আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

১৬ প্রকার উপদ্রব

এবারে ১৬ প্রকার উপদ্রবের ব্যাপারে আলোচনা করা যাক। ত্রিপিটকে খোঁজ নিয়ে দেখলাম দুধরনের উপদ্রবের কথা বলা হয়েছে। প্রথম প্রকার উপদ্রবের কথা এসেছে বিনয়পিটকের পারাজিকা গ্রন্থে। সেখানে কুটির বা বিহার প্রতিষ্ঠা করার আগে জায়গাটা উপদ্রবহীন কিনা তা পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছে। সঙ্ঘ গিয়ে সেটাকে পর্যবেক্ষণ করে উপদ্রবহীন বলে রায় দিলে তবেই সেখানে কুটির বা বিহার প্রতিষ্ঠা করা যায়। নাহলে সেগুলো বিনয় মোতাবেক গুরুতর অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। যদিও বর্তমানে কে শোনে কার কথা।

দ্বিতীয় প্রকার উপদ্রবের দেখা মেলে নমক্কার টীকায়। সেখানে ১৬ প্রকার ভয়কেই উপদ্রব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ক্ষমা প্রার্থনায় মূলত এই দ্বিতীয় প্রকার উপদ্রবের কথাই বলা হয়েছে বলে আমার ধারণা।

তবে আসুন প্রথমে জেনে নিই প্রথম প্রকার উপদ্রবের ব্যাপারে। কোনো স্থান কুটির বা বিহার নির্মাণের উপযুক্ত কিনা তা জানার জন্য দুই ধরনের উপদ্রব আছে কিনা দেখতে হয়- প্রাণির উপদ্রব এবং পারিপার্শ্বিক উপদ্রব।

প্রাণির উপদ্রবের মধ্যে রয়েছে ১৩ প্রকার প্রাণির উপদ্রব। সেগুলো হচ্ছে-

১. কীটপতঙ্গ ও সরিসৃপের উপদ্রব: এক্ষেত্রে মূলত পিঁপড়া, উইপোকা ইঁদুর, সাপ, বৃশ্চিক ও কেন্নোর উপদ্রব আছে কিনা দেখতে হয়। কোনো স্থানে যদি তাদের বাসা থাকে তাহলে সেখানে নিত্য তাদের উপদ্রব হয়। তাই সেরকম স্থান পরিহার করা উচিত। কিন্তু যদি সেখানে তাদের বাসা না থাকে, তারা যদি সেখানে বিচরণ করে আবার তাদের বাসায় ফিরে যায় তাহলে সেই স্থান উপদ্রবহীন বলা যায়। তখন তাদেরকে তাড়িয়ে দিয়ে সেখানে বিহার বা কুটির নির্মাণ করা যায়।
২. হাতি ও ঘোড়ার উপদ্রব: হাতি ও ঘোড়া যেখানে নিত্য অবস্থান করে সেখানে তাদের উপদ্রব থাকে। তাই সেই স্থান বসবাসের উপযোগী নয়। শুধু তাই নয়, তারা যেখানে নিত্য চরতে যায় বা তারা যেপথে নিত্য আসাযাওয়া করে সেই স্থানও বসবাসের উপযোগী নয়।
৩. হিংস্র প্রাণির উপদ্রব: সিংহ, বাঘ, চিতাবাঘ, ভালুক, হায়েনা বা বন্যকুকুরের আবাসস্থল ও তাদের নিত্য বিচরণক্ষেত্রে কুটির বা বিহার করা উচিত নয়। এমনকি তাদের নিত্য গমনপথেও এরকম কুটির বা বিহার করা উচিত নয়। সেগুলো হয় উপদ্রবপূর্ণ।
উপরোক্ত ১৩ প্রকার প্রাণির উপদ্রব থাকলে সেই স্থান বিহার বা কুটিরের জন্য অনুপযুক্ত। তাছাড়া অন্য যেকোনো ক্ষতিকর প্রাণির উপদ্রব থাকলে তখনও সেখানে বিহার বা কুটির করা অনুচিত।

পারিপার্শ্বিক উপদ্রব হচ্ছে ১৬ প্রকার। এগুলো হচ্ছে-

1. কুটির বা বিহারের জায়গার চারদিকে ধান, গম ইত্যাদির শস্যক্ষেত্র থাকলে তা কুটির বা বিহার নির্মাণের ক্ষেত্রে উপদ্রব বলে গণ্য হয়।
2. চারদিকে শিম, ডাল ইত্যাদি শস্যক্ষেত্র থাকলে তাও কুটির বা বিহার নির্মাণের ক্ষেত্রে উপদ্রব বলে গণ্য হয়।
3. অপরাধীদেরকে ধরে নিয়ে যেখানে শাস্তি দেয়া হয় সেরকম স্থানের আশেপাশে হলে তাও কুটির বা বিহার নির্মাণের ক্ষেত্রে উপদ্রব বলে গণ্য হয়।
4. বধ্যভূমির আশেপাশে হলে তাও কুটির বা বিহার নির্মাণের ক্ষেত্রে উপদ্রব বলে গণ্য হয়।
5. শ্মশানের আশেপাশে হলে তাও কুটির বা বিহার নির্মাণের ক্ষেত্রে উপদ্রব বলে গণ্য হয়।
6. উদ্যানের আশেপাশে হলে তাও কুটির বা বিহার নির্মাণের ক্ষেত্রে উপদ্রব বলে গণ্য হয়।
7. রাজার জমি হলে তাও উপদ্রব হয়।
8. হাতিশালার আশেপাশে হলে তাও উপদ্রব হয়।
9. ঘোড়াশালার আশেপাশে হলে তাও উপদ্রব হয়।
10. কারাগারের আশেপাশে হলে তাও উপদ্রব হয়।
11. মদের দোকানের আশেপাশে হলে তাও উপদ্রব হয়।
12. মাংসের দোকানের আশেপাশে হলে তাও উপদ্রব হয়।
13. রাস্তার আশেপাশে হলে তাও উপদ্রব হয়।
14. চৌরাস্তার আশেপাশে হলে তাও উপদ্রব হয়।
15. মিলনায়তন বা সভাগৃহের আশেপাশে হলে তাও উপদ্রব হয়।
16. মহাসড়কের আশেপাশে হলে তাও উপদ্রব হয়।

এগুলো মূলত কুটির বা বিহার স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু ক্ষমা প্রার্থনায় যে ১৬ প্রকার উপদ্রব নিঃশেষে বিনষ্ট হওয়ার প্রার্থনা করা হয়, সেগুলোর জন্য আমাদের দেখতে হবে নমক্কার টীকায়। সেখানে বলা হয়েছে, ‘উপদ্দৰা নাম পন সোল়সৰিধা হোন্তি জাতিভযং, জরাভযং, ব্যাধিভযং, মরণভযং, রাজভযং, চোরভযং, অগ্গিভযং, উদকভযং, ঊমিভযং, কুম্ভিলভযং, আৰট্টভযং, সুসুকাভযং, অত্তানুৰাদভযং, পরানুৰাদভযং, দণ্ডভযং, দুগ্গতিভযঞ্চাতি।নম.টী.৩০।’

অর্থাৎ উপদ্রব হচ্ছে ১৬ প্রকার- জন্মভয়, বার্ধক্যভয়, ব্যাধিভয়, মরণভয়, রাজভয়, চোরডাকাতের ভয়, অাগুনের ভয়, পানির ভয়, ঢেউর ভয়, কুমীরের ভয়, ঘূর্ণাবর্তের ভয়, হিংস্র মাছের ভয়, নিজের বিবেকের দংশনের ভয়, অপরের দোষারোপের ভয়, রাজদণ্ডের ভয়, দুর্গতি বা চারি অপায়ের ভয়। এই ভয়গুলো জীবনকে বিপন্ন করে তোলে বলে এগুলো হচ্ছে উপদ্রব। আমাদের সবার এই ১৬ প্রকার উপদ্রব সমূলে বিনষ্ট হোক, শীঘ্রই দুঃখ থেকে মুক্ত হয়ে নির্বাণ লাভ হোক এই কামনা রইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *