম গোসাল। একদিন তিনি তেলের কলসি নিয়ে কাদাময় পথে যাচ্ছিলেন। তার মনিব তাকে সতর্ক করলেন, ‘বাপু, পিছলে পড়ে যেও না।’ কিন্তু মক্খলি ঠিকই পিছলে গিয়ে আছাড় খেলেন। আছাড় খেয়ে ভয়ে মক্খলি পালাতে লাগলেন। মনিব তখন পিছে পিছে তাড়া করে তার পরনের কাপড়ের কোণাটা ধরে ফেললেন। অবস্থা বেগতিক দেখে মক্খলি তখন কাপড় ফেলে নগ্ন হয়ে পালিয়ে গেলেন। লতাপাতা দিয়ে নিজেকে না ঢেকে জন্মদিনের পোশাকে সে এক গ্রামে পৌঁছে গেলেন। পূরণকাশ্যপের মতোই তাকেও লোকজন অর্হৎ মনে করল। ক্রমান্বয়ে তার পাঁচশ শিষ্য হলো। (অঙ্গু.টী.০৩.১৩৮-১৪৩)
রাজা একদিন গেলেন এই মক্খলিগোসালের কাছে। তাকেও রাজা জিজ্ঞেস করলেন ইহজন্মেই ধর্মের ফল লাভ হয় বলে দেখানো যায় কিনা। মক্খলিগোসাল বললেন, ‘মহারাজ, কোনো হেতু বা কারণ ছাড়াই সত্ত্বরা কলুষিত বা বিশুদ্ধ হয়। প্রচেষ্টায় কিছু হয় না। নিয়তি মোতাবেক যা হবার তা হবেই। মুর্খ হোক, পণ্ডিত হোক তারা চুরাশি হাজার কল্প জন্ম জন্মান্তরে ঘুরে ঘুরে দুঃখ থেকে মুক্ত হবে। তার বেশিও নয়, কমও নয়।’ (দী.নি.১৬৭-১৬৯)। শুনে রাজা আর কিছু বললেন না। তিনি নিরবে চলে গেলেন।

অজিত কেশকম্বল বলেন, “কর্মফল বলতে কিছু নেই!”

তৃতীয় লোকগুরু ছিলেন অজিত কেশকম্বল। অজিত হচ্ছে তার আসল নাম। মানুষের চুলের তৈরী কম্বল ব্যবহার করতেন বলে তার নাম হয় অজিত কেশকম্বল। অঙ্গুত্তর নিকায়ে (অ.নি.৩.১৩৮) বুদ্ধ বলেন, ‘ভিক্ষুগণ, যত ধরনের বস্ত্র আছে তার মধ্যে মানুষের চুলের তৈরী কেশকম্বল হচ্ছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানের। সেগুলো ঠাণ্ডার সময়ে ঠাণ্ডা, গরমের সময়ে গরম, দেখতে বিশ্রী, দুর্গন্ধ, অস্বস্তিকর!’ (সা.দী.টীকা.৩.২৫২)
তো, রাজা একদিন গেলেন এই অজিতের কাছে। তাকেও রাজা জিজ্ঞেস করলেন ইহজন্মেই ধর্মের ফল লাভ হয় বলে দেখানো যায় কিনা। অজিত কেশকম্বল বললেন, ‘মহারাজ, দান ও পূজার ফল নেই, ভালোমন্দ কর্মের ফল নেই, পরকাল বলে কিছু নেই, মাতাপিতাকে সেবা করার কোনো ফল নেই, দেবতা বলতে কিছু নেই, এমন কোনো শ্রমণ ব্রাহ্মণ নেই যিনি নিজে দেখেশুনে ইহকাল পরকালের সবকিছু বলে দিতে পারেন। এই দেহ হচ্ছে চারিধাতু দিয়ে গঠিত। মরে গেলে পৃথিবীধাতু পৃথিবীতে চলে যায়, পানিধাতু পানিতে চলে যায়, তেজধাতু তেজে চলে যায়, বায়ুধাতু বায়ুতে চলে যায়। মনটা তখন আকাশে ঘুরে বেড়ায়। তাকে খাটিয়ায় শুইয়ে শ্মশানে নেয়া হয়। শ্মশান পর্যন্ত তার দেহকে দেখা যায়। এরপর আগুনে পুড়ে তা ছাই হয়ে যায়। কবুতরের ডানার মতো সাদা হয়ে হাড়গুলো অবশিষ্ট থাকে মাত্র। যাকে এত দানদক্ষিণা দেয়া হলো শেষ পর্যন্ত তার ফল পাওয়া গেল কেবল কিছু ছাই। একারণেই দান দেয়া নিরর্থক। বোকারা দান দেয়, আর পণ্ডিতেরা তা গ্রহণ করে মাত্র। আর কোনো ফল নেই।’ (দী.নি.১৭০-১৭২)

পকুধ কচ্চায়ন বলেন, “সবই হচ্ছে অনাসৃষ্টি!”

চতুর্থ লোকগুরু ছিলেন পকুধ কচ্চায়ন। পকুধ হচ্ছে তার আসল নাম। কচ্চায়ন হচ্ছে তার গোত্রের নাম। (সা.দী.টীকা.৩.২৫২) রাজা একদিন গেলেন এই পকুধ কচ্চায়নের কাছে। তাকেও রাজা জিজ্ঞেস করলেন ইহজন্মেই ধর্মের ফল লাভ হয় বলে দেখানো যায় কিনা। পকুধ কচ্চায়ন বললেন, ‘মহারাজ, সাতটি পুঞ্জ আছে। পৃথিবীপুঞ্জ, জলপুঞ্জ, তেজপুঞ্জ, বায়ুপুঞ্জ, সুখপুঞ্জ, দুঃখপুঞ্জ, জীবপুঞ্জ। এই সাতটি পুঞ্জ কারো দ্বারা সৃষ্ট নয়, কারো দ্বারা নির্মিত নয়। সেগুলো অন্য কিছু দ্বারা প্রভাবিত হয় না। যেকোনো কিছুতেই সেগুলো থাকে নির্বিকার। তাই ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কাটলেও কেউ কাউকে হত্যা করে না। চালডালের স্তুপে কোপ দিলে যেভাবে অস্ত্র ঢুকে যায়, তেমনি জীবপুঞ্জের মধ্যেও সেভাবে অস্ত্র ঢুকে যায়। সেখানে ‘আমি একে হত্যা করেছি’ বলাটা কেবল কথার কথা।’ (দী.নি.১৭৩-১৭৫)

নির্গ্রন্থ নাটপুত্র বলেন, “ঠাণ্ডা পানি ব্যবহার করবেন না!”

“আমাদেরকে সংসারে ধরেবেঁধে রাখার মতো কলুষতার গ্রন্থি আর নেই। আমরা কলুষতা গ্রন্থিহীন” এমন দাবি থেকে তার নাম হয় নির্গ্রন্থ। নাটের পুত্র বলে তার নাম নাটপুত্র। তিনি ঠাণ্ডা পানি ব্যবহার করতেন না। পায়খানা সেরে গরম পানি পেলে গরম পানি দিয়ে ধোয়ামোছার কাজ করতেন। গরম পানি না পেলে ধুতেন না। নদী বা রাস্তায় পানি অতিক্রম করতে হলে বালির স্তুপে ‘আমার শীল ভঙ্গ হয়েছে’ বলে অধিষ্ঠান করে যেতেন। (সা.দী.টীকা.৩.২৫২)
রাজা একদিন গেলেন এই নির্গ্রন্থ নাটপুত্রের কাছে। তাকেও রাজা জিজ্ঞেস করলেন ইহজন্মেই ধর্মের ফল লাভ হয় বলে দেখানো যায় কিনা। নির্গ্রন্থ নাটপুত্র নিজেকে দেখিয়ে বললেন, ‘মহারাজ, নির্গ্রন্থ চারটি ক্ষেত্রে সংযত থাকেন। তিনি ঠাণ্ডাপানি ব্যবহার থেকে বিরত থাকেন। সকল প্রকার পাপ থেকে বিরত থাকেন। সকল প্রকার পাপ থেকে বিরত থেকে পাপবিধৌত করেন। সকল প্রকার কর্ম ক্ষয় করে বিশুদ্ধ হয়ে মোক্ষ প্রাপ্ত হয়ে অবস্থান করেন। একারণেই নির্গ্রন্থ হচ্ছেন মোক্ষপ্রাপ্ত, সংযত ও সুপ্রতিষ্ঠিত।’ (দী.নি.১৭৬-১৭৮)

সঞ্চয় বেলট্ঠপুত্র বলেন, “আমি কিছু বলি না!”

সঞ্চয় হচ্ছে তার নাম। বেলট্ঠের পুত্র বলে তার নাম বেলট্ঠপুত্র।(সা.দী.টীকা.৩.২৫২)
রাজা একদিন গেলেন এই সঞ্চয় বেলট্ঠপুত্রের কাছে। তাকেও রাজা জিজ্ঞেস করলেন ইহজন্মেই ধর্মের ফল লাভ হয় বলে দেখানো যায় কিনা। সঞ্চয় বেলট্ঠপুত্র বললেন, ‘পরকাল আছে কিনা জিজ্ঞেস করলে পরকাল আছে বলে আমি বলি না, নেইও বলি না, আছেও নেইও বলি না। হয় বলেও বলি না। নয় বলেও বলি না, হয় বা নয় বলেও বলি না। দেবতা আছে কিনা, ভালোমন্দ কর্মের ফল আছে কিনা, মরণের পরে তথাগত থাকেন কিনা সেরকম জিজ্ঞেস করলেও আমি আছে বলি না, নেইও বলি না। আছেও নেইও বলি না। হয় বলে বলি না, নয় বলেও বলি না। হয়ও নয়ও বলেও বলি না।’ (দী.নি.১৭৯-১৮১)
বুদ্ধের সময়ে এই ছয়জন বিখ্যাত ধর্মীয় গুরু ছিলেন। তাদের মধ্যে প্রথমজনের পাপকর্ম ও পুণ্যকর্মে বিশ্বাস ছিল না। দ্বিতীয়জন নিয়তিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তৃতীয়জন কর্মফলে বিশ্বাস করতেন না। চতুর্থজনকে বস্তুবাদী বলা চলে। পঞ্চমজন মোটামুটি কর্ম ও কর্মফলে বিশ্বাস করতেন, কিন্তু ভ্রান্ত ধারণার পথিক ছিলেন। ষষ্ঠজন তো চালাক। তিনি নিজের অজ্ঞতাকে কারো কাছে প্রকাশ করতে নারাজ। তাই কোনোটাই ঠিক করে বলেন না। আর লোকজন ভাবে, বা:, এটাও নয়, ওটাও নয়, কোনোটাই নয়! কী দারুণ থিওরি! এভাবে তারা সবাই ভুল ধারণা পোষণ করতেন। লোকজনকেও সেগুলো বুঝাতেন।
পরবর্তী পোস্টে আমি সৃষ্টিকর্তার তত্ত্বের ব্যাপারে লিখব। তার আগে এই বিষয়গুলো জানা থাকলে ভালো। তাই এখানে এগুলো লিখে দিলাম। আশা করি বুঝতে পারবেন সবাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *