আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

বৌদ্ধধর্মে সৃষ্টিতত্ত্ব -৩য় পর্ব: অদৃশ্য জগতটাকে দেখার উপায়

আমার আগের পোস্ট যারা পড়েছেন তারা এখন জানেন যে, পৃথিবীর ৯৫% – ৯৯% হচ্ছে আমাদের কাছে অদৃশ্য। বৌদ্ধধর্ম ও বিজ্ঞান উভয়ই এক্ষেত্রে একমত। পৃথিবীর সেই অদৃশ্য অংশটাকে আমরা চোখে দেখি না, কানে শুনি না, ধরতে পারি না, ছুঁতে পারি না। অথচ সেই অদৃশ্য পৃথিবী আছে, সেই অদৃশ্য জগত আছে আমাদেরই আশেপাশে। কিন্তু সেটাকে আমরা দেখতে পাই না কেন? কারণ একটাই। সেটা দেখার জন্য আমাদের সেরকম চোখ নেই।

তাহলে কীরকম চোখ লাগবে আমাদের? খুদ্দক নিকায়ের ইতিবুত্তকের চোখসুত্রে আছে, ‘মংসচক্খু, দিব্বচক্খু, পঞ্ঞাচক্খু – ইমানি খো, ভিক্খৰে, তীণি চক্খূনী’’তি (ইতি.৬১)।’ অর্থাৎ বুদ্ধ বলেছেন, মাংসচোখ, দিব্যচোখ, প্রজ্ঞাচোখ – এই হচ্ছে ভিক্ষুগণ তিন প্রকার চোখ। এখানে মাংসচোখ মানে হচ্ছে আমাদের স্বাভাবিক চোখ। এটা দিয়েই আমরা এই দৃশ্যমান জগতকে দেখি। দিব্যচোখ দিয়ে দেখা যায় অদৃশ্য জগতটাকে। প্রজ্ঞাচোখ দিয়ে দেখা যায় চতুরার্য সত্যকে।

এখানে অন্ধদের কথা চিন্তা করুন। তাদের মাংসচোখ নেই। যেটা দিয়ে এই দৃশ্যমান জগতকে দেখা যায় সেটাই তাদের নেই। তাই তারা এই দৃশ্যমান জগতের ব্যাপারে অন্ধ। একারণেই হাতি দেখতে গিয়ে অন্ধদের কেউ বলে হাতি হচ্ছে কুলার মতো, আর কেউ বলে হাতি হচ্ছে সাপের মতো, কেউ বলে হাতি হচ্ছে ঝাড়ুর মতো। অথচ যাদের মাংসচোখ আছে, যারা হাতিকে পরিষ্কার দেখতে পায় তারা ঠিকই জানে হাতি এরকম কোনোটাই নয়।

এবার আমাদের কথা চিন্তা করুন। আমাদের মাংসচোখ আছে বটে, কিন্তু দিব্যচোখ নেই। তাই আমরা দৃশ্যমান জগতকে দেখি, কিন্তু অদৃশ্য জগতের ব্যাপারে অন্ধ। তাই অন্ধদের হাতি দেখার মতোই আমরা কেউ কেউ বলি স্বর্গ নরক আছে, কেউ বলি স্বর্গ নরক নেই, কেউ বলি সৃষ্টিকর্তা আছে, কেউ বলি সৃষ্টিকর্তা নেই।আর প্রজ্ঞাচোখ কয়জনের আছে, চতুরার্যসত্যকে কয়জন দেখতে পায় সেকথা আর বললাম না।

আমার পায়াসি রাজার কথা মনে পড়ছে। পায়াসি রাজাও আমাদের মতোই কৌতুহলী ছিলেন। নিজের চোখে না দেখে তিনি কোনো কিছুকে বিশ্বাস করতেন না। তখন কুমারকাশ্যপ ভান্তে রাজাকে বলেছিলেন, ‘ন খো, রাজঞ্ঞ, এৰং পরো লোকো দট্ঠব্বো, যথা ত্বং মঞ্ঞসি ইমিনা মংসচক্খুনা।(দীঘ.০২.৪১৮)।’ অর্থাৎ ‘হে রাজা, আপনি মনে করেছেন পরলোককে মাংসচোখে দেখা যায়। পরলোককে কিন্তু সেভাবে দেখা যায় না।’ এখানে পরলোক বলতে স্বর্গ, নরক ব্রহ্মলোক ইত্যাদি জগতকে বুঝাচ্ছে যেগুলো হচ্ছে অদৃশ্য জগতেরই অংশ। সেগুলোকে আমাদের সাধারণ চোখে দেখা যায় না। তাহলে কীভাবে সেগুলোকে দেখতে হয়? কুমারকাশ্যপ ভান্তে বুঝিয়ে দেন এভাবে, ‘যেসমস্ত শ্রমণ ব্রাহ্মণ বনে অরণ্যে নির্জনে বাস করেন, তারা সেখানে অপ্রমত্ত হয়ে ধ্যান করে দিব্যচোখের অধিকারী হন। তারা বিশুদ্ধ দিব্য চোখে ইহলোক ও পরলোকের প্রাণিদেরকে দেখেন, দেবতাদেরকেও দেখেন। এভাবেই পরলোককে দেখতে হয়।’

সোজা কথায়, আপনাকে ধ্যান করে দিব্যচোখের অধিকারী হতে হবে। সেই দিব্যচোখ দিয়েই আপনি তখন এই অদৃশ্য জগতকে দেখতে পাবেন। বর্তমান যুগে সেটা হয়তো আপনাদের কাছে অকল্পনীয় মনে হতে পারে, কিন্তু বৌদ্ধধর্মে সেই ধ্যানপদ্ধতি এখনো সগৌরবে টিকে আছে। আপনি সেই ধ্যানপদ্ধতি অনুসারে ধ্যানে নিবেদিতপ্রাণ হলে হয়তো সেরকম দিব্যচোখের অধিকারী এখনো হতে পারেন। ব্যাপারটা কঠিন বটে, তবে অসম্ভব কিছু নয়।

এখানে একটা ব্যাপার খেয়াল করুন। অন্যান্য ধর্মেও কিন্তু এধরনের অদৃশ্য জগতের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তারা সেগুলো বলে দিয়েই খালাস। স্বচক্ষে দেখার কোনো উপায়ের কথা তারা বলে না। বৌদ্ধধর্ম এদিক দিয়ে ব্যতিক্রম। এই ধর্ম আপনাদেরকে শুধু যে এই অদৃশ্য জগত সম্পর্কে বলে দেয় তা নয়। এই জীবনেই আপনি কীভাবে সেগুলো দেখতে পারেন সেটা দেখতেও আপনাকে উৎসাহিত করে। কাজেই নিরবে ধ্যানে মন দিন। ধ্যানমগ্ন হলে সেই অদৃশ্য জগতের রহস্য নিশ্চয়ই আপনার কাছে উন্মোচিত হবে একদিন নয় একদিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *