আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

গাছের কি প্রাণ আছে?

জগদীশচন্দ্র বসু তো সেই ১৯০১ সালে প্রমাণ করে দিয়েছেন গাছের প্রাণ আছে। তাই শুধু বিজ্ঞানীরা নয়, আধুনিককালের লোকজনও এক কথায় বলে দেয়, গাছের প্রাণ আছে। বুদ্ধের আমলেও লোকজন এমন বিশ্বাস করত। কিন্তু বৌদ্ধধর্ম এব্যাপারে কী বলে?

বুদ্ধের আমলে অনেক ভিক্ষু গাছ কেটে কুটির বানাচ্ছিল। এতে লোকজন নিন্দা করতে লাগল। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে বুদ্ধ তখন ভিক্ষুদেরকে গাছ কাটতে নিষেধ করে দিলেন (পাচি.৮৯)। তিনি ভিক্ষুদেরকে বকা দিলেন এভাবে, ‘হতচ্ছাড়ার দল! কীভাবে তোমরা গাছ কাটতে পারলে? অন্যদের দিয়েও কাটালে? লোকজন গাছপালাকে জীবিত বলে মনে করে। তাই তোমাদের এধরনের কাজে শ্রদ্ধাহীনদের শ্রদ্ধা তো জাগবেই না, বরং তারা আরো দূরে সরে যাবে। আর যারা শ্রদ্ধাশীল তাদেরও কারো কারো শ্রদ্ধা কমে যাবে।’

বুদ্ধের বকাঝকার স্টাইলটা দেখুন। তিনি কিন্তু বলেন নি যে গাছপালার জীবন আছে। তিনি শুধু বলেছেন, লোকজন মনে করে গাছপালারও জীবন আছে। তাই এখন যদি ভিক্ষুরা লোকজনের মতামতের তোয়াক্কা না করে নির্বিচারে গাছ কাটা শুরু করে দেয় তাহলে নিন্দার ঝড় বয়ে যাবে। তাতে লোকজনের মধ্যে অনেকেরই ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা আরো কমে যাবে। একারণেই বুদ্ধ ভিক্ষুদেরকে গাছ কাটতে নিষেধ করেছিলেন। ফলে এখন সামান্য পাতা ছিঁড়লেও ভিক্ষুদের অপরাধ হয়। গাছ কাটা তো দূরের কথা।

কিন্তু সারত্থদীপনী টীকা এব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছে। কেউ মারা গিয়ে গাছ হয়ে জন্মেছে বলে তো বুদ্ধ বলে যান নি। একত্রিশ লোকভূমির মধ্যে প্রাণিরা মারা গিয়ে দেবতা হতে পারে, মানুষ হতে পারে, ব্রহ্মা হতে পারে, প্রেত হতে পারে, অসুর হতে পারে, ইতর প্রাণি হতে পারে, নারকীয় সত্ত্ব হতে পারে, কিন্তু গাছপালা হতে পারে বলে কখনো বলা হয় নি। সারা ত্রিপিটকে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোনো প্রাণি গাছ হয়ে জন্মেছে বলে খুঁজে পাওয়া যায় না। সোজা কথায়, বৌদ্ধধর্ম গাছকে প্রাণি বলে স্বীকারই করে না। তাহলে বুদ্ধ কেন গাছ কাটতে নিষেধ করলেন? এই প্রশ্ন উত্থাপন করে সারত্থদীপনী টীকা তার জবাবও দিয়েছে এভাবে, ভিক্ষুশ্রমণের পক্ষে গাছপালা কাটা বা কোনোভাবে ক্ষতি করা অশোভন। এছাড়াও গাছে বৃক্ষদেরতারা থাকে। গাছ কাটলে তাদের ঘরবাড়িও ভেঙে যায়। এই দুটো কারণেও বুদ্ধ তার শিষ্যদেরকে গাছপালা কাটতে নিষেধ করেছিলেন। (সা.দী.টী.৩.৯০)

কিন্তু বৌদ্ধধর্ম গাছকে প্রাণি বলে স্বীকার করে না, তার ব্যাখ্যাটা কী? এর উত্তর পেয়েছি বার্মায় অভিধর্ম শিখতে শিখতে। ভালো করে বলতে গেলে, অভিধর্মার্থ সংগ্রহ শিখতে গিয়ে। অভিধর্মার্থ সংগ্রহে রূপ বা পদার্থের উপরে একটা অধ্যায় আছে। সেটাতে বিভিন্ন ধরনের পদার্থ ও পদার্থের কণাগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

আরেকটু ভালো করে বললে ব্যাপারটা হচ্ছে এরকম। আমাদের এই জগত হচ্ছে কেবল দুটো জিনিস নিয়ে গঠিত। সেগুলো হচ্ছে মন ও পদার্থ। পদার্থের মধ্যে প্রাণিদেহ (উপাদিন্নরূপ) আছে, জড়বস্তু (অনুপাদিন্নরূপ) আছে। প্রাণিদেহ বলতে বুঝাচ্ছে মানুষ, দেবতা, কীটপতঙ্গ ইত্যাদির দেহ। জড়বস্তু হচ্ছে পৃথিবী, পাহাড় পর্বত, মাটি, পানি, গাছপালা, চন্দ্র, সূর্য ইত্যাদি।

প্রাণিদেহ বা জড়বস্তু যাই হোক না কেন, সবই হচ্ছে পদার্থ এবং সবই অত্যন্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা দিয়ে গঠিত। এদের মধ্যে চারটি হচ্ছে মৌলিক কণা। সেগুলোকে আমরা বলি পৃথিবীকণা, জলকণা, তাপকণা ও বায়ুকণা। তাদের সাথে আরো আছে রূপকণা, শব্দকণা, গন্ধকণা, স্বাদকণা, পুষ্টিকণা, হৃদকণা, পুষ্টিকণা ইত্যাদি কত কত কণা। আমাদের দেহের মধ্যে এই কণাগুলো প্রতিনিয়ত উৎপন্ন হয়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এরা আবার একাকী উৎপন্ন হতে পারে না। বরং গুচ্ছ গুচ্ছ আকারে উৎপন্ন হয়। এই কণাগুচ্ছকে বলা হয় কলাপ। তবে আমি এদেরকে কণাগুচ্ছ বলতেই পছন্দ করি।

উদাহরণস্বরূপ, শুদ্ধঅষ্টক কলাপ বা অষ্টক কণাগুচ্ছে থাকে পৃথিবীকণা, জলকণা, তাপকণা, বায়ুকণা, রূপকণা, গন্ধকণা, স্বাদকণা ও পুষ্টিকণা। আরো অনেক অনেক ধরনের কণাগুচ্ছ আছে যাদের রয়েছে বিভিন্ন ধরনের কাজ। আমি সেসবে যাব না। শুধু অষ্টক কণাগুচ্ছের কথা বললাম, কারণ এই কণাগুচ্ছগুলো দিয়েই এই গাছপালা, নদীনালা, পাহাড় পর্বত, মাটি, পানি, বায়ু ইত্যাদি তৈরি। জড়পদার্থে কেবল এই কণাগুচ্ছগুলো থাকে (অভি.সং.৬.রূপপরিচ্ছেদ.৫০)। গাছপালার মধ্যে আমরা যে অসংখ্য বৈচিত্র্যতা দেখতে পাই তা সবই হচ্ছে এই কণাগুচ্ছের মধ্যে থাকা কণাগুলোর শক্তি বা প্রাবল্যতার তারতম্যের কারণে।

তা বুঝতে গিয়ে আমরা নেত্তিপ্রকরণ অর্থকথার সাহায্য নিতে পারি। নেত্তিপ্রকরণ অর্থকথা বলছে, গাছপালার বিভিন্ন ধরনের পার্থক্য ঘটে মূলত তাদের অভ্যন্তরীণ কণাগুলোর শক্তির তারতম্যের কারণে। একজন সম্যক সম্বুদ্ধ এই পার্থক্যের কারণগুলো সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল থাকেন। তিনি জানেন কোন কণা বেশি প্রবল হওয়ার কারণে এই গাছের কাণ্ড কালো হয়, ওটা সাদা হয়, এটা মসৃণ হয়, ওটা খসখসে হয়, এটা পুরু হয়, ওটা পাতলা হয়। এই এই উপাদান বা কণা বেশি প্রবল হওয়ার কারণে এই গাছের পাতার রং, আকার ইত্যাদি এমন হয়। এই এই উপাদান বা কণা বেশি প্রবল হওয়ার কারণে এই গাছের ফুল নীল হয়, হলদে হয়, লাল হয়, সাদা হয়, সুগন্ধ হয়, দুর্গন্ধ হয়। এই উপাদান বা কণা বেশি হওয়ার কারণে এই গাছের ফল ছোট হয়, ওটার বড় হয়, লম্বা হয়, বেঁটে হয়, সুন্দর আকারের হয়, বিশ্রী আকারের হয়, মসৃণ হয়, খসখসে হয়, সুগন্ধ হয়, দুর্গন্ধ হয়, তেতো হয়, মিষ্টি হয়, কটু হয়, টক হয়, কষা হয়। এই উপাদান বা কণা প্রবল হওয়ার কারণে এই গাছের কাঁটা তীক্ষ্ণ হয়, সুতীক্ষ্ণ হয়, সোজা হয়, বাঁকা হয়, কালো হয়, নীল হয়, সাদা হয়। এভাবে উপাদান বা পদার্থের কণাগুলোর মধ্যে শক্তি বা প্রাবল্যতার পার্থক্যের কারণে জড়পদার্থগুলো ভিন্ন ভিন্ন হয় বলে সম্যক সম্বুদ্ধ জানেন। তবে এগুলো কেবল সর্বজ্ঞ বুদ্ধগণেরই জ্ঞানবল। এই জ্ঞান অন্যদের থাকে না। অন্যরা এগুলো জানতে পারে না। এমনকি পচ্চেকবুদ্ধ এবং বুদ্ধের শিষ্যরাও নয়। আর সাধারণ মানুষ তো নয়ই। (নেত্তি.অ.৫৯)।

কিন্তু এগুলো তো সব বইয়ের কথা। বিজ্ঞান তো পরীক্ষা নিরীক্ষা করে প্রমাণ করে দেয়। অভিধর্মেও কি সেরকম পরীক্ষা করে দেখা যাবে? সহজ উত্তর, দেখা যায় এবং যাবে। সেটা কীভাবে? পদার্থের কণাগুলো খুব ক্ষুদ্র। সেগুলোকে খালি চোখে দেখা যায় না। দেখতে হয় ধ্যানের আলোতে। সেই ধ্যানের আলোতে আপনি যখন যথানিয়মে চারপাশকে দেখবেন, সেখানে আর ব্যক্তি থাকবে না, প্রাণি থাকবে না। আপনি তখন সবকিছুকে পদার্থের কণাগুচ্ছ হিসেবে দেখবেন। আপনি দেখবেন আপনার পরনের কাপড়চোপড়ও কলাপ বা কণাগুচ্ছে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। সেগুলো খুব দ্রুতগতিতে উৎপন্ন হয়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আপনি গাছপালাগুলোকে অস্বচ্ছ কণাগুচ্ছ হিসেবে দেখবেন। সেগুলোর ফাঁকে ফাঁকে স্বচ্ছ জিনিসকেও দেখতে পাবেন যেগুলো হচ্ছে গাছপালার মধ্যে থাকা পোকামাকড়ের দেহ। এভাবে ধ্যানের আলোয় নিজেই পরীক্ষা করে দেখতে পারবেন নিজের দেহ ও মনকে, এবং গাছপালাকে। সেখানে দেখতে পাবেন, আপনার ও অন্যান্য প্রাণিদের দেহে প্রাণকণাগুলো ছড়িয়ে আছে সারা দেহে, অথচ গাছপালাতে সেগুলো একবিন্দুও নেই। নিজের চোখে ব্যাপারটা দেখলে তখন আর গাছপালার প্রাণ আছে কি প্রাণ নেই সেব্যাপারে আপনার আর কোনো সন্দেহ থাকবে না।

বিস্তারিত জানার জন্য ‘জানা ও দেখা’ বইয়ের মধ্যে পাঅক সেয়াদের ৪নং দেশনাটা পড়তে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *