আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

অভিধর্মের প্রাথমিক শিক্ষা

অভিধর্ম প্রতিদিন একটু একটু শিখছি উঃ ছন্দৰর সেয়াদের কাছ থেকে।

আগের একদিন শিখেছিলাম, দুনিয়াতে আছে শুধু পদার্থ আর মন। সেই মনেরও ভাগ আছে। সত্ত্বদের মন যখন বিভিন্ন ধরনের ইন্দ্রিয়সুখের খোঁজে ছুটে বেড়ায় তখন তা হয় কামজগতের মন। আমাদের বেশিরভাগেরই মন হচ্ছে এই কামজগতের। আমরা হাসি, কাঁদি, বিভিন্ন কাজ করি, সবই এই কামজগতের মন নিয়ে। খুব কমই আছে যারা এই কামজগতের উর্ধ্বে যেতে পারে। ফলে তারা এই কামজগতেই বারবার জন্মাতে থাকে। সুখ দুঃখ ভোগ করতে থাকে।

আবার সত্ত্বদের কারো কারো মন সাধারণ জাগতিক সুখের প্রতি আকৃষ্ট হয় না। তাই সে ধ্যানমগ্ন হয়। তখন তার মন আর কামজগতে থাকে না। সেটা উঠে যায় সুক্ষ্ম পদার্থের জগতে। বলা যায় কোয়ান্টাম জগতে। সেটা এক আলাদা জগত। সেখানে ধ্যানীদের রাজত্ব চলে। সেই কোয়ান্টাম মনগুলো হয় প্রচণ্ড শক্তিশালী। সেই শক্তিশালী মন দিয়ে তারা তখন পদার্থকেও ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তবে সেই মন দিয়ে কিন্তু জন্মান্তর চক্রের শৃঙ্খলকে ভেঙে ফেলা যায় না।

কিন্তু যারা সেই জগতকেও পছন্দ করে না তারা তখন নিরাকারের ধ্যান করে। সেখানে আর সুক্ষ্ম পদার্থ থাকে না। সেখানে কোনো পদার্থই থাকে না। সেটা হয় পদার্থহীন জগত, আকার অবয়বহীন জগত। সেখানে থাকে কেবল মন। সেটা হচ্ছে কোয়ান্টাম জগতেরও ধরাছোঁয়ার বাইরে। মন সেখানে চুড়ান্ত রকমের শক্তিশালী হয়ে থাকে। তবে একসময় এদেরও পতন হয়।

আবার কিছু কিছু সত্ত্ব স্বচক্ষে দেখার মতো করে দেখে যে, এই জগত হচ্ছে নিয়ত পরিবর্তনশীল, পদার্থ ও মন সবসময় বদলে যাচ্ছে, সেগুলো থেকে আগে বা পরে দুঃখই আসছে, সেগুলোতে কোনো আত্মা নেই, যেন দম দেয়া পুতুল! দম শেষ, পুতুলের খেলা ভঙ্গ। এসব দেখে তার মোহ উবে যায়। তার প্রত্যেকটি কাজে, প্রত্যেকটি কথায়, প্রত্যেকটি চিন্তায় সে তখন পদার্থ ও মনের উৎপত্তি ও বিলীন হয়ে যাওয়াকেই দেখতে পায়। সে ধ্যানমগ্ন হয়। তখন সে বিদ্যুতের ঝলকানির মতো করে নির্বাণকে দেখে। সেরকম মন আর কখনো হয় নি তার। সেটা হয় এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। সেটা হয় এক অসাধারণ মন। সেই মন তখন জন্মান্তরের চক্র থেকে মুক্ত হয়। সকল দুঃখের অবসান হয়। বুদ্ধ ও অন্যান্য অর্হৎগণ বহু জন্ম জন্মান্তরের সাধনায় এমন অসাধারণ মনের অধিকারী হতে পেরেছিলেন। আমাদের সবার এমন অসাধারণ মন লাভ হোক। জন্মমৃত্যুহীন চিরশান্তির নির্বাণ লাভ হোক।

8 thoughts on “অভিধর্মের প্রাথমিক শিক্ষা

  1. বন্দনা ভান্তে। নিম্নের কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য করজোরে প্রার্থনা করছি–
    ১। শমথ ভাবনা আর বিদর্শন ভাবনার মধ্যে মৌলিক পার্থক্যগুলো কিকি?
    ২। শমথ ভাবনা কিভাবে করতে হয়?
    ৩। শুধু আনাপানা স্মৃতি করা বা শ্বাস নিচ্ছি – ফেলছি শুধু এটাই কি শমথ ভাবনার নিয়ম? এছাড়া আর কোন পার্থক্য আছে কি?
    ৪। তবে বিদর্শন ভাবনা কিভাবে করতে হয়?
    সহজ এবং প্রান্জল ভাষায় উত্তর পেলে জানতে সুবিধা হতো এবং সেভাবে প্রয়োগ করা যেতো। অনেক দিন থেকে শ্বাস নিচ্ছি ফেলছি এভাবে ১৫ মিঃ থেকে ২০ মিঃ করে ধ্যান করার চেষ্টা করছি কিন্তু মনকে স্থির করছি না? বন্দনা নিতে নিতেই মন বা চিত্ত বন্দনার উপর বেশিক্ষণ স্থির থাকেনা। বন্দনা কেবল মুখস্থ আওড়ানোই হয় মনঃসংযোগ ঘটিয়ে প্রার্থনা আর করা হয়ে উঠেনা। এরকম মন উচাটন রোগের পরিত্রান কি? আমাকে দিয়ে কি মার্গ দর্শন সম্ভব নয়?

    1. ভাবনা মানেই হচ্ছে মনটাকে কোনো একটা বিষয়ে নিয়োজিত রাখা। শমথ ভাবনায় শুধু একটা বিষয়ে মনটাকে রাখার চর্চা করতে হয়। যেমন আপনি যদি আনাপান ভাবনা করেন, তাহলে মনটাকে রাখতে হবে কেবল নাকের ডগায়। সেটা বলা খুব সহজ বটে, যারা ভাবনা করে তারা বুঝবে সেটা কেমন কঠিন। আমি প্রথম প্রথম খুব আনাপান ভাবনা করতে চেষ্টা করতাম। কিন্তু প্রায়ই এরকম হতো যে একবার শ্বাস নিয়েছি, শ্বাস ফেলেছি, তারপরেই মনটা কোথায় উধাও হয়ে যেত। কত বছর ধরে চেষ্টা করতে হয়েছে আমার। এখনো চেষ্টা চলছে!
      আপনি যদি পাঅক ভাবনাকেন্দ্রে যান, তাহলে সেয়াদ প্রথমেই আপনাকে জিজ্ঞেস করবেন, আপনি কতক্ষণ নাকের ডগায় মনটাকে রাখতে পারেন? খুব সহজ পদ্ধতি। কেবল মনটাকে নাকের ডগায় রাখতে হবে, শ্বাসপ্রশ্বাস নাকের ডগায় যেখানে স্পর্শ করে সেই স্পর্শের জায়গাটাতে মনটাকে রাখতে হবে। যদি এখন ১ মিনিট পারেন তো চেষ্টা করুন ২ মিনিট সেখানে ধরে রাখার জন্য। ২মিনিট পারলে এবার চেষ্টা করুন ৫ মিনিট ধরে রাখার জন্য। দিনে কমপক্ষে ৪/৫ বার ধ্যানে বসুন। প্রতিবারে বসলে কমপক্ষে ২০/ ৩০ মিনিট করে বসুন। এভাবে একনাগাড়ে চেষ্টা করলে দেখবেন আস্তে আস্তে মনটা স্থির হচ্ছে। কমপক্ষে ৩০ মিনিট বা ৪০ মিনিট ধরে রাখতে পারলেই সাধারণত আলো দেখতে পাবেন। বহু দৃশ্য দেখতে পাবেন যেন বাস্তবের চেয়েও বাস্তব। হয়তো সুন্দর স্বর্গীয় দৃশ্য দেখতে পাবেন, আবার ভয়ংকর কিছুও দেখতে পারেন। সেগুলো মনের কল্পনা মাত্র। সেগুলোতে ভয় পাবেন না, আবার আসক্তও হবেন না। মনে মনে বলুন, এগুলো মনের কল্পনা। এরপর আবার নাকের ডগায় মন রাখুন।

      ৩০/৪০ মিনিট ধরে মনোযোগ রাখতে পারলে আলো আসে। আমরা সেটাকে বলি নিমিত্ত। আলো সাধারণত দুভাবে আসে। কারো কারো প্রথমে হালকা কুয়াশার মতো ধ্যানের আলো ফুটতে থাকে। এরপর মনোযোগ দৃঢ় হতে থাকলে সেই আলোও উজ্জ্বল হয়ে আসে। পরে এত উজ্জ্বল হয় যে মনে হয় সারা দুনিয়া আলোয় ভরে গেছে। দিনের আলো সেটার কাছে নস্যি! কিন্তু আপনি নির্বিকার মনে নাকের ডগায় মন রাখতে পারলে সেই আলোটা মিলিয়ে গিয়ে নাকের ডগায় উজ্জ্বল হয়ে স্থির হয়ে যাবে। কারো কারো সেটা আলো নয়, বরং ঝলমলে হীরের মতো ঝিকমিকি করে।
      আবার কারো কারো ধ্যানের আলো আসে না। সরাসরি নাকের ডগায় আলোর গোলক এসে স্থির হয়।

      যেভাবেই আসুক না কেন, যতক্ষণ পর্যন্ত আলো এসে আপনার নাকের ডগায় স্থির না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি নাকের ডগায় মন দেবেন। আলো আসুক কি অন্ধকার আসুক তা কেয়ার করবেন না।

  2. ভান্তে, বন্দনা।
    ১. চিত্তক্ষণ কী? ১ চিত্তক্ষণ বলতে কী বোঝায়? এটি কীভাবে গঠিত হয়? এর অংশগুলো কী কী? ১ সেকেন্ডে কতটি চিত্ত/চিত্তক্ষণ অতিবাহিত হয়?
    ২. স্রোতাপত্তি মার্গ লাভ এবং অর্হত্ত্ব ফল লাভ, বুদ্ধের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটি কি পরপর হয়েছে? অর্থাৎ বুদ্ধের কি কেবল ৮ চিত্তক্ষণ লেগেছে? বুদ্ধত্ত্ব লাভের সময় রাতের প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় প্রহরে বুদ্ধ যে ঋদ্ধি অর্জন করেছেন সবগুলোই কি বুদ্ধত্ত্ব লাভের আগে?
    ৩. বুদ্ধ কি বাল্যকালেই অষ্টসমাপত্তি লাভী ছিলেন?

    1. ১. আমাদের মনে একের পর এক চিত্ত উৎপন্ন হয়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বিরামহীনভাবে। সেই একেকটা চিত্তের উৎপত্তি, স্থিতি ও বিলীন হওয়ার মুহুর্তকে বলা হয় এক চিত্তক্ষণ। অভিধর্মমতে, এক তুড়ি ক্ষণেই নাকি আমাদের মনের মধ্যে লক্ষ কোটি চিত্ত উৎপন্ন হয়ে যায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ১ সেকেণ্ডে আপনি কয়টা তুড়ি মারতে পারবেন?
      ২. মার্গ লাভ হয় মার্গচিত্তবীথিতে। মার্গচিত্তের পর দুটো বা তিনটা ফলচিত্ত উৎপন্ন হয়। এরপর ভবাঙ্গচিত্তগুলো উৎপন্ন হয়। আবার মার্গচিত্ত উৎপন্ন হলে তারপরে দুটো বা তিনটা ফলচিত্ত উৎপন্ন হয়। এরপর অসংখ্য ভবাঙ্গচিত্ত উৎপন্ন হয়। সোজা কথায়, বাইরে থেকে দেখে মুহুর্তের মধ্যে অর্হত্ব লাভ হয়েছে মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে সেখানে অসংখ্য চিত্তক্ষণ লাগে।
      ৩. জ্বি না। অষ্টসমাপত্তি হচ্ছে অরূপ ধ্যান লাভী হওয়া। সেটা হয় না-সংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞা ধ্যান লাভী হলে। সেটা তিনি গৃহত্যাগের পরে কেবল উদক রামপুত্রের কাছে গিয়ে শিখেছিলেন। কিন্তু সেই ধ্যানে দুঃখমুক্তি হয় নি। তাই এর পরে তিনি ছয় বছর ধরে কঠোর সাধনায় নেমেছিলেন।

  3. ভান্তে, বন্দনা। স্রোতাপত্তি, সকৃদাগামি, অনাগামি, অর্হত্ত্ব মার্গফললাভীরা ধ্যান অনুশীলনের শুরুতে কি কর্মস্থান অর্থাৎ শমথ ভাবনা দিয়ে শুরু করে চিত্ত সমাধিস্থ হওয়ার পর বিদর্শনে প্রবেশ করেন নাকি ধ্যানে বসা মাত্রই তারা বিদর্শনে প্রবেশ করতে পারেন নাকি তাদের চিত্তে সর্বদা বিদর্শন বিদ্যমান? অর্থাৎ শমথ ভাবনা কি তাদের জন্য অপ্রয়োজনীয় নাকি শমথ ধ্যান ব্যবহার করেই তারা বিদর্শনে প্রবেশ করেন নাকি তারা কেবলমাত্র বিদর্শন চর্চা করেন?

    1. শমথ ধ্যান শেষে বিদর্শন করলেও হয়, আবার সরাসরি বিদর্শন চর্চা করলেও হয়। শমথ ধ্যান খুব কঠিন। তার চেয়ে সরাসরি বিদর্শনে যাওয়াটা সোজা। তাই বর্তমানে বিদর্শনের এত জয়জয়কার। তবে এটা ঠিক, বিদর্শন চর্চা ছাড়া নির্বাণ অসম্ভব।

      1. কেও যদি স্রোতাপন্ন হয় তার কি আর সমথ ভাবনার দরকার হয় নাকি সরাসরি বিদর্শনে প্রবেশ করতে পারে?

        1. স্রোতাপন্ন ব্যক্তি ইতিমধ্যেই নির্বাণকে দেখে ফেলেছে একবার। তাই তার আর শমথের প্রতি আগ্রহ না জাগাটাই স্বাভাবিক। তার ঝোঁক থাকবে সরাসরি বিদর্শনে। কিন্তু সে যদি শমথ চর্চা করতে চায় তাহলে সে শমথ ভাবনাও চর্চা করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *