আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

অর্হতের দেহও পচে যায় – পুনরালোচনা

কিছুদিন আগে সর্বশেষ পচ্চেক বুদ্ধের ব্যাপারে লিখেছিলাম। সর্বশেষ পচ্চেকবুদ্ধ ছিলেন মাতঙ্গ পচ্চেকবুদ্ধ। সিদ্ধার্থের জন্মের পরে এই পচ্চেকবুদ্ধ যখন পরিনির্বাণের জন্য হিমালয়ের এক পর্বতে চলে গেলেন তিনি সেখানে দেখলেন আগে পরিনির্বাপিত হওয়া এক পচ্চেক বুদ্ধের হাড়গোড় পড়ে আছে। তিনি সেগুলো খাদে ফেলে দিলেন। এরপর পাথরের উপর বসে নিজেও পরিনির্বাপিত হলেন। (সুত্তনি.অ.৭৪)

এখানে বিষয়টা একটু ভেবে দেখুন। সেখানে পড়ে ছিল আগে পরিনির্বাপিত হওয়া এক পচ্চেকবুদ্ধের হাড়গোড়। পরিনির্বাণের পরে তার রক্ত মাংস ইত্যাদি পচে গলে মাটিতে মিশে গিয়েছিল। শুধু হাড়গুলো রয়ে গিয়েছিল। একদম সাধারণ মৃতদেহের মতো। ঠিক যেমনটা আমরা সচরাচর দেখে থাকি।

ব্যাপারটা অনেকের বিশ্বাসের ভিত্তিমূলে আঘাত করেছে। তারা এতদিন ধরে জেনে এসেছে অর্হতের দেহ পরম বিশুদ্ধ। তারা আরো জেনে এসেছে, পরিনির্বাপিত হলে অর্হতের দেহ পচে না, বরং ধাতুতে পরিণত হয়। এরকম ধারণা কোত্থেকে শুরু হলো তা বলা মুশকিল কিন্তু অর্হতের মৃতদেহ পচে যায় নি, অবিকৃত রয়ে গেছে এমনটা ত্রিপিটক ও অর্থকথার কোথাও উল্লেখ দেখলাম না।

তবে হ্যাঁ, ত্রিপিটকে সেরকম উল্লেখ না থাকলেও সেটা সম্ভব হতে পারে একটা উপায়ে। আর সেটা হচ্ছে – যদি কোনো অর্হৎ ব্যক্তি পরিনির্বাণের আগে সেরকম অধিষ্ঠান করে যান। দীর্ঘনিকায়ের মহাপরিনির্বাণ সুত্রের অর্থকথায় এরকম একটা অধিষ্ঠানের ঘটনা আছে। সেখানে অবশ্য মৃতদেহের জন্য অধিষ্ঠান করা হয় নি। দুইশ বছর ধরে ফুল, সুগন্ধি ও প্রদীপ অবিকৃত থাকার জন্যই অধিষ্ঠান করেছিলেন মহাকাশ্যপ ভান্তে।

বিষয়টা হচ্ছে এরকম। বুদ্ধের পরিনির্বাণের পরে তার ধাতুগুলো রাজগিরের পূর্বদক্ষিণে একটা চৈত্যের মধ্যে সংগ্রহ করে রাখা হয়েছিল। তার চারপাশে হাজারো জলজ এবং স্থলজ ফুল ছিটানো হয়েছিল। হাজারো সুগন্ধি তেলের প্রদীপ জ্বালানো হয়েছিল। এরপর মহাকাশ্যপ ভান্তে অধিষ্ঠান করলেন, ‘এই ফুলগুলো শুকিয়ে না যাক, সুগন্ধি বিনষ্ট না হোক, প্রদীপগুলো নিভে না যাক।’ ২১৮ বছর পরে সম্রাট অশোক ৮৪০০০ বিহার নির্মাণ করার উদ্দেশ্যে সেই চৈত্যের দরজা খুলে দেখলেন প্রদীপগুলো তখনো জ্বলছে। ফুলগুলো তখনো তাজা রয়েছে, যেন মাত্র এসে কেউ ফুল দিয়ে ধাতুপূজা করে গেছে। সুগন্ধি তখনো অটুট (দী.নি.অ.২.২৪০)। এতবছর ধরে সময় যেন সেই চৈত্যের মধ্যে আক্ষরিক অর্থেই থমকে গেছে। এমনই হচ্ছে অধিষ্ঠানের শক্তি।

এই সুত্র ধরে বলা যায়, অধিষ্ঠানের বলে ফুল, সুগন্ধি ও প্রদীপ যেমন অটুট থাকতে পারে, তেমনি পরিনির্বাণের আগে অধিষ্ঠান করে গেলে মৃতদেহও অবিকৃত থাকতে পারে। মিলিন্দপ্রশ্নের মধ্যে নাগসেন ভান্তেও পরোক্ষভাবে সেরকম বলে গেছেন (মিলিন্দ.৫. অনুমানপঞ্হো.৭)। তবে আমি আবারও বলি, সেরকম অধিষ্ঠান কেউ করে গেছে বলে ত্রিপিটকে বা অর্থকথার কোথাও উল্লেখ দেখা যায় না।

আবার আরেকটা বিষয় আছে এখানে। অধিষ্ঠান করে গেলে সাধারণত মৃতদেহ একদম জীবন্তের মতো দেখানোর কথা। মহাকাশ্যপ ভান্তের অধিষ্ঠানের ফলে ফুলগুলো একদম তাজা রয়ে গিয়েছিল, সুগন্ধি তখনো ছিল, প্রদীপগুলো তখনো জ্বলছিল। এই হিসেবে কেউ যদি অধিষ্ঠান করে যায়, ‘আমার মৃতদেহ পচে না যাক’ বা ‘আমার মৃতদেহ অটুট থাকুক’ তাহলে সেটা সেরকম অবস্থাতেই থাকার কথা। একদম জীবন্ত বা ঘুমিয়ে আছে এরকম দেখানোর কথা। কিন্তু বার্মায় আমি এরকম দুয়েকজনের মৃতদেহ অবিকৃত অবস্থায় দেখেছি সেগুলোর কোনোটাই এমন জীবন্ত বা ঘুমন্ত বলে মনে হয় নি। তাই এই যুক্তিতেও অর্হত্বের প্রশ্নে সন্দেহের অবকাশ থেকে যায়।

আরেকটা বিষয় লক্ষণীয়। অধিষ্ঠানের এই শক্তি আসে কীসের কারণে? ধ্যানবলে। কিন্তু শুধু অর্হৎদেরই যে এমন ধ্যানবল থাকে তা তো নয়। অন্যান্য ধ্যানলাভীরাও সেরকম অধিষ্ঠান করে যেতে পারে। কোনো ধ্যানলাভী ব্যক্তি যদি মৃত্যুর আগে অধিষ্ঠান করে যায়, তাহলে তার দেহও সেরকম অবিকৃত থাকাটাই স্বাভাবিক। তখন সেই অবিকৃত মৃতদেহ দেখে কি বুঝার উপায় থাকে যে সে অর্হৎ নয়, চতুর্থধ্যান লাভ করেছে মাত্র? তখন প্রচলিত কথা মোতাবেক তাকে তো অর্হৎদের দলেই ফেলা হবে!

আরেকটা বিষয় আছে। দেবতাদের অধিষ্ঠানেও কোনোকিছু অবিকৃত রয়ে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, নন্দমাতার গাথা আবৃত্তি শুনে মহারাজা বৈশ্রবন নন্দমাতার ধান্যাগার পূর্ণ করে দিয়ে অধিষ্ঠান করেছিলেন, ‘উপাসিকা যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন যেন ঊন না হয়।’ এরপর থেকে নন্দমাতার ধান্যাগার কখনোই অপূর্ণ থাকে নি। (অঙ্গুত্তরনিকায (অট্ঠকথা)=>সত্তকনিপাত-অট্ঠকথা=>৫. মহাযঞ্ঞৰগ্গো.৫৩)

অতএব দেখতেই পাচ্ছেন, এখানে পচে যাওয়ার অনেকগুলো সম্ভাব্য কারণ থাকতে পারে। তাই সেটা দিয়ে কখনোই একজনের অর্হত্বকে পরিমাপ করা যায় না। একারণেই আমি বলি, মৃতদেহ পচে গেল কি অবিকৃত রয়ে গেল সেটা কখনোই একজনের অর্হত্ব লাভের মাপকাঠি নয়। আমি আরও বলি, অর্হৎদের দেহ পচে না সেটা একটা ভ্রান্ত ধারণা মাত্র। এরকম ভ্রান্ত ধারণা এই বার্মাতেও বহুল প্রচলিত। কিন্তু ত্রিপিটক তা বলে না। ত্রিপিটকের ঘটনাগুলো বলে দেয়, দাহ না করলে এবং অধিষ্ঠান না করলে অর্হৎদের দেহও পচে যায়, গলে যায়। কিন্তু যারা অন্ধভাবে এসব বিশ্বাস করে তারা তবুও হৈচৈ করতে থাকে। আচ্ছা, তারা দাবি করছে বলেই কি ত্রিপিটকের কথাগুলো বদলাবে? তারা চায় ত্রিপিটক তাদের বিশ্বাস অনুসারে চলুক। তাদের মতামত অনুসারেই ত্রিপিটক রচিত হোক। কিন্তু আমি বলি, তাদেরই বরং ত্রিপিটক অনুসারে নিজ নিজ ভ্রান্ত ধারণাগুলোকে বদলে ফেলা উচিত।

1 thought on “অর্হতের দেহও পচে যায় – পুনরালোচনা

  1. ভান্তে, বন্দনা।

    “*নির্বাণ প্রাপ্তির পর অরহৎ গণের শরীর কিরূপ হয়???

    (এই আর্টিকেলটি পড়বেন। পড়ার পর পরই শেয়ার করবেন)

    ===> বিখ্যাত বৌদ্ধ ধর্মীয় গ্রন্থ ‘সারসংগ্রহ’র ৭৬ পৃষ্ঠার বলা হয়েছে- “সুত্র পিটকের ধনিয় সুত্রার্থ বর্ণনায় বর্ণিত হইয়াছে যে—ক্ষীণাশ্রবদিগের মৃত শরীরও দুর্গন্ধ হয় না অর্থাৎ মানুষ যেই ক্লেশের দ্বারা ক্লিষ্ট হয়, সেই ক্লেশের দ্বারাই তাহারা দুর্গন্ধ হইয়া থাকে। অপিচ যাহাঁরা ক্লেশ বিহীন, তাঁহাদের মৃত শরীরও দুর্গন্ধ হয় না।”

    ===> পালি টেক্সট সোসাইটির পিটকীয় পুস্তক গুলোর মধ্যে সুত্রনিপাত অর্থকথার ১.২৭৮ পৃষ্ঠা হতে ১.২৯৩ পৃষ্ঠার ‘আমগন্ধ সূত্র বর্ণনা’র দুটি বিশেষ অংশ নিম্নে উল্লেখ করছি-

    ১. ‘‘কো সো, ব্রাহ্মণ, আমগন্ধো নামা’’তি? ‘‘মচ্ছমংসং, ভো গোতমা’’তি। ভগৰা ‘‘ন, ব্রাহ্মণ, মচ্ছমংসং আমগন্ধো। অপিচ খো আমগন্ধো নাম সব্বে কিলেসা পাপকা অকুসলা ধম্মা’’তি।”
    ২. “অমনুঞ্ঞত্তা কিলেসঅসুচিমিস্সকত্তা সব্ভি জিগুচ্ছিতত্তা পরমদুগ্গন্ধভাৰাৰহত্তা চ। যে হি উস্সন্নকিলেসা সত্তা, তে তেহি অতিদুগ্গন্ধা হোন্তি, নিক্কিলেসানং মতসরীরম্পি দুগ্গন্ধং ন হোতি, তস্মা এসামগন্ধো।”

    প্রথম অংশটিতে বলা হচ্ছে- আমাদের শরীরের মাংসের গন্ধ হয় ক্লেশ নামক সর্ব প্রকারের পাপমূলক অকুশল ধর্মের কারণে।
    দ্বিতীয় অংশটিতে বলা হচ্ছে- ক্লেশের কারণেই শরীর দুর্গন্ধ হয়। তবে ক্লেশবিহীনের (অরহৎ গণের) মৃত শরীরও দুর্গন্ধ হয় না।

    ===>পরমত্থজোতিকায খুদ্দক-অট্ঠকথায আরো বলা হয়েছে-
    অতীতে কাশ্যপ বুদ্ধও একই কথা ভাষণ করেছিলেন তিষ্য নামক ব্রাহ্মণকে। যিনি পরে বুদ্ধের শ্রাবক হন।

    ===> বিপস্সানা রিসার্চ ইন্সটিউটের পিটকীয় গ্রন্ধ গুলোর মধ্যে অঙ্গুত্তর একক নিপাত টীকার “রাহুল-রট্ঠপালত্থেরৰত্থুর” ১.১৫৪ পৃষ্ঠায় এই বিষয়ে সহমত প্রদর্শন করা হয়েছে।

    তাই আমাদের জানা উচিত আমরা যারা ক্লেশে পরিপূর্ণ তাদের শরীরই দুর্গন্ধ যুক্ত হবে। কিন্তু যাঁরা অরহৎ হবেন তাঁদের মৃত শরীরও দুর্গন্ধযুক্ত হবে না। পঁচবে না। কারণ পঁচার মত, গন্ধ হবার মত যে উপাদান আমাদের রয়েছে তাঁদের অচিন্তেনীয় প্রজ্ঞা গুণে তা বিলীন প্রাপ্ত হয়। ফলে তাঁদের মৃত শরীর হয় দুর্গন্ধমুক্ত।

    *তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে অরহৎ গণের মৃত শরীর কিরূপ হয়?

    ===> সাধারণতঃ অরহৎ গণের মৃত শরীর ধাতুতে পরিণত হয়। অনেকে বলে থাকেন অধিষ্ঠান করলে ধাতু হয় অন্যথায় ধাতু হয় না। কথাটি পুরোপুরি সত্য নয়। তবে এই অর্থে সত্য যে, সেক্ষেত্রে ধাতু স্থায়ী (বিশেষ সময়ের জন্য) হবার জন্য অধিষ্ঠান না করলে তাঁর শরীরও খুঁজে পাওয়া যাবে না। শরীরের কোন অংশ বিশেষ আমরা খুঁজে পাব না। অরহৎ ‘দব্ব’ এর শরীর আকাশেই অর্ন্তধান হয়। তাই ঐ ধাতু খুঁজে পাওয়া যায় নি। কারণটি অনুধাবন করা যায় তাঁর ধাতু স্থায়ী হবার জন্য তিনি অধিষ্ঠান করেন নি। কিন্তু শরীর থাকবে ধাতু হবে না, পঁচে যাবে, দুর্গন্ধ হবে এমন হলে মনে করতে হবে তিনি অরহৎ নন।

    এ প্রসংগে বলি, অনেকেরেই ধারণা বুদ্ধ এবং অরহতের চিত্তই পরিশুদ্ধ, দেহ নয়। অর্থাৎ দেহ পঁচে যাবে, দুর্গন্ধ হবে এবং পরিশুদ্ধ নয়। যদি এরূপ কেউ ধারণা করেন তারা হবেন মিথ্যা বাদী। সত্য বাদী হচেছ- অরহৎ গণের শরীর পচেঁ না, দুর্গন্ধ হয় না। জীবন্ত অবস্থায় তাঁরা যেমনটি ছিলেন ঐরূপই থাকবেন। তাই তাঁদেরকে ফরমালিন, বরফ ইত্যাদি দিয়ে রাখারও দরকার নাই। কেননা না পচঁলে, দুর্গন্ধ না হলে ফরমালিন দেয়ার কি প্রয়োজন?

    পঞ্চম সংগীতিকারক প্রধাণ বার্মার বিদর্শণের প্রাণ সঞ্চারণকারী অগ্রমহাপন্ডিত শ্রীমৎ লেটি সেয়াদ তার ‘উত্তম পুরুষ দীপনী’ নামক গ্রন্থে লিখেছেন-

    Uttamapurisa-dīpanī, a treatise on the attributes of ariyas written in 1900, he asserted,
    … [B]efore attaining buddhahood the Blessed One’s aggregates were tainted with the corruption of the kilesas and the grime of kamma. After attaining buddhahood no such corruption or grime remained…
    [It is for this reason that] the corpses of buddhas and arahants neither decay nor emit foul odor, instead they remain fresh just as when they were alive… Their mental aggregates are utterly purified and so generate physical bodies that are pure… [Therefore] do not listen to the heretical doctrine (micchā-vāda) that claims that only the enlightened mind is the Buddha and that the body is not the Buddha.

    Although both the Buddha and the Arahant eat the same kind of food as
    non-Arahants, the purity of the aggregates of mind in the former produce
    Materiality born of pure consciousness, which is as pure and clear as sterilized cotton-wool.

    *ধাতু সম্পর্কে আরো বিশদ ব্যাখা করছি-

    ===> নির্বাণ তিন ভাবে হয়। যথা: ক্লেশ পরিনির্বাণ, স্কন্ধ পরিনির্বাণ এবং ধাতু পরিনির্বাণ। গৌতম বুদ্ধ ছয় বৎসর কঠোর সাধনা করার পর বোধিপালংকে `ক্লেশ পরিনির্বাণ` প্রাপ্ত হয়েছিলেন। কুশিনারায় ৮০ বছর বয়য়ে `স্কন্ধ পরিনির্বাণ` প্রাপ্ত হয়েছিলেন। `ধাতু পরিনির্বাণ` এখনো হয় নি। তা হবে আরো ২৪০০ বৎসর মত রয়েছে। নির্বাণের ক্ষেত্রে বুদ্ধ এবং অরহৎ গণের সাথে যদি তেমন পার্থক্য না থাকে। তবে তাদের ক্ষেত্রেও যদি একই ভাবে নির্বাণ হয় তাহলে অরহৎ গণের স্কন্ধ নির্বাণের পর ধাতু হয়ে নির্বাণ অনিবার্য যা নিয়ে বর্তমানে অহরহ বির্তক হয়।

    যেহেতু নির্বাণ মানে নিভে যাওয়া সেই অর্থে চিন্তা করলে ক্লেশ নির্বাণ, স্কন্ধ নির্বাণ এবং ধাতু নির্বাণ তিনটির ক্ষেত্রেই নিভে যাওয়া নির্দেশ করবে। বুদ্ধের ধাতু নির্বাণ হয়ে গেলে আমরা সেই ধাতু সমূহ আর দেখব না। সেগুলোর আর কোন অস্থিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না।

    অনেকেই এই ধাতু নির্বাণ সঠিক ভাবে অনুধাবন করেন না। অনেকে বলেন ধাতু নির্বাণ ইচ্ছাধীন। অর্থাৎ ইচ্ছা করলে ধাতু হয়, ইচ্ছে না হলে হয় না। আমি এরূপ উদাহরণ অনেক অনুসন্ধানের পরও পাই নি। অরহৎ ভিক্ষু ‘দব্ব’ এর ধাতু নির্বাণ হয় নি তাও বলা যায় না। মূলতঃ নির্বাণের ব্যাখা অনুসারে তাঁরও ধাতু নির্বাণ হয়েছিল তবে তা হয়েছিল স্কন্ধ নির্বাণের সাথে সাথেই। অর্থাৎ খুব অল্প স্থায়ী ধাতু নির্বাণ। দীর্ঘ স্থায়ী ধাতু নির্বাণ হচ্ছে মহাকাশ্যপের যিনি অধিষ্ঠান করেছেন তাঁর দেহ ধাতু আর্যমিত্র বুদ্ধ হাতে নিবেন। অর্থাৎ তাঁর ধাতু এক বুদ্ধান্তরকাল স্থায়ী হবে। অর্থাৎ সংক্ষেপে আমি বলতে চাচ্ছি ‘ধাতু নির্বাণ’ ব্যতীত কেউ নির্বাণ লাভ করেছে এমন বলা চলে না।

    *সম্যক সম্বুদ্ধের ধাতু কিরূপ হবে তার বর্ণনায় মধ্যমনিকায় অর্থকথায় বলা হয়েছে-
    ===> “অপ্পাযুকবুদ্ধানঞ্হি সরীরধাতু ন একগ্ঘনা হোতি। অধিট্ঠানানুভাৰেন ৰিপ্পকিরিযতি। তেনেৰ অম্হাকম্পি ভগৰা, – ‘‘অহং ন চিরট্ঠিতিকো, অপ্পকেহি সত্তেহি অহং দিট্ঠো, যেহি ন দিট্ঠো, তেৰ বহুতরা, তে মে ধাতুযো আদায তত্থ তত্থ পূজেন্তা সগ্গপরাযণা ভৰিস্সন্তী’’তি পরিনিব্বানকালে, ‘‘অত্তনো সরীরং ৰিপ্পকিরিযতূ’’তি অধিট্ঠাসি। দীঘাযুকবুদ্ধানং পন সুৰণ্ণক্খন্ধো ৰিয একগ্ঘনং ধাতুসরীরং তিট্ঠতি।”

    আমি বাংলায় বলছি: কিছু বুদ্ধ আছেন যাদের আয়ু দীর্ঘ হয় যেমন: কাশ্যপ সম্যকসম্বুদ্ধ। আবার কিছু আছেন আয়ু সল্প হয় যেমন: গৌতম বুদ্ধ। উভয় বুদ্ধের ক্ষেত্রেই শরীর ধাতু হয়। কারণ আমি আগেই বলেছি নির্বাণ তিন প্রকার। তবে ধাতু কিরূপ হবে তা নির্ভর করবে বুদ্ধের অধিষ্ঠানের উপর। অর্থাৎ ধাতু হবেই। তবে ধাতু কিরকম হবে এবং কত সময়ের জন্য হবে তা নির্ভর করবে বুদ্ধ/অরহতের উপর। যাদের(সম্যক সম্বুদ্ধের) আয়ু অল্প তাদের শরীর ধাতু এক হয় না। অধিষ্ঠানের কারণে বিভিন্ন ভাবে বিভিক্ত হয়। পরিনির্বাণের সময় অল্পায়ু বুদ্ধের মত আমাদের গৌতম বুদ্ধও অধিষ্ঠান করেছিলেন আমি তো বেশি দিন থাকবো না তাই বেশি সংখ্যক লোক পূজা করে স্বর্গে যাবার জন্য আমার শরীর ধাতু বিভিন্ন ভাগ হউক। কারণ বেশি আয়ু যুক্ত বুদ্ধের মত শরীর ধাতু যদি শুধুমাত্র একটি বিশাল অংশের হয় তাহলে তা শুধু এক জায়গায় যেমন শুধুমাত্র বুদ্ধগয়ায় থাকতো। তাহলে সবাই পূজার সুযোগ পেত না। তাই গৌতম বুদ্ধ এর এই অধিষ্ঠান ছিল যেন শরীর ধাতু অনেক হয়। ফলে ব্রহ্মলোকের বহ্মারা দুস্সা জাদীতে, স্বর্গে চুলামনি জাদী, বাংলাদেশে মহাসুখ প্রার্থণা পূরক বুদ্ধ ধাতু জাদী, রাম জাদী সহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের সবাই পূজার সুযোগ পাচ্ছে।

    শুনলাম বর্তমানে বাংলাদেশে একজন অরহৎ নামধারী ভন্তের মৃত শরীর থেকে নাকি দুর্গন্ধ বের হয়েছে। তাকে ফরমালিন, বরফ প্রভৃতি দিয়ে রাখা হলো। তিনি কিভাবে অরহৎ বুঝলাম না!!! মানুষ আর কত মিথ্যে ‘বিশেষণে” অন্ধ হয়ে থাকবে………..!!! বুঝলাম না দেশে আর কত মিথ্যার উৎপত্তি হবে…………………!

    অ্যাডমিন- রক্তিম বড়ুয়া

    ছবি ১- বুদ্ধের পরিনির্বাণ লাভের মুহুর্ত
    ছবি ২- বুদ্ধের পরিনির্বাণ লাভের পর তখনকার সময়ের সকল রাজাদের গুরু আর্চায্য দ্রোণ ব্রাহ্মণ কতৃক বুদ্ধের মহামূল্যবান দেহ ধাতু বিভিন্ন রাজ্যের রাজাদের ভাগ করে দিচ্ছেন।
    ছবি ৩- মায়ানমারের বিখ্যাত অরহত মোগোক ছেয়াদ ভান্তের নির্বাণের পর দেহ ধাতু।
    ছবি ৪- ভিয়েতনামের বিখ্যাত ৩ জন অরহত ভান্তের শরীর বিনা ওষুধে বছরের পর বছর এই ভাবে আছেন। ওনারা ধ্যান রত অবস্থায় পরিনির্বাপিত হত।
    ছবি ৫- মায়ানমারের আরো একজন বিখ্যাত অরহতের দেহ ধাতু কাঠের মত হয়ে আছেন। যেখানে কোন প্রকার ওষুধ ব্যবহার কিংবা দুর্গন্ধ নাই। উমুক্ত অবস্থায় আছেন প্রতিদিন হাজার হাজার পুজারী দর্শন করেন।”

    লেখাটি এখানে ( https://www.facebook.com/374081582631781/posts/1901502873222970 ) পোস্ট করা হয়েছে। ভান্তে, আসল সত্যটি কী?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *