আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

কর্মপ্রক্রিয়া : কর্ম যেভাবে কাজ করে

কর্মতত্ত্ব নিয়ে বাংলায় তেমন উল্লেখযোগ্য বই আমার পড়া হয় নি। শুধু জ্যোতিপাল মহাথেরোর কর্মতত্ত্ব বইটা পড়েছিলাম। পরে পাঅক সেয়াদের বইগুলোর মধ্যে পেলাম The Workings of Kamma. সেটা পেয়ে মহা উৎসাহে অনুবাদ শুরু করে দিয়েছিলাম। কিন্তু অন্যান্য কাজে ব্যস্ত হয়ে যাওয়াতে সেটা আর করা হয় নি। দীর্ঘ কয়েক বছর পর আমার সতীর্থ বিমুক্তিসার ভিক্ষুর অনুরোধে আবার বইটার অনুবাদ শুরু করলাম। কর্ম ও তার ব্যাখ্যাগুলো সাধারণজনের কাছে নিরস মনে হতে পারে, তবে অনুসন্ধিৎসু পাঠকগণের কাছে এটা অমূল্য জিনিস। তাই এর প্রথম দুয়েক পাতার অনুবাদ তুলে দিলাম। ——————————————————————————————
কর্মপ্রক্রিয়া : কর্ম যেভাবে কাজ করে
এখানে আমরা দুটো প্রধান সুত্র নিয়ে আলোচনা করবো। একটিকে বলা হয় গদ্দুলবদ্ধ-সুত্তং (রশিতে আবদ্ধ সুত্র), অন্যটিকে বলা হয় দুতিয-গদ্দুলবদ্ধ-সুত্তং (দ্বিতীয় রশিতে আবদ্ধ সুত্র)। আমরা প্রথমটা দিয়ে শুরু করব। সেখানে বলা হয়েছে-
আমি এরূপ শুনেছি। একসময় ভগবান বুদ্ধ শ্রাবস্তীর জেতবনে অনাথপিণ্ডিকের বিহারে অবস্থান করছিলেন। সেখানে ভগবান ভিক্ষুদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন: ভিক্ষুগণ, সংসারের শুরুটা অচিন্তনীয়। অবিদ্যার আবরণে আচ্ছন্ন, তৃষ্ণার শৃঙ্খলে আবদ্ধ, দিগ্বিদিক ছুটোছুটি করতে থাকা সত্ত্বদের প্রথম শুরুটা জানা যায় না। (সং.নি.৩.৯৯)
বুদ্ধ এখানে সংসার নিয়ে আলোচনা করেছেন, প্রাণিদের এক জগত থেকে আরেক জগতে ধাবিত হওয়া নিয়ে (এখন মানুষ, পরজন্মে হয়তো দেবতা, এরপরে কোনো ইতর প্রাণি, এরপরে আবার হয়তো মানুষ ইত্যাদিরূপে জন্মগ্রহণ করা নিয়ে) আলোচনা করেছেন, এবং এক জগতের মধ্যেই বারবার ঘুরতে থাকা নিয়ে (বারবার মানুষ হিসেবে জন্মানো, অথবা বারবার দেবতা হিসেবে জন্মানো ইত্যাদি নিয়ে) আলোচনা করেছেন। এই ক্রমাগত চলতে থাকা প্রক্রিয়াটির পেছনে বুদ্ধ দুটো প্রধান কারণকে উল্লেখ করেছেন: অবিদ্যা এবং তৃষ্ণা। আমাদের দৈনন্দিন কাজগুলোর মধ্যে কর্মশক্তি থাকতে হলে সেখানে অবিদ্যা ও তৃষ্ণা থাকতে হয়। এই কর্মশক্তি হচ্ছে এমন একটি শক্তি, যার দ্বারা স্বেচ্ছাকৃত দৈহিক, বাচনিক অথবা মানসিক কাজগুলো কর্মফল উৎপন্ন করতে সক্ষম হয়। এই শক্তিকে ‘অন্যক্ষণিক কর্ম’(নানাখণিক-কম্ম)ও বলা হয়, কারণ আমরা কর্ম উৎপন্ন করি কোনো একটি নির্দিষ্ট সচেতন ক্ষণে, আর সেই কর্মটি পরিপক্ক হলে, তার কর্মশক্তি সেই কর্মের ফলকে প্রদান করে অন্য আরেকটি ক্ষণে: সেটা হয় এই জীবনে, অথবা অন্য কোনো ভবিষ্যৎ জন্মে। কিন্তু অবিদ্যা ও তৃষ্ণাহীন কাজের মধ্যে এই কর্মশক্তি থাকে না।
এখন এই অবিদ্যা কী? বিশুদ্ধি-মার্গে এটিকে এভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে: পারমার্থিকভাবে অবিদ্যমান নারী, পুরুষের মাঝে এটি ধাবিত হয়; কিন্তু বিদ্যমান স্কন্ধ ইত্যাদির মাঝে এটি ধাবিত হয় না…(বিশুদ্ধিমার্গ.৫৮৭)
এর মানে কী? এর মানে হচ্ছে, অবিদ্যা শুধুমাত্র প্রচলিত সত্যকে (সম্মুতিসচ্চ) দেখে, অর্থাৎ এটি শুধুমাত্র নারী-পুরুষ, মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, কুকুর, বিড়াল, শুয়োর, মুরগি ইত্যাদি দেখে। এভাবে দেখাটা ভুল, কারণ বাস্তবে (যথাভূত) এই জিনিসগুলোর অস্তিত্ব নেই। বাস্তবে যেসব জিনিসের অস্তিত্ব আছে সেগুলো হচ্ছে স্কন্ধ বা পুঞ্জ, ধাতু, আয়তন বা ভিত্তি, নামরূপ বা মন ও পদার্থ, কারণসাপেক্ষ উৎপত্তি বা প্রতীত্য-সমুৎপাদ, কর্মপ্রক্রিয়া, ত্রিলক্ষণ ইত্যাদি, অর্থাৎ সংক্ষেপে, চারি আর্যসত্যেরই অস্তিত্ব আছে। এসব জিনিস, যেগুলো পরমার্থ সত্য, সেগুলোকে অবিদ্যা দেখে না। একারণেই আমরা যদি ভাবি: ‘এ হচ্ছে নারী, এ হচ্ছে পুরুষ, মা, বাবা, পুত্র, কন্যা ইত্যাদি,’ তখন এটি হয় সত্ত্বের ধারণা (সত্তসঞ্ঞা) মাত্র, যা হচ্ছে অবিদ্যারই বহিঃপ্রকাশ। আর সেই অবিদ্যাই হচ্ছে কর্মের হেতু, যেকারণে সত্ত্বরা জন্ম থেকে জন্মান্তরে পরিভ্রমণ করতে থাকে, দুঃখ থেকে দুঃখান্তরে পরিভ্রমণ করতে থাকে।
অবিদ্যা হচ্ছে এমনটি ভাবা যে, নারী আছে, পুরুষ আছে, বাবা আছে, মা আছে, পুত্র আছে, কন্যা আছে, ইত্যাদি। এভাবে ভাবাটা ভুল, কারণ প্রকৃতপক্ষে সেখানে কোনো নারী নেই, পুরুষ নেই, ইত্যাদি। পারমার্থিকভাবে সেখানে শুধুমাত্র নামরূপ বা মন ও পদার্থ আছে। এখন এই রূপ বা পদার্থকে পরীক্ষা করার জন্য আমাদের রূপভাবনা (রূপ-কম্মট্ঠান) চর্চা করতে হয়, অর্থাৎ চারধাতু ভাবনা চর্চা করতে হয়। তখন আমরা ঠিকই পদার্থের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণাগুলোকে দেখি, যেগুলো হচ্ছে পদার্থের গুচ্ছ (রূপকলাপ)। আমরা যদি সেই ক্ষুদ্র কণাগুলোকে বিশ্লেষণ করি, তখন আমরা পারমার্থিক পদার্থকে দেখি: যা হচ্ছে সব মিলিয়ে আটাশ ধরনের।
পদার্থ ছাড়াও আছে মন, যা পদার্থের উপরে নির্ভর করে। মনকে পরীক্ষা করার জন্য আমাদের মনভাবনা (নাম-কম্মট্ঠান) চর্চা করতে হয়। তখন আমরা ঠিকই আমাদের মনের মধ্যে চলতে থাকা বিভিন্ন ধরনের মানসিক প্রক্রিয়াগুলোর সচেতন মুহুর্তগুলোকে দেখি। আমরা সেই সচেতন মুহুর্তগুলোকে বিশ্লেষণ করলে পারমার্থিক মনকে দেখতে পাই: সব মিলিয়ে একাশি ধরনের মন, সাথে আছে সেগুলোর সহযোগী মানসিক উপাদানগুলো। সেখানে আর অন্য কিছু নেই: শুধুমাত্র পদার্থ ও মন। সেই পদার্থ ও মনগুলো উৎপন্ন হয়েই বিলীন হয়ে যায়, যার মানে হচ্ছে সেগুলো অস্থায়ী বা অনিত্য। যেহেতু সেগুলো অনিত্য, সেগুলোতে তাই কোনো স্থায়ী সত্ত্ব যেমন- নারী, পুরুষ, বাবা, মা, পুত্র, কন্যা ইত্যাদি থাকতে পারে না। যদি কেউ মনে করে যে এ ধরনের সত্ত্ব আছে, তাহলে সেটি হচ্ছে অবিদ্যারই বহিঃপ্রকাশ।
এমন অবিদ্যা থাকলে, সেই অবিদ্যমান বস্তুগুলোর জন্য তৃষ্ণা উৎপন্ন হতে পারে। আর যখন আমাদের দৈহিক, বাচনিক ও মানসিক কাজগুলো এমন অবিদ্যা ও তৃষ্ণার সাথে জড়িয়ে যায়, তখন আমাদের কাজগুলো কর্মশক্তি পায়, সেগুলো তখন কর্মে পরিণত হয়। সেই কর্মগুলো যদি পরিপক্ক হয়, তা কোনো ভালো বা খারাপ ফল দেয়, আর আমরা সেই ফলস্বরূপ সংসারের চক্রে দিগ্বিদিক ছুটতে থাাকি, পরিভ্রমণ করতে থাকি। একারণেই এই সুত্রে বুদ্ধ বলেছেন: ভিক্ষুগণ, সংসারের শুরুটা অচিন্তনীয়। অবিদ্যার আবরণে আচ্ছন্ন, তৃষ্ণার শৃঙ্খলে আবদ্ধ, দিগ্বিদিক ছুটোছুটি করতে থাকা সত্ত্বদের প্রথম শুরুটা জানা যায় না।
এরপরে বুদ্ধ ব্যাখ্যা করেছেন, কীভাবে ভবিষ্যতে এই মহাবিশ্ব ধ্বংস হবে। তবে তা আর এখানে লিখব না। অাগ্রহীগণ বইটা বের হলে তখন সেটা পড়ে জানতে পারবেন। রেফারেন্স: সংযুত্তনিকায=>খন্ধৰগ্গপাল়ি=>১. খন্ধসংযুত্তং => ৭.গদ্দুলবদ্ধসুত্তং সংযুত্তনিকায=>খন্ধৰগ্গপাল়ি=>১. খন্ধসংযুত্তং => ৮.দুতিযগদ্দুলবদ্ধসুত্তং

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *